hadith book logo

সুন্নাত ও বিদয়াত

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৯

বিদয়াতের পুঞ্জীভূত স্তূপ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা)এর পূর্বোক্ত কথাটি যে অক্ষরে অক্ষরে সত্য, তা মুসলমানদের সাহাবী পরবর্তী যুগের ইতিহাস অকাট্য ও নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে। উত্তরকালে মুসলিম সমাজে নানাবিধ বিদয়াত প্রচলিত হয়ে পড়ে, সুন্নাত ধীরে পরিত্যক্ত হয়-মন ও জীবন থেকে নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু যখনি সুন্নাতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা শুরু হয়েছে, তখনই এই ব্যক্তিগত অন্ধ অনুসরণের প্রবল বিদ্বেষ তার পথে প্রচন্ড বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ ব্যক্তির নাম করে যে তার জীবদ্দশায় হয়তো বড় আলীম বা পীর, অলী আল্লাহ হওয়ার সূখ্যাতি পেয়ে গেছেন জনগণের মাঝে-তাঁর দোহাই দিয়ে বলা হয়েছেঃ অমুক বুজুর্গ বা অমুক পীর একথা বলে গেছেন, কাজেই এতে কোনো দোষ নেই। এভাবে ব্যক্তি ভিত্তিক সত্যাসত্য ও ন্যায়ান্যায়ের বিচার ইসলামে এক সম্পূর্ণ নতুন জিনিস-সুস্পষ্ট বিদয়াত। অথচ ইসলামে নবী করীম(স) ছাড়া আর কোনো ব্যক্তির কথা অথবা কাজের দোহাই আদৌ সমর্থনীয় নয়। এভাবে মুসলিম সমাজে ধীরে ধীরে সুন্নাত-রাসূলে করীম(স) এর আদর্শ –তলিয়ে গিয়ে সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিদয়াত-আবর্জনার স্তূপ। এ বিদয়াত যেমন দেখা দিয়েছে আকীদা বিশ্বাসে, চিন্তায়-মনে, তেমনি আমলে ও আখলাকে, বাস্তব জীবনের সর্বদিকে ও সর্বক্ষেত্রে। এ স্তুপ প্রায় আকাশছোঁয়া। এর একটা একটা করে গণনা করাও সাধ্যাতীত। অথচ এ বিদয়াতগুলো চিহ্নিত ও নির্ধারিত না হলে মুসলমানকে তা থেকে রক্ষা করার-বিদয়াতের স্তুপের তলা থেকে তাদের উদ্ধার করার আরে কোনোই উপায় নেই। তাই আমরা কতকগুলো বড় বড় বিদয়াত সম্পর্কে যথাসম্ভব সংক্ষেপে আলোচনা পেশ করবো। আমরা দেখাবঃ এক-একটি বিদয়াত কিভাবে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করেছে ও শিকড় গেড়ে বসেছে এবং মূল ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের কোথায়-কোন গোমরাহীর সুদূর প্রান্তে নিয়ে পৌছিয়েছে।

এ পর্যায়ের আলোচনার শেষভাগে আমরা ‘খলিফায়ে রাশিদ’ হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের সে বিখ্যাত ভাষণটির কথা উল্লেখ করবো, যা তিনি খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পরই সমবেত লোকদের সামনে পেশ করেছিলেন।

ভাষণটি এইঃ জেনে রাখো, তোমাদের নবীর পর আর কোনো নবী-ই নেই, তোমাদের কিতাব(কুরআন মজীদ) এর পর আর কোনো কিতাব-ই নেই, তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট সুন্নাতের পর আর কোনো সুন্নাত নেই এবং তোমাদের এই উম্মতের পর আর কোনো (নবীর) উম্মত হবেনা। তোমরা জেনে রাখো, হালাল তা-ই, যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে তাঁর রাসূলের জবানীতে হালাল করে দিয়েছেন এবং তা হালাল কিয়ামত পর্য্ন্ত। জেনে রাখো, হারাম কেবল তা-ই, যা আল্লাহ হারাম করেছেন তাঁর কিতাবে তাঁর রাসূলের জবানীতে, তা হারাম কিয়ামত পর্য্ন্ত। জেনে রাখবে, আমি বিদয়াতপন্থী বা নতুন কিছুর প্রবর্ত্ক নই। আমি শুধু দ্বীনের অনুসরণকারী মাত্র। জেনে রাখো, আমি চূড়ান্ত ফয়সালাকারী কেউ নই, আমি তো শুধু নির্বাহকারী। জেনে রাখবে, আমি ধন-ভান্ডার সঞ্চয়কারী নই বরং আমি সেখানেই তাই রাখব, যা যেখানে রাখার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। এ-ও জেনে রাখবে, আমি তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি নই; আমাকে তো তোমাদের উপর বোঝাস্বরূপ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, আর শেষ কথা জেনে রাখবে, স্রষ্টার নাফরমানী করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবেনা।

বস্তুত এ ভাষণটি ইসলামী আদর্শানুসারী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিরই উপযুক্ত ভাষণ। এ ভাষণের মূল বক্তব্য আমাদের এ আলোচনারও বক্তব্য।