hadith book logo

ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নির্বাচিত ফাতাওয়া

লেখকঃ মিরফাত বিনতে কামিল আবদিল্লাহ উসরা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭০

কোনো কোনো ছাত্রের পক্ষ থেকে আলেমদের নিন্দা বা সমালোচনা করা

প্রশ্ন: কিছু সংখ্যক যুবকের ব্যাপারে সম্মানিত শাইখের কী অভিমত— তাদের কেউ কেউ আবার তালেবে ইলম বা শরী‘আতের ছাত্র, যাদের অভ্যাস হয়ে গেছে তাদের একে অপরের নিন্দা করা, তাদের নিকট থেকে জনসাধারণকে দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং জনগণকে সতর্ক করা, এটা কি শরী‘আত সম্মত কাজ, যার জন্য সাওয়াব দেওয়া হবে অথবা শাস্তি দেওয়া হবে?

উত্তর: আমি মনে করি এ ধরণের কাজ হারাম। যখন কোনো মানুষের জন্য তার এমন মুমিন ভাইয়ের গীবত করা বৈধ নয়, যিনি আলেম নন, তাহলে তার জন্য কীভাবে তার ঈমানদার আলেম ভাইদের গীবত করা বৈধ হবে? সুতরাং মুমিন ব্যক্তির জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো, সে তার মুমিন ভাইদের গীবত করা থেকে নিজের জিহ্বাকে বিরত রাখবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱجۡتَنِبُواْ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعۡضَ ٱلظَّنِّ إِثۡمٞۖ وَ لَا تَجَسَّسُواْ وَلَا يَغۡتَب بَّعۡضُكُم بَعۡضًاۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمۡ أَن يَأۡكُلَ لَحۡمَ أَخِيهِ مَيۡتٗا فَكَرِهۡتُمُوهُۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ تَوَّابٞ رَّحِيمٞ ١٢ ﴾ [ الحجرات : ١٢ ]

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২] আর এই ব্যক্তি যিনি এসব বিপদজনক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন (গীবত অযথা সমালোচনা করছেন) তার জেনে রাখা উচিৎ, সে যখন আলেমের নিন্দা ও সমালোচনা করবে, তখন তা অবশ্যই ঐ সমালোচিত আলেম যেসব সত্য কথা বলেছেন, তাও প্রত্যাখ্যান করার কারণ হিসেবে গণ্য হবে ...। সুতরাং সত্য প্রত্যাখ্যান করার খারাপ পরিণতি ও তার পাপ ঐ ব্যক্তির ওপর বর্তাবে, যে ব্যক্তি আলেমের নিন্দা ও সমালোচনা করেছে। কারণ, আলেমের নিন্দা ও সমালোচনা করাটা শুধু কোনো ব্যক্তির সমালোচনা করা নয়, বরং তা হলো নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরাধিকারের নিন্দা ও সমালোচনা করা।

কারণ, আলেমগণ হলেন নবীদের উত্তরাধিকারী। সুতরাং যখন আলেমগণ সমালোচিত ও দুর্নামের শিকার হবেন, তখন তাদের নিকট যে জ্ঞান রয়েছে, তা জনগণ বিশ্বাস করবে না, অথচ তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। আর যখন এই সমালোচিত আলেম শরী‘য়াতের কোনো বিষয় নিয়ে আসবে, তখন তারা তার কিছুই বিশ্বাস করবে না।

আমি বলি না যে, সকল আলেমই নিষ্পাপ, বরং প্রত্যেক মানুষের নিকট থেকে ভুল-ত্রুটির প্রকাশ ঘটে, আর তুমি যখন কোনো আলেমকে এমন বিষয়ে ভুল করতে দেখবে, যা তোমার আকিদা বা বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট, তখন তুমি তার সাথে যোগাযোগ কর এবং তার সাথে পারস্পরিক বুঝাপড়া করা, অতঃপর যদি তোমার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রকৃত সত্য বিষয়টি তার সাথে রয়েছে, তাহলে তোমার জন্য আবশ্যক হলো তার অনুসরণ করা, আর যদি বিষয়টি তোমার কাছে স্পষ্ট না হয়, কিন্তু তুমি তার কথার সঙ্গত কারণ পেয়ে থাক, তাহলে তোমার ওপর আবশ্যক হলো বিরত থাকা, আর যদি তার কথার সঙ্গত কারণ খুঁজে না পাও, তাহলে তার কথা থেকে সতর্ক কর। কারণ, ভুলের স্বীকৃতি প্রদান করা বৈধ নয় ...; কিন্তু তুমি তার সমালোচনা ও নিন্দা করতে পারবে না, যদিও তা উত্তম নিয়তে হউক না কেন। কেননা তিনি হলেন সুপরিচিত আলেম, আর আমরা যদি এমন কোনো ভুলের কারণে ভালো নিয়তে প্রসিদ্ধ আলেমদের সমালোচনা করতে চাই, যে ভুলটি তারা কোনো ফিকহী মাসআলার ক্ষেত্রে করেছেন, তাহলে আমরা অনেক বড় বড় আলেমেরও সমালোচনা করতে পারব; কিন্তু এই ক্ষেত্রে আবশ্যক হলো আমি যা (পূর্বে) আলোচনা করেছি (অর্থাৎ সমালোচনা না করে তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসা...)। আর তুমি যখন কোনো আলেমের ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করবে, তখন তুমি তার সাথে আলোচনা ও পর্যালোচনা করবে, অতঃপর যদি তোমার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রকৃত সত্য বিষয়টি তার সাথে রয়েছে, তাহলে তুমি তার অনুসরণ করবে, আর যদি সঠিক বিষয়টি তোমার সাথে থাকে, তাহলে সে তোমার অনুসরণ করবে ..., আর যদি বিষয়টি স্পষ্ট না হয় এবং তোমাদের মধ্যকার মতবিরোধটি বৈধ মতবিরোধের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তোমার ওপর আবশ্যক হলো সেই বিষয়ে পারস্পরিক সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকা এবং সে যেন তাই বলে, যা সে বলে থাকে, আর তুমিও তাই বলবে, যা তুমি বলে থাক।

আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য নিবেদিত) ..., বিতর্ক ও মতবিরোধ শুধু এই যুগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ... বরং এই বিরোধ সাহাবীগণের যুগ থেকে শুরু করে আমাদের এই দিন পর্যন্ত চলছে; তবে যখন ভুলের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে, কিন্তু সে তার কথাটিকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে, তখন তোমার আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো ভুল-ত্রুটি স্পষ্ট করে দেওয়া এবং তার থেকে দূরে সরে আসা; তবে ঐ ব্যক্তিকে দোষারোপ করে এবং তার থেকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ করার ভিত্তিতে নয়। কারণ, এই ব্যক্তি তুমি যে বিষয়ে তার সাথে বিতর্ক করেছ তা ছাড়া অনেক সময় সত্য বক্তব্যও দিয়ে থাকেন ...।

মোটকথা, আমি আমার ভাইদেরকে এই পরীক্ষা (আলেমদের সমালোচনা) বা এই ব্যাধি (অন্যের বিরুদ্ধে কথা বলা) থেকে সাবধান ও সতর্ক করছি, আর আল্লাহ তা‘আলার নিকট আমার জন্য ও তাদের জন্য এমন সব বিষয় থেকে পরিত্রাণ ও প্রতিকার প্রার্থনা করছি, যা আমাদেরকে আমাদের দীন ও দুনিয়ার ব্যাপারে কলুষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

শাইখ ইবন ‘উসাইমীন

ফাতাওয়া ( فتاوى ): ১/৬২

(ঈষৎ পরিবর্তিত)