১
কুরআন ও হাদীসের আলোকে সহজ আকীদা
লেখকঃ ড. আহমাদ ইবন আব্দুর রহমান আল-কাযী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩
লেখকের ভূমিকা
নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা চাই। আর আমরা আমাদের আত্মার অনিষ্টতা থেকে এবং আমাদের আমলসমূহের মন্দ পরিণতি থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, তাকে গোমরাহ করার কেউ নেই এবং যাকে গোমরাহ করেন তাকে হিদায়াত দেওয়ারও কেউ নেই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তার কোনো শরীক নেই। যিনি এ কথা বলেন:
﴿هُوَ ٱلَّذِي بَعَثَ فِي ٱلۡأُمِّيِّۧنَ رَسُولٗا مِّنۡهُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٢﴾ [ الجمعة : ٢ ]
“তিনিই উম্মীদের [উম্মী দ্বারা আরবের লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে।] মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে তেলাওয়াত করে তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করে এবং তাদেরকে শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমাত। যদিও ইতঃপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিল”। [সূরা আল-জুমু‘আ, আয়াত: ২] আর আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা ও রাসূল। যাকে প্রেরণ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি করুণা করেন। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ١٦٤﴾ [ ال عمران : ١٦٤ ]
“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যেহেতু তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যেন সে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪ ]
অতঃপর...
মহান আল্লাহ তার রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য দীন ও হিদায়াতের আলোকবর্তিকা দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং স্পষ্ট গোমরাহী থেকে এমন পরিপূর্ণ হিদায়াত যা দ্বারা বক্ষ প্রশস্ত হয় এবং অন্তরসমূহ পরিতৃপ্তি লাভ করে তার দিকে বের করে নিয়ে আসেন। কারণ, হিদায়াত হলো, (উপকারী ইলম) ও (সত্য দীন) হলো, নেক আমল। এ দুটি মহান রুকনের উপর ভিত্তি করেই হায়াতে তাইয়্যেবা তথা পবিত্র জীবন অস্তিত্ব লাভ করে।
একজন বান্দা তার বিশ্বাস, ইবাদাত, মু‘আমালা ও চারিত্রিক গুণাবলীর বিষয়ে যতকিছুর মুখাপেক্ষি হয় তার সবই মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে যা সংক্ষিপ্ত তার বর্ণনা এবং যা অস্পষ্ট তার ব্যাখ্যা এবং যা ব্যাপক তার বিস্তারিত জ্ঞান প্রদানের জন্য রয়েছে পবিত্র নির্ভরযোগ্য হাদীস । যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ألا وإني أوتيت الكتاب، ومثله معه»
“জেনে রেখো, অবশ্যই আমাকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং কিতাবের সাথে দেওয়া হয়েছে কিতাবের মতো অন্য একটি বিষয়” যাকে হাদীস বলা হয়। [আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬০৬]
এ দীনের বুনিয়াদ, মূলনীতি, শক্তির উৎস এবং এ দীন সমস্ত দীনের উপর বিজয়ী দীন হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ হলো, ইসলামী আকীদা। কারণ, ইসলামী আকীদায় রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা অন্য কোনো দীনের মধ্যে নেই। যেমন,
প্রথমত: তাঅহীদ: আল্লাহ তা‘আলাকে ইবাদতের ক্ষেত্রে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ-অনুকরণের ক্ষেত্রে একক জ্ঞান করার নাম তাঅহীদ।
দ্বিতীয়ত: অহী-নির্ভরতা: আর তা হলো, উৎস হিসেবে অহীকেই গ্রহণ করা, কুরআন ও হাদীসের বাইরে না যাওয়া এবং কোনো যুক্তি ও কিয়াসের প্রতি ঝুঁকে না পড়া।
তৃতীয়ত: শয়তানের ছোঁয়া লাগার পূর্বে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে যে ফিতরাত বা স্বভাবজাত ব্যবস্থাপনার উপর সৃষ্টি করেছেন সে ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।
চতুর্থত: সন্দেহ ও সংশয় মুক্ত, সু-স্পষ্ট বিবেক বুদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।
পঞ্চমত: ব্যাপকতা: সৃষ্টি, জীবন ও মানুষের জীবনের এমন কোনো দিক নেই যার সু-স্পষ্ট বর্ণনা ও সমাধান তাতে করা হয় নি।
ষষ্টত: সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সদৃশ হওয়া: দীনের কোনো একটি বিধানের মধ্যে কোনো প্রকার বৈপরীত্য নেই এবং কোনো একটি বিধানের সাথে অপর কোনো বিধানের অসঙ্গতি নেই। বরং একটি অপরটিকে সত্যায়ন করে।
সপ্তম: মাধ্যম পন্থা: বিবিধ মতবাদের মাঝে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির যে দোষ রয়েছে, তা থেকে তা মুক্ত। বরং ইসলামী আকীদা সেগুলোর মাঝখানে ন্যায় ও ইনসাফের একটি দাঁড়িপাল্লা।
এ বৈশিষ্ট্যসমূহের ফলাফল হলো নিম্নলিখিত বিষয়গুলো:
প্রথমত: মাখলুকের গোলামী পরিহার করে রাব্বুল আলামীনের গোলামীকে বাস্তবায়ন করা।
দ্বিতীয়ত: বিদ‘আতী ও বিদ‘আত মুক্ত হয়ে রাব্বুল আলামীনের রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণকে বাস্তবায়ন করা।
তৃতীয়ত: মহা প্রজ্ঞাবান ও মহা পরিচালক স্রষ্টার সাথে সু-সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে আত্মার প্রশান্তি ও অন্তরের নিরাপত্তা লাভ করা।
চতুর্থত: কুসংস্কার ও বিবাদ থেকে নিরাপত্তা লাভ করা, চিন্তার পরিতৃপ্ততা ও বুদ্ধির যথাযথ ব্যবহারের সুযোগ লাভ করা।
পঞ্চমত: দেহ ও আত্মার প্রয়োজনে সাড়া দেওয়া এবং বিশ্বাস ও চাল-চলন, আচার ব্যবহারের মাঝে পূর্ণতা।
আলেমগণ সর্বদা ইসলামী আকীদাকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবেই বিবেচনা করতেন। তারা ইসলামী আকীদা শিক্ষা দেওয়া, ব্যাখ্যা করা ইত্যাদি কাজেই তাদের সব রকম চেষ্টা ব্যয় করতেন। এ বিষয়ে তারা কেউ কেউ সংক্ষিপ্ত কিতাব বা ভাষ্য আকারে আবার কেউ কেউ ব্যাখ্যা আকারে বিস্তারিত কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন। আবার কোনো কোনো সময় তারা সালাফদের আকীদার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, আবার কখনো নির্দিষ্ট কোনো মাসআলা, আবার কখনো বিদ‘আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের জবাব দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কিতাবাদি লিখতেন।
আমি আকীদার মাসায়েলকে কাছাকাছি করা এবং ঈমানের ছয়টি মূলনীতি যার আলোচনা ধারাবাহিকভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসিদ্ধ হাদীস, হাদীসে জিবরীল-এ রয়েছে সে তারতীব অনুযায়ী শুধুমাত্র দু’টি অহীর নস-কুরআন ও হাদীসের উপর নির্ভর করে আলোচনা করাকে ভালো মনে করেছি। প্রতিটি মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন মাসআলা মূলনীতির আলোকে তুলে ধরা আর যারা এ অধ্যায়ের আলোকে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ হয়েছে তাদের চিহ্নিত করা এবং সংক্ষেপে তাদের যুক্তিকে খন্ডন করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছি। ফলে এ আকীদার কিতাবটি দীর্ঘ লম্বা ও সংক্ষিপ্ত উভয়ের মাঝামাঝি রচিত হয়েছে। অর্থাৎ একেবারে লম্বাও নয় আবার একেবারে সংক্ষিপ্তও নয়। বইটির বর্ণনাকে খুবই স্পষ্ট ও সহজ করা হয়েছে যাতে প্রতিটি মুসলিম এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে এবং সহজ ও ধারাবাহিকভাবে সালাফদের আকীদার সার সংক্ষেপ জেনে মহান লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। আমি এ কিতাবের নাম রেখেছি, ‘কুরআন ও হাদীসের আলোকে সহজ আকীদা’ বা
( العقيدة الميسرة من الكتاب العزيز والسنة المطهرة )
আল্লাহ তা‘আলার নিকট আমার কামনা, তিনি যেন আমার এ আমলকে কবুল করেন এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অসীলা করেন। আর এর দ্বারা তিনি তার বান্দাদেরকে উপকৃত করেন।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد ، وعلى آله وصحبه أجمعين .
লেখক: আহমাদ ইবন আব্দুর রহমান আল-কাযী
উনাইযাহ: সৌদি আরব
তাং ১৭/২/১৪২৭
﴿هُوَ ٱلَّذِي بَعَثَ فِي ٱلۡأُمِّيِّۧنَ رَسُولٗا مِّنۡهُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٢﴾ [ الجمعة : ٢ ]
“তিনিই উম্মীদের [উম্মী দ্বারা আরবের লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে।] মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে, যে তাদের কাছে তেলাওয়াত করে তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করে এবং তাদেরকে শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমাত। যদিও ইতঃপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিল”। [সূরা আল-জুমু‘আ, আয়াত: ২] আর আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা ও রাসূল। যাকে প্রেরণ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি করুণা করেন। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ١٦٤﴾ [ ال عمران : ١٦٤ ]
“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যেহেতু তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যেন সে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪ ]
অতঃপর...
মহান আল্লাহ তার রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য দীন ও হিদায়াতের আলোকবর্তিকা দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং স্পষ্ট গোমরাহী থেকে এমন পরিপূর্ণ হিদায়াত যা দ্বারা বক্ষ প্রশস্ত হয় এবং অন্তরসমূহ পরিতৃপ্তি লাভ করে তার দিকে বের করে নিয়ে আসেন। কারণ, হিদায়াত হলো, (উপকারী ইলম) ও (সত্য দীন) হলো, নেক আমল। এ দুটি মহান রুকনের উপর ভিত্তি করেই হায়াতে তাইয়্যেবা তথা পবিত্র জীবন অস্তিত্ব লাভ করে।
একজন বান্দা তার বিশ্বাস, ইবাদাত, মু‘আমালা ও চারিত্রিক গুণাবলীর বিষয়ে যতকিছুর মুখাপেক্ষি হয় তার সবই মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে যা সংক্ষিপ্ত তার বর্ণনা এবং যা অস্পষ্ট তার ব্যাখ্যা এবং যা ব্যাপক তার বিস্তারিত জ্ঞান প্রদানের জন্য রয়েছে পবিত্র নির্ভরযোগ্য হাদীস । যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ألا وإني أوتيت الكتاب، ومثله معه»
“জেনে রেখো, অবশ্যই আমাকে কিতাব দেওয়া হয়েছে এবং কিতাবের সাথে দেওয়া হয়েছে কিতাবের মতো অন্য একটি বিষয়” যাকে হাদীস বলা হয়। [আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬০৬]
এ দীনের বুনিয়াদ, মূলনীতি, শক্তির উৎস এবং এ দীন সমস্ত দীনের উপর বিজয়ী দীন হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ হলো, ইসলামী আকীদা। কারণ, ইসলামী আকীদায় রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা অন্য কোনো দীনের মধ্যে নেই। যেমন,
প্রথমত: তাঅহীদ: আল্লাহ তা‘আলাকে ইবাদতের ক্ষেত্রে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ-অনুকরণের ক্ষেত্রে একক জ্ঞান করার নাম তাঅহীদ।
দ্বিতীয়ত: অহী-নির্ভরতা: আর তা হলো, উৎস হিসেবে অহীকেই গ্রহণ করা, কুরআন ও হাদীসের বাইরে না যাওয়া এবং কোনো যুক্তি ও কিয়াসের প্রতি ঝুঁকে না পড়া।
তৃতীয়ত: শয়তানের ছোঁয়া লাগার পূর্বে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে যে ফিতরাত বা স্বভাবজাত ব্যবস্থাপনার উপর সৃষ্টি করেছেন সে ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।
চতুর্থত: সন্দেহ ও সংশয় মুক্ত, সু-স্পষ্ট বিবেক বুদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।
পঞ্চমত: ব্যাপকতা: সৃষ্টি, জীবন ও মানুষের জীবনের এমন কোনো দিক নেই যার সু-স্পষ্ট বর্ণনা ও সমাধান তাতে করা হয় নি।
ষষ্টত: সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সদৃশ হওয়া: দীনের কোনো একটি বিধানের মধ্যে কোনো প্রকার বৈপরীত্য নেই এবং কোনো একটি বিধানের সাথে অপর কোনো বিধানের অসঙ্গতি নেই। বরং একটি অপরটিকে সত্যায়ন করে।
সপ্তম: মাধ্যম পন্থা: বিবিধ মতবাদের মাঝে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির যে দোষ রয়েছে, তা থেকে তা মুক্ত। বরং ইসলামী আকীদা সেগুলোর মাঝখানে ন্যায় ও ইনসাফের একটি দাঁড়িপাল্লা।
এ বৈশিষ্ট্যসমূহের ফলাফল হলো নিম্নলিখিত বিষয়গুলো:
প্রথমত: মাখলুকের গোলামী পরিহার করে রাব্বুল আলামীনের গোলামীকে বাস্তবায়ন করা।
দ্বিতীয়ত: বিদ‘আতী ও বিদ‘আত মুক্ত হয়ে রাব্বুল আলামীনের রাসূলের অনুসরণ-অনুকরণকে বাস্তবায়ন করা।
তৃতীয়ত: মহা প্রজ্ঞাবান ও মহা পরিচালক স্রষ্টার সাথে সু-সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে আত্মার প্রশান্তি ও অন্তরের নিরাপত্তা লাভ করা।
চতুর্থত: কুসংস্কার ও বিবাদ থেকে নিরাপত্তা লাভ করা, চিন্তার পরিতৃপ্ততা ও বুদ্ধির যথাযথ ব্যবহারের সুযোগ লাভ করা।
পঞ্চমত: দেহ ও আত্মার প্রয়োজনে সাড়া দেওয়া এবং বিশ্বাস ও চাল-চলন, আচার ব্যবহারের মাঝে পূর্ণতা।
আলেমগণ সর্বদা ইসলামী আকীদাকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবেই বিবেচনা করতেন। তারা ইসলামী আকীদা শিক্ষা দেওয়া, ব্যাখ্যা করা ইত্যাদি কাজেই তাদের সব রকম চেষ্টা ব্যয় করতেন। এ বিষয়ে তারা কেউ কেউ সংক্ষিপ্ত কিতাব বা ভাষ্য আকারে আবার কেউ কেউ ব্যাখ্যা আকারে বিস্তারিত কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন। আবার কোনো কোনো সময় তারা সালাফদের আকীদার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, আবার কখনো নির্দিষ্ট কোনো মাসআলা, আবার কখনো বিদ‘আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের জবাব দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কিতাবাদি লিখতেন।
আমি আকীদার মাসায়েলকে কাছাকাছি করা এবং ঈমানের ছয়টি মূলনীতি যার আলোচনা ধারাবাহিকভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রসিদ্ধ হাদীস, হাদীসে জিবরীল-এ রয়েছে সে তারতীব অনুযায়ী শুধুমাত্র দু’টি অহীর নস-কুরআন ও হাদীসের উপর নির্ভর করে আলোচনা করাকে ভালো মনে করেছি। প্রতিটি মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন মাসআলা মূলনীতির আলোকে তুলে ধরা আর যারা এ অধ্যায়ের আলোকে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ হয়েছে তাদের চিহ্নিত করা এবং সংক্ষেপে তাদের যুক্তিকে খন্ডন করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছি। ফলে এ আকীদার কিতাবটি দীর্ঘ লম্বা ও সংক্ষিপ্ত উভয়ের মাঝামাঝি রচিত হয়েছে। অর্থাৎ একেবারে লম্বাও নয় আবার একেবারে সংক্ষিপ্তও নয়। বইটির বর্ণনাকে খুবই স্পষ্ট ও সহজ করা হয়েছে যাতে প্রতিটি মুসলিম এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে এবং সহজ ও ধারাবাহিকভাবে সালাফদের আকীদার সার সংক্ষেপ জেনে মহান লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। আমি এ কিতাবের নাম রেখেছি, ‘কুরআন ও হাদীসের আলোকে সহজ আকীদা’ বা
( العقيدة الميسرة من الكتاب العزيز والسنة المطهرة )
আল্লাহ তা‘আলার নিকট আমার কামনা, তিনি যেন আমার এ আমলকে কবুল করেন এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অসীলা করেন। আর এর দ্বারা তিনি তার বান্দাদেরকে উপকৃত করেন।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد ، وعلى آله وصحبه أجمعين .
লেখক: আহমাদ ইবন আব্দুর রহমান আল-কাযী
উনাইযাহ: সৌদি আরব
তাং ১৭/২/১৪২৭