১
হাফেয ইবন কাসীরের তাফসীর থেকে সংক্ষেপিত সূরা আল-আনফালের তাফসীর
লেখকঃ শাইখ আহমদ মুহাম্মাদ শাকের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৫
মুহাজির এবং আনসারগণ পরস্পর পরস্পরের বন্ধু:
আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের একাধিক প্রকার বর্ণনা করেছেন, আর তাদেরকে বিভক্ত করেছেন মুহাজিরে যারা তাদের ঘরবাড়ী ও ধনসম্পদ ছেড়ে বের হয়ে এসেছে তারা এসেছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে সাহায্য করার জন্য, দীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে, আর এ জন্য তারা তাদের ধনসম্পদ এবং আত্মা ব্যয় করেছেন। (আর) আনসারে বিন্যাস করেছেন, তারা হচ্ছে মদীনাবাসী মুসলিমবৃন্দ যারা তাদের মুহাজির ভাইদেরকে তাদের বাড়ীঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন, আর তাদের ধনসম্পদ দিয়ে তাদের আরামের ব্যবস্থা করেছিলেন, আর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে সাহায্য করেছিলেন তাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করার মাধ্যমে। بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ “এরা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু” তাদের প্রত্যেকের রয়েছে অপরের জন্য অধিক অধিকার অন্যদের চেয়ে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির এবং আনসারবৃন্দের প্রত্যেক দু’জনের মাঝে ভাতৃত্ব সৃষ্টি করে দেন, এ কারণে তারা পরস্পরে উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন যা আত্মীয়স্বজনের ওপর অগ্রগণ্য ছিল। অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা মীরাসের আয়াতের মাধ্যমে এ বিষয়টিকে রহিত করে দেন। সহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে এ বিষয়টি প্রমাণিত রয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৭৪৭] মুজাহিদ, ইকরামাহ, হাসান, হাসান রহ. ও অন্যান্যরা একই কথা বলেছেন। [ইমাম আহমাদ রহ. বর্ণনা করেন, জারীর ইবন আব্দুল্লাহ আল বাজালী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «المهاجرون والأنصار بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ، والطلقاء من قريش والعتقاء من ثقيف بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ إلى يوم القيامة» “মুহাজির এবং আনসারবৃন্দ পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, (মক্কা বিজয়ের পরের প্রতিশোধ না নিয়ে) ছেড়ে দেওয়া কুরাইশরা এবং সাক্বীফ গোত্রের মুক্তরা (যাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের যুদ্ধের পরে ছেড়ে দেন) কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তারা পরস্পর বন্ধু”।আহমাদ রহ. স্বীয় মুসনাদে (৪/৩৬৩) এককভাবে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (অনুবাদক)] আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের একাধিক স্থানে মুহাজির ও আনসারগণের প্রশংসা করেছেন, তিনি বলেছেন: وَالسَّابِقُونَ الأوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الأنْهَارُ [ التوبة : “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম সারির অগ্রণী আর যারা তাদেরকে যাবতীয় সৎকর্মে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তাদের জন্য তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالأنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ [ التوبة : “আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন নাবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি যারা সংকটকালে তাকে অনুসরণ করেছিল”। [সূরা আদ-তাওবাহ আয়াত: ১১৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ﴿لِلۡفُقَرَآءِ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ ٱلَّذِينَ أُخۡرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِمۡ وَأَمۡوَٰلِهِمۡ يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ ٨ وَٱلَّذِينَ تَبَوَّءُو ٱلدَّارَ وَٱلۡإِيمَٰنَ مِن قَبۡلِهِمۡ يُحِبُّونَ مَنۡ هَاجَرَ إِلَيۡهِمۡ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمۡ حَاجَةٗ مِّمَّآ أُوتُواْ وَيُؤۡثِرُونَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ وَلَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَةٞۚ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٩﴾ [ الحشر : ٨، ٩ ] “(আর এ সম্পদ) সে সব দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য যাদেরকে তাদের বাড়ীঘর ও সম্পত্তি-সম্পদ থেকে উৎখাত করা হয়েছে। যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে, আর তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। এরাই (কথায় ও কাজে) সত্যবাদী। (আর এ সম্পদ তাদের জন্যও) যারা মুহাজিরদের আসার আগে থেকেই (মাদীনাহ) নগরীর বাসিন্দা ছিল আর ঈমান গ্রহণ করেছে। তারা তাদেরকে ভালোবাসে যারা তাদের কাছে হিজরাত করে এসেছে। মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তা পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোনো কামনা রাখে না, আর তাদেরকে (অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে) নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা যতই অভাবগ্রস্ত হোক না কেন। যাদেরকে হৃদয়ের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম”। তিনি কতই না চমৎকারভাবে এ আয়াতে বলেছেন: وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمۡ حَاجَةٗ مِّمَّآ أُوتُوا “মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তা পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোনো কামনা রাখে না” অর্থাৎ হিজরতের কারণে আল্লাহ তা‘আলা মুহাজিরবৃন্দকে যে মর্যাদা দিয়েছেন তার জন্য তাদের প্রতি তারা পরশ্রীকাতর নয়। আয়াতে বাহ্যত বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা আনসারদের ওপর মুহাজিরদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আর এ বিষয়ের ওপর আলেমগণের মাঝে ঐক্যমত সৃষ্টি হয়েছে কেউ এ ব্যাপারে মতনৈক্য করে নি। এ কারণেই ইমাম বাযযার সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব থেকে তিনি হুযাইফাহ থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে হিজরত ও সাহায্য দু’টির মধ্যে যে কোনো একটি গ্রহণ করতে বললে আমি হিজরতকে গ্রহণ করি।