১
আম্মা পারা
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৭
১১২- সূরা ইখলাস
সূরার নামকরণ :
কুরআন মাজীদের অন্যান্য সূরার ক্ষেত্রে সাধারণত সেখানে ব্যবহৃত কোন শব্দের মাধ্যমে তার নামকরণ করতে দেখা গেছে। কিন্তু এ সূরাটিতে ইখলাস শব্দ কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। কাজেই এর এ নামকরণ করা হয়েছে এর অর্থের ভিত্তিতে। কারণ এখানে খালেস তথা নির্ভেজাল তাওহীদের আলোচনা করা হয়েছে। ইখলাস অর্থ খাঁটি, নির্ভেজাল।
নাযিলের সময়কাল :
এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করলে একে মক্কায় একেবারে প্রথম যুগে অবতীর্ণ সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে কুরআনের কোন বিস্তারিত আয়াত তখনো পর্যন্ত নাযিল হয়নি।
শানে নুযূল :
মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে প্রশ্ন করেছিল- আল্লাহ তা‘আলা কিসের তৈরি? এর জবাবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে।
(সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী : ৬/৩৭০; তাবারানী; মু‘জামুল আওসাত : ৩/৯৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ যে মাবুদের ইবাদাত ও বন্দেগী করার প্রতি লোকদের আহবান জানাচ্ছিলেন তার মৌলিক সত্তা ও অবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোক প্রশ্ন করেছিল। এ ধরনের প্রশ্ন যখনই এসেছে তখনই তিনি জবাবে আল্লাহর হুকুমে লোকদেরকে এ সূরাটিই পড়ে শুনিয়েছেন। সর্বপ্রথম মক্কায় কুরাইশ বংশীয় মুশরিকরা তাঁকে এ প্রশ্ন করে। তাদের এ প্রশ্নের জবাবে এ সূরাটি নাযিল হয়।
সূরার বিষয়বস্তু :
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন তখন মূর্তি পূজারী মুশরিকরা কাঠ, পাথর, সোনা, রূপা ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিসের তৈরি মূর্তিসমূহের পূজা করতো। সেই মূর্তিগুলোর আকার, আকৃতি ও দেহাবয়ব ছিল। এ দেবদেবীদের রীতিমত বংশধারাও ছিল। কোন দেবী এমন ছিল না, যার স্বামী ছিল না; আবার কোন দেবতা এমন ছিল না, যার স্ত্রী ছিল না। তাদের খাবার দাবারেরও প্রয়োজন দেখা দিতো। তাদের পূজারীরা তাদের জন্য এসবের ব্যবস্থা করতো। এ অবস্থায় যখন লোকদেরকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর আনুগত্য করার দাওয়াত দেয়া হয় তখন তাদের মনে এ প্রশ্ন জাগা নিতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল যে, সেই রব কেমন। এ সমস্ত প্রশ্নের জবাব মাত্র কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করে কুরআন মূলত আল্লাহর অস্তিত্বের এমন সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা পেশ করে দিয়েছে, যা সব ধরনের মুশরিকী চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার মূলোৎপাটন করে এবং আল্লাহর সত্তার সাথে সৃষ্টির গুণাবলির মধ্য থেকে কোন একটি গুণকেও সংযুক্ত করার কোন অবকাশই রাখেনি।
গুরুত্ব ও ফযীলত :
এ সূরার বহু ফযীলত রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :
১. এর ভালোবাসা জান্নাতে যাওয়ার কারণ; হাদীসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে আরয করল; আমি এই সূরাকে খুব ভালোবাসি। তিনি বললেন, এর ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে। (মুসনাদে আহমাদ : ৩/১৪১, ১৫০)
২. এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ : হাদীসে এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমরা সবাই একত্রিত হয়ে যাও। আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাব। অতঃপর যাদের পক্ষে সম্ভব ছিল, তারা একত্রিত হলে তিনি আগমন করলেন এবং সূরা ইখলাস পাঠ করে শোনালেন। তিনি আরো বললেন, এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। (মুসলিম : ৮১২; তিরমিযী, হা/২৯০০)
৩. বিপদাপদে উপকারী : হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করে তা তাকে বালা-মুসীবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হবে। (আবু দাউদ, হা/৫০৮২; তিরমিযী, হা/৩৫৭৫)
৪. ঘুমানোর আগে পড়ার উপর গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, হে উকবা ইবনে আমের! আমি কি তোমাকে এমন তিনটি উত্তম সূরা শিক্ষা দিব না, যার মতো কিছু তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবূর এবং কুরআনেও নাযিল হয়নি। উকবা বললেন, আমি বললাম, অবশ্যই হ্যাঁ! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। উকবা বলেন, তারপর রাসূল ﷺ আমাকে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস এ সূরাগুলো পড়ালেন। তারপর বললেন, হে উকবা! রাত্রিতে তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত নিদ্রা যেয়ো না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ কর। উকবা (রাঃ) বলেন, সেদিন থেকে আমি কখনও এই আমল ছাড়িনি। (মুসনাদে আহমাদ : ৪/৪১৮, ১৫৮-৫৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিয়মিত আমল : আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন বিছানায় ঘুমানোর জন্য যেতেন তখন তিনি তার দু’হাতের তালু একত্রিত করতেন। তারপর সেখানে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। তারপ এ দু’হাতের তালু দিয়ে তার শরীরের যতটুকু সম্ভব মাসেহ করতেন। তার মাথা ও মুখ থেকে শুরু করে শরীরের সামনের অংশে তা করতেন। এমনটি রাসূল ﷺ তিনবার করতেন।
(সহীহ বুখারী, হা/৫০১৭; আবু দাউদ, হা/৫০৫৬; তিরমিযী, হা/৩৪০২)
আয়াত : ১-৪
﷽
قُلْ هُوَ اللهُ اَحَدٌ (১) اَللهُ الصَّمَدُ (২) لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ (৩) وَلَمْ يَكُنْ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ (৪)
শাব্দিক অনুবাদ :
(১) قُلْ তুমি বলো, هُوَ তিনিই اَللهُ আল্লাহ اَحَدٌ একক-অদ্বিতীয়। (২) اَللهُ আল্লাহ اَلصَّمَدُ অমুখাপেক্ষী। (৩) لَمْ يَلِدْ তিনি কাউকে জন্ম দেননি, وَلَمْ يُوْلَدْ আর তিনিও কারো থেকে জন্মগ্রহণ করেননি। (৪) وَلَمْ يَكُنْ আর নেই لَهٗ তাঁর كُفُوًا সমতুল্য اَحَدٌ কেউই।
সরল অনুবাদ :
(১) (হে মুহাম্মদ) তুমি বলো,১ তিনিই আল্লাহ, তিনি এক ও একক।২ (২) তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।৩ (৩) তাঁর থেকে কেউ জন্ম নেয়নি আর তিনিও কারো থেকে জন্মগ্রহণ করেননি।৪ (৪) আর তাঁর সমতুল্য কেউ-ই নেই।৫
টীকা :
[১] এখানে বলুন শব্দটির মাধ্যমে প্রথমত রাসূলুল্লাহ ﷺ কে সম্বোধন করা হয়েছে। কারণ তাকেই প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনার রব কে? তিনি কেমন? আবার তাকেই হুকুম দেয়া হয়েছিল, প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পর এ সম্বোধনটি প্রত্যেক মুমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ কে যে কথা বলার হুকুম দেয়া হয়েছিল, এখন সে কথা প্রত্যেক মুমিনকেই বলতে হবে।
[২] এ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে যাঁর সম্পর্কে তোমরা প্রশ্ন করছ তিনি আল্লাহ, একক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান, অংশীদার কিছুই নেই। তাই তিনি পূর্ণতার অধিকারী। সুন্দর নামসমূহ, পূর্ণ শ্রেষ্ঠ গুণাবলী এককভাবে শুধুমাত্র তাঁরই। أَحَدٌ শব্দটি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা তিনিই গুণাবলী ও কার্যাবলীতে একমাত্র পরিপূর্ণ সত্তা।
[৩] صَمَدٌ শব্দের অর্থ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের অনেক উক্তি আছে। আলী (রাঃ) ও ইকরামা বলেছেন, সামাদ হচ্ছেন এমন এক সত্তা- যাঁর কাছে সবাই তাদের প্রয়োজন পেশ করে থাকে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন, তিনি এমন সরদার, নেতা, যার নেতৃত্ব পূর্ণতা লাভ করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, যে সরদার তার নেতৃত্ব, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, ধৈর্য, সংযম, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা তথা শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সমস্ত গুণাবলিতে পূর্ণতার অধিকারী তিনি সামাদ।
আসল ও প্রকৃত সামাদ হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। সৃষ্টি যদি কোন দিক দিয়ে সামাদ হয়ে থাকে তাহলে অন্য দিক দিয়ে সামাদ নয়। কোন কোন সৃষ্টি তার মুখাপেক্ষী হলেও সে নিজে আবার কারো মুখাপেক্ষী। তার নেতৃত্ব আপেক্ষিক, নিরংকুশ নয়। কারো তুলনায় সে শ্রেষ্ঠতম হলেও তার তুলনায় আবার অন্য কেউ আছে শ্রেষ্ঠতম। কিছু সৃষ্টির কিছু প্রয়োজন সে পূর্ণ করতে পারে; কিন্তু সবার সমস্ত প্রয়োজন পূর্ণ করার ক্ষমতা কোন সৃষ্টির নেই। বিপরীত পক্ষে আল্লাহর সামাদ হবার গুণ অর্থাৎ তাঁর মুখাপেক্ষীহীনতার গুণ সবদিক দিয়েই পরিপূর্ণ। সারা দুনিয়া তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। সামাদ হবার কারণে তাঁর একক মাবুদ হবার ব্যাপারটিও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই।
[৪] যারা আল্লাহর বংশ পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, এটা তাদের জবাব। সন্তান প্রজনন সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য- স্রষ্টার নয়। অতএব, তিনি কারো সন্তান নন এবং তাঁর কোন সন্তান নেই। আবূ হুরায়রা (রাঃ) নাবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, কিছুসংখ্যক বানী আদম আমার প্রতি মিথ্যারোপ করছে। অথচ তাদের এমনটি করা উচিত নয়। আর কিছুসংখ্যক বানী আদম আমাকে গালি দিচ্ছে। অথচ তাদের এ রকম করা উচিত হয়নি। আমার প্রতি তাদের মিথ্যারোপ করার অর্থ, তারা বলে, আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু (মৃত্যুর পর) পুনরায় জীবিত করবেন না। অথচ তাকে পুনরায় জীবিত করার চেয়ে প্রথম বার সৃষ্টি করা সহজ নয়। আর আমাকে তাদের গালি দেয়ার অর্থ, তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। অথচ আমি একক, কারো মুখাপেক্ষী নই আমি কাউকে জন্ম দেইনি, কেউ আমাকে জন্ম দেয়নি এবং আমার কোন সমকক্ষও নেই। (সহীহ বুখারী, হা/৪৯৭৪)
[৫] মূলে বলা হয়েছে কুফূ। এর মানে হচ্ছে, নজীর, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদা সম্পন্ন ও সমতুল্য। আয়াতের মানে হচ্ছে, সারা বিশ্ব-জাহানে আল্লাহর সমকক্ষ অথবা তাঁর সমমর্যাদাসম্পন্ন কিংবা নিজের গুণাবলী, কর্ম ও ক্ষমতার ব্যাপারে তাঁর সমান পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে এমন কেউ কোন দিন ছিল না এবং কোন দিন হতেও পারবে না এবং আকার-আকৃতিতেও কেউ তাঁর সাথে সামঞ্জস্য রাখে না।
মুশরিকরা প্রতি যুগে মাবুদদের ব্যাপারে এ ধারণা পোষণ করে এসেছে যে, মানুষের মতো তাদেরও একটি জাতি বা শ্রেণি আছে। তার সদস্য সংখ্যাও অনেক। তাদের মধ্যে বিয়ে-শাদী এবং বংশ বিস্তারের কাজও চলে। তারা আল্লাহ রাববুল আলামীনকেও এ জাহেলী ধারণা থেকে মুক্ত রাখেনি। তাঁর জন্য সন্তান সন্ততিও ঠিক করে নিয়েছে। তারা ফেরেশতাদেরকে মহান আল্লাহর কন্যা গণ্য করতো। যদিও তাদের কেউ কাউকে আল্লাহর পিতা গণ্য করার সাহস করেনি। এ সবের উত্তরেই এ সূরায় বলা হয়েছে, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। যদিও মহান আল্লাহকে আহাদ ও আস-সামাদ বললে এসব উদ্ভট ধারণা-কল্পনার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়, তবুও এরপর না তার কোন সন্তান আছে, না তিনি কারো সন্তান- এ কথা বলায় এ ব্যাপারে আর কোন প্রকার সংশয় সন্দেহের অবকাশই থাকে না।
এ সূরার শিক্ষাসমূহ :
আল্লাহর উপর ঈমান আনতে হলে তাঁর গুণাবলি দেখেই ঈমান আনতে হবে। তাঁর গুণাবলিই তাঁর পরিচয় বহন করে।
মানুষের স্রষ্টা ও পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ। তাই আন্তরিকতা ও ইখলাসের সাথে তাঁর ইবাদাত করাই মানুষের কর্তব্য।
আল্লাহর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনিই আইন রচনা করেন এবং হুকুম জারি করেন। এজন্য আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে মানুষের তৈরি করা আইনের অনুসরণ করা শির্ক।
শির্কের সকল ছিদ্রপথ বন্ধ করে, খাঁটিভাবে তাওহীদবাদী হতে হবে- এটাই ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
অত্র সূরায় উল্লেখিত চারটি বৈশিষ্ট্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে।
কুরআন মাজীদের অন্যান্য সূরার ক্ষেত্রে সাধারণত সেখানে ব্যবহৃত কোন শব্দের মাধ্যমে তার নামকরণ করতে দেখা গেছে। কিন্তু এ সূরাটিতে ইখলাস শব্দ কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। কাজেই এর এ নামকরণ করা হয়েছে এর অর্থের ভিত্তিতে। কারণ এখানে খালেস তথা নির্ভেজাল তাওহীদের আলোচনা করা হয়েছে। ইখলাস অর্থ খাঁটি, নির্ভেজাল।
নাযিলের সময়কাল :
এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করলে একে মক্কায় একেবারে প্রথম যুগে অবতীর্ণ সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে কুরআনের কোন বিস্তারিত আয়াত তখনো পর্যন্ত নাযিল হয়নি।
শানে নুযূল :
মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে প্রশ্ন করেছিল- আল্লাহ তা‘আলা কিসের তৈরি? এর জবাবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে।
(সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী : ৬/৩৭০; তাবারানী; মু‘জামুল আওসাত : ৩/৯৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ যে মাবুদের ইবাদাত ও বন্দেগী করার প্রতি লোকদের আহবান জানাচ্ছিলেন তার মৌলিক সত্তা ও অবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোক প্রশ্ন করেছিল। এ ধরনের প্রশ্ন যখনই এসেছে তখনই তিনি জবাবে আল্লাহর হুকুমে লোকদেরকে এ সূরাটিই পড়ে শুনিয়েছেন। সর্বপ্রথম মক্কায় কুরাইশ বংশীয় মুশরিকরা তাঁকে এ প্রশ্ন করে। তাদের এ প্রশ্নের জবাবে এ সূরাটি নাযিল হয়।
সূরার বিষয়বস্তু :
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন তখন মূর্তি পূজারী মুশরিকরা কাঠ, পাথর, সোনা, রূপা ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিসের তৈরি মূর্তিসমূহের পূজা করতো। সেই মূর্তিগুলোর আকার, আকৃতি ও দেহাবয়ব ছিল। এ দেবদেবীদের রীতিমত বংশধারাও ছিল। কোন দেবী এমন ছিল না, যার স্বামী ছিল না; আবার কোন দেবতা এমন ছিল না, যার স্ত্রী ছিল না। তাদের খাবার দাবারেরও প্রয়োজন দেখা দিতো। তাদের পূজারীরা তাদের জন্য এসবের ব্যবস্থা করতো। এ অবস্থায় যখন লোকদেরকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর আনুগত্য করার দাওয়াত দেয়া হয় তখন তাদের মনে এ প্রশ্ন জাগা নিতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল যে, সেই রব কেমন। এ সমস্ত প্রশ্নের জবাব মাত্র কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করে কুরআন মূলত আল্লাহর অস্তিত্বের এমন সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা পেশ করে দিয়েছে, যা সব ধরনের মুশরিকী চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার মূলোৎপাটন করে এবং আল্লাহর সত্তার সাথে সৃষ্টির গুণাবলির মধ্য থেকে কোন একটি গুণকেও সংযুক্ত করার কোন অবকাশই রাখেনি।
গুরুত্ব ও ফযীলত :
এ সূরার বহু ফযীলত রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :
১. এর ভালোবাসা জান্নাতে যাওয়ার কারণ; হাদীসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে আরয করল; আমি এই সূরাকে খুব ভালোবাসি। তিনি বললেন, এর ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে। (মুসনাদে আহমাদ : ৩/১৪১, ১৫০)
২. এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ : হাদীসে এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমরা সবাই একত্রিত হয়ে যাও। আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শোনাব। অতঃপর যাদের পক্ষে সম্ভব ছিল, তারা একত্রিত হলে তিনি আগমন করলেন এবং সূরা ইখলাস পাঠ করে শোনালেন। তিনি আরো বললেন, এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। (মুসলিম : ৮১২; তিরমিযী, হা/২৯০০)
৩. বিপদাপদে উপকারী : হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করে তা তাকে বালা-মুসীবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হবে। (আবু দাউদ, হা/৫০৮২; তিরমিযী, হা/৩৫৭৫)
৪. ঘুমানোর আগে পড়ার উপর গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, হে উকবা ইবনে আমের! আমি কি তোমাকে এমন তিনটি উত্তম সূরা শিক্ষা দিব না, যার মতো কিছু তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবূর এবং কুরআনেও নাযিল হয়নি। উকবা বললেন, আমি বললাম, অবশ্যই হ্যাঁ! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। উকবা বলেন, তারপর রাসূল ﷺ আমাকে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস এ সূরাগুলো পড়ালেন। তারপর বললেন, হে উকবা! রাত্রিতে তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত নিদ্রা যেয়ো না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ কর। উকবা (রাঃ) বলেন, সেদিন থেকে আমি কখনও এই আমল ছাড়িনি। (মুসনাদে আহমাদ : ৪/৪১৮, ১৫৮-৫৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিয়মিত আমল : আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন বিছানায় ঘুমানোর জন্য যেতেন তখন তিনি তার দু’হাতের তালু একত্রিত করতেন। তারপর সেখানে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। তারপ এ দু’হাতের তালু দিয়ে তার শরীরের যতটুকু সম্ভব মাসেহ করতেন। তার মাথা ও মুখ থেকে শুরু করে শরীরের সামনের অংশে তা করতেন। এমনটি রাসূল ﷺ তিনবার করতেন।
(সহীহ বুখারী, হা/৫০১৭; আবু দাউদ, হা/৫০৫৬; তিরমিযী, হা/৩৪০২)
আয়াত : ১-৪
﷽
قُلْ هُوَ اللهُ اَحَدٌ (১) اَللهُ الصَّمَدُ (২) لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ (৩) وَلَمْ يَكُنْ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ (৪)
শাব্দিক অনুবাদ :
(১) قُلْ তুমি বলো, هُوَ তিনিই اَللهُ আল্লাহ اَحَدٌ একক-অদ্বিতীয়। (২) اَللهُ আল্লাহ اَلصَّمَدُ অমুখাপেক্ষী। (৩) لَمْ يَلِدْ তিনি কাউকে জন্ম দেননি, وَلَمْ يُوْلَدْ আর তিনিও কারো থেকে জন্মগ্রহণ করেননি। (৪) وَلَمْ يَكُنْ আর নেই لَهٗ তাঁর كُفُوًا সমতুল্য اَحَدٌ কেউই।
সরল অনুবাদ :
(১) (হে মুহাম্মদ) তুমি বলো,১ তিনিই আল্লাহ, তিনি এক ও একক।২ (২) তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।৩ (৩) তাঁর থেকে কেউ জন্ম নেয়নি আর তিনিও কারো থেকে জন্মগ্রহণ করেননি।৪ (৪) আর তাঁর সমতুল্য কেউ-ই নেই।৫
টীকা :
[১] এখানে বলুন শব্দটির মাধ্যমে প্রথমত রাসূলুল্লাহ ﷺ কে সম্বোধন করা হয়েছে। কারণ তাকেই প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনার রব কে? তিনি কেমন? আবার তাকেই হুকুম দেয়া হয়েছিল, প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পর এ সম্বোধনটি প্রত্যেক মুমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ কে যে কথা বলার হুকুম দেয়া হয়েছিল, এখন সে কথা প্রত্যেক মুমিনকেই বলতে হবে।
[২] এ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে যাঁর সম্পর্কে তোমরা প্রশ্ন করছ তিনি আল্লাহ, একক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান, অংশীদার কিছুই নেই। তাই তিনি পূর্ণতার অধিকারী। সুন্দর নামসমূহ, পূর্ণ শ্রেষ্ঠ গুণাবলী এককভাবে শুধুমাত্র তাঁরই। أَحَدٌ শব্দটি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা তিনিই গুণাবলী ও কার্যাবলীতে একমাত্র পরিপূর্ণ সত্তা।
[৩] صَمَدٌ শব্দের অর্থ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের অনেক উক্তি আছে। আলী (রাঃ) ও ইকরামা বলেছেন, সামাদ হচ্ছেন এমন এক সত্তা- যাঁর কাছে সবাই তাদের প্রয়োজন পেশ করে থাকে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন, তিনি এমন সরদার, নেতা, যার নেতৃত্ব পূর্ণতা লাভ করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, যে সরদার তার নেতৃত্ব, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, ধৈর্য, সংযম, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা তথা শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সমস্ত গুণাবলিতে পূর্ণতার অধিকারী তিনি সামাদ।
আসল ও প্রকৃত সামাদ হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। সৃষ্টি যদি কোন দিক দিয়ে সামাদ হয়ে থাকে তাহলে অন্য দিক দিয়ে সামাদ নয়। কোন কোন সৃষ্টি তার মুখাপেক্ষী হলেও সে নিজে আবার কারো মুখাপেক্ষী। তার নেতৃত্ব আপেক্ষিক, নিরংকুশ নয়। কারো তুলনায় সে শ্রেষ্ঠতম হলেও তার তুলনায় আবার অন্য কেউ আছে শ্রেষ্ঠতম। কিছু সৃষ্টির কিছু প্রয়োজন সে পূর্ণ করতে পারে; কিন্তু সবার সমস্ত প্রয়োজন পূর্ণ করার ক্ষমতা কোন সৃষ্টির নেই। বিপরীত পক্ষে আল্লাহর সামাদ হবার গুণ অর্থাৎ তাঁর মুখাপেক্ষীহীনতার গুণ সবদিক দিয়েই পরিপূর্ণ। সারা দুনিয়া তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। সামাদ হবার কারণে তাঁর একক মাবুদ হবার ব্যাপারটিও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই।
[৪] যারা আল্লাহর বংশ পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, এটা তাদের জবাব। সন্তান প্রজনন সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য- স্রষ্টার নয়। অতএব, তিনি কারো সন্তান নন এবং তাঁর কোন সন্তান নেই। আবূ হুরায়রা (রাঃ) নাবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, কিছুসংখ্যক বানী আদম আমার প্রতি মিথ্যারোপ করছে। অথচ তাদের এমনটি করা উচিত নয়। আর কিছুসংখ্যক বানী আদম আমাকে গালি দিচ্ছে। অথচ তাদের এ রকম করা উচিত হয়নি। আমার প্রতি তাদের মিথ্যারোপ করার অর্থ, তারা বলে, আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু (মৃত্যুর পর) পুনরায় জীবিত করবেন না। অথচ তাকে পুনরায় জীবিত করার চেয়ে প্রথম বার সৃষ্টি করা সহজ নয়। আর আমাকে তাদের গালি দেয়ার অর্থ, তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। অথচ আমি একক, কারো মুখাপেক্ষী নই আমি কাউকে জন্ম দেইনি, কেউ আমাকে জন্ম দেয়নি এবং আমার কোন সমকক্ষও নেই। (সহীহ বুখারী, হা/৪৯৭৪)
[৫] মূলে বলা হয়েছে কুফূ। এর মানে হচ্ছে, নজীর, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদা সম্পন্ন ও সমতুল্য। আয়াতের মানে হচ্ছে, সারা বিশ্ব-জাহানে আল্লাহর সমকক্ষ অথবা তাঁর সমমর্যাদাসম্পন্ন কিংবা নিজের গুণাবলী, কর্ম ও ক্ষমতার ব্যাপারে তাঁর সমান পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে এমন কেউ কোন দিন ছিল না এবং কোন দিন হতেও পারবে না এবং আকার-আকৃতিতেও কেউ তাঁর সাথে সামঞ্জস্য রাখে না।
মুশরিকরা প্রতি যুগে মাবুদদের ব্যাপারে এ ধারণা পোষণ করে এসেছে যে, মানুষের মতো তাদেরও একটি জাতি বা শ্রেণি আছে। তার সদস্য সংখ্যাও অনেক। তাদের মধ্যে বিয়ে-শাদী এবং বংশ বিস্তারের কাজও চলে। তারা আল্লাহ রাববুল আলামীনকেও এ জাহেলী ধারণা থেকে মুক্ত রাখেনি। তাঁর জন্য সন্তান সন্ততিও ঠিক করে নিয়েছে। তারা ফেরেশতাদেরকে মহান আল্লাহর কন্যা গণ্য করতো। যদিও তাদের কেউ কাউকে আল্লাহর পিতা গণ্য করার সাহস করেনি। এ সবের উত্তরেই এ সূরায় বলা হয়েছে, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। যদিও মহান আল্লাহকে আহাদ ও আস-সামাদ বললে এসব উদ্ভট ধারণা-কল্পনার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়, তবুও এরপর না তার কোন সন্তান আছে, না তিনি কারো সন্তান- এ কথা বলায় এ ব্যাপারে আর কোন প্রকার সংশয় সন্দেহের অবকাশই থাকে না।
এ সূরার শিক্ষাসমূহ :
আল্লাহর উপর ঈমান আনতে হলে তাঁর গুণাবলি দেখেই ঈমান আনতে হবে। তাঁর গুণাবলিই তাঁর পরিচয় বহন করে।
মানুষের স্রষ্টা ও পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ। তাই আন্তরিকতা ও ইখলাসের সাথে তাঁর ইবাদাত করাই মানুষের কর্তব্য।
আল্লাহর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনিই আইন রচনা করেন এবং হুকুম জারি করেন। এজন্য আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে মানুষের তৈরি করা আইনের অনুসরণ করা শির্ক।
শির্কের সকল ছিদ্রপথ বন্ধ করে, খাঁটিভাবে তাওহীদবাদী হতে হবে- এটাই ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
অত্র সূরায় উল্লেখিত চারটি বৈশিষ্ট্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে।