১
হাফেয ইবন কাসীরের তাফসীর থেকে সংক্ষেপিত সূরা আল-আনফালের তাফসীর
লেখকঃ শাইখ আহমদ মুহাম্মাদ শাকের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৭
কাফরদের ব্যয় তাদের পরিতাপের কারণ:
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক রহ. বলেন, হাদীস বর্ণনা করেছেন আমার নিকট যুহরী, মুহাম্মাদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন হিব্বান, ‘আসিম ইবন উমার ইবন কাতাদা এবং হুসাইন ইবন আব্দুর রহমান ইবন আমর্ ইবন সা‘দ ইবন মু‘আয, তারা বলেন, বদরের যুদ্ধে কুরাইশরা যখন পর্যুদস্ত হয় তাদের বাহিনী মক্কায় ফিরে আসে, আবু সুফিয়ানও বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে ফিরে আসে, আব্দুল্লাহ ইবন আবু রাবী‘আহ, ইকরিমা ইবন আবু জাহাল, সাফওয়ান ইবন উমাইইয়া কতিপয় কুরাইশদের কাছে গমন করতে থাকে, এদের বাপ-চাচা, পুত্র এবং তাদের ভাই-বেরাদর বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছে তারা আবু সুফিয়ান ইবন হারব এবং বাণিজ্য কাফেলায় যাদের সম্পদ ছিল তাদের সাথে কথা বলে, তারা বলল: হে কুরাইশবৃন্দ, মুহাম্মাদ তোমাদেরকে দুঃখ-দুর্দশায় ফেলেছে, তোমাদের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করেছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তোমরা এ সম্পদের দ্বারা আমাদেরকে সহযোগিতা কর। হতে পারে এর মাধ্যমে আমরা তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারব। ফলে তারা তা-ই করে। বর্ণনাকারী বলেন, তাদের ব্যাপারে (যা আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে) আল্লাহ তা‘আলা إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ “যে সব লোক সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে তারা তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে থাকে” থেকে أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡخَٰسِرُونَ “এরাই হলো সর্বস্বান্ত” এ পর্যন্ত অবতীর্ণ করেন। অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে মুজাহিদ, সা‘ঈদ ইবন জুবাইর, হাকাম ইবন উইয়াইনা, কাতাদা, সুদ্দী এবং ইবন আবযা রহ. থেকে। তারা বলেন যে, এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে আবু সুফিয়ান এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে উহুদের যুদ্ধের জন্য তার সম্পদ খরচের ব্যাপারে। দাহ্হাক রহ. বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে।
যে কোনো অর্থেই হোক আয়াতটি ব্যাপক ও সার্বিকভাবে বর্ণিত হয়েছে, ফলে আয়াতটি ব্যাপক, যদিও নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়াতে তার নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট খাস। আল্লাহ তা‘আলা অবহিত করেন যে, কাফেররা তাদের সম্পদ ব্যয় করে সত্য পথের অনুসরণ হতে লোকেদেরকে বাধা দেওয়ার জন্য, তারা এরূপ করার ফলে তদের সম্পদ চলে যাবে পরে এটিই তাদের জন্য অনুশোচনার অর্থাৎ পরিতাপের কারণ হবে। ثُمَّ تَكُونُ عَلَيۡهِمۡ حَسۡرَةٗ “অতঃপর এটিই তাদের দুঃখ ও অনুশোচনার কারণ হবে”। অর্থাৎ তারা (এর বিনিময়ে) কিছুই পাবে না। কেননা, তারা আল্লাহ তা‘আলার আলোকে নিভিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করেছে আর সত্যের কালেমার ওপর তাদের কালেমাকে বিজয়ী করতে চেয়েছে; কিন্তু কাফেররা অপছন্দ করা সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আলোকে পূর্ণ করবেন, তাঁর দীনকে সাহায্য করবেন, তাঁর কালেমার ঘোষণা দিবেন এবং সকল ধর্মের ওপর তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন। এ হচ্ছে দুনিয়ায় তাদের অপমান আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। তাদের মাঝে যারা জীবিত থাকবে তারা স্বচক্ষে দেখবে এবং নিজ কর্ণে শুনবে যা তাদেরকে কষ্ট দিবে। আর যারা নিহত হয়েছে অথবা মারা গেছে তারা চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা এবং চিরন্তর শাস্তির দিকে ফিরে যাবে। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَسَيُنفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيۡهِمۡ حَسۡرَةٗ ثُمَّ يُغۡلَبُونَۗ وَٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ إِلَىٰ جَهَنَّمَ يُحۡشَرُونَ “তারা তা ব্যয় করতেই থাকবে, অতঃপর এটিই তাদের দুঃখ ও অনুশোচনার কারণ হবে। পরে তারা পরাজিতও হবে। যারা কুফুরী করে তাদেরকে (অবশেষে) জাহান্নামের পানে একত্রিত করা হবে”।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: لِيَمِيزَ ٱللَّهُ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِ “যাতে আল্লাহ পবিত্র থেকে অপবিত্রকে আলাদা করে দেন” আলী ইবন আবু তালহা বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা لِيَمِيزَ ٱللَّهُ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِ “যাতে আল্লাহ পবিত্র থেকে অপবিত্রকে আলাদা করে দেন” এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, যাতে করে সৌভাগ্যবানদেরকে হতভাগাদের থেকে পৃথক করে নিতে পারেন। সুদ্দী রহ. বলেন, মুমিনদের কাফের থেকে পৃথক করবেন। হতে পারে এ পৃথক করা আখিরাতে হবে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَيَوۡمَ نَحۡشُرُهُمۡ جَمِيعٗا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشۡرَكُواْ مَكَانَكُمۡ أَنتُمۡ وَشُرَكَآؤُكُمۡۚ فَزَيَّلۡنَا بَيۡنَهُمۡۖ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُم مَّا كُنتُمۡ إِيَّانَا تَعۡبُدُونَ ٢٨﴾ [ يونس : ٢٨ ] “আর যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্র করব, অতঃপর যারা শির্ক করেছে, তাদেরকে বলব, ‘থাম, তোমরা ও তোমাদের শরীকরা’। অতঃপর আমি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাব। আর তাদের শরীকরা’ বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের ইবাদাত করতে না’’। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৮] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَيَوۡمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ يَوۡمَئِذٖ يَتَفَرَّقُونَ ١٤﴾ [ الروم : ١٤ ] “আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন তারা বিভক্ত হয়ে পড়বে”। [সূরা আর-রূম, আয়াত: ১৪] এবং অপর আয়াতে বলেন, ﴿يَوۡمَئِذٖ يَصَّدَّعُونَ ٤٣﴾ [ الروم : ٤٣ ] “সেদিন তারা বিভক্ত হয়ে পড়বে”। [সূরা আর-রূম, আয়াত: ১৪] এবং আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَٱمۡتَٰزُواْ ٱلۡيَوۡمَ أَيُّهَا ٱلۡمُجۡرِمُونَ ٥٩﴾ [ يس : ٥٩ ] “আর (বলা হবে) ‘হে অপরাধীরা, আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও’’। [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫৯] এ পৃথক করা দুনিয়াতেও হতে পারে। মুমিনদের যে আমল প্রকাশ পায় তা দ্বারা। অর্থাৎ আমি তাদের এর ক্ষমতা দিয়েছি, যাতে করে তিনি আলাদা করেন কে তাঁর কাফের শত্রুদেরকে হত্যা করার মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করে আর কে এ থেকে বিরত থেকে তাঁর নাফরমানী করে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَآ أَصَٰبَكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡتَقَى ٱلۡجَمۡعَانِ فَبِإِذۡنِ ٱللَّهِ وَلِيَعۡلَمَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١٦٦ وَلِيَعۡلَمَ ٱلَّذِينَ نَافَقُواْۚ وَقِيلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡاْ قَٰتِلُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ أَوِ ٱدۡفَعُواْۖ قَالُواْ لَوۡ نَعۡلَمُ قِتَالٗا لَّٱتَّبَعۡنَٰكُمۡۗ ١٦٧﴾ [ ال عمران : ١٦٦، ١٦٧ ] “আর তোমাদের ওপর যে বিপদ এসেছিল দুই দল মুখোমুখি হওয়ার দিন তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি মুমিনদেরকে জেনে নেন। আর যাতে তিনি জেনে নেন মুনাফিকদেরকে। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘এসো, আল্লাহর পথে লড়াই কর অথবা প্রতিরোধ কর’। তারা বলেছিল, ‘যদি আমরা লড়াই হবে জানতাম [এর দু’টি অর্থ হতে পারে- যদি আমরা লড়াই করতে জানতাম অথবা লড়াই সংঘটিত হবে বলে জানতাম।] তবে অবশ্যই তোমাদেরকে অনুসরণ করতাম’। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৬-১৬৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿مَّا كَانَ ٱللَّهُ لِيَذَرَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ عَلَىٰ مَآ أَنتُمۡ عَلَيۡهِ حَتَّىٰ يَمِيزَ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِۗ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُطۡلِعَكُمۡ عَلَى ٱلۡغَيۡبِ ١٧٩﴾ [ ال عمران : ١٧٩ ] “আল্লাহ মুমিনদেরকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে গায়িবের বিধান জ্ঞাত করেন না”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৯] সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, আমি তোমাদের কাফেরদের দ্বারা পরীক্ষা করলাম তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে এবং তাদের শক্তি দিলাম মাল খরচ করার এবং এ ব্যাপারে তা ব্যয় করার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿أَمۡ حَسِبۡتُمۡ أَن تَدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ وَلَمَّا يَعۡلَمِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ مِنكُمۡ وَيَعۡلَمَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٤٢﴾ [ ال عمران : ١٤٢ ] “তোমরা কি ভেবেছ যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ এখনও পর্যন্ত পরখ করেন নি তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে আর কারা ধৈর্যশীল”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪২] সুতরাং, আয়াতের অর্থ হচ্ছে আমরা তোমাদেরকে পরীক্ষা করেছি কাফেরদের দ্বারা যারা তোমাদের সাথে লড়াই করে আর আমি তাদেরকে এ ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যয় করার সামর্থ্য দিয়েছি لِيَمِيزَ ٱللَّهُ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِ وَيَجۡعَلَ ٱلۡخَبِيثَ بَعۡضَهُۥ عَلَىٰ بَعۡضٖ فَيَرۡكُمَهُۥ جَمِيعٗا “যাতে আল্লাহ পবিত্র থেকে অপবিত্রকে আলাদা করে দেন, অতঃপর অপবিত্রদের এককে অন্যের ওপর রাখবেন, সকলকে স্তুপীকৃত করবেন”। অর্থাৎ তিনি এ সবকিছু একত্রিত করবেন তা এভাবে যে, একের ওপর আরেক একত্রিত করা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা মেঘমালা সম্পর্কে বলেন, ﴿ثُمَّ يَجۡعَلُهُۥ رُكَامٗا ٤٣﴾ [ النور : ٤٣ ] “তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, তারপর সেগুলো স্তুপীকৃত করেন”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৪৩] একে অপরের উপর আরোহণকারী। فَيَجۡعَلَهُۥ فِي جَهَنَّمَۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡخَٰسِرُونَ “অতঃপর এ সমষ্টিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এরাই হলো সর্বস্বান্ত” অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতে এরা ক্ষতিগ্রস্ত।
﴿قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ إِن يَنتَهُواْ يُغۡفَرۡ لَهُم مَّا قَدۡ سَلَفَ وَإِن يَعُودُواْ فَقَدۡ مَضَتۡ سُنَّتُ ٱلۡأَوَّلِينَ ٣٨ وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ فَإِنِ ٱنتَهَوۡاْ فَإِنَّ ٱللَّهَ بِمَا يَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ٣٩ وَإِن تَوَلَّوۡاْ فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَوۡلَىٰكُمۡۚ نِعۡمَ ٱلۡمَوۡلَىٰ وَنِعۡمَ ٱلنَّصِيرُ ٤٠﴾ [ الانفال : ٣٨، ٤٠ ]
অর্থনুবাদ:
“যারা কুফুরী করে তাদেরকে বল, ‘তারা যদি নিবৃত্ত হয় তাহলে তারা পূর্বে যা করেছে তা ক্ষমা করা হবে, আর যদি (কুফরীর) পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে আগের লোকেদের (প্রতি অনুসৃত) নীতির দৃষ্টান্ত তো অতীতের পাতাতেই আছে।’ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। অতঃপর তারা যদি বিরত হয় তাহলে তারা (ন্যায় বা অন্যায়) যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে জেনে রেখ যে, আল্লাহ্ই তোমাদের অভিভাবক, কতই না উত্তম অভিভাবক! কতই না উত্তম সাহায্যকারী”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৩৮-৪০]
তাফসীর:
যে কোনো অর্থেই হোক আয়াতটি ব্যাপক ও সার্বিকভাবে বর্ণিত হয়েছে, ফলে আয়াতটি ব্যাপক, যদিও নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়াতে তার নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট খাস। আল্লাহ তা‘আলা অবহিত করেন যে, কাফেররা তাদের সম্পদ ব্যয় করে সত্য পথের অনুসরণ হতে লোকেদেরকে বাধা দেওয়ার জন্য, তারা এরূপ করার ফলে তদের সম্পদ চলে যাবে পরে এটিই তাদের জন্য অনুশোচনার অর্থাৎ পরিতাপের কারণ হবে। ثُمَّ تَكُونُ عَلَيۡهِمۡ حَسۡرَةٗ “অতঃপর এটিই তাদের দুঃখ ও অনুশোচনার কারণ হবে”। অর্থাৎ তারা (এর বিনিময়ে) কিছুই পাবে না। কেননা, তারা আল্লাহ তা‘আলার আলোকে নিভিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করেছে আর সত্যের কালেমার ওপর তাদের কালেমাকে বিজয়ী করতে চেয়েছে; কিন্তু কাফেররা অপছন্দ করা সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আলোকে পূর্ণ করবেন, তাঁর দীনকে সাহায্য করবেন, তাঁর কালেমার ঘোষণা দিবেন এবং সকল ধর্মের ওপর তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন। এ হচ্ছে দুনিয়ায় তাদের অপমান আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। তাদের মাঝে যারা জীবিত থাকবে তারা স্বচক্ষে দেখবে এবং নিজ কর্ণে শুনবে যা তাদেরকে কষ্ট দিবে। আর যারা নিহত হয়েছে অথবা মারা গেছে তারা চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা এবং চিরন্তর শাস্তির দিকে ফিরে যাবে। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَسَيُنفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيۡهِمۡ حَسۡرَةٗ ثُمَّ يُغۡلَبُونَۗ وَٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ إِلَىٰ جَهَنَّمَ يُحۡشَرُونَ “তারা তা ব্যয় করতেই থাকবে, অতঃপর এটিই তাদের দুঃখ ও অনুশোচনার কারণ হবে। পরে তারা পরাজিতও হবে। যারা কুফুরী করে তাদেরকে (অবশেষে) জাহান্নামের পানে একত্রিত করা হবে”।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: لِيَمِيزَ ٱللَّهُ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِ “যাতে আল্লাহ পবিত্র থেকে অপবিত্রকে আলাদা করে দেন” আলী ইবন আবু তালহা বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা لِيَمِيزَ ٱللَّهُ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِ “যাতে আল্লাহ পবিত্র থেকে অপবিত্রকে আলাদা করে দেন” এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, যাতে করে সৌভাগ্যবানদেরকে হতভাগাদের থেকে পৃথক করে নিতে পারেন। সুদ্দী রহ. বলেন, মুমিনদের কাফের থেকে পৃথক করবেন। হতে পারে এ পৃথক করা আখিরাতে হবে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَيَوۡمَ نَحۡشُرُهُمۡ جَمِيعٗا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشۡرَكُواْ مَكَانَكُمۡ أَنتُمۡ وَشُرَكَآؤُكُمۡۚ فَزَيَّلۡنَا بَيۡنَهُمۡۖ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُم مَّا كُنتُمۡ إِيَّانَا تَعۡبُدُونَ ٢٨﴾ [ يونس : ٢٨ ] “আর যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্র করব, অতঃপর যারা শির্ক করেছে, তাদেরকে বলব, ‘থাম, তোমরা ও তোমাদের শরীকরা’। অতঃপর আমি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাব। আর তাদের শরীকরা’ বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের ইবাদাত করতে না’’। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৮] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَيَوۡمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ يَوۡمَئِذٖ يَتَفَرَّقُونَ ١٤﴾ [ الروم : ١٤ ] “আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন তারা বিভক্ত হয়ে পড়বে”। [সূরা আর-রূম, আয়াত: ১৪] এবং অপর আয়াতে বলেন, ﴿يَوۡمَئِذٖ يَصَّدَّعُونَ ٤٣﴾ [ الروم : ٤٣ ] “সেদিন তারা বিভক্ত হয়ে পড়বে”। [সূরা আর-রূম, আয়াত: ১৪] এবং আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَٱمۡتَٰزُواْ ٱلۡيَوۡمَ أَيُّهَا ٱلۡمُجۡرِمُونَ ٥٩﴾ [ يس : ٥٩ ] “আর (বলা হবে) ‘হে অপরাধীরা, আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও’’। [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৫৯] এ পৃথক করা দুনিয়াতেও হতে পারে। মুমিনদের যে আমল প্রকাশ পায় তা দ্বারা। অর্থাৎ আমি তাদের এর ক্ষমতা দিয়েছি, যাতে করে তিনি আলাদা করেন কে তাঁর কাফের শত্রুদেরকে হত্যা করার মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করে আর কে এ থেকে বিরত থেকে তাঁর নাফরমানী করে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَآ أَصَٰبَكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡتَقَى ٱلۡجَمۡعَانِ فَبِإِذۡنِ ٱللَّهِ وَلِيَعۡلَمَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١٦٦ وَلِيَعۡلَمَ ٱلَّذِينَ نَافَقُواْۚ وَقِيلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡاْ قَٰتِلُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ أَوِ ٱدۡفَعُواْۖ قَالُواْ لَوۡ نَعۡلَمُ قِتَالٗا لَّٱتَّبَعۡنَٰكُمۡۗ ١٦٧﴾ [ ال عمران : ١٦٦، ١٦٧ ] “আর তোমাদের ওপর যে বিপদ এসেছিল দুই দল মুখোমুখি হওয়ার দিন তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি মুমিনদেরকে জেনে নেন। আর যাতে তিনি জেনে নেন মুনাফিকদেরকে। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘এসো, আল্লাহর পথে লড়াই কর অথবা প্রতিরোধ কর’। তারা বলেছিল, ‘যদি আমরা লড়াই হবে জানতাম [এর দু’টি অর্থ হতে পারে- যদি আমরা লড়াই করতে জানতাম অথবা লড়াই সংঘটিত হবে বলে জানতাম।] তবে অবশ্যই তোমাদেরকে অনুসরণ করতাম’। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৬-১৬৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿مَّا كَانَ ٱللَّهُ لِيَذَرَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ عَلَىٰ مَآ أَنتُمۡ عَلَيۡهِ حَتَّىٰ يَمِيزَ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِۗ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُطۡلِعَكُمۡ عَلَى ٱلۡغَيۡبِ ١٧٩﴾ [ ال عمران : ١٧٩ ] “আল্লাহ মুমিনদেরকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে গায়িবের বিধান জ্ঞাত করেন না”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭৯] সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, আমি তোমাদের কাফেরদের দ্বারা পরীক্ষা করলাম তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে এবং তাদের শক্তি দিলাম মাল খরচ করার এবং এ ব্যাপারে তা ব্যয় করার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿أَمۡ حَسِبۡتُمۡ أَن تَدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ وَلَمَّا يَعۡلَمِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ مِنكُمۡ وَيَعۡلَمَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٤٢﴾ [ ال عمران : ١٤٢ ] “তোমরা কি ভেবেছ যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ এখনও পর্যন্ত পরখ করেন নি তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে আর কারা ধৈর্যশীল”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪২] সুতরাং, আয়াতের অর্থ হচ্ছে আমরা তোমাদেরকে পরীক্ষা করেছি কাফেরদের দ্বারা যারা তোমাদের সাথে লড়াই করে আর আমি তাদেরকে এ ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যয় করার সামর্থ্য দিয়েছি لِيَمِيزَ ٱللَّهُ ٱلۡخَبِيثَ مِنَ ٱلطَّيِّبِ وَيَجۡعَلَ ٱلۡخَبِيثَ بَعۡضَهُۥ عَلَىٰ بَعۡضٖ فَيَرۡكُمَهُۥ جَمِيعٗا “যাতে আল্লাহ পবিত্র থেকে অপবিত্রকে আলাদা করে দেন, অতঃপর অপবিত্রদের এককে অন্যের ওপর রাখবেন, সকলকে স্তুপীকৃত করবেন”। অর্থাৎ তিনি এ সবকিছু একত্রিত করবেন তা এভাবে যে, একের ওপর আরেক একত্রিত করা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা মেঘমালা সম্পর্কে বলেন, ﴿ثُمَّ يَجۡعَلُهُۥ رُكَامٗا ٤٣﴾ [ النور : ٤٣ ] “তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, তারপর সেগুলো স্তুপীকৃত করেন”। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৪৩] একে অপরের উপর আরোহণকারী। فَيَجۡعَلَهُۥ فِي جَهَنَّمَۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡخَٰسِرُونَ “অতঃপর এ সমষ্টিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এরাই হলো সর্বস্বান্ত” অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতে এরা ক্ষতিগ্রস্ত।
﴿قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ إِن يَنتَهُواْ يُغۡفَرۡ لَهُم مَّا قَدۡ سَلَفَ وَإِن يَعُودُواْ فَقَدۡ مَضَتۡ سُنَّتُ ٱلۡأَوَّلِينَ ٣٨ وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ فَإِنِ ٱنتَهَوۡاْ فَإِنَّ ٱللَّهَ بِمَا يَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ٣٩ وَإِن تَوَلَّوۡاْ فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَوۡلَىٰكُمۡۚ نِعۡمَ ٱلۡمَوۡلَىٰ وَنِعۡمَ ٱلنَّصِيرُ ٤٠﴾ [ الانفال : ٣٨، ٤٠ ]
অর্থনুবাদ:
“যারা কুফুরী করে তাদেরকে বল, ‘তারা যদি নিবৃত্ত হয় তাহলে তারা পূর্বে যা করেছে তা ক্ষমা করা হবে, আর যদি (কুফরীর) পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে আগের লোকেদের (প্রতি অনুসৃত) নীতির দৃষ্টান্ত তো অতীতের পাতাতেই আছে।’ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। অতঃপর তারা যদি বিরত হয় তাহলে তারা (ন্যায় বা অন্যায়) যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে জেনে রেখ যে, আল্লাহ্ই তোমাদের অভিভাবক, কতই না উত্তম অভিভাবক! কতই না উত্তম সাহায্যকারী”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৩৮-৪০]
তাফসীর: