hadith book logo

ঈমানের মৌলিক নীতিমালা সংক্রান্ত মণিমুক্তা

লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ ইয়োসরী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩২

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: শরী‘আতের বিধান প্রয়োগ করার নীতিমালা

কুফর ও কাফির বলে আখ্যায়িত করার বিষয়টি একটি শরী‘আতী বিধান এবং এ উভয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার একমাত্র মালিক হলেন আল্লাহ তা‘আলা।

আর যে ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে সাব্যস্ত হবে, তা কোনো প্রকার সন্দেহের দ্বারা বিলীন বা বিলুপ্ত হবে না, আর সুস্পষ্টভাবে গ্রহণ করা ইসলামকে সুস্পষ্ট কুফুরী ব্যতীত বিনষ্ট করা যায় না।

আর কাফির, ফাসিক অথবা বিদ‘আতপন্থী বলে সাব্যস্ত করার ব্যাপারে ভুল করার চেয়ে এসব (কাফির, ফাসিক অথবা বিদ‘আতপন্থী) বলে আখ্যায়িত না করার ব্যাপারে ভুল করাটা অনেক বেশি সুবিধাজনক।

আর দুনিয়াতে শরী‘আতের বিধিবিধানগুলো প্রযোজ্য হবে বাহ্যিক অবস্থা ও শেষ বিষয় বা কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে। সুতরাং যে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ঈমানের বিষয়টি প্রকাশ করবে, তাকে ঈমানদার বলে সিদ্ধন্ত দেওয়া হবে, আর যে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ঈমানের বিপরীত কিছু প্রকাশ করবে, তাকে অবিশ্বাসী বলে সিদ্ধন্ত দেওয়া হবে, আর অন্তরের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণের দায়িত্বটি ন্যস্ত থাকবে গায়েবী জগতের বিষয়ে সুবিজ্ঞ আল্লাহর ওপর।

আর সুনির্দিষ্ট করে নয়, বরং সাধারণ অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মৃত ব্যক্তিগণের ব্যাপারে জাহান্নামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করা থেকে নাজাতের বিষয়টি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করা হবে এবং কাফির ও নাস্তিক সম্প্রদায়ের মৃত ব্যক্তিদের ব্যাপারে জাহান্নামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করার বিষয়টি নিশ্চিতরূপে বলা হবে।

আর নিষিদ্ধ কর্মে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে সাধারণভাবে যে সব হুমকি বর্ণিত হয়েছে, তা সেই নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হওয়া ব্যক্তির ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে নির্দিষ্টভাবে পতিত হওয়া দাবি করে না; চাই সে নিষিদ্ধ করা বিষয়টি কথা হউক অথবা কাজ হউক অথবা বিশ্বাসের বিষয় হউক।

কারণ, সাধারণ হুকুমের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়াকে আবশ্যক করে না। সুতরাং শর্তসমূহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে দলীল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার পরেই শুধু ব্যক্তি বিশেষের ওপর হুকুম জারি হবে। সে কাজটি জেনে শুনে করেছে কি না, তার উদ্দেশ্য কী ছিল, সে কি তা ইচ্ছাকৃত করেছে, এসব জানতে হবে। সাথে সাথে তাকে নির্দিষ্ট হুকুমের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে কোনো বাধা আছে কী না তাও জানতে হবে।

আর যে ব্যক্তি দাওয়াতের বিষয়টি বুঝতে পারেনি, সে ব্যক্তির ওপর দলীল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় নি।

আর ওযরের (যৌক্তিক কারণে অক্ষমতার) বিষয়টি দীনের মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখায় এবং ইজমা ও ইখতিলাফের (মেতনৈক্যের) জায়গায় সমান তালে প্রযোজ্য হবে।

আর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এবং সামগ্রিকভাবে যখন অজ্ঞতার সম্ভবনা দেখা দেবে, তখন যুক্তি-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত ও সঠিক বিষয় স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত তা ‘ওযর’ বলে গণ্য হবে।

আর দার্শনিক ও বাতেনীয়াগণ কর্তৃক অপব্যাখ্যা কৃত এমন প্রতিটি অপব্যাখ্যা, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার শামিল অথবা দীনের অপরিহার্য কোনো মূলনীতিকে অস্বীকার করার শামিল এবং এ ধরনের অপব্যাখ্যা করতে তাকে বাধ্য করা হয়নি, তাহলে এমন অপব্যাখ্যাকারী কাফির হয়ে যাবে।

আর যে ব্যক্তি এরূপ নয়, সে হবে দুই জনের একজন, যাদের একজন গুনাহগার হবে, তবে কাফির হয়ে যাবে না। যেমন, ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মুরজিয়া, মু‘তাযিলা ও তাদের অনুরূপ সম্প্রদায়ের সকল লোকজন যেভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। আর অপরজন গুনাহগার হবে না, তাকে বিদ‘আতপন্থী ও কাফিরও বলা যাবে না, যেমন, ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মুজতাহিদগণ যেভাবে আকিদা-বিশ্বাস ও শরী‘আতের শাখা-প্রশাখাসমূহ নিয়ে ব্যাখ্যা করে থাকেন।

আর জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য ওযর বলে বিবেচিত হবে, যা শরী‘আতের বিধিবিধান প্রয়োগ করতে বাধা প্রদান করে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِلَّا مَنۡ أُكۡرِهَ وَقَلۡبُهُۥ مُطۡمَئِنُّۢ بِٱلۡإِيمَٰنِ﴾ [ النحل : ١٠٦ ]

“তবে তার জন্য (মহাশাস্তি) নয়, যাকে কুফুরীর জন্য বাধ্য করা হয়, কিন্তু তা হৃদয় ঈমানে অবিচলিত।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১০৬]

আর যদি কোনো কথা কুফরির দিকে নিয়ে যায় এমন কথায় কাফির বলা হলে, তা তৎক্ষণাৎ কুফুরী বলে গণ্য হয় না। আর কোনো কথা বা মাযহাব (মতবাদের) সরাসরি মেনে না নিলে সেটার দাবী অনুযায়ী কাউকে কাফির বা বিদ‘আতপন্থী বলে আখ্যায়িত করা শুদ্ধ হবে না।

আর সামগ্রিকভাবে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে রায় বা সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়টি ন্যস্ত হবে গ্রহণযোগ্য বিচারকগণের ওপর এবং দীনের ব্যাপারে অভিজ্ঞ ফকীহ ইমামগণের মধ্য থেকে সুদক্ষ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের ওপর।