hadith book logo

ঈমানের মৌলিক নীতিমালা সংক্রান্ত মণিমুক্তা

লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ ইয়োসরী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২১

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ: এককভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্য ‘উলূহিয়্যাত’ তথা মা‘বুদের গুণাবলী সাব্যস্ত করা

‘আল-উলূহিয়্যাত’ ( الألوهية ) শব্দটি প্রিয় প্রত্যাশিত কাঙ্ক্ষিত মা‘বুদ ‘ইলাহ’ ( الإله ) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত, যাঁর জন্য অন্তরগুলো বিনয়ের সাথে অবনত হয় এবং যাঁর স্মরণে হৃদয়গুলো শান্তি অনুভব করে, আর মনগুলো যাঁর ফয়সালা ও তাকদীরের প্রতি আস্থাবান হয়, যাঁর ইবাদত করে, যাঁর ওপর ভরসা করে এবং যাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।

আর ‘উলূহিয়্যাত’ তথা মা‘বুদের ওপর ঈমান মানে: এক আল্লাহর ইবাদত করা, যিনি একক এবং যাঁর কোনো শরীক নেই।

আর ‘উলূহিয়্যাত’ তথা মা‘বুদ তার গুণে একক ও অদ্বিতীয় হওয়ার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ﴾ [ البقرة : ١٦٣ ]

“আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ﴾ [ محمد : ١٩ ]

“কাজেই জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই।” [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯]

আর ইবাদত এমন একটি বিষয়ের নাম, যা এমন সব বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কথাসমষ্টি ও কার্যাবলীকে অন্তর্ভুক্ত করে; যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, যা পালন করা হয় চূড়ান্ত ভালোবাসা ও পরিপূর্ণ আন্তরিকতা দিয়ে, অসীম অনুগত ও পরিপূর্ণ বিনয়ী হয়ে, তাঁর সত্তাকে সম্মান করার নিমিত্তে, তাঁর শাস্তির ভয়ে এবং রহমতের আশায়।

আর ইবাদতের জন্য আল্লাহ তা‘আলাকে এককভাবে নির্দিষ্ট করাটা দীন ইসলামের মৌলিক বিষয়, মহাজ্ঞানী মালিকের অধিকার, মানব সৃষ্টির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য এবং কাফির ও মুসলিমগণের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করার অন্যতম সূচক। নবীগণের দা‘ওয়াতের সারাংশ এবং সকল মানুষের উদ্দেশ্যে প্রথম বার্তা, আর তা হলো দুনিয়াতে বাঁচার পথ এবং আখেরাতে মহামুক্তি। কারণ, তা হলো দীনের প্রথম ও শেষ কথা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [ النحل : ٣٦ ]

“আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]

আর আল্লাহর উলূহিয়্যাত’ ( ألوهية )-এর প্রতি ঈমান আনয়নের বিষয়টি আল্লাহর ‘রুবূবিয়্যাত, নামসমষ্টি ও মহান গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনয়ন করার বিষয়টিকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

আর কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ ( لاإلهَ إلا اللهُ ) এমন সাক্ষ্য প্রদান করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে: একক আল্লাহর জন্য তার সকল কর্মকাণ্ডকে, তাঁর নাম ও গুণাবলী অবহিত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় জানাকে এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ব্যাপার একনিষ্ঠতাকে- আন্তরিকতা ও আগ্রহ সহকারে এবং অবনত মস্তকে ও ভয়ভীতিসহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ ﴾ [ البينة : ٥ ]

“আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে।” [সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫]

আর কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল’ ( محمّدُ رسول اللهِ ) এমন সাক্ষ্য প্রদান করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে: তাঁর রিসালাতের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাসকে, তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনকে, তাঁর পরিবেশিত তথ্য বা হাদীসসমূহকে সত্য বলে বিশ্বাস করাকে, তাঁর নির্দেশের অনুসরণ করাকে এবং তাঁর নিষেধ করা বিষয় থেকে দূরে থাকাকে। আরও অন্তর্ভুক্ত করে যাবতীয় বিদ‘আত, তিরস্কৃত অন্ধ অনুসরণ অথবা শরী‘আতসম্মত নয় এমন নিন্দিত অনুসরণ থেকে মুক্ত থেকে শুধু তাঁর প্রবর্তিত বিধান অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত করার বিষয়টিকে।

