পরিচ্ছেদঃ ২৯
দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ: শেষ দিবসের ওপর ঈমান
আর ঈমানের অন্যতম আরেকটি রুকন হলো: শেষ দিবসের ওপর এবং তার ভূমিকা ও আলামতসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করা।
আর প্রত্যেক যে ব্যক্তিই মারা যাবে তার ছোট কিয়ামত শুরু হয়ে গেছে।
আর মৃত্যুক্ষণে ফিরিশতা অবতরণ করে মুমিন ব্যক্তিকে দয়াময় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ এবং জান্নাতে তার জন্য বরাদ্দকৃত আসনের সুসংবাদ প্রদান করেন, আর মৃত্যুর সময় মানুষ কখনও কখনও ফিতনার সম্মুখীন হয়, আর আমলের ভালো-মন্দ নির্ভর করে তার শেষ অবস্থার ওপর।
আর কবর হলো আখিরাতের প্রথম মানযিল (স্টেশন), আর আল্লাহর কাছেই কেবল আশ্রয় প্রার্থনা করা হবে তার আলিঙ্গন ও ফিতনা থেকে, আর কবরের শাস্তি ও শান্তি সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের, আর তা অস্বীকার করে থাকে নাস্তিক, ভণ্ড দার্শনিক ও বিদ‘আতপন্থীদের একটি দল, বস্তুত তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এমন বিষয়কে, যা তাদের জ্ঞানের আওতায় নেই, আর ঈমানদারগণের কাউকে কাউকে আল্লাহ তা‘আলা কবরের ফিতনা ও শাস্তি থেকে নিরাপত্তা দান করেন।
আর ‘বারযাখ’ নামক জগতের বিধিবিধান পরিচালিত হয় রূহের উপর এবং শরীর তার অনুগামী।
আর কিয়মাত সংঘটিত হওয়ার আগে আগে কিছু বিশেষ আলামত ও নমুনা দেখা যাবে।
আর তার কিছু নিদর্শন ছোট এবং তা সংঘটিত হয়ে গেছে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ ও তাঁর মৃত্যু এবং তাঁর জীবদ্দশায় চন্দ্র খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া।
আর তার কিছু আলামত সংঘটিত হচ্ছে এবং তা বারবার সংঘটিত হবে। যেমন, ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী দাজ্জালগণের আবির্ভাব; ভূমিধ্বস, ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির আত্মপ্রকাশ এবং মুসলিমগণের বিরুদ্ধে সকল জাতি ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
তার আরও কিছু আলামত আছে, যা এখনও সংঘটিত হয় নি এবং তার অপেক্ষা করা হচ্ছে। যেমন, স্বর্ণের পাহাড় দ্বারা ফুরাত নদী ঢেকে ফেলা, আরব উপ-দ্বীপে সবুজ-শ্যামল বাগান সৃষ্টি ও নদ-নদীর প্রবাহ, রোম বিজয় এবং মাহদী আলাইহিস সালাম-এর আত্মপ্রকাশ।
আর কিয়ামতের কিছু বড় বড় আলামত রয়েছে, সেগুলো হলো: দাজ্জালের আবির্ভাব, ‘ঈসা ইবন মারইয়াম ‘আলাইহিস সালামের অবতরণ, তারপর ইয়াজুজ ও মা’জুজের আগমন এবং ধোঁয়া, অতঃপর পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয় হবে এবং সে সময়ে আর কোনো তাওবা কবুল করা হবে না, আর বিশেষ এক জাতীয় প্রাণীর আবির্ভাব, অতঃপর এমন আগুন, যা মানুষকে সমবেত করবে এবং এটা কিয়ামতের সর্বশেষ বড় আলামত এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে প্রথম আয়াত বা আলামত।
আর কিয়ামতের নিদর্শনগুলো প্রকাশের পর ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, আল-কুরআন উঠে যাবে, মানুষ মূর্তিপূজার দিকে ফিরে যাবে, বাইতুল্লাহ তথা মাসজিদে হারাম ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ঈমানদারগণের রূহ কবজ (হরণ) করা হবে।
আর কিয়ামতের দিনে সবকিছু কব্জাভুক্ত করা হবে, যমীনকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে, আকাশ ফেটে যাবে এবং তাকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, সূর্যকে গুটিয়ে নিয়ে তার আলোক বিচ্ছুরণ বন্ধ করা হবে, চন্দ্র গ্রহণের শিকার হয়ে তার আলো নিষ্প্রভ হবে এবং সাগর ও নদীগুলো বিস্ফোরিত হবে।
অতঃপর শিঙায় দু’টি বা তিনটি ফুঁ দেওয়া হবে এবং তাতে জনগণ আতঙ্কিত হবে, আর অপর ফুঁ দ্বারা তারা মারা যাবে, তবে আল্লাহ যাকে চান সে ব্যতীত। অতঃপর তৃতীয় বারের ফুঁতে তারা দাঁড়িয়ে গিয়ে পরস্পর তাকাতাকি করবে, যেমনভাবে তিনি তাদেরকে প্রথম সৃষ্টি করেছেন, ঠিক সেভাবে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।
আর পুনরুত্থান ও হাশর-নশরের বিষয়টি সঠিক ও সত্য বলে প্রমাণিত শরী‘আতের দলীল দ্বারা, বুদ্ধিভিত্তিক যুক্তির মাধ্যমে এবং মুসলিম ও কিতাবধারীগণের ইজমা‘ বা ঐক্যবদ্ধ রায় দ্বারা।
আর কিয়ামতের দিনে সর্বপ্রথম যার যমীন (কবর) উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতঃপর জনগণকে অবস্থান করার জায়গায় সমবেত করা হবে খালি পা, বিবস্ত্র ও খাতনাবিহীন অবস্থায়, আর সেদিন সর্বপ্রথম যাকে কাপড় পরানো হবে, তিনি হলেন ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম। অতঃপর মুমিনগণকে দয়াময়ের নিকট বাহনে করে সম্মানিত মেহমানরূপে সমবেত করা হবে, আর কাফিরগণকে অন্ধ, বোবা ও বধির করে তৃষ্ণাতুর অবস্থায় উপুড় করে জাহান্নামের দিকে নিক্ষেপ করা হবে।
অতঃপর মহাসমাবেশের দিনের উদ্দেশ্য তাদেরকে একত্রিত করা হবে। অতঃপর (আল্লাহর) সাক্ষাৎ হাসিল হবে, আর আপনার রব এবং ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধভাবে আগমন করবে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার দরবারে বান্দাগণের সমাবেশ হবে, তাদের মধ্য থেকে কোনো কিছুই গোপন থাকবে না, আর মুমিনগণের অপরাধ নির্দিষ্ট করার জন্য একটা সমাবেশ হবে, যাতে তাদেরকে তার প্রতিবেদন দেওয়া যায়, তাদের কাছে তা গোপন রাখা যায় এবং ক্ষমা করা যায়, আর এটাই হলো সহজ হিসাব।
আর কঠিন হিসাব হলো জেরা বা চুলচেরা হিসাব-নিকাশ, আর যার সূক্ষ্ম হিসাব নেওয়া হবে তাকে তো শাস্তি দেওয়া হবে, আর জান্নাতবাসীদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন, যিনি বিনা হিসাবে কোনো পূর্বশাস্তি ছাড়াই তাতে প্রবেশ করবেন।
আর আমলনামা নিয়ে আসা হবে এবং তাতে থাকবে ছোট-বড় সকল কথা ও কাজের রেকর্ড।
আর সাক্ষী হিসেবে হাযির করা হবে সংরক্ষণকারী ফিরিশতাগণ, সম্মানিত লেখকবৃন্দ, কান, চোখ এবং সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ত্বকসমষ্টিকে, আর তাদের নিকট মাযলুমের (নির্যাতিতের) জন্য যালিমের থেকে কিসাস (প্রতিশোধ) নেওয়া হবে।
অতঃপর আমলনামাগুলো উড়ানো হবে এবং পৃষ্ঠাগুলো খুলে দেওয়া হবে, তারপর কেউ কেউ তা ডান হাতে গ্রহণ করবে, আমরা আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। আবার কেউ কেউ তা তার পিঠের পেছন থেকে বাম হাতে গ্রহণ করবে, আল্লাহর কাছে আমরা আমাদের জন্য ক্ষমাসুন্দর আচরণ প্রত্যাশা করছি।
অতঃপর কিয়ামতের দিনে ওজনের পাল্লা স্থাপন করা হবে। তারপর যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবেন সফলকাম এবং যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
আর মানুষ প্রস্থান করবে পুলসিরাতের দিকে অন্ধকারের মাঝে, তারপর মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য সূচিত হবে, অতঃপর তাদের সকলকে তার হিসাব অনুযায়ী নূর বা আলো প্রদান করা হবে।
আর কিয়ামতের দিনে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ‘কাউছার’ নামক বিশেষ নি‘য়ামতের ব্যবস্থা থাকবে এবং তার থেকে তার হাউয সম্প্রসারণ করা হবে, যে ব্যক্তি তা থেকে একবার পানি পান করবে, সে পরবর্তীতে কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না।
তার পানি দুধের চেয়েও অনেক বেশি সাদা হবে, বরফের চেয়ে অনেক বেশি শীতল, মধুর চেয়ে অনেক বেশি মিষ্টি, তার ঘ্রাণ মিশকের চেয়ে অনেক বেশি সুগন্ধযুক্ত এবং তার পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির সংখ্যার মত।
আর ‘সিরাত’ হলো জাহান্নামের মধ্যভাগের উপরে সম্প্রসারিত সেতু, মানুষ তার কাছে উপস্থিত হবে তাদের আমল নিয়ে, তারপর কেউ পার হয়ে যাবে নিরাপদে অক্ষতভাবে, আবার কেউ পার হবে আঁচড় খেয়ে আহতবস্থায়, আর অন্যজন জাহান্নামের আগুনে স্তূপ হয়ে পড়বে, আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উপর দাঁড়িয়ে ফিরিশতাগণসহ বলতে থাকবেন:
«رَبِّ سَلِّمْ سَلِّمْ» .
“হে আমার রব! শান্তি বর্ষণ করুন, শান্তি বর্ষণ করুন।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫০৩]
তার পরে জান্নাতবাসীগণের মাঝে যুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণের অনুষ্ঠান হবে।
আর শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্যতম আরেকটি দিক হলো, শাফা‘আতের প্রতি ঈমান আনয়ন করা, আর তা সাব্যস্ত হবে দু’টি শর্ত পূরণের মাধ্যমে: সুপারিশকারীর জন্য আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি, আর সুপারিশকারী ও যার জন্য সুপারিশ করা হবে- উভয়ের প্রতি তাঁর (আল্লাহর) সন্তুষ্টি।
তন্মধ্যে মহান শাফা‘আতের বিষয়টি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট, আর তা হবে বিচার-ফয়সালার কাজটি শেষ করার জন্য, আর তাই হলো ‘মাকামে মাহমূদ’ বা প্রশংসিত স্থান।
তন্মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি শাফা‘আত (সুপারিশ) হবে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়ার ব্যাপারে এবং তাছাড়া তিনি আরও অনেক সুপারিশ করবেন।
তন্মধ্যে আরেকটি শাফা‘আত (সুপারিশ) হবে মুমিনগণ এবং আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী পাপীগণের ব্যাপারে, আর এ প্রকারের শাফা‘আতটি সাব্যস্ত হবে তাঁর জন্য এবং সকল ফিরিশতা, নবী ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গের জন্য।
আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত (সুপারিশ) দ্বারা সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ হবে: যে ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে তার আন্তরিকতা সহকারে বলেছে: لا إله إلا الله (আল্লাহ ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্য ইলাহ নেই)।
আর সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ তা‘আলার সুপারিশে বহু লোকজন জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসবে।
আর আখেরাতের প্রতি ঈমান আনয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্যতম আরেকটি দিক হলো, কিয়ামতের দিনে মুমিনগণ কর্তৃক তাদের রবকে দেখার বিষয়টির প্রতি ঈমান আনয়ন করা।
আরও ঈমান আনা, আফসোস ও অপমানের দিনে কাফিরগণকে দীদারে ইলাহী থেকে পর্দার আড়াল করে বঞ্চিত করার বিষয়টির ওপর।
আর আখেরাতের প্রতি ঈমান আনয়ন করার অন্তর্ভুক্ত অন্যতম আরেকটি দিক হলো: জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি ঈমান আনয়ন করা।
কারণ, জান্নাত হলো সৎব্যক্তিগণের আবাসস্থল, আর জাহান্নাম হলো পাপীদের শেষ ঠিকানা।
আর উভয়টি আল্লাহর সৃষ্টি, এখনও স্থায়ীভাবে বিদ্যমান এবং এগুলো ধ্বংস হবে না।
আর জান্নাত ও তার নি‘য়ামতরাজির কতগুলো মানগত স্তর ও শ্রেণি রয়েছে, আর জাহান্নাম ও তার শাস্তিরও কতগুলো মান ও ধাপ রয়েছে।
আর প্রত্যেকটির জন্য রক্ষক ও দরজার ব্যবস্থা আছে; জান্নাতের আছে আটটি দরজা, আর জাহান্নামের রয়েছে সাতটি দরজা এবং তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী সৃষ্টি হলো: এ উম্মাত এবং তারা হবেন তার অধিবাসীদের অর্ধেক বা তার চেয়ে বেশি।
আর জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী ব্যক্তি হবেন এ উম্মাতের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাতে সর্বশেষ প্রবশেকারী হবেন এ জাতির পাপী লোকেরা।
আর তার অধিকাংশ অধিবাসী হলো: দরিদ্র ও দুর্বলগণ।
আর জান্নাতের সকল অধিবাসী কেবল আল্লাহর রহমতে তাতে প্রবেশ করবেন।
আর আমাদের উম্মাত ব্যতীত অন্যান্য জাতির অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আর জাহান্নামে অধিকাংশ অধিবাসী হবে নারী।
আর যে ব্যক্তি তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ ও ঈমানের ওপর মারা যেতে পারে নি, সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।
আর আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী পাপীগণের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে, সে তাতে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে না।
অতঃপর প্রত্যেকেই যখন তার আবাসস্থল জান্নাত বা জাহান্নামে পৌঁছে যাবে, তখন মৃত্যুকে যবেহ করা হবে; ফলে আর কখনও কারও মৃত্যু হবে না।
আর আখেরাতের প্রতি ঈমান আনয়ন করা, ব্যক্তিকে আনুগত্য করার ব্যাপারে প্রেরণা যোগায়, অবাধ্য হওয়া থেকে দূরে রাখে এবং সার্বক্ষণিক দীনের ওপর অটল রাখে, আর দুনিয়ার ভোগবিলাস ও চাকচিক্যের ব্যাপর সংযমী হতে এবং আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে উৎসাহিত করে, আর দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদের সময় ধৈর্য ধারণ করতে অনুপ্রেরণা দেয়।