hadith book logo

হাফেয ইবন কাসীরের তাফসীর থেকে সংক্ষেপিত সূরা আল-আনফালের তাফসীর

লেখকঃ শাইখ আহমদ মুহাম্মাদ শাকের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪

বদরের রাতে বৃষ্টি বর্ষণ:

আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَيُنزلُ عَلَيْكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً “আকাশ থেকে তোমাদের ওপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলেন” আলী ইবন আবু তলহা বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বদরের ময়দানে আসেন, তিনি সেখানে শিবির স্থাপন করেন। মুশরিকদের মাঝে ও তাদের মাঝে ছিল বালু। মুশরিকরা পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেললে মুসলিমদের কষ্ট হতে থাকে। শয়তান মুসলিমদের অন্তরে ক্রোধ সৃষ্টি করে, তাদের মাঝে কুমন্ত্রণা দেয়। তোমরা মনে কর তোমরা আল্লাহর বন্ধু, তোমাদের মাঝে তাঁর রাসূল রয়েছেন, মুশরিকরা তোমাদের ওপর পানির দখল গ্রহণ করেছে। যখন তোমরা প্রবিত্রতার দো‘আ করছিলে। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেন, মুসলিমগণ পানি পান করেন, পবিত্রত অর্জন করেন, আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে শয়তানের অপবিত্রতা দূর করে দেন, বৃষ্টি হওয়ার ফলে বালু স্থির হয়, মুসলিমগণ এবং তাদের বাহনগুলো তার উপর দিয়ে হেঁটে যায় এরপর তারা তাদের শত্রুদের নিকট গিয়ে পৌঁছে। আল্লাহ তা‘আলা তার নবীকে এবং মুমিনদেরকে এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে সাহায্য করেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম পাঁচশত ফিরিশতা নিয়ে ডানে ছিলেন এবং মিকাঈল আলাইহিস সালাম অপর পাঁচশ নিয়ে বামে ছিলেন।

অনুরূপ আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, মুশরিকরা তাদের কাফেলাকে সাহায্য করতে এসে এবং তাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসে এমন স্থানে অবস্থান নেয় যেখানে পানি ছিল। তারা মুমিনদের ওপর প্রাধান্য নিয়ে নিল। ফলে মুমিনদের কষ্ট হতে লাগল, তাদের পিপাসা পেল, তারা অপবিত্র অবস্থায় সালাত আদায় করা আরম্ভ করল। এ বিষয়টি মুসলিমগণের অন্তরে বিভিন্ন দুশ্চিন্তার উদ্রেক করছিল। মুসলিমগণ দুর্বলতা অনুভব করে। তারপর আল্লাহ তা‘আলা আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যার ফলে পানিতে মাঠ ভরে যায়। তখন মুমিনরা পানি পান করল, তাদের বাহনদের পানি পান করালো, পবিত্রতার গোসল করল, তাদের পাত্রগুলো ভরে নিল— আল্লাহ তা‘আলা তাদের পবিত্রতার ব্যবস্থা করল। তাদের পদসমূহ দৃঢ় করল এবং তাদের মনোবল বাড়িয়ে দিল। অনুরূপ বর্ণনা কাদাদাহ, দাহ্হাক ও সূদ্দী রহ. থেকেও বর্ণিত

প্রসিদ্ধ কথা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বদরে তিনি এমন স্থানে অবস্থান নিলেন যেখানে সামান্য পানি ছিল। অর্থাৎ প্রাথমিক পানি। তখন হুবাব ইবনুল মুনযির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু অগ্রসর হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যে জায়গায় আপনি অবস্থান করেছেন তা কি আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাহলে এ স্থান অকিক্রম করব না, নাকি যুদ্ধ করার জন্য এ স্থান গ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, «بَلْ مَنْزِلٌ نَزَلْتُهُ لِلْحَرْبِ وَالْمَكِيدَةِ» “বরং যুদ্ধ করা ও ষড়যন্ত্রের জবাব দেওয়ার জন্য এখানে উপস্থিত হয়েছি”। তখন সে বলল, আল্লাহর রাসূল এটি ভালো কোনো জায়গা নয়। আপনি আমাদের নিয়ে পানির নিকট নিয়ে যান যা সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে মিলিত। আমরা তার পিছনে কুপ খনন করব, ফলে আমাদের পানি থাকবে, তাদের পানি থাকবে না। তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চললেন এবং তাই করলেন।

এ সম্পর্কে সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনা দিয়ে হাদীস বর্ণনা করেছেন মাগাযীর গ্রন্থকার ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইবন ইয়াসার রহ.। তিনি বলেন, আমার নিকট বর্ণনা করেছেন ইয়াযীদ ইবন রুমান (তিনি) উরওয়া ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে, তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বালুময় উপত্যকায় আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, বৃষ্টি যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ শিবির স্থাপন করেছিলেন সে স্থানটিকে মজবুত করে যাতে করে তাদের চলাফিরায় বিঘ্ন না ঘটে, আর কুরাইশদের স্থানটিকে এমন করে দেয় যাতে তাদের চলাফিরায় বিঘ্ন ঘটে।

মুজাহিদ রহ. বলেন, তন্দ্রার পুর্বেই আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন, বৃষ্টির ফলে বালু উড়া বন্ধ হয়, জমিন মজবুত হয়, তাদের অন্তর পরিতৃপ্ত হয় এবং তাদের পাগুলো দৃঢ় হয়।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী: لِيُطَهِّرَكُمْ بِهِ “তোমাদেরকে তা দিয়ে পবিত্র করার জন্য” অর্থাৎ ছোট-বড় অপবিত্রতা থেকে আর তা বাহ্যিক দিককে পবিত্র করে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ “তোমাদের থেকে শয়তানী পংকিলতা দূর করার জন্য” অর্থাৎ কুমন্ত্রণা ও খারাপ চিন্তা থেকে আর তা হচ্ছে আভ্যন্তরীণ বিষয়ের পবিত্রতা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে বলেন, ﴿عَٰلِيَهُمۡ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضۡرٞ وَإِسۡتَبۡرَقٞۖ وَحُلُّوٓاْ أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٖ ٢١﴾ [ الانسان : ٢١ ] “তাদের আবরণ হবে চিকন সবুজ রেশম ও মোটা রেশম, আর তাদেরকে অলংকারে সজ্জিত করা হবে রুপার কঙ্কণ দ্বারা”। [সূরা আল-ইনসান, আয়াত: ২১] এটি হচ্ছে বাহ্যিক সৌন্দর্য, ﴿وَسَقَىٰهُمۡ رَبُّهُمۡ شَرَابٗا طَهُورًا ٢١﴾ [ الانسان : ٢١ ] “আর তাদের রব্ব তাদেরকে পান করাবেন পবিত্র পরিচ্ছন্ন পানীয়” অর্থাৎ যা তাদের মধ্যে ক্রোধ, হিংসা ও ঘৃণা রয়েছে তা পবিত্র করে। আর তা হচ্ছে আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও এর পবিত্রতা। [সূরা আল-ইনসান, আয়াত: ২১] وَلِيَرْبِطَ عَلَى قُلُوبِكُمْ “তোমাদের দিলকে মজবুত করার জন্য” ধৈর্যের সাথে আর তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহিত করে আর তা হচ্ছে আভ্যন্তরীণ সাহসিকতা। وَيُثَبِّتَ بِهِ الأقْدَامَ “আর তা দিয়ে তোমাদের পায়ের ভিত শক্ত করার জন্য” আর তা হচ্ছে বাহ্যিক সাহসিকতা। আল্লাহ ভালো জানেন।