আর স্বীকারোক্তিমূলক শাহাদাতাঈনের [শাহাদতাঈন হলো: أشهد أن لا إلهَ إلا اللهُ و أشهد أنَّ محمدا رسول الله “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল”।] উচ্চারণ করার মানে হলো- দুনিয়ার বিধিবিধানের ক্ষেত্রে ইসলামের চুক্তিনামা বা দলীল সাব্যস্ত হওয়া।

আর আল্লাহর উলূহিয়্যাত’ ( ألوهية )-এর প্রতি ঈমান আনয়নের আরেকটি দিক হলো: এককভাবে আল্লাহ তা‘আলাকে দো‘আ ও আবেদন নিবেদনের ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা। কারণ, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এ ব্যাপারে ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার নিকট ছাড়া অন্য কারও কাছে তা চাওয়া হবে না।

আর যবেহ, মান্নত, তাওয়াফ, সা‘ঈ, ভয়, তাওয়াক্কুল (ভরসা) ইত্যাদি ধরনের ইবাদত শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সম্পাদন করা হবে।

আর মসজিদ ও মাশ‘আর তথা মক্কার পবিত্র স্থানসমূহ ব্যতীত পৃথিবীর কোনো ভূ-খণ্ডে সালাত, যিকির, দো‘আ ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করার ইচ্ছা পোষণ করা যাবে না।

আর অসীলা করার কিছু শরী‘আতসম্মত এবং কিছু শরী‘আত কর্তৃক নিষিদ্ধ পদ্ধতি রয়েছে। সুতরাং শরী‘আতসম্মত অসীলা হলো- যা আল্লাহ তা‘আলার নাম ও গুণাবলী এবং তাঁর কার্যাবলীর দ্বারা অথবা সৎ আমলসমূহ দ্বারা করা হয়ে থাকে, অথবা নেক দো‘আর মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। তা ছাড়া বাকি সব শরী‘আত কর্তৃক নিষিদ্ধ অসীলার অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ বিধিসম্মত বা শরী‘আতসম্মত করেন নি।

আর বরকতের বিষয়টি শুধু এক আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে, আর বরকত লাভ করার বিষয়টি তাওকীফী বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক জানিয়ে দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং তা শুধু পাকা দলীল দ্বারাই সাব্যস্ত হবে।

আর আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে শির্ক হওয়ার প্রত্যেকটি মাধ্যম বা উপায়কে অথবা আল্লাহর দীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করার পথকে বন্ধ করে দেওয়া ওয়াজিব বা আবশ্যক। কারণ মাধ্যমও উদ্দেশ্যের হুকুম রাখে।

আর তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের ইবাদতের অন্যতম একটি দিক হলো আল্লাহ তা‘আলাকে এককভাবে আনুগত্য, আত্মসমর্পণ, আইনকানুন ও বিধিবিধানের জন্য নির্দিষ্ট করা। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যা হালাল করেছেন শুধু তাই হালাল বলে গণ্য হবে। আর আল্লাহ যা হারাম করেছেন শুধু তাই হারাম বলে গণ্য হবে, আর আল্লাহ যা শরী‘আত বলে ঘোষণা করেছেন তা ব্যতীত অন্য কিছু দীন বলে গণ্য হবে না।

আর ঈমানদারগণকে বন্ধু মনে করা এবং কাফিরগণকে শত্রু মনে করাটা দীনের মূলনীতি ও ঈমানের শাখা-প্রশাখার অন্তর্ভুক্ত।

আর যে ব্যক্তি মুসলিম জাতি ভিন্ন অন্য কোনো জাতিকে ভালোবাসে ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে, সে ব্যক্তি দীনকে ধ্বংস করল এবং জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

আর বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সর্বোত্তম মানুষ হলেন ঐ ব্যক্তি, যিনি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর অনুগত, আর তারা হলেন রাসূলগণের পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহাবীগণ, অতঃপর তাদের মত যারা একের পর এক।

আর ইবাদত ও দাসত্বের কতগুলো প্রকার ও বিধিবিধান রয়েছে।

সুতরাং ইবাদতের প্রকারসমূহ তিন ভাগে বিভক্ত: আন্তরিকভাবে ও মৌখিকভাবে এবং মানুষের যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গের মাধ্যমে, আর প্রত্যেকটির জন্যই বিশেষ ইবাদত রয়েছে।