১
হাফেয ইবন কাসীরের তাফসীর থেকে সংক্ষেপিত সূরা আল-আনফালের তাফসীর
লেখকঃ শাইখ আহমদ মুহাম্মাদ শাকের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১২
মুসলিমবৃন্দের সাহায্য প্রার্থনা এবং ফিরিশতা পাঠিয়ে তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার সাড়া প্রদান:
ইমাম বুখারী রহ. আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের দিন বলেন, «اللَّهُمَّ أَنْشُدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ، اللَّهُمَّ إِنْ شِئْتَ لَمْ تُعْبَدْ» “হে আল্লাহ, আমি আপনার কৃত অঙ্গিকারের জন্য আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি, হে আল্লাহ আপনি যদি চান যে আপনার ইবাদাত করা হবে না”। (এমন সময়) আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাত ধরে বলেন, আপনার জন্য যথেষ্ট হয়েছে, এমন সময় তিনি বলতে বলতে বের হন: «سَيُهْزَمُ الجمع وَيُوَلُّونَ الدبر» “জামা‘আত (মুশরিকরা) পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করবে”। [নাসাঈ, হাদীস নং ১১৫৫৭; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৯৫৩]
আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী: بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلائِكَةِ مُرْدِفِينَ “এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে সাহায্য করব -যারা পর পর আসবে” অর্থাৎ একের পর এক আসবে, যেমন হারুন ইবন হুবাইরাহ আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, مُرْدِفِينَ অর্থাৎ যারা পর পর আসবে। এ অর্থ হওয়ারও সম্ভাবনা আছে مُرْدِفِينَ অর্থাৎ তোমাদের সাহায্যার্থে। যেমনটি আউফী ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন। মুজাহিদ, ইবন কাসীর ও ইবন যায়েদ আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেন, مُرْدِفِينَ অর্থাৎ সাহায্য, যেমন তুমি লোককে বল, তুমি তাকে এমন এমন বাড়িয়ে দাও। ইবন জারির রহ. বলেন, রাসূলের ডানে যাতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ছিলেন, জিবরীল আলাহিস সালাম এক হাজার ফিরিশতা নিয়ে অবতরণ করেন। আর রাসূলের বামে মিকাইল ফিরিশতা এক হাজার ফিরিশতার মধ্যে অবতরণ করেন। যদি সনদটি শুদ্ধ হয়, তার অর্থ এক হাজারের পিছনে আরো এক হাজার অবতরণ করেন। এ কারণেই অনেকে مُرْدِفِينَ কে দাল-এর উপর যবরের সাথে পড়েছেন। প্রসিদ্ধ হলো যা আলী ইবন আবু তালহা বর্ণনা করেন: আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুমিনগণকে এক হাজার ফিরিশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেন, একদিকে তিনি জিবরীল আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে পাঁচশত ফিরিশতা পাঠান, অপর দিকে মিকাঈল আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে পাঠান পাঁচশত ফিরিশতা। ইমাম আবু জাফর ইবন জারীর এবং ইমাম মুসলিম রহ. আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এবং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাতে রয়েছে: জনৈক মুসলিম তার সম্মুখে এক মুশরিকের পশ্চাদ্ধাবন করেন হঠাৎ তিনি উপরে বেত্রাঘাত এবং অশ্বারোহীর শব্দ শুনতে পান সে বলছে: এস, হে হাইযূম। তিনি হঠাৎ মুশরিকটির দিকে তাকিয়ে দেখেন সে জমিনে পড়ে আছে, তিনি তার দিকে তাকিয়ে দেখেন তার নাক কেটে গেছে আর তার চেহার বিদীর্ণ হয়েছে, যেন সে এতে ছড়ির আঘাত পেয়েছে আর তার চেহারা সম্পূর্ণরূপে সবুজ হয়ে গেছে, আনসারী ব্যক্তিটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে এ কথা জানালে তিনি বলেন, তুমি সত্য বলেছ, সেটা ছিল তৃতীয় আসমানের সাহায্য। সেদিন সত্তরজন নিহত হয় আর বন্দী হয় সত্তরজন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, “পরিচ্ছেদ: বদরে ফিরিশতাদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে”। এরপর রিফা‘আহ ইবন রাফি‘ আয-যুরাক্বী রহ. বর্ণনা করেন, তিনি ছিলেন বদরী সাহাবী, তিনি বলেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলেন, যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তাদের সম্মান কিরূপ, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «مِنْ أَفْضَلِ الْمُسْلِمِينَ» ‘তারা হচ্ছে সর্বোত্তম মুসলিম’ অথবা এ জাতীয় কোনো কথা বলেন। তিনি বলেন, অনুরূপ সম্মান সে সমস্ত ফিরিশতাদের যারা বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ইমাম বুখারী এককভাবে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। ত্বাবরানী মু‘জামুল কাবীরে রাফি‘ ইবন খাদীজ থেকে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন তা ভুল, বিশুদ্ধ হচ্ছে বুখারীর বর্ণনা। আল্লাহ ভালো জানেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমারকে বলেন যখন তিনি হাতিব ইবন আবু বালতা‘আকে হত্যা করার পরামর্শ দেন: «إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللَّهَ قَدِ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غفرت لكم؟» “সে বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে, আর তুমি কি জান না, আল্লাহ তা‘আলা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি তাকিয়ে বলেন, তোমাদের যা খুশি কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৯৮৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৯৪]
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى “আর আল্লাহ যে এটি করেছিলেন তার উদ্দেশ্য তোমাদেরকে সুসংবাদ দান ছাড়া অন্য কিছু নয়” অর্থাৎ ফিরিশতামণ্ডলীকে প্রেরণ এবং এ বিষয়টি সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিতকরণকে করেছেন তোমাদের জন্য সু-সংবাদস্বরূপ।
وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُم “আর যাতে এর মাধ্যমে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি ঘটে” নয়ত আল্লাহ তা‘আলা এটি ছাড়াই তোমাদের শত্রুদের ওপরে তোমাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَا النَّصْرُ إِلا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ “সাহায্য তো একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকেই আসে” যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فَإِذَا لَقِيتُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فَضَرۡبَ ٱلرِّقَابِ حَتَّىٰٓ إِذَآ أَثۡخَنتُمُوهُمۡ فَشُدُّواْ ٱلۡوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّۢا بَعۡدُ وَإِمَّا فِدَآءً حَتَّىٰ تَضَعَ ٱلۡحَرۡبُ أَوۡزَارَهَاۚ ذَٰلِكَۖ وَلَوۡ يَشَآءُ ٱللَّهُ لَٱنتَصَرَ مِنۡهُمۡ وَلَٰكِن لِّيَبۡلُوَاْ بَعۡضَكُم بِبَعۡضٖۗ وَٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَلَن يُضِلَّ أَعۡمَٰلَهُمۡ ٤ سَيَهۡدِيهِمۡ وَيُصۡلِحُ بَالَهُمۡ ٥ وَيُدۡخِلُهُمُ ٱلۡجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمۡ ٦﴾ [ محمد : ٤، ٦ ] “অতঃপর যখন তোমরা কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত হানো, অবশেষে যখন তাদেরকে পূর্ণরূপে পরাস্ত কর, তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে ফেল। অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ কর। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে। এ নির্দেশই তোমাদেরকে দেওয়া হলো। আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে (নিজেই) তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান (এজন্য তোমাদেরকে যুদ্ধ করার সুযোগ দেন)। যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয় তিনি তাদের কর্মফল কক্ষনো বিনষ্ট করবেন না। তিনি তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন আর তাদের অবস্থা ভালো করে দেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন যা তাদেরকে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন”। [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৪-৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿وَتِلۡكَ ٱلۡأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيۡنَ ٱلنَّاسِ وَلِيَعۡلَمَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَيَتَّخِذَ مِنكُمۡ شُهَدَآءَۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلظَّٰلِمِينَ ١٤٠ وَلِيُمَحِّصَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَيَمۡحَقَ ٱلۡكَٰفِرِينَ ١٤١﴾ [ ال عمران : ١٤٠، ١٤١ ] (জয়-পরাজয়ের) “এ দিনগুলোকে আমরা মানুষের মধ্যে আবর্তিত করে থাকি যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে চিনে নিতে পারেন এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, বস্তুত আল্লাহ যালিমদেরকে ভালোবাসেন না এবং (এ জন্যেও) যেন আল্লাহ মুমিনদেরকে সংশোধন করেন ও কাফেরদের নিশ্চিহ্ন করেন”। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৪০-১৪১] এ হচ্ছে প্রজ্ঞা যার জন্য আল্লাহ তা‘আলা মুমিনগণের হাতের মাধ্যমে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদের আইন প্রদান করেছেন। অন্যথায় আল্লাহ তা‘আলা পূর্বের জাতিসমূহকে তাদের নবীগণকে অস্বীকার করার কারণে বিভিন্ন ধরণের বিপর্যয় দিয়ে শাস্তি দিয়েছিলেন যা সেই মিথ্যা সাব্যস্তকারী জাতিসমূহকে ঘিরে ধরেছিল। যেমন, তিনি নূহ আলাইহিস সালামের জাতিকে তুফান দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন, আদকে বায়ু দ্বারা, সামূদকে প্রচণ্ড আওয়াজ দ্বারা, লূত আলাইহিস সালামের জাতিকে ভুমিধস, উল্টে দেওয়া ও সিজ্জীলের পাথর দ্বারা, শু‘আইব আলাইহিস সালামের কাওমকে ছায়ার দিবসের দ্বারা। এরপর যখন আল্লাহ তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেন, তখন তিনি তার শত্রু ফির‘আউন এবং তার জাতিকে সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেন এরপর তিনি মূসা আলাইহিস সালামের ওপরে তাওরাত অবতীর্ণ করেন, সেখানে তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বিধান আরোপ করেন। এ বিধান তার পরে পরবর্তী শরী‘আতসমূহে টিকে থাকে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَلَقَدۡ ءَاتَيۡنَا مُوسَى ٱلۡكِتَٰبَ مِنۢ بَعۡدِ مَآ أَهۡلَكۡنَا ٱلۡقُرُونَ ٱلۡأُولَىٰ بَصَآئِرَ لِلنَّاسِ ٤٣﴾ [ القصص : ٤٣ ] “আমি পূর্ববর্তী অনেক মানব গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার পর মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা” [সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৪৩] মুমিনগণের কাফেরদেকে হত্যা করা, কাফেরদের জন্য চরম অপমানজনক। এতে মুমিনগণের আত্মা ঠাণ্ডা হয়। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা নিন্মোক্ত আয়াতে মুমিনগণের জন্য বলেন, قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ [ التوبة : ١٤ ] “তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, তোমাদের হাত দিয়েই আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন, তাদেরকে অপমানিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে সাহায্য করবেন আর মুমিনদের অন্তর ঠাণ্ডা করবেন”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১৪] এ কারণে কুরাইশ কাফেরদের তুচ্ছজ্ঞান করা শত্রুদের হাতে নিহত হওয়া ছিল তাদের জন্য বেশি অপমানজনক আর বিশ্বাসী দলের অন্তরের জন্য ছিল শীতলকারী। যেমন, আবু জাহল যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয় আর এটি ছিল তার জন্য তার বিছানায় মৃত্যুর চেয়ে অধিক অপমানজনক। আলো, বাতাস অথবা এ জাতীয় কষ্টক্লেশ থেকে। যেমন, আবু লাহাব (তার ওপর আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপ) গুটিবসন্তে মারা যায়, তার নিকট আত্মীয়দের কেউ আসে নি, দুরে থেকে পানি নিক্ষেপ করে তারা তাকে গোসল দিয়েছিল, আর পাথর নিক্ষেপ করে তারা তাকে দাফন করেছিল। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ “আল্লাহ তো মহাপরাক্রমশালী” অর্থাৎ সম্মান আল্লাহ তা‘আলার, তাঁর রাসূলের এবং মুমিনগণের দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জগতে। যেমন, তিনি বলেন, ﴿إِنَّا لَنَنصُرُ رُسُلَنَا وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَيَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡأَشۡهَٰدُ ٥١﴾ [ غافر : ٥١ ] “আমি আমার রসূলদেরকে আর মুমিনদেরকে অবশ্যই সাহায্য করব দুনিয়ার জীবনে আর (কিয়ামতে) যে দিন সাক্ষীরা দাঁড়াবে”। [সূরা আল-গাফির, আয়াত: ৫১] حَكِيم “মহাবিজ্ঞানী” কাফেরদের হত্যার যে বিধান তিনি দিয়েছেন তাতে, অথচ তিনি আপন শক্তি ও ক্ষমতায় তাদেরকে ধ্বংস করে দিতে পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী।
﴿إِذۡ يُغَشِّيكُمُ ٱلنُّعَاسَ أَمَنَةٗ مِّنۡهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيۡكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ لِّيُطَهِّرَكُم بِهِۦ وَيُذۡهِبَ عَنكُمۡ رِجۡزَ ٱلشَّيۡطَٰنِ وَلِيَرۡبِطَ عَلَىٰ قُلُوبِكُمۡ وَيُثَبِّتَ بِهِ ٱلۡأَقۡدَامَ ١١ إِذۡ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ أَنِّي مَعَكُمۡ فَثَبِّتُواْ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْۚ سَأُلۡقِي فِي قُلُوبِ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلرُّعۡبَ فَٱضۡرِبُواْ فَوۡقَ ٱلۡأَعۡنَاقِ وَٱضۡرِبُواْ مِنۡهُمۡ كُلَّ بَنَانٖ ١٢ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ شَآقُّواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥۚ وَمَن يُشَاقِقِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَإِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ١٣ ذَٰلِكُمۡ فَذُوقُوهُ وَأَنَّ لِلۡكَٰفِرِينَ عَذَابَ ٱلنَّارِ ١٤﴾ [ الانفال : ١١، ١٤ ]
অর্থানুবাদ:
“স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তাঁর নিকট হতে প্রশান্তি ধারা হিসেবে তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেছিলেন, আকাশ থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলেন তোমাদেরকে তা দিয়ে পবিত্র করার জন্য। তোমাদের থেকে শায়ত্বানী পংকিলতা দূর করার জন্য, তোমাদের দিলকে মজবুত করার জন্য আর তা দিয়ে তোমাদের পায়ের ভিত শক্ত করার জন্য। স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফিরিশতাদের প্রতি অহী পাঠিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি; অতএব, মুমিনদেরকে তোমরা দৃঢ়পদ রেখ’। অচিরেই আমি কাফেরদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করব, কাজেই তাদের স্কন্ধে আঘাত হান, আঘাত হান প্রত্যেকটি আঙ্গুলের গিঁটে গিঁটে। এর কারণ, তারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতা করে আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করবে (তাদের জেনে রাখা দরকার) আল্লাহ শাস্তিদানে বড়ই কঠোর। এটিই তোমাদের শাস্তি, অতএব তার স্বাদ গ্রহণ কর, কাফেরদের জন্য আছে আগুনের (জাহান্নামের) শাস্তি।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১১-১৪]
তাফসীর:
আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী: بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلائِكَةِ مُرْدِفِينَ “এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে সাহায্য করব -যারা পর পর আসবে” অর্থাৎ একের পর এক আসবে, যেমন হারুন ইবন হুবাইরাহ আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, مُرْدِفِينَ অর্থাৎ যারা পর পর আসবে। এ অর্থ হওয়ারও সম্ভাবনা আছে مُرْدِفِينَ অর্থাৎ তোমাদের সাহায্যার্থে। যেমনটি আউফী ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন। মুজাহিদ, ইবন কাসীর ও ইবন যায়েদ আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেন, مُرْدِفِينَ অর্থাৎ সাহায্য, যেমন তুমি লোককে বল, তুমি তাকে এমন এমন বাড়িয়ে দাও। ইবন জারির রহ. বলেন, রাসূলের ডানে যাতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ছিলেন, জিবরীল আলাহিস সালাম এক হাজার ফিরিশতা নিয়ে অবতরণ করেন। আর রাসূলের বামে মিকাইল ফিরিশতা এক হাজার ফিরিশতার মধ্যে অবতরণ করেন। যদি সনদটি শুদ্ধ হয়, তার অর্থ এক হাজারের পিছনে আরো এক হাজার অবতরণ করেন। এ কারণেই অনেকে مُرْدِفِينَ কে দাল-এর উপর যবরের সাথে পড়েছেন। প্রসিদ্ধ হলো যা আলী ইবন আবু তালহা বর্ণনা করেন: আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুমিনগণকে এক হাজার ফিরিশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেন, একদিকে তিনি জিবরীল আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে পাঁচশত ফিরিশতা পাঠান, অপর দিকে মিকাঈল আলাইহিস সালামের নেতৃত্বে পাঠান পাঁচশত ফিরিশতা। ইমাম আবু জাফর ইবন জারীর এবং ইমাম মুসলিম রহ. আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এবং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাতে রয়েছে: জনৈক মুসলিম তার সম্মুখে এক মুশরিকের পশ্চাদ্ধাবন করেন হঠাৎ তিনি উপরে বেত্রাঘাত এবং অশ্বারোহীর শব্দ শুনতে পান সে বলছে: এস, হে হাইযূম। তিনি হঠাৎ মুশরিকটির দিকে তাকিয়ে দেখেন সে জমিনে পড়ে আছে, তিনি তার দিকে তাকিয়ে দেখেন তার নাক কেটে গেছে আর তার চেহার বিদীর্ণ হয়েছে, যেন সে এতে ছড়ির আঘাত পেয়েছে আর তার চেহারা সম্পূর্ণরূপে সবুজ হয়ে গেছে, আনসারী ব্যক্তিটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে এ কথা জানালে তিনি বলেন, তুমি সত্য বলেছ, সেটা ছিল তৃতীয় আসমানের সাহায্য। সেদিন সত্তরজন নিহত হয় আর বন্দী হয় সত্তরজন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, “পরিচ্ছেদ: বদরে ফিরিশতাদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে”। এরপর রিফা‘আহ ইবন রাফি‘ আয-যুরাক্বী রহ. বর্ণনা করেন, তিনি ছিলেন বদরী সাহাবী, তিনি বলেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলেন, যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তাদের সম্মান কিরূপ, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «مِنْ أَفْضَلِ الْمُسْلِمِينَ» ‘তারা হচ্ছে সর্বোত্তম মুসলিম’ অথবা এ জাতীয় কোনো কথা বলেন। তিনি বলেন, অনুরূপ সম্মান সে সমস্ত ফিরিশতাদের যারা বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ইমাম বুখারী এককভাবে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। ত্বাবরানী মু‘জামুল কাবীরে রাফি‘ ইবন খাদীজ থেকে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন তা ভুল, বিশুদ্ধ হচ্ছে বুখারীর বর্ণনা। আল্লাহ ভালো জানেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমারকে বলেন যখন তিনি হাতিব ইবন আবু বালতা‘আকে হত্যা করার পরামর্শ দেন: «إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللَّهَ قَدِ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غفرت لكم؟» “সে বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে, আর তুমি কি জান না, আল্লাহ তা‘আলা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি তাকিয়ে বলেন, তোমাদের যা খুশি কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৯৮৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৯৪]
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى “আর আল্লাহ যে এটি করেছিলেন তার উদ্দেশ্য তোমাদেরকে সুসংবাদ দান ছাড়া অন্য কিছু নয়” অর্থাৎ ফিরিশতামণ্ডলীকে প্রেরণ এবং এ বিষয়টি সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিতকরণকে করেছেন তোমাদের জন্য সু-সংবাদস্বরূপ।
وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُم “আর যাতে এর মাধ্যমে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি ঘটে” নয়ত আল্লাহ তা‘আলা এটি ছাড়াই তোমাদের শত্রুদের ওপরে তোমাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَا النَّصْرُ إِلا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ “সাহায্য তো একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকেই আসে” যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فَإِذَا لَقِيتُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فَضَرۡبَ ٱلرِّقَابِ حَتَّىٰٓ إِذَآ أَثۡخَنتُمُوهُمۡ فَشُدُّواْ ٱلۡوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّۢا بَعۡدُ وَإِمَّا فِدَآءً حَتَّىٰ تَضَعَ ٱلۡحَرۡبُ أَوۡزَارَهَاۚ ذَٰلِكَۖ وَلَوۡ يَشَآءُ ٱللَّهُ لَٱنتَصَرَ مِنۡهُمۡ وَلَٰكِن لِّيَبۡلُوَاْ بَعۡضَكُم بِبَعۡضٖۗ وَٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَلَن يُضِلَّ أَعۡمَٰلَهُمۡ ٤ سَيَهۡدِيهِمۡ وَيُصۡلِحُ بَالَهُمۡ ٥ وَيُدۡخِلُهُمُ ٱلۡجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمۡ ٦﴾ [ محمد : ٤، ٦ ] “অতঃপর যখন তোমরা কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত হানো, অবশেষে যখন তাদেরকে পূর্ণরূপে পরাস্ত কর, তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে ফেল। অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ কর। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে। এ নির্দেশই তোমাদেরকে দেওয়া হলো। আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে (নিজেই) তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান (এজন্য তোমাদেরকে যুদ্ধ করার সুযোগ দেন)। যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয় তিনি তাদের কর্মফল কক্ষনো বিনষ্ট করবেন না। তিনি তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন আর তাদের অবস্থা ভালো করে দেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন যা তাদেরকে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন”। [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৪-৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿وَتِلۡكَ ٱلۡأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيۡنَ ٱلنَّاسِ وَلِيَعۡلَمَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَيَتَّخِذَ مِنكُمۡ شُهَدَآءَۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلظَّٰلِمِينَ ١٤٠ وَلِيُمَحِّصَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَيَمۡحَقَ ٱلۡكَٰفِرِينَ ١٤١﴾ [ ال عمران : ١٤٠، ١٤١ ] (জয়-পরাজয়ের) “এ দিনগুলোকে আমরা মানুষের মধ্যে আবর্তিত করে থাকি যাতে আল্লাহ মুমিনদেরকে চিনে নিতে পারেন এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, বস্তুত আল্লাহ যালিমদেরকে ভালোবাসেন না এবং (এ জন্যেও) যেন আল্লাহ মুমিনদেরকে সংশোধন করেন ও কাফেরদের নিশ্চিহ্ন করেন”। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৪০-১৪১] এ হচ্ছে প্রজ্ঞা যার জন্য আল্লাহ তা‘আলা মুমিনগণের হাতের মাধ্যমে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদের আইন প্রদান করেছেন। অন্যথায় আল্লাহ তা‘আলা পূর্বের জাতিসমূহকে তাদের নবীগণকে অস্বীকার করার কারণে বিভিন্ন ধরণের বিপর্যয় দিয়ে শাস্তি দিয়েছিলেন যা সেই মিথ্যা সাব্যস্তকারী জাতিসমূহকে ঘিরে ধরেছিল। যেমন, তিনি নূহ আলাইহিস সালামের জাতিকে তুফান দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন, আদকে বায়ু দ্বারা, সামূদকে প্রচণ্ড আওয়াজ দ্বারা, লূত আলাইহিস সালামের জাতিকে ভুমিধস, উল্টে দেওয়া ও সিজ্জীলের পাথর দ্বারা, শু‘আইব আলাইহিস সালামের কাওমকে ছায়ার দিবসের দ্বারা। এরপর যখন আল্লাহ তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেন, তখন তিনি তার শত্রু ফির‘আউন এবং তার জাতিকে সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেন এরপর তিনি মূসা আলাইহিস সালামের ওপরে তাওরাত অবতীর্ণ করেন, সেখানে তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বিধান আরোপ করেন। এ বিধান তার পরে পরবর্তী শরী‘আতসমূহে টিকে থাকে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَلَقَدۡ ءَاتَيۡنَا مُوسَى ٱلۡكِتَٰبَ مِنۢ بَعۡدِ مَآ أَهۡلَكۡنَا ٱلۡقُرُونَ ٱلۡأُولَىٰ بَصَآئِرَ لِلنَّاسِ ٤٣﴾ [ القصص : ٤٣ ] “আমি পূর্ববর্তী অনেক মানব গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার পর মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা” [সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৪৩] মুমিনগণের কাফেরদেকে হত্যা করা, কাফেরদের জন্য চরম অপমানজনক। এতে মুমিনগণের আত্মা ঠাণ্ডা হয়। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা নিন্মোক্ত আয়াতে মুমিনগণের জন্য বলেন, قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ [ التوبة : ١٤ ] “তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, তোমাদের হাত দিয়েই আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন, তাদেরকে অপমানিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে সাহায্য করবেন আর মুমিনদের অন্তর ঠাণ্ডা করবেন”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১৪] এ কারণে কুরাইশ কাফেরদের তুচ্ছজ্ঞান করা শত্রুদের হাতে নিহত হওয়া ছিল তাদের জন্য বেশি অপমানজনক আর বিশ্বাসী দলের অন্তরের জন্য ছিল শীতলকারী। যেমন, আবু জাহল যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয় আর এটি ছিল তার জন্য তার বিছানায় মৃত্যুর চেয়ে অধিক অপমানজনক। আলো, বাতাস অথবা এ জাতীয় কষ্টক্লেশ থেকে। যেমন, আবু লাহাব (তার ওপর আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপ) গুটিবসন্তে মারা যায়, তার নিকট আত্মীয়দের কেউ আসে নি, দুরে থেকে পানি নিক্ষেপ করে তারা তাকে গোসল দিয়েছিল, আর পাথর নিক্ষেপ করে তারা তাকে দাফন করেছিল। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ “আল্লাহ তো মহাপরাক্রমশালী” অর্থাৎ সম্মান আল্লাহ তা‘আলার, তাঁর রাসূলের এবং মুমিনগণের দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জগতে। যেমন, তিনি বলেন, ﴿إِنَّا لَنَنصُرُ رُسُلَنَا وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَيَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡأَشۡهَٰدُ ٥١﴾ [ غافر : ٥١ ] “আমি আমার রসূলদেরকে আর মুমিনদেরকে অবশ্যই সাহায্য করব দুনিয়ার জীবনে আর (কিয়ামতে) যে দিন সাক্ষীরা দাঁড়াবে”। [সূরা আল-গাফির, আয়াত: ৫১] حَكِيم “মহাবিজ্ঞানী” কাফেরদের হত্যার যে বিধান তিনি দিয়েছেন তাতে, অথচ তিনি আপন শক্তি ও ক্ষমতায় তাদেরকে ধ্বংস করে দিতে পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী।
﴿إِذۡ يُغَشِّيكُمُ ٱلنُّعَاسَ أَمَنَةٗ مِّنۡهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيۡكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ لِّيُطَهِّرَكُم بِهِۦ وَيُذۡهِبَ عَنكُمۡ رِجۡزَ ٱلشَّيۡطَٰنِ وَلِيَرۡبِطَ عَلَىٰ قُلُوبِكُمۡ وَيُثَبِّتَ بِهِ ٱلۡأَقۡدَامَ ١١ إِذۡ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ أَنِّي مَعَكُمۡ فَثَبِّتُواْ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْۚ سَأُلۡقِي فِي قُلُوبِ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلرُّعۡبَ فَٱضۡرِبُواْ فَوۡقَ ٱلۡأَعۡنَاقِ وَٱضۡرِبُواْ مِنۡهُمۡ كُلَّ بَنَانٖ ١٢ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ شَآقُّواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥۚ وَمَن يُشَاقِقِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَإِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ١٣ ذَٰلِكُمۡ فَذُوقُوهُ وَأَنَّ لِلۡكَٰفِرِينَ عَذَابَ ٱلنَّارِ ١٤﴾ [ الانفال : ١١، ١٤ ]
অর্থানুবাদ:
“স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তাঁর নিকট হতে প্রশান্তি ধারা হিসেবে তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেছিলেন, আকাশ থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলেন তোমাদেরকে তা দিয়ে পবিত্র করার জন্য। তোমাদের থেকে শায়ত্বানী পংকিলতা দূর করার জন্য, তোমাদের দিলকে মজবুত করার জন্য আর তা দিয়ে তোমাদের পায়ের ভিত শক্ত করার জন্য। স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফিরিশতাদের প্রতি অহী পাঠিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি; অতএব, মুমিনদেরকে তোমরা দৃঢ়পদ রেখ’। অচিরেই আমি কাফেরদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করব, কাজেই তাদের স্কন্ধে আঘাত হান, আঘাত হান প্রত্যেকটি আঙ্গুলের গিঁটে গিঁটে। এর কারণ, তারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরোধিতা করে আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করবে (তাদের জেনে রাখা দরকার) আল্লাহ শাস্তিদানে বড়ই কঠোর। এটিই তোমাদের শাস্তি, অতএব তার স্বাদ গ্রহণ কর, কাফেরদের জন্য আছে আগুনের (জাহান্নামের) শাস্তি।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১১-১৪]
তাফসীর: