১
কুরআন ও সহীহ হাদীসে আলোকে সদকা-খয়রাত
লেখকঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দুল আযীয আল-মাদানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৮
৩. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য সদকা-খয়রাত করলে তা কখনোই বৃথা যায় না:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَمَثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُمُ ٱبۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ ٱللَّهِ وَتَثۡبِيتٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ كَمَثَلِ جَنَّةِۢ بِرَبۡوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٞ فََٔاتَتۡ أُكُلَهَا ضِعۡفَيۡنِ فَإِن لَّمۡ يُصِبۡهَا وَابِلٞ فَطَلّٞۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٌ ٢٦٥ ﴾ [ البقرة : ٢٦٥ ]
“যারা পরকালের প্রতিদানে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্যই তাঁর পথে দান করে তাদের উপমা যেমন উঁচু জমিনে অবস্থিত একটি উদ্যান। তাতে প্রবল বৃষ্টি হলে ফসল হয় দ্বিগুণ। আর তা না হলে শিশিরই সে জমিনের জন্য যথেষ্ট। তোমরা যাই করছো আল্লাহ তা‘আলা তা সবই দেখছেন”। [আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿ ۞لَّيۡسَ عَلَيۡكَ هُدَىٰهُمۡ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهۡدِي مَن يَشَآءُۗ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٖ فَلِأَنفُسِكُمۡۚ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ٱبۡتِغَآءَ وَجۡهِ ٱللَّهِۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٖ يُوَفَّ إِلَيۡكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ ٢٧٢ ﴾ [ البقرة : ٢٧٢ ]
“তোমরা যে ধন-সম্পদগুলো আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করো তা তো তোমাদের নিজেদের জন্যই। তবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদগুলো ব্যয় করো না। যা কিছুই তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করবে তা তোমাদেরকে পূর্ণভাবেই দেওয়া হবে। এতটুকুও তোমাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭২]
তিনি আরো বলেন,
﴿ وَلَا يُنفِقُونَ نَفَقَةٗ صَغِيرَةٗ وَلَا كَبِيرَةٗ وَلَا يَقۡطَعُونَ وَادِيًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمۡ لِيَجۡزِيَهُمُ ٱللَّهُ أَحۡسَنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٢١ ﴾ [ التوبة : ١٢١ ]
“তেমনিভাবে তারা ছোট-বড় যা কিছুই (আল্লাহ তা‘আলার পথে) ব্যয় করুক না কেন এবং যে প্রান্তরই তারা অতিক্রম করুক না কেন তা সবই তাদের নামে লেখা হবে যেন আল্লাহ তা‘আলা তাদের কৃতকর্ম সমূহের অতি উত্তম বিনিময় দিতে পারেন”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২১]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿ وَمَآ أَنفَقۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَهُوَ يُخۡلِفُهُۥۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلرَّٰزِقِينَ ٣٩ ﴾ [ سبا : ٣٩ ]
“তোমরা যা কিছু দান করবে আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতিদান অবশ্যই দিবেন। তিনি তো হলেন উত্তম রিযিকদাতা”। [সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : يَا ابْنَ آدَمَ أَنْفِقْ أُنْفِقْ عَلَيْكَ» ب : 4684 ، م : 399
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে বনী আদম! তুমি দান করো। আমিও তোমাকে দান করবো”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৯৩]
আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا اسْتُوْدِعَ شَيْئًا حَفِظَهُ»
“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলার নিকট কোনো কিছু আমানত রাখা হলে তিনি তা হিফাযত করেন”। [সহীহুত তারগীবি ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ৮৭৪]
অনেকেই একটি টাকা সদকা করতে এক হাজার বার ভাবেন, এ টাকাটা কি কাজে লাগবে? এ টাকাটা কোথায় যাবে? এ লোকটার উপর তো আস্থা রাখা যায় না? মনে হয় সে খেয়ে ফেলবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আরে আপনাকে এতো কিছু চিন্তা করতে হবে না। আপনি শুধু এতটুকুই দেখবেন যে, যদি লোকটি নিজের জন্যেই আপনার কাছে সদকা চেয়ে থাকে তা হলে লোকটি কি ব্যক্তিগতভাবে সদকা খাওয়ার উপযুক্ত? না কি নয়? তবে এ ব্যাপারটা তার বাহ্যিক রূপ দেখলেই সাধারণত অনুমান করা যায়। তার সম্পর্কে প্রচুর খোঁজাখুঁজির কোনো প্রয়োজন নেই। বেশি খোঁজাখুঁজি করা মানে সদকা না দেওয়ারই ভান করা।
একদা দু’ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিদায়ী হজে তাঁর নিকট সদকা প্রার্থনা করে। তখন তিনি মানুষদের মাঝে সদকা বন্টন করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার নিজ চক্ষু নিম্নগামী করে নেন। তাদেরকে সুঠাম ও শক্তিশালীই মনে হচ্ছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
«إِنَّ شِئْتُمَا أَعْطَيْتُكُمَا، وَلَا حَظَّ فِيهَا لِغَنِيٍّ، وَلَا لِقَوِيٍّ مُكْتَسِبٍ»
“যদি তোমরা চাও তা হলে আমি তোমাদেরকে সদকা দিতে পারি। তবে মনে রাখবে, কোনো ধনী ও শক্তিশালী কর্মক্ষম ব্যক্তি সদকা খেতে পারে না তথা সদকায় তার কোনো অধিকার নেই”। [সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬৩৩]
আর যদি লোকটি নিজের জন্য সদকা না চেয়ে বরং তিনি অন্য কোনো ধর্মীয় কাজের জন্য সদকা চান তখন আপনার দেখার বিষয় হবে, লোকটি কি নিজেই কাজটি করতে যাচ্ছেন, না কি অন্য জন। যদি তিনি নিজেই কাজটি করতে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন তা হলে দেখবেন, লোকটি কি উক্ত কাজ করার উপযুক্ততা রাখেন, না কি রাখেন না? যদি তিনি সত্যিই উক্ত কাজ সম্পাদনের উপযুক্ততা রেখে থাকেন এবং এ সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে আপনার ধারণা হয় তা হলে তাঁর দিকে সহযোগিতার হাত যথাসাধ্য বাড়াবেন। আর যদি তিনি অথবা তিনি যাঁর প্রতিনিধি কেউই উক্ত কাজের পূর্ণ অভিজ্ঞতা রাখেন না। আর কাজটি উক্ত সমাজে সম্পাদিত হওয়া খুবই প্রয়োজন তা হলে আপনার কাজ হবে, তাঁকে সহযোগিতা না করে এ কাজের যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে তাঁর হাতে উক্ত কাজের দায়িত্ব অর্পণ করে তাঁর যথাসাধ্য সহযোগিতা করা। উপরন্তু তিনি টাকাটি কাজে লাগাবেন, না কি খেয়ে ফেলবেন এ জাতীয় চিন্তা অমূলক। কারণ, এ জাতীয় চিন্তা করা মানে কাজটি না করার ভান করা। তবে লোকটির অর্থ আত্মসাতের পূর্ব রেকর্ড থাকলে তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে এবং তাঁর বিকল্প খুঁজতে হবে।
এতটুকু বিশ্বাসের উপর আপনি যদি কাউকে কোনো সহযোগিতা করলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি উক্ত কাজের অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলেন অথবা তাঁর দ্বারা আত্মসাতের ন্যায় ঘৃণ্য কাজটি সংঘটিত হলো অথবা তিনি নিজেই সদকা খাওয়ার অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলো তা হলে আপনার দান এতটুকুও বৃথা যাবে না। বরং তা আপনি আল্লাহ তা‘আলার নিকট পূর্ণভাবেই পেয়ে যাবেন।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«قَالَ رَجُلٌ : لَأَتَصَدَّقَنَّ اللَّيْلَةَ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِيْ يَدِ زَانِيَةٍ، فَأَصْبَحُوْا يَتَحَدَّثُوْنَ : تُصُدِّقَ اللَّيْلَةَ عَلَى زَانِيَةٍ، قَالَ : اللَّهُمَّ ! لَكَ الْـحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ، لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِيْ يَدِ غَنِيٍّ، فَأَصْبَحُوْا يَتَحَدَّثُوْنَ : تُصُدِّقَ عَلَى غَنِيٍّ، قَالَ : اللَّهُمَّ ! لَكَ الْـحَمْدُ عَلَى غَنِيٍّ، لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِيْ يَدِ سَارِقٍ، فَأَصْبَحُوْا يَتَحَدَّثُوْنَ : تُصُدِّقَ عَلَى سَارِقٍ، فَقَالَ : اللَّهُمَّ ! لَكَ الْـحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ وَعَلَى غَنِيٍّ وَعَلَى سَارِقٍ، فَأُتِيَ فَقِيْلَ لَهُ : أَمَّا صَدَقَتُكَ فَقَدْ قُبِلَتْ، أَمَّا الزَّانِيَةُ فَلَعَلَّهَا تَسْتَعِفُّ بِهَا عَنْ زِنَاهَا، وَلَعَلَّ الْغَنِيَّ يَعْتَبِرُ فَيُنْفِقُ مِمَّا أَعْطَاهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ، وَلَعَلَّ السَّارِقَ يَسْتَعِفُّ بِهَا عَنْ سَرِقَتِهِ»
“জনৈক ব্যক্তি মনে মনে বললো, আজ রাত আমি সদকা দেবো। যখন রাত হলো তখন সে সদকা নিয়ে বের হলো এবং জনৈকা ব্যভিচারিণীকে তা দিয়ে দিলো। সকাল বেলায় লোকেরা বলতে শুরু করলে, আজ রাত জনৈকা ব্যভিচারিণীকে সদকা দেওয়া হয়েছে। তখন সে বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। আমার সদকাটা তো পড়ে গেলো জনৈকা ব্যভিচারিণীর হাতে। আমি আবারো সদকা দেবো। যখন রাত হলো তখন সে সদকা নিয়ে আবারো বের হলো এবং জনৈক ধনী ব্যক্তিকে তা দিয়ে দিলো। সকাল বেলায় লোকেরা বলতে শুরু করলে, আজ রাত জনৈক ধনীকে সদকা দেওয়া হয়েছে। তখন সে বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। আমার সদকাটা তো পড়ে গেলো জনৈক ধনীর হাতে। আমি আবারো সদকা দেবো। যখন রাত হলো তখন সে আবারো সদকা নিয়ে বের হলো এবং জনৈক চোরকে তা দিয়ে দিলো। সকাল বেলায় লোকেরা বলতে শুরু করলে, আজ রাত জনৈক চোরকে সদকা দেওয়া হয়েছে। তখন সে বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। আমার সদকাটা তো পড়ে গেলো জনৈকা ব্যভিচারিণী, জনৈক ধনী এবং জনৈক চোরের হাতে। তখন তাকে স্বপ্নযোগে বলা হলোঃ তোমার সকল সদকাই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। হয়তো বা তোমার সদকার কারণে ব্যভিচারিণী ব্যভিচার ছেড়ে দেবে, ধনী ব্যক্তি এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সেও আল্লাহর পথে সদকা দেওয়া শুরু করবে এবং চোরটিও চুরি করা ছেড়ে দেবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০২২]
﴿ وَمَثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُمُ ٱبۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ ٱللَّهِ وَتَثۡبِيتٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ كَمَثَلِ جَنَّةِۢ بِرَبۡوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٞ فََٔاتَتۡ أُكُلَهَا ضِعۡفَيۡنِ فَإِن لَّمۡ يُصِبۡهَا وَابِلٞ فَطَلّٞۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٌ ٢٦٥ ﴾ [ البقرة : ٢٦٥ ]
“যারা পরকালের প্রতিদানে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্যই তাঁর পথে দান করে তাদের উপমা যেমন উঁচু জমিনে অবস্থিত একটি উদ্যান। তাতে প্রবল বৃষ্টি হলে ফসল হয় দ্বিগুণ। আর তা না হলে শিশিরই সে জমিনের জন্য যথেষ্ট। তোমরা যাই করছো আল্লাহ তা‘আলা তা সবই দেখছেন”। [আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿ ۞لَّيۡسَ عَلَيۡكَ هُدَىٰهُمۡ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهۡدِي مَن يَشَآءُۗ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٖ فَلِأَنفُسِكُمۡۚ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ٱبۡتِغَآءَ وَجۡهِ ٱللَّهِۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٖ يُوَفَّ إِلَيۡكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ ٢٧٢ ﴾ [ البقرة : ٢٧٢ ]
“তোমরা যে ধন-সম্পদগুলো আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করো তা তো তোমাদের নিজেদের জন্যই। তবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদগুলো ব্যয় করো না। যা কিছুই তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করবে তা তোমাদেরকে পূর্ণভাবেই দেওয়া হবে। এতটুকুও তোমাদের প্রতি যুলুম করা হবে না। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭২]
তিনি আরো বলেন,
﴿ وَلَا يُنفِقُونَ نَفَقَةٗ صَغِيرَةٗ وَلَا كَبِيرَةٗ وَلَا يَقۡطَعُونَ وَادِيًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمۡ لِيَجۡزِيَهُمُ ٱللَّهُ أَحۡسَنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٢١ ﴾ [ التوبة : ١٢١ ]
“তেমনিভাবে তারা ছোট-বড় যা কিছুই (আল্লাহ তা‘আলার পথে) ব্যয় করুক না কেন এবং যে প্রান্তরই তারা অতিক্রম করুক না কেন তা সবই তাদের নামে লেখা হবে যেন আল্লাহ তা‘আলা তাদের কৃতকর্ম সমূহের অতি উত্তম বিনিময় দিতে পারেন”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২১]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿ وَمَآ أَنفَقۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَهُوَ يُخۡلِفُهُۥۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلرَّٰزِقِينَ ٣٩ ﴾ [ سبا : ٣٩ ]
“তোমরা যা কিছু দান করবে আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতিদান অবশ্যই দিবেন। তিনি তো হলেন উত্তম রিযিকদাতা”। [সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى : يَا ابْنَ آدَمَ أَنْفِقْ أُنْفِقْ عَلَيْكَ» ب : 4684 ، م : 399
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে বনী আদম! তুমি দান করো। আমিও তোমাকে দান করবো”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৯৩]
আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا اسْتُوْدِعَ شَيْئًا حَفِظَهُ»
“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলার নিকট কোনো কিছু আমানত রাখা হলে তিনি তা হিফাযত করেন”। [সহীহুত তারগীবি ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ৮৭৪]
অনেকেই একটি টাকা সদকা করতে এক হাজার বার ভাবেন, এ টাকাটা কি কাজে লাগবে? এ টাকাটা কোথায় যাবে? এ লোকটার উপর তো আস্থা রাখা যায় না? মনে হয় সে খেয়ে ফেলবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আরে আপনাকে এতো কিছু চিন্তা করতে হবে না। আপনি শুধু এতটুকুই দেখবেন যে, যদি লোকটি নিজের জন্যেই আপনার কাছে সদকা চেয়ে থাকে তা হলে লোকটি কি ব্যক্তিগতভাবে সদকা খাওয়ার উপযুক্ত? না কি নয়? তবে এ ব্যাপারটা তার বাহ্যিক রূপ দেখলেই সাধারণত অনুমান করা যায়। তার সম্পর্কে প্রচুর খোঁজাখুঁজির কোনো প্রয়োজন নেই। বেশি খোঁজাখুঁজি করা মানে সদকা না দেওয়ারই ভান করা।
একদা দু’ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিদায়ী হজে তাঁর নিকট সদকা প্রার্থনা করে। তখন তিনি মানুষদের মাঝে সদকা বন্টন করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার নিজ চক্ষু নিম্নগামী করে নেন। তাদেরকে সুঠাম ও শক্তিশালীই মনে হচ্ছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
«إِنَّ شِئْتُمَا أَعْطَيْتُكُمَا، وَلَا حَظَّ فِيهَا لِغَنِيٍّ، وَلَا لِقَوِيٍّ مُكْتَسِبٍ»
“যদি তোমরা চাও তা হলে আমি তোমাদেরকে সদকা দিতে পারি। তবে মনে রাখবে, কোনো ধনী ও শক্তিশালী কর্মক্ষম ব্যক্তি সদকা খেতে পারে না তথা সদকায় তার কোনো অধিকার নেই”। [সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬৩৩]
আর যদি লোকটি নিজের জন্য সদকা না চেয়ে বরং তিনি অন্য কোনো ধর্মীয় কাজের জন্য সদকা চান তখন আপনার দেখার বিষয় হবে, লোকটি কি নিজেই কাজটি করতে যাচ্ছেন, না কি অন্য জন। যদি তিনি নিজেই কাজটি করতে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন তা হলে দেখবেন, লোকটি কি উক্ত কাজ করার উপযুক্ততা রাখেন, না কি রাখেন না? যদি তিনি সত্যিই উক্ত কাজ সম্পাদনের উপযুক্ততা রেখে থাকেন এবং এ সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে আপনার ধারণা হয় তা হলে তাঁর দিকে সহযোগিতার হাত যথাসাধ্য বাড়াবেন। আর যদি তিনি অথবা তিনি যাঁর প্রতিনিধি কেউই উক্ত কাজের পূর্ণ অভিজ্ঞতা রাখেন না। আর কাজটি উক্ত সমাজে সম্পাদিত হওয়া খুবই প্রয়োজন তা হলে আপনার কাজ হবে, তাঁকে সহযোগিতা না করে এ কাজের যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে তাঁর হাতে উক্ত কাজের দায়িত্ব অর্পণ করে তাঁর যথাসাধ্য সহযোগিতা করা। উপরন্তু তিনি টাকাটি কাজে লাগাবেন, না কি খেয়ে ফেলবেন এ জাতীয় চিন্তা অমূলক। কারণ, এ জাতীয় চিন্তা করা মানে কাজটি না করার ভান করা। তবে লোকটির অর্থ আত্মসাতের পূর্ব রেকর্ড থাকলে তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে এবং তাঁর বিকল্প খুঁজতে হবে।
এতটুকু বিশ্বাসের উপর আপনি যদি কাউকে কোনো সহযোগিতা করলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি উক্ত কাজের অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলেন অথবা তাঁর দ্বারা আত্মসাতের ন্যায় ঘৃণ্য কাজটি সংঘটিত হলো অথবা তিনি নিজেই সদকা খাওয়ার অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলো তা হলে আপনার দান এতটুকুও বৃথা যাবে না। বরং তা আপনি আল্লাহ তা‘আলার নিকট পূর্ণভাবেই পেয়ে যাবেন।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«قَالَ رَجُلٌ : لَأَتَصَدَّقَنَّ اللَّيْلَةَ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِيْ يَدِ زَانِيَةٍ، فَأَصْبَحُوْا يَتَحَدَّثُوْنَ : تُصُدِّقَ اللَّيْلَةَ عَلَى زَانِيَةٍ، قَالَ : اللَّهُمَّ ! لَكَ الْـحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ، لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِيْ يَدِ غَنِيٍّ، فَأَصْبَحُوْا يَتَحَدَّثُوْنَ : تُصُدِّقَ عَلَى غَنِيٍّ، قَالَ : اللَّهُمَّ ! لَكَ الْـحَمْدُ عَلَى غَنِيٍّ، لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِيْ يَدِ سَارِقٍ، فَأَصْبَحُوْا يَتَحَدَّثُوْنَ : تُصُدِّقَ عَلَى سَارِقٍ، فَقَالَ : اللَّهُمَّ ! لَكَ الْـحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ وَعَلَى غَنِيٍّ وَعَلَى سَارِقٍ، فَأُتِيَ فَقِيْلَ لَهُ : أَمَّا صَدَقَتُكَ فَقَدْ قُبِلَتْ، أَمَّا الزَّانِيَةُ فَلَعَلَّهَا تَسْتَعِفُّ بِهَا عَنْ زِنَاهَا، وَلَعَلَّ الْغَنِيَّ يَعْتَبِرُ فَيُنْفِقُ مِمَّا أَعْطَاهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ، وَلَعَلَّ السَّارِقَ يَسْتَعِفُّ بِهَا عَنْ سَرِقَتِهِ»
“জনৈক ব্যক্তি মনে মনে বললো, আজ রাত আমি সদকা দেবো। যখন রাত হলো তখন সে সদকা নিয়ে বের হলো এবং জনৈকা ব্যভিচারিণীকে তা দিয়ে দিলো। সকাল বেলায় লোকেরা বলতে শুরু করলে, আজ রাত জনৈকা ব্যভিচারিণীকে সদকা দেওয়া হয়েছে। তখন সে বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। আমার সদকাটা তো পড়ে গেলো জনৈকা ব্যভিচারিণীর হাতে। আমি আবারো সদকা দেবো। যখন রাত হলো তখন সে সদকা নিয়ে আবারো বের হলো এবং জনৈক ধনী ব্যক্তিকে তা দিয়ে দিলো। সকাল বেলায় লোকেরা বলতে শুরু করলে, আজ রাত জনৈক ধনীকে সদকা দেওয়া হয়েছে। তখন সে বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। আমার সদকাটা তো পড়ে গেলো জনৈক ধনীর হাতে। আমি আবারো সদকা দেবো। যখন রাত হলো তখন সে আবারো সদকা নিয়ে বের হলো এবং জনৈক চোরকে তা দিয়ে দিলো। সকাল বেলায় লোকেরা বলতে শুরু করলে, আজ রাত জনৈক চোরকে সদকা দেওয়া হয়েছে। তখন সে বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। আমার সদকাটা তো পড়ে গেলো জনৈকা ব্যভিচারিণী, জনৈক ধনী এবং জনৈক চোরের হাতে। তখন তাকে স্বপ্নযোগে বলা হলোঃ তোমার সকল সদকাই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। হয়তো বা তোমার সদকার কারণে ব্যভিচারিণী ব্যভিচার ছেড়ে দেবে, ধনী ব্যক্তি এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সেও আল্লাহর পথে সদকা দেওয়া শুরু করবে এবং চোরটিও চুরি করা ছেড়ে দেবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০২২]