hadith book logo

ইসলামী মিডিয়ার স্বরূপ ও তাৎপর্য

লেখকঃ ড. মো: আব্দুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

গ. জবাবদিহিতা

ইসলামে মিডিয়ার যেমন স্বাধীনতা দিয়েছে তেমনি রয়েছে এর জবাবদিহিতা। অর্থাৎ এখানে স্বাধীনতাটা জবাবদিহিতার শৃংখলে আবদ্ধ। আল্লাহ্‌র ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে একজন সংবাদ কর্মীর স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু আল্লাহ্‌র নিকট পরকালে এ স্বাধীনতা গ্রহণ করার জন্য জবাবদিহি করতে হয়। এটা মহান আল্লাহ্‌ মানুষের স্বভাব প্রকৃতিতে দিয়েছেন। ফলে সে সাধ্য অনুযায়ী তাঁর ইবাদাত করবে, অন্যের নিকট ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দিবে, ইসলাম সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান লাভে ব্রতী হবে, সত্য ও সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হবে, কল্যাণের কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা করবে এবং ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস অবলম্বনে নিজস্ব উদ্দেশ্য সাধনে সচেষ্ট হবে। [.সাঈদ আলী সাবিত, আল হুররিয়াতুল ইলমিয়া ফী দুয়েল ইসলাম, (রিয়াদ : আল্-আলামিল কুতুব, ১৪১২ হি.), পৃ. ৫৪।]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম নমুনা, যিনি সর্বপ্রথম মানুষকে হেদায়াতের দিকে আহ্বান করেছেন। তার আহবানে সাড়া দিয়ে অনেকে হেদায়াত লাভ করেছে। আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে বলেন-

﴿ ۞يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغۡ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ مِن رَّبِّكَۖ وَإِن لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَهُۥۚ وَٱللَّهُ يَعۡصِمُكَ مِنَ ٱلنَّاسِۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡكَٰفِرِينَ ٦٧ ﴾ [ المائ‍دة : ٦٧ ]

‘‘হে রাসূল! আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা প্রচার করুন; যদি না করেন তবে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না। আর আল্লাহ্‌ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।’’

অনুরূপভাবে একজন প্রচারকর্মীকে মহান আল্লাহ্‌র সামনে জবাবদিহি করতে হবে; সে যথাযথভাবে রাসূলের রেখে যাওয়া রিসালাতের অসম্পন্ন কাজ মানুষের নিকট প্রচার করতে সক্ষম হয়েছে কি-না। সেদিন মিথ্যা বলে পার পাবার কোনই সুযোগ নেই। কারণ সে দুনিয়ার কোনো শাসক-প্রশাসকের কাছে জবাবদিহি করছে না। [.সূরা আল্-মায়েদা : ৬৭।] আল্লাহ্‌ বলেন:

﴿ مَّا يَلۡفِظُ مِن قَوۡلٍ إِلَّا لَدَيۡهِ رَقِيبٌ عَتِيدٞ ١٨ ﴾ [ق: ١٨ ]

“সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে।” [.সূরা ক্বাফ : ১৮।]

﴿۞لَّا يُحِبُّ ٱللَّهُ ٱلۡجَهۡرَ بِٱلسُّوٓءِ مِنَ ٱلۡقَوۡلِ إِلَّا مَن ظُلِمَۚ وَكَانَ ٱللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا ١٤٨ ﴾ [ النساء : ١٤٨ ]

‘‘মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ্‌ পছন্দ করেন না; তবে যার উপর যুলুম করা হয়েছে। আর আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’’ [.সূরা আন্-নিসা : ১৪৮।]

ইসলাম প্রচারের অন্যতম উদ্দেশ্য আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি বিধান। আর তা প্রচার করে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। ফলে তার জবাবদিহিমূলক ঝোক প্রবণতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। অতএব জবাবদিহিতা ইসলামী মিডিয়া ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ»

অর্থাৎ ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ও শেষ দিবসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তার উচিত ভাল কথা বলা অথবা চুপ থাকা।’’ [.ইমাম বুখারী, সহীহ, প্রাগুক্ত, বাবু মান কানা ই’মিনু বিল্লাহ ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি, হাদীস নং ৬০১৮।]

মিডিয়ার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ইসলামী সমাজের নিরাপত্তা বিধানের সহায়ক। এর সাহায্যে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকান্ড নিরাপদ থাকে। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যা রাহেমাহুল্লাহ্‌ বলেন-

جميع الولايات الإسلامية إنما مقصودها الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر وبالصدق في كل الأخبار والعدل في الإنشاء من الأقوال والأعمال تصلح جميع الأحوال -

‘‘সকল ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হল, সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজ হতে নিষেধ করা, সকল সংবাদ সত্য হওয়া, ন্যায় বিচার করা, কথা ও কাজের মাধ্যমে সর্বাবস্থায় সংশোধন করা।’’ [.শায়খুল ইসলাম ইবন্ তাইমিয়া, আল হিসবা ওয়াল অজিফাতুল হুকুমাহ আল ইসলামিয়া, বৈরুত: দারুল কিতাবিল আরাবী, ১৯৭৬ ইং, পৃ. ৬-৭।]

অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করেন,

﴿ وَتَمَّتۡ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدۡقٗا وَعَدۡلٗاۚ لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَٰتِهِۦۚ﴾ [ الانعام : ١١٥ ]

‘‘আর সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রব-এর বাণী পরিপূর্ণ; তার বাণীর কোনো পরিবর্তনকারী নেই।’’ [.সূরা আল-আনআম : ১১৫।]

মূলত জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা স্থায়ী হয়। সমাজের প্রতিটি মানুষ নিরাপত্তা লাভ করে, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা প্রভৃতি প্রচার-প্রসার হতে মিডিয়া বিরত থাকে। আল্লাহ্‌ বলেন-

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلۡفَٰحِشَةُ فِي ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ ١٩ ﴾ [ النور : ١٩ ]

‘‘নিশ্চয় যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ্‌ জানেন, তোমরা জান না।’’ [.সূরা নূর : ১৯।]