১
হাফেয ইবন কাসীরের তাফসীর থেকে সংক্ষেপিত সূরা আল-আনফালের তাফসীর
লেখকঃ শাইখ আহমদ মুহাম্মাদ শাকের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৯
কুফর ও শির্ক খতম করার জন্য যুদ্ধের নির্দেশ:
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” ইমাম বুখারী আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি এসে বলে: হে আবু আব্দুর রহমান, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে যা বলেছেন সেটা কি করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَإِن طَآئِفَتَانِ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱقۡتَتَلُواْ ٩﴾ [ الحجرات : ٩ ] “মুমিনদের দু’দল লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লে” [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত: ৯] কিসে আপনাকে যুদ্ধ করতে বাধা দেয় যেমন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন? ফলে তিনি বলেন, হে ভাতিজা, এ আয়াত স্মরণ করব কিন্তু লড়াই করব না এ বিষয়টি আমার নিকট অধিক প্রিয় এ আয়াতটি স্মরণ করার চেয়ে যাতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَمَن يَقۡتُلۡ مُؤۡمِنٗا مُّتَعَمِّدٗا ٩٣﴾ [ النساء : ٩٣ ] “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯৩] আয়াতের শেষ পর্যন্ত। তিনি বলেন, অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায়” আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এরূপ করেছি যখন ইসলাম ছিল দুর্বল, যখন কোনো ব্যক্তি তার দীনের ব্যাপারে পরীক্ষিত হত যে, হয় তারা তাকে হত্যা করবে আর নয়ত বন্দী করবে। অবশেষে যখন ইসলাম শক্তিশালী হয় ও বিস্তার লাভ করে তখন ফিতনার বেশি আশঙ্কা নেই। এরপর যখন তিনি দেখেন যে, তিনি তাঁর ইচ্ছার সাথে একমত নন তখন বলেন, আলী এবং উসমান (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) সম্পর্কে আপনাদের মতামত কী? আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, আলী এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা সম্পর্কে আমার মতামত হচ্ছে: উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করেছেন; কিন্তু তোমরা এটি অপছন্দ করেছ যে, তাঁকে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করুন। আর আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই এবং তাঁর জামাতা, তিনি তাঁর হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বলেন, আর এ হল তাঁর মেয়ে যেমন তোমরা দেখছ। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৬৫, ৪৬৫১]
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” অর্থাৎ যে পর্যন্ত না শির্ক খতম হয়। অনুরূপ বর্ণনা করেন আবুল ‘আলিয়া, মুজাহিদ, হাসান, কাতাদা, আর-রাবী‘ ইবন আনাস, সুদ্দী, মুকাতিল ইবন হাইইয়ান এবং যাইদ ইবন আসলাম।
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক রহ. বলেন, আমি যুহরী কর্তৃক উরওয়া ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এবং অন্যান্য আলেমদের থেকে জেনেছি তারা বলেন, حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ “যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায়” যে পর্যন্ত কোনো মুসলিম তাঁর দীনের কারণে নির্যাতিত না হয়। (যার কারণে তাকে তাঁর দীন পরিত্যাগ করতে হয়)
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” দাহ্হাক রহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্য একত্ববাদের ঘোষণা দেয়।
হাসান, কাতাদা এবং ইবন জুরাইয রহ. বলেন, وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” যে বলে: لَا إِلَهَ إلا الله “আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই”। একনিষ্ঠ তাওহীদ কেবল আল্লাহর জন্য। যাতে কোনো শির্ক থাকবে না। আল্লাহর ছাড়া অন্যান্য শরীক থেকে মুক্ত হওয়া। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক রহ. বলেন, তাওহীদ একনিষ্টভাবে আল্লাহর জন্য হয়। তাতে শির্ক না থাকে। তাঁকে বাদ দিয়ে আর সকল উপাস্যকে বর্জন করে।
আব্দুর রহমান ইবন যাইদ ইবন আসলাম রহ. বলেন, وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” তোমাদের দীনের সাথে কুফুরী না থাকে। আর তিনি এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন এ হাদীস দ্বারা যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لَا إِلَهَ إلا الله، فإذا قالوها فقد عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا وَحِسَابُهُمْ على الله عزَّ وجلَّ» . “আমি লোকেদের সাথে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে: لَا إِلَهَ إلا الله আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই। যখন তারা সেটা বলে তখন তাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে রয়েছে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা, তবে ন্যায়সঙ্গতভাবে (কারও জানমাল গেলে ভিন্ন কথা), আর তাদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহর নিকট”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২/৩৬] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আরও বর্ণিত, আবু মূসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, سُئِل رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الرَّجُلِ يُقَاتِلُ شُجَاعَةً وَيُقَاتِلُ حَمِيَّة، وَيُقَاتِلُ رِيَاءً، أيُّ ذَلِكَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، عَزَّ وَجَلَّ؟ فَقَالَ : من قاتل لتكون كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا، فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، عَزَّ وَجَلَّ “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যে লড়াই করে বীরত্ব দেখানোর জন্য, লড়াই করে আপন গোত্রের মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং লড়াই করে লোক দেখানোর জন্য, এগুলোর কোনটি আল্লাহর পথে লড়াই বলে গণ্য? তখন তিনি বলেন, যে ব্যক্তি লড়াই করে আল্লাহ তা‘আলার বাণীকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য, সেই আল্লাহর পথে লড়াই করে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৮১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৪]
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: فَإِنِ ٱنتَهَوۡاْ “অতঃপর তারা যদি বিরত হয়” অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের লড়াইয়ের কারণে যে কুফুরীতে তারা লিপ্ত রয়েছে তা থেকে, তাহলে তোমরাও বিরত হও, যদিও তোমরা তাদের ভেতরের কথা না জান। فَإِنَّ ٱللَّهَ بِمَا يَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ “তাহলে তারা (ন্যায় বা অন্যায়) যা করে আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা” যেমন তিনি বলেন, فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ [ التوبة : ١١ ] “কিন্তু তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১] অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ [ التوبة : ١١ ] “তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ لِلَّهِۖ فَإِنِ ٱنتَهَوۡاْ فَلَا عُدۡوَٰنَ إِلَّا عَلَى ٱلظَّٰلِمِينَ ١٩٣﴾ [ البقرة : ١٩٣ ] “ফিতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত এবং দীন আল্লাহর জন্য নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, অতঃপর যদি তারা বিরত হয় তবে যালিমদের ওপর ছাড়া কোনোও প্রকারের কঠোরতা অবলম্বন জায়েয হবে না” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৩] বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামা ইবন যাইদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলেন, যখন তিনি তরবারী দিয়ে জনৈক ব্যক্তিকে পরাভূত করেন আর এমন সময় সে বলে: لَا إِلَهَ إلا الله আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই, এরপর তিনি তাকে আঘাত করে হত্যা করেন। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হলে তিনি উসামাকে বলেন, «أقتلته بعدما قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ؟ وَكَيْفَ تَصْنَعُ بلا إله إلا الله يوم القيامة» ؟ فقال : يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّمَا قَالَهَا تَعَوُّذًا، قَالَ : «هَلَّا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ» ، وَجَعَلَ يَقُولُ وَيُكَرِّرُ عَلَيْهِ : «مَنْ لَكَ بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» ؟ قَالَ أُسَامَةُ : حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي لم أكن أسلمت إلا يومئذ، “সে لَا إِلَهَ إلا الله (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই) বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করেছ? কিয়ামত দিবসে لَا إِلَهَ إلا الله (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই)-এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে তুমি কী করবে? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, সে তো জান বাঁচাতে এটি বলেছে? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি কি তার অন্তর ফেড়ে দেখেছ? তিনি বারবার এ কথা বলতে থাকেন, কিয়ামত দিবসে لَا إِلَهَ إلا الله (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই)-এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে কে তোমার সাথে থাকবে। উসামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, অবশেষে আমার আকাঙ্খা হয় যে, আমি যদি সেই দিনই ইসলাম গ্রহণ করতাম। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪২৫৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৬]
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَإِن تَوَلَّوۡاْ فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَوۡلَىٰكُمۡۚ نِعۡمَ ٱلۡمَوۡلَىٰ وَنِعۡمَ ٱلنَّصِيرُ “আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে জেনে রেখ যে, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই না উত্তম অভিভাবক! কতই না উত্তম সাহায্যকারী!” অর্থাৎ তারা যদি তোমাদের বিরুদ্ধাচরনে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিরবচ্ছিন্ন থাকে فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَوۡلَىٰكُمۡۚ “তবে জেনে রাখ আল্লাহ তা‘আলাই তোমাদের শত্রুদের ওপর তোমাদের অভিভাবক”। তোমাদের মালিক এবং তোমাদের দুশমণদের বিপক্ষে সাহায্যকারী, তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক এবং শ্রেষ্ট সাহায্যকারী।
﴿وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّمَا غَنِمۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُۥ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِ إِن كُنتُمۡ ءَامَنتُم بِٱللَّهِ وَمَآ أَنزَلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا يَوۡمَ ٱلۡفُرۡقَانِ يَوۡمَ ٱلۡتَقَى ٱلۡجَمۡعَانِۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ٤١﴾ [ الانفال : ٤١ ]
অর্থানুবাদ:
“তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রসূল, রাসূলের আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য, যদি তোমরা আল্লাহর ওপর আর চূড়ান্ত ফায়সালা-ফুরকানের দিন, দু’পক্ষের মিলিত হওয়ার দিন, আমি যা আমার বান্দার ওপর অবতীর্ণ করেছিলাম তার ওপর ঈমান এনে থাক। আর আল্লাহ সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪১]
তাফসীর:
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” অর্থাৎ যে পর্যন্ত না শির্ক খতম হয়। অনুরূপ বর্ণনা করেন আবুল ‘আলিয়া, মুজাহিদ, হাসান, কাতাদা, আর-রাবী‘ ইবন আনাস, সুদ্দী, মুকাতিল ইবন হাইইয়ান এবং যাইদ ইবন আসলাম।
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক রহ. বলেন, আমি যুহরী কর্তৃক উরওয়া ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এবং অন্যান্য আলেমদের থেকে জেনেছি তারা বলেন, حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ “যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায়” যে পর্যন্ত কোনো মুসলিম তাঁর দীনের কারণে নির্যাতিত না হয়। (যার কারণে তাকে তাঁর দীন পরিত্যাগ করতে হয়)
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” দাহ্হাক রহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্য একত্ববাদের ঘোষণা দেয়।
হাসান, কাতাদা এবং ইবন জুরাইয রহ. বলেন, وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” যে বলে: لَا إِلَهَ إلا الله “আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই”। একনিষ্ঠ তাওহীদ কেবল আল্লাহর জন্য। যাতে কোনো শির্ক থাকবে না। আল্লাহর ছাড়া অন্যান্য শরীক থেকে মুক্ত হওয়া। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক রহ. বলেন, তাওহীদ একনিষ্টভাবে আল্লাহর জন্য হয়। তাতে শির্ক না থাকে। তাঁকে বাদ দিয়ে আর সকল উপাস্যকে বর্জন করে।
আব্দুর রহমান ইবন যাইদ ইবন আসলাম রহ. বলেন, وَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ “আর দীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়” তোমাদের দীনের সাথে কুফুরী না থাকে। আর তিনি এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন এ হাদীস দ্বারা যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لَا إِلَهَ إلا الله، فإذا قالوها فقد عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا وَحِسَابُهُمْ على الله عزَّ وجلَّ» . “আমি লোকেদের সাথে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে: لَا إِلَهَ إلا الله আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই। যখন তারা সেটা বলে তখন তাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে রয়েছে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা, তবে ন্যায়সঙ্গতভাবে (কারও জানমাল গেলে ভিন্ন কথা), আর তাদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহর নিকট”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২/৩৬] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আরও বর্ণিত, আবু মূসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, سُئِل رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الرَّجُلِ يُقَاتِلُ شُجَاعَةً وَيُقَاتِلُ حَمِيَّة، وَيُقَاتِلُ رِيَاءً، أيُّ ذَلِكَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، عَزَّ وَجَلَّ؟ فَقَالَ : من قاتل لتكون كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا، فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، عَزَّ وَجَلَّ “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, যে লড়াই করে বীরত্ব দেখানোর জন্য, লড়াই করে আপন গোত্রের মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং লড়াই করে লোক দেখানোর জন্য, এগুলোর কোনটি আল্লাহর পথে লড়াই বলে গণ্য? তখন তিনি বলেন, যে ব্যক্তি লড়াই করে আল্লাহ তা‘আলার বাণীকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য, সেই আল্লাহর পথে লড়াই করে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৮১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৪]
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: فَإِنِ ٱنتَهَوۡاْ “অতঃপর তারা যদি বিরত হয়” অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের লড়াইয়ের কারণে যে কুফুরীতে তারা লিপ্ত রয়েছে তা থেকে, তাহলে তোমরাও বিরত হও, যদিও তোমরা তাদের ভেতরের কথা না জান। فَإِنَّ ٱللَّهَ بِمَا يَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ “তাহলে তারা (ন্যায় বা অন্যায়) যা করে আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা” যেমন তিনি বলেন, فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ [ التوبة : ١١ ] “কিন্তু তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১] অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ [ التوبة : ١١ ] “তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ لِلَّهِۖ فَإِنِ ٱنتَهَوۡاْ فَلَا عُدۡوَٰنَ إِلَّا عَلَى ٱلظَّٰلِمِينَ ١٩٣﴾ [ البقرة : ١٩٣ ] “ফিতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত এবং দীন আল্লাহর জন্য নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, অতঃপর যদি তারা বিরত হয় তবে যালিমদের ওপর ছাড়া কোনোও প্রকারের কঠোরতা অবলম্বন জায়েয হবে না” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৩] বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামা ইবন যাইদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলেন, যখন তিনি তরবারী দিয়ে জনৈক ব্যক্তিকে পরাভূত করেন আর এমন সময় সে বলে: لَا إِلَهَ إلا الله আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই, এরপর তিনি তাকে আঘাত করে হত্যা করেন। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হলে তিনি উসামাকে বলেন, «أقتلته بعدما قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ؟ وَكَيْفَ تَصْنَعُ بلا إله إلا الله يوم القيامة» ؟ فقال : يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّمَا قَالَهَا تَعَوُّذًا، قَالَ : «هَلَّا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ» ، وَجَعَلَ يَقُولُ وَيُكَرِّرُ عَلَيْهِ : «مَنْ لَكَ بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» ؟ قَالَ أُسَامَةُ : حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّي لم أكن أسلمت إلا يومئذ، “সে لَا إِلَهَ إلا الله (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই) বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করেছ? কিয়ামত দিবসে لَا إِلَهَ إلا الله (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই)-এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে তুমি কী করবে? তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, সে তো জান বাঁচাতে এটি বলেছে? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি কি তার অন্তর ফেড়ে দেখেছ? তিনি বারবার এ কথা বলতে থাকেন, কিয়ামত দিবসে لَا إِلَهَ إلا الله (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই)-এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে কে তোমার সাথে থাকবে। উসামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, অবশেষে আমার আকাঙ্খা হয় যে, আমি যদি সেই দিনই ইসলাম গ্রহণ করতাম। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪২৫৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৬]
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: وَإِن تَوَلَّوۡاْ فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَوۡلَىٰكُمۡۚ نِعۡمَ ٱلۡمَوۡلَىٰ وَنِعۡمَ ٱلنَّصِيرُ “আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে জেনে রেখ যে, আল্লাহই তোমাদের অভিভাবক, কতই না উত্তম অভিভাবক! কতই না উত্তম সাহায্যকারী!” অর্থাৎ তারা যদি তোমাদের বিরুদ্ধাচরনে এবং তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিরবচ্ছিন্ন থাকে فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَوۡلَىٰكُمۡۚ “তবে জেনে রাখ আল্লাহ তা‘আলাই তোমাদের শত্রুদের ওপর তোমাদের অভিভাবক”। তোমাদের মালিক এবং তোমাদের দুশমণদের বিপক্ষে সাহায্যকারী, তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক এবং শ্রেষ্ট সাহায্যকারী।
﴿وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّمَا غَنِمۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُۥ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِ إِن كُنتُمۡ ءَامَنتُم بِٱللَّهِ وَمَآ أَنزَلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا يَوۡمَ ٱلۡفُرۡقَانِ يَوۡمَ ٱلۡتَقَى ٱلۡجَمۡعَانِۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ٤١﴾ [ الانفال : ٤١ ]
অর্থানুবাদ:
“তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রসূল, রাসূলের আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য, যদি তোমরা আল্লাহর ওপর আর চূড়ান্ত ফায়সালা-ফুরকানের দিন, দু’পক্ষের মিলিত হওয়ার দিন, আমি যা আমার বান্দার ওপর অবতীর্ণ করেছিলাম তার ওপর ঈমান এনে থাক। আর আল্লাহ সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪১]
তাফসীর: