hadith book logo

অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ প্রসঙ্গ

লেখকঃ ড. রাগিব আস-সারজানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪২

তৃতীয় ও সর্বেশষ আবেদন: সর্বকালের সর্বসাধারণের প্রতি:

আপনারা ইসলামের বিধি-বিধান ও মুসলমিদের ইতিহাসকে তার সঠিক উৎস থেকে জানুন। আমরা অতীত ও বর্তমানে ইতিহাসে ও বাস্তবে অনেক যুলুমের স্বীকার হয়েছি। আমাদের অনেক ইতিহাস লিখিত হয়েছে আমাদের শত্রুদের হাতে। আমাদের অনেক সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয় ও অনেক ভেদ-রহস্যের। কথা রচিত হয়েছে আমদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীদের কলমে। এটি তো ইনসাফের কথা হতে পারে না যে, মানুষ আমাদের ঘটনা শুনবে এমন কারো নিকট থেকে যে আমাদেরকে ঘৃণা করে। এটাও ইনসাফের দাবী নয় যে, আমরা ইসলামের একনিষ্ঠ ধারক-বাহকদের রচনা বাদ দিয়ে অন্যদের মিথ্যা ও বানোয়াট কথার ওপর নির্ভর করবো।

ইসলামের ইতিহাসকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে জাল করা হয়েছে এবং স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এর বিকৃতি সাধন করা হয়েছে। পশ্চিমারা ও স্বার্থবাদী মহলের অনেকেই মুসলিম উম্মাহর মস্তিস্ক বিকৃত করা ও সভ্যতার ইতিহাসকে কলংকিত করার প্রয়াস চালিয়েছে। তাদের কেউ জাল ইতিহাস রচনা করেছে আবার কেউ করেছে বিকৃতি সাধন। কেউ সঠিককে ভুলে যাওয়ার ভান করে অশুদ্ধকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আবার কেউ মানবীয় দোষ-ত্রুটিকে প্রকাশ করে গুণ-গরিমা সম্পর্কে নিরবতা প্রদর্শন করেছে। এসব কিছু করেছে তারা গভীর ষড়যন্ত্র সুবিন্যস্ত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ফলে ইসলামী ইতিহাসের নতুন এক বিকৃত রূপ ও কাঠামো তৈরি হয়েছে, বাস্তবতার সাথে যার কোনো মিল-ই নেই। আমি পৃথিবীর সত্য সন্ধানী গবেষকদেরকে এবং শান্তি ও উন্নতি প্রত্যাশী সকলকে আহ্বান করবো যে, আসুন, আমরা দীন ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাসকে তার সঠিক উৎস এবং স্বচ্ছ উৎপত্তিস্থল থেকে অধ্যয়ন করি।

পৃথিবী যদি আমাদের ইতিহাস অধ্যয়নের পাঠ ছেড়ে দেয় এবং আমাদের সভ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণসমূহ ভূলে যায় তাহলে অনেক মঙ্গল ও কল্যাণকে হারারে এবং এক মহা সম্পদের অবহেলা ও অপচয় করা হবে।

মানবতার দীর্ঘ ইতিহাসে ইসলাম কোনো গতানুগতিক কিছু নয়; বরং ইসলাম হচ্ছে মানব ইতিহাসের মেরুদণ্ডতুল্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের পূর্বে যেসব কল্যাণকর বিষয় পৃথিবীতে ছিল আমরা সেগুলোকে বহাল রেখেছি, সেগুলোর সাথে সংযোজন করেছি এবং সেগুলোকে আরো ত্বরান্বিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত করেছি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّمَا بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الأَخْلاَقِ»

“নিশ্চয় আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম গুণাবলীর পূর্ণতা বিধানের জন্যে।” [. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৪২২১, বায়হাকী, হাদীস নং ২০৫৭১, আলবানী: সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ (৪৩)।]

যার ফলে ইসলাম উন্নত চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখড়ে উপনীত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়ে উঠেছেন প্রশংসনীয় গুণাবলীর উজ্জল দৃষ্টান্ত।

হে সর্বকালের ইনসাফপ্রিয় লোক সকল! ইসলামকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখুন, তার সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের সীমাহীনতা দেখে অবাক হয়ে যাবেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনুন, জানুন। আপনাদের প্রতি এটি অনেক বড় অবিচার যে, আপনারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারেন নি।

হে লোক সকল!

পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে বসবাসকারী হে মানবগোষ্ঠী! আমাদের দ্বারা সম্ভব নয় এবং এটা আমাদের দায়িত্বও নয় যে, আমরা তোমাদের মুসলিম বানিয়ে ফেলবো। আমরা যেটি পারবো এবং যে জন্য আমরা আদিষ্ট তা হচ্ছে আমরা তোমাদের নিকট আমাদের স্বচ্ছ-সুন্দর বাণী পৌছে দিতে পারি, অতঃপর তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারে তোমরা পূর্ণ স্বাধীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ ءَامِنُواْ بِهِۦٓ أَوۡ لَا تُؤۡمِنُوٓاْۚ﴾ [ الاسراء : ١٠٧ ]

“বলো, ‘তোমরা এতে ঈমান আন বা না আন’।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১০৭]

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, অবশ্যই এমন একটি দিন আসবে যেদিন মহান আল্লাহ আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিবেন। সেদিন সকলেই বুঝতে পারবে যে, কে সঠিক পথে ছিল আর কে ভুলের মধ্যে ছিল। কে হিদায়াতের অনুসারী ছিল আর কে স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ إِنَّ رَبَّكَ يَقۡضِي بَيۡنَهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ فِيمَا كَانُواْ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَ﴾ [ يونس : ٩٣ ]

“নিশ্চয় তোমার রব কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে ফয়সালা করবেন যা নিয়ে তারা মতবিরোধ করত।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৯৩]

সবশেষে………

এটি নিশ্চিত যে, এ গ্রন্থে সংযোজন করার মতো এমন অনেক কিছুরই সংযোজনের ক্ষেত্রে আমি সফল হতে পারি নি। সময়ের সংকীর্ণতা, পূণরোক্তি থেকে নিরাপদ থাকা, কোনো ঘটনা ভুলে যাওয়া কিংবা অন্য কনো অজ্ঞতার কারণে। আমি স্বীকার করছি যে, আমি একজন মানুষ। আর অপূর্ণতাই মানুষের বৈশিষ্ট্য।

ইমাম শাফে‘ঈ [. তিনি হলেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস আশ-শাফে‘ঈ। জন্ম ১৫০হি.। তিনি তৃতীয় স্তরের মুজতাহিদ। আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আতের মতে বড় চার ইমামের একজন তিনি। তিনিই গোটা শাফে‘ঈ মাযহাবের উদ্ভাবক। তিনিই সর্বপ্রথম উসূলে ফিকহ শাস্ত্র সংকলন করেন। আহমদ ইবন হাম্বল রহ. বলেন, ইমাম শাফে‘ঈ হলে দিবসের সূ্র্য এবং ত্রাণকর্তার ন্যায়। আমি প্রত্যেক সালাতের পরে দো‘আ করি: اللهم اغفرلي ووالدي ولمحمد بن أدريس الشافعي .“হে আল্লাহ আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতা এবং মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস আশ-শাফে‘ঈকে ক্ষমা করে দিন।” ইমাম শাফে‘ঈ রহ. ২০৬হি. মিশরে মারা যান।] রহ. কতইনা সুন্দর কথা বলেছেন -আমি এ গ্রন্থকে সে কথা দ্বারাই শেষ করতে চাই। তিনি তার কিতাবুর রিসালাহ [. কিতাবুর রিসালাহ হচ্ছে ফিকহে শাফে‘ঈদের মূলনীতি বিষয়ক গ্রন্থ। এটি শুধুমাত্র উসূলে ফিকহ বিষয়েই সর্ব প্রথম রচিত গ্রন্থ নয়; বরং উসূলে হাদীসের বিষয়েও সর্ব প্রথম রচিত গ্রন্থ। ফিকহের পাশাপাশি এটি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও গ্রন্থ। কারণ, ইমাম শাফে‘ঈ রহ. সাহিত্য ও অলঙ্কার শাস্ত্রে অগাদ পাণ্ডিত্বের অধিকারী ছিলেন। এ গ্রন্থে তিনি উসূলের আম-খাস, নাসেখ-মানসূখ, ইসতেহসান প্রভৃতি অধ্যায় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।] ( كتاب الرسالة )-কে আশি বার নিরীক্ষণ করার পর স্বীয় ছাত্র আল্লামা মাযানী [. তিনি হলেন আবু ইবরাহীম ইসমাঈল ইবন ইয়াহইয়া আল মাযানী। তিনি বাগ্মী, ফকীহ, ও আবেদ ছিলেন। তার যৌবন কালে তার সম্পর্কে ইমাম শাফে‘ঈ রহ. বলেছেন, لو ناظر المزني الشيطان لقطعه .“যে শয়তান মাযানীর দিকে দৃষ্টিপাত করে মাযানী তাকে কেটে ফেলেন।” ইমাম শাফে‘ঈ আরো বলেছেন, “মাযানী হচ্ছে আমার মাযহাবের সাহায্যকারী”। শাফে‘ঈ মাযহাবের অনেকগুলো গ্রন্থ রয়েছে। যেমন, আল-মুখতাসার ( المختصر ), ওয়াল মুখতার আস-সগীর ( والمختصر الصغير )।] রহ.-কে বলেছেন: “আল্লাহ চান না যে, তাঁর গ্রন্থ (আল-কুরআন) ব্যতীত অন্য কোনো গ্রন্থ নির্ভুল হোক।” [. ইবন আবেদীন: হাশিয়াতু রদ্দুল মুখতার ১/২৯।]

وصل اللهم وسلم وبارك على المبعوث رحمة للعالمين