hadith book logo

সুন্নাত ও বিদয়াত

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

‘সুন্নাত’ শব্দের ব্যাখ্যা

‘সুন্নাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘পথ’।

কুরআন মজীদে এ ‘সুন্নাত’ শব্দটি বহু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

একটি আয়াত হলোঃ

سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلُ ۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا [ ٤٨ : ٢٣ ]

আল্লাহর সুন্নাত, যা পূর্ব থেকেই কার্যকর হয়ে রয়েছে। আর আল্লাহর এ সুন্নাতে কোনরূপ পরিবর্তন দেখবেনা কখনো।(আল ফাতহঃ48)

অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ فَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَبْدِيلًا ۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ اللَّهِ تَحْوِيلًا

-তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোনরূপ পরিবর্তন হতে- কোনো প্রকারের ব্যতিক্রম হতে দেখবেনা।(আল ফাতীরঃ42)

সূরা বনি ইসরাঈলেও ‘সুন্নাত’ শব্দটি একই আয়াতে দুবার ব্যবহৃত হয়েছে।

আয়াতটি - سُنَّةَ مَن قَدْ أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِن رُّسُلِنَا ۖ وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحْوِيلًا [ ١٧ : ٧٧ ]

-তোমার পূর্বে যেসব রাসূল পাঠিয়েছি এ হচ্ছে তাদের ব্যাপারে সুন্নাত এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোনোরূপ পরিবর্তন পাবেনা।

এসব আয়াতে ব্যবহৃত ‘সুন্নাত’ শব্দের শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থ পথ, পন্থা ও পদ্ধতি। কিন্তু ‘সুন্নাতুল্লাহ’-আল্লাহর সুন্নাতের মানে কি?

ইমাম রাগেব ইসফাহানী লিখেছেনঃ আল্লাহ তা’আলার সুন্নাত বলা হয় তাঁর কর্মকুশলতার বাস্তব পন্থাকে, তাঁর আনুগত্য করার নিয়ম ও পদ্ধতিকে।

এভাবে দেখা যায় যে, ‘সুন্নাত’ শব্দটি একটি মৌলিক বিষয় সম্পর্কিত এবং তা যেমন আল্লাহর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছে, তেমনি করা হয়েছে নবী ও রাসূলদের ক্ষেত্রেও। সাধারণ মানুষের বাস্তব অবস্থান বুঝবার জন্যেও এ শব্দের ব্যবহার দেখা যায় কুরআন মজীদে।

এ হলো ‘সুন্নাত’ শব্দটির শাব্দিক ব্যবহার ও আভিধানিক অর্থ। আমরা এখানে ‘সুন্নাত’ শব্দটির যে বিশ্লেষণ শুরু করেছি, তা এ দৃষ্টিতেই। আমাদের সামনে রয়েছে ‍ এর মূল ও নির্গলিত অর্থ ।

ইমাম রাগেবের ভাষায়ঃ নবীর সুন্নাত হচ্ছে সে নিয়ম, পন্থা ও পদ্ধতি, যা তিনি বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করে চলতেন।

আর আল্লামা মুহাম্মাদ বশীর সাহসোয়ানীর ভাষায় ‘সুন্নাত’ হলোঃ সেই বিশেষ পথ, পন্থা ও পদ্ধতি যা নবী করীম (সাঃ) এর সময় থেকেই দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে কোনো কাজ করার বা না করার দিক দিয়ে বাস্তবভাবে অনুসরণ করা হয়-যার উপর দিয়ে চলাচল করা হয়। ‘কিতাবুল মকসূদ’ এর ‘কিতাবুল কাজী’ অধ্যায়ে ‘সুন্নাত’ শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবেঃ ‘সুন্নাত’ দ্বীন ইসলামের এমন এক অনুসৃত কর্মপদ্ধতি, যার অনুসরণ সকল অবস্থায়ই ওয়াজিব বা কর্তব্য।

আল্লামা আবদুল আযীয আল হানাফী লিখেছেনঃ ‘সুন্নাত’ শব্দ বোঝায় রাসূল(সাঃ) এর কথা ও কাজ। আর তা রাসূলে করীম(সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব কর্মনীতি বুঝবার জন্যও ব্যবহৃত হয়।

আল্লামা সফীউদ্দীন আল-হাম্বলী লিখেছেনঃ কুরআন ছাড়া রাসূলের যে কথা, যে কাজ বা অনুমোদন বর্ণনার সূত্রে পাওয়া যায় তা-ই সুন্নাত।

মনে রাখতে হবে, এখানে সুন্নাতের সে অর্থ আলোচ্য নয়, যা হাদীস বিজ্ঞানীরা পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন; সে অর্থও নয় যা ফিকহ শাস্ত্রে গ্রহণ করা হয়েছে। হাদীস বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় ‘সুন্নাত’ হচ্ছে রাসূলে করীম(সাঃ) এর মুখের কথা, কাজ ও সমর্থন অনুমোদনের বর্ণনা- যাকে প্রচলিত কথায় বলা হয় ‘হাদীস’। আর ফিকাহশাস্ত্রে ‘সুন্নাত’ বলা হয় এমন কাজকে, যা ফরজ ও ওয়াজিব নয় বটে; কিন্তু নবী করীম(সাঃ) তা প্রায়ই করেছেন। এ গ্রন্থে এ দুটো সুন্নাতের কোনটি-ই আলোচ্য নয়। এখানে আলোচ্য হচ্ছে ‘সুন্নাত’ তার মূলগত অর্থের দিক দিয়ে যা মৌলিক আদর্শ রীতি-নীