১
হাফেয ইবন কাসীরের তাফসীর থেকে সংক্ষেপিত সূরা আল-আনফালের তাফসীর
লেখকঃ শাইখ আহমদ মুহাম্মাদ শাকের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৬
যুদ্ধের ময়দান পলায়ন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তার শাস্তি:
যারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করে তাদের জন্য আগুনের শাস্তি রয়েছে মর্মে আল্লাহ তা‘আলা হুঁশিয়ার করেন, আল্লাহ বলেন - يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا “হে মুমিনগণ! তোমরা যখন যোদ্ধা-বাহিনীরূপে কাফেরদের সম্মুখীন হও” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১৫] অর্থাৎ, তাদের নিকটবর্তী ও মুখোমুখী হও فَلا تُوَلُّوهُمُ الأدْبَارَ “তখন তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না” অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন হও না, তোমাদের সাথীদের ছেড়ে পালিয়ে যেও না وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ “এমন দিনে যুদ্ধে কৌশল অবলম্বন উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১৬] অর্থাৎ সে এমন ভাব দেখিয়ে তার (শত্রু) থেকে পলায়ন করে যেন সে তাকে ভয় পেয়েছে ফলে সে তাকে অনুসরণ করে এরপর সে সুযোগ গ্রহণ করে আর ফিরে এসে তাকে হত্যা করে। এ ক্ষেত্রে তার (মুসলিমের) কোনো গোনাহ নেই। সা‘ঈদ ইবন জুবাইর এবং সুদ্দী এ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। দাহ্হাক রহ. বলেন, যে ব্যক্তি শত্রুদের শক্তি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার জন্য তার সাথীদের থেকে সামনে এগিয়ে যায় এবং তা কাজে লাগায়। أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ “বা নিজ দলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার” অথবা এখান থেকে পালিয়ে মুসলিমের অন্য দলের সাথে মিলিত হয় (ফলে) সে তাদেরকে সহযোগিতা করে অথবা তারা তাকে সাহায্য করে, এটি তার জন্য বৈধ। এমনকি সে যদি ক্ষুদ্র কোনো দলে থাকে এরপর পালিয়ে তার নেতার নিকট যায় অথবা বড় কোনো নেতার নিকট যায় তবুও সে এ অনুমতির আওতায় পড়বে। আব্দুল্লাহ ইবন উমার থেকে ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন, রাসূলের প্রেরিত একটি সৈন্য দলে যুদ্ধরত ছিলাম। এ যুদ্ধে লোকেরা পালিয়ে যায়। আমি পালিয়ে যাওয়াদের মধ্যে একজন। পরে আমরা বললাম, আমরাতো যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করেছি এখন আমরা কি করব? তারপর আমরা বললাম, আমরা মদীনায় প্রবেশ করে তাতে রাত কাঁটাই। তারপর বললাম আমরা আমাদের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তুলে ধরি। যদি কোনো তাওবা থাকে তবে ভালো আর না হয় আমাদের ধ্বংস। আমরা সকালের সালাতের পূর্বে দরবারে আসি। তিনি বের হয়ে বললেন, তারা কারা? তখন আমরা বললাম, আমরা যুদ্ধে ময়দান থেকে পলায়নকারী। তখন তিনি বললেন, না বরং তোমরা অবস্থানকারী, আমি তোমাদের দল এবং মুসলিমদের দলভুক্ত। তারপর আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে তার হাতে চুমু দিলাম। অনুরূপ বর্ণনা করেছেন আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাযাহ, ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান।
অনুরূপ বলেছেন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবু উবাইদাহর সম্পর্কে বলেন যখন তিনি পারস্যে একটি সেতুর ওপর যুদ্ধ করছিলেন আর এ সময় পারস্য সৈন্যরা ছিল সংখ্যায় অনেক: সে যদি আমার নিকট ফিরে আসত তবে আমি তার জন্য এক দল হয়ে যেতাম। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে একই বর্ণনা দেন। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, যা আবু উসমান আন-নাহদী উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন, আবু ‘উবাইদ যখন লড়াই করছিলেন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, হে লোক সকল, আমি প্রতিটি মুসলিমের সেনাদল। মুজাহিদ রহ. বলেন, উমার রা. বলেন, আমি প্রত্যেক মুসলিমের দল।
আর দাহ্হাক রহ. أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ “বা নিজ দলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার” এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, المتحيز হচ্ছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণের নিকট ফিরে যায়; কিন্তু পলায়ন যদি এ সমস্ত কারণের কোনো একটির জন্য না হয় তবে তা হারাম, কবীরা গোনাহ। কেননা এ সম্পর্কে বুখারী ও মুসলিম তাদের ‘সহীহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ» قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ : «الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وقذف المحصنات الغافلات المؤمنات» ‘‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী গোনাহ থেকে বেঁচে থাক: বলা হয়: হে আল্লাহর রাসূল সেগুলো কী কী? তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু, এমন আত্মাকে হত্যা করা যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন তবে ন্যায়ভাবে (হলে ভিন্ন কথা), সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভোগ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং মুমিনা, সাধাসিধে পবিত্রা নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৯] এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَقَدْ بَاءَ “সে তো পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল” অর্থাৎ ফিরে গেল بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ “আল্লাহর গজবে, আর তার ঠিকানা” তার গন্তব্য, এবং প্রত্যাবর্তণ দিবসে তার বাসস্থান جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ “জাহান্নামই আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল”। [ইমাম আহমাদ রহ. বাশীর ইবন মা‘বাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বাই‘আত গ্রহণ করার জন্য আসি, তিনি আমাকে শর্ত দেন আমি এ কথা সাক্ষ্য দেই— আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, সালাত কায়েম করি, যাকাত আদায় করি, হজ পালন করি, রমযানের সাওম পালন করি, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করি। আমি বললাম দু’টি পালন করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়, এক- জিহাদ। কারণ, তারা ধারণা করে, যে পিছপা হয় সে আল্লাহর ক্রোধে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল। আমি আশংকা করি, আমি যখন যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হব, অন্তর দুর্বল হয়ে পড়বে এবং মৃত্যু ভয়ে পলায়ন করব। দুই- সদকা। আমার কিছুই নেই মাত্র কতক ছাগল এবং দশটি যুদ-আমার পরিবারের বাহন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত ধরে নাড়া দিয়ে বলেন, «فَلَا جِهَادَ وَلَا صَدَقَةَ، فِيمَ تَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِذًا؟» “জিহাদ নেই আবার সাদকাও নেই, তাহলে তুমি কীভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে”? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আমি বাই‘আত গ্রহণ করব, অতঃপর আমি সবগুলোর ওপর বাই‘আত গ্রহণ করি। ইমাম আহমাদ রহ. স্বীয় মুসনাদে (৫/২২৪) হাদীসটি উল্লেখ করেছে। এ সনদে হাদীসটি গরীব, ছয় কিতাবে হাদীসটি আসে নি। (অনুবাদক)] কেউ কেউ বলেন, পলায়ন করা হারাম শুধু সাহাবীগণের জন্য। কারণ, তাদের জন্য জিহাদ করা ছিল ফরযে ‘আইন। কেউ কেউ বলেন, আনসারদের ওপর হারাম। কারণ, তারা সর্বাবস্থায় শোনা ও মানার ওপর বাই‘আত করেছেন।
কেউ কেউ বলেন, এ আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য বদরী সাহাবীগণ। (এ মত বর্ণিত, আমর, ইবন আব্বাস, আবু হুরায়রা, আবু সা‘ঈদ না‘ফে, হাসান বাসরী সা‘ঈদ ইবন জুবাইর, ইকরিমাহ, কাতাদা ও দাহ্হাক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম প্রমূখ থেকে) এ মতের পক্ষে তাদের প্রমাণ, এ দিন এমন কোনো ক্ষুদ্র জামা‘আত ছিল না যাদের কোনো দল আছে, যাদের দিকে তারা ফিরে যাবে, একমাত্র এ দল ছাড়া। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «اللَّهُمَّ إِنَّ تُهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةَ لَا تُعْبَدُ في الأرض» “হে আল্লাহ তুমি যদি এ ক্ষুদ্র জামা‘আতকে ধ্বংস কর, তবে জমিনে ইবাদাত করার আর কেউ থাকবে না”। এ কারণে হাসান রহ. আল্লাহর বাণী: وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَه “এমন দিনে যে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল” সম্পর্কে বলেন, এটি ছিল বদরের দিন। তবে বর্তমানে যদি কেউ তার শহর বা দলের দিক ফিরে আসে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।
ইবনুল মুবারক রহ. ইয়াযিদ ইবন হাবীব রহ. থেকে বর্ণনা করে বলেন, বদরের দিন যে পলায়ন করে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَن يُوَلِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ دُبُرَهُۥٓ إِلَّا مُتَحَرِّفٗا لِّقِتَالٍ أَوۡ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٖ فَقَدۡ بَآءَ بِغَضَبٖ مِّنَ ٱللَّهِ وَمَأۡوَىٰهُ جَهَنَّمُۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ “এমন দিনে যুদ্ধে কৌশল অবলম্বন বা নিজ দলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে সে তো আল্লাহর গজবে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল, জাহান্নামই তার ঠিকানা আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।” তারপর যখন ওহুদের দিন আসে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ تَوَلَّوۡاْ مِنكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡتَقَى ٱلۡجَمۡعَانِ إِنَّمَا ٱسۡتَزَلَّهُمُ ٱلشَّيۡطَٰنُ بِبَعۡضِ مَا كَسَبُواْۖ وَلَقَدۡ عَفَا ٱللَّهُ عَنۡهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٞ ١٥٥﴾ [ ال عمران : ١٥٥ ] “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যারা পিছু হটে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন দু’দল মুখোমুখি হয়েছিল, শয়তানই তাদের কিছু কৃতকর্মের ফলে তাদেরকে পদস্খলিত করেছিল। আর অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, সহনশীল”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৫] তারপর যখন সাত বছর পর হুনাইনের যুদ্ধের দিন আসে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ثُمَّ وليِتُم مُّدْبِرِينَ “অতঃপর তোমরা পৃষ্ট প্রদর্শন করলে” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৫] ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَلَى من يشآء “তারপর আল্লাহ যাকে চান তার তাওবা কবুল করেন”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৭] আবু সা‘ঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি এ আয়াত وَمَن يُوَلِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ دُبُرَهُ “এমন দিনে যে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল” সম্পর্কে বলেন, এ আয়াতটি বদরী সাহাবীগণের বিষয়ে নাযিল হয়।
তবে আয়াতটি বদরী সাহাবীগণের সম্পর্কে নাযিল হলেও উল্লিখিত মতামত বদরী সাহাবী ছাড়া অন্যদের জন্য যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা হারাম হওয়ার পরিপন্থী নয়। যেমন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত উল্লিখিত হাদীস থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, যুদ্ধ থেকে পলায়ন করা ধ্বংসাত্মক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ ভালো জানেন।
﴿فَلَمۡ تَقۡتُلُوهُمۡ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ قَتَلَهُمۡۚ وَمَا رَمَيۡتَ إِذۡ رَمَيۡتَ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ رَمَىٰ وَلِيُبۡلِيَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ مِنۡهُ بَلَآءً حَسَنًاۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٞ ١٧ ذَٰلِكُمۡ وَأَنَّ ٱللَّهَ مُوهِنُ كَيۡدِ ٱلۡكَٰفِرِينَ ١٨﴾ [ الانفال : ١٧، ١٨ ]
অর্থানুবাদ:
(আসল ব্যাপার হলো) “তোমরা তাদেরকে হত্যা করো নি, বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন, তুমি যখন নিক্ষেপ করছিলে তাতো তুমি নিক্ষেপ করো নি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন যাতে তিনি মুমিনদেরকে এক সুন্দরতম পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ করতে পারেন। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আমার এ ব্যবস্থা তোমাদের জন্য, (আর কাফেরদের সম্পর্কে কথা এ যে) আল্লাহ কাফেরদের ষড়যন্ত্রকে অকেজো করে দেন”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১৭-১৮]
তাফসীর:
অনুরূপ বলেছেন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবু উবাইদাহর সম্পর্কে বলেন যখন তিনি পারস্যে একটি সেতুর ওপর যুদ্ধ করছিলেন আর এ সময় পারস্য সৈন্যরা ছিল সংখ্যায় অনেক: সে যদি আমার নিকট ফিরে আসত তবে আমি তার জন্য এক দল হয়ে যেতাম। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে একই বর্ণনা দেন। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, যা আবু উসমান আন-নাহদী উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন, আবু ‘উবাইদ যখন লড়াই করছিলেন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, হে লোক সকল, আমি প্রতিটি মুসলিমের সেনাদল। মুজাহিদ রহ. বলেন, উমার রা. বলেন, আমি প্রত্যেক মুসলিমের দল।
আর দাহ্হাক রহ. أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ “বা নিজ দলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার” এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, المتحيز হচ্ছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণের নিকট ফিরে যায়; কিন্তু পলায়ন যদি এ সমস্ত কারণের কোনো একটির জন্য না হয় তবে তা হারাম, কবীরা গোনাহ। কেননা এ সম্পর্কে বুখারী ও মুসলিম তাদের ‘সহীহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ» قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ : «الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وقذف المحصنات الغافلات المؤمنات» ‘‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী গোনাহ থেকে বেঁচে থাক: বলা হয়: হে আল্লাহর রাসূল সেগুলো কী কী? তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যাদু, এমন আত্মাকে হত্যা করা যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন তবে ন্যায়ভাবে (হলে ভিন্ন কথা), সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভোগ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং মুমিনা, সাধাসিধে পবিত্রা নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৯] এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَقَدْ بَاءَ “সে তো পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল” অর্থাৎ ফিরে গেল بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ “আল্লাহর গজবে, আর তার ঠিকানা” তার গন্তব্য, এবং প্রত্যাবর্তণ দিবসে তার বাসস্থান جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ “জাহান্নামই আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল”। [ইমাম আহমাদ রহ. বাশীর ইবন মা‘বাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বাই‘আত গ্রহণ করার জন্য আসি, তিনি আমাকে শর্ত দেন আমি এ কথা সাক্ষ্য দেই— আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, সালাত কায়েম করি, যাকাত আদায় করি, হজ পালন করি, রমযানের সাওম পালন করি, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করি। আমি বললাম দু’টি পালন করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়, এক- জিহাদ। কারণ, তারা ধারণা করে, যে পিছপা হয় সে আল্লাহর ক্রোধে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল। আমি আশংকা করি, আমি যখন যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হব, অন্তর দুর্বল হয়ে পড়বে এবং মৃত্যু ভয়ে পলায়ন করব। দুই- সদকা। আমার কিছুই নেই মাত্র কতক ছাগল এবং দশটি যুদ-আমার পরিবারের বাহন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত ধরে নাড়া দিয়ে বলেন, «فَلَا جِهَادَ وَلَا صَدَقَةَ، فِيمَ تَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِذًا؟» “জিহাদ নেই আবার সাদকাও নেই, তাহলে তুমি কীভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে”? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আমি বাই‘আত গ্রহণ করব, অতঃপর আমি সবগুলোর ওপর বাই‘আত গ্রহণ করি। ইমাম আহমাদ রহ. স্বীয় মুসনাদে (৫/২২৪) হাদীসটি উল্লেখ করেছে। এ সনদে হাদীসটি গরীব, ছয় কিতাবে হাদীসটি আসে নি। (অনুবাদক)] কেউ কেউ বলেন, পলায়ন করা হারাম শুধু সাহাবীগণের জন্য। কারণ, তাদের জন্য জিহাদ করা ছিল ফরযে ‘আইন। কেউ কেউ বলেন, আনসারদের ওপর হারাম। কারণ, তারা সর্বাবস্থায় শোনা ও মানার ওপর বাই‘আত করেছেন।
কেউ কেউ বলেন, এ আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য বদরী সাহাবীগণ। (এ মত বর্ণিত, আমর, ইবন আব্বাস, আবু হুরায়রা, আবু সা‘ঈদ না‘ফে, হাসান বাসরী সা‘ঈদ ইবন জুবাইর, ইকরিমাহ, কাতাদা ও দাহ্হাক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম প্রমূখ থেকে) এ মতের পক্ষে তাদের প্রমাণ, এ দিন এমন কোনো ক্ষুদ্র জামা‘আত ছিল না যাদের কোনো দল আছে, যাদের দিকে তারা ফিরে যাবে, একমাত্র এ দল ছাড়া। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «اللَّهُمَّ إِنَّ تُهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةَ لَا تُعْبَدُ في الأرض» “হে আল্লাহ তুমি যদি এ ক্ষুদ্র জামা‘আতকে ধ্বংস কর, তবে জমিনে ইবাদাত করার আর কেউ থাকবে না”। এ কারণে হাসান রহ. আল্লাহর বাণী: وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَه “এমন দিনে যে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল” সম্পর্কে বলেন, এটি ছিল বদরের দিন। তবে বর্তমানে যদি কেউ তার শহর বা দলের দিক ফিরে আসে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।
ইবনুল মুবারক রহ. ইয়াযিদ ইবন হাবীব রহ. থেকে বর্ণনা করে বলেন, বদরের দিন যে পলায়ন করে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَن يُوَلِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ دُبُرَهُۥٓ إِلَّا مُتَحَرِّفٗا لِّقِتَالٍ أَوۡ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٖ فَقَدۡ بَآءَ بِغَضَبٖ مِّنَ ٱللَّهِ وَمَأۡوَىٰهُ جَهَنَّمُۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ “এমন দিনে যুদ্ধে কৌশল অবলম্বন বা নিজ দলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে সে তো আল্লাহর গজবে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ল, জাহান্নামই তার ঠিকানা আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।” তারপর যখন ওহুদের দিন আসে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ تَوَلَّوۡاْ مِنكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡتَقَى ٱلۡجَمۡعَانِ إِنَّمَا ٱسۡتَزَلَّهُمُ ٱلشَّيۡطَٰنُ بِبَعۡضِ مَا كَسَبُواْۖ وَلَقَدۡ عَفَا ٱللَّهُ عَنۡهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٞ ١٥٥﴾ [ ال عمران : ١٥٥ ] “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যারা পিছু হটে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন দু’দল মুখোমুখি হয়েছিল, শয়তানই তাদের কিছু কৃতকর্মের ফলে তাদেরকে পদস্খলিত করেছিল। আর অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, সহনশীল”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৫] তারপর যখন সাত বছর পর হুনাইনের যুদ্ধের দিন আসে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ثُمَّ وليِتُم مُّدْبِرِينَ “অতঃপর তোমরা পৃষ্ট প্রদর্শন করলে” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৫] ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَلَى من يشآء “তারপর আল্লাহ যাকে চান তার তাওবা কবুল করেন”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৭] আবু সা‘ঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি এ আয়াত وَمَن يُوَلِّهِمۡ يَوۡمَئِذٖ دُبُرَهُ “এমন দিনে যে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল” সম্পর্কে বলেন, এ আয়াতটি বদরী সাহাবীগণের বিষয়ে নাযিল হয়।
তবে আয়াতটি বদরী সাহাবীগণের সম্পর্কে নাযিল হলেও উল্লিখিত মতামত বদরী সাহাবী ছাড়া অন্যদের জন্য যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা হারাম হওয়ার পরিপন্থী নয়। যেমন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত উল্লিখিত হাদীস থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, যুদ্ধ থেকে পলায়ন করা ধ্বংসাত্মক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ ভালো জানেন।
﴿فَلَمۡ تَقۡتُلُوهُمۡ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ قَتَلَهُمۡۚ وَمَا رَمَيۡتَ إِذۡ رَمَيۡتَ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ رَمَىٰ وَلِيُبۡلِيَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ مِنۡهُ بَلَآءً حَسَنًاۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٞ ١٧ ذَٰلِكُمۡ وَأَنَّ ٱللَّهَ مُوهِنُ كَيۡدِ ٱلۡكَٰفِرِينَ ١٨﴾ [ الانفال : ١٧، ١٨ ]
অর্থানুবাদ:
(আসল ব্যাপার হলো) “তোমরা তাদেরকে হত্যা করো নি, বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন, তুমি যখন নিক্ষেপ করছিলে তাতো তুমি নিক্ষেপ করো নি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন যাতে তিনি মুমিনদেরকে এক সুন্দরতম পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ করতে পারেন। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আমার এ ব্যবস্থা তোমাদের জন্য, (আর কাফেরদের সম্পর্কে কথা এ যে) আল্লাহ কাফেরদের ষড়যন্ত্রকে অকেজো করে দেন”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১৭-১৮]
তাফসীর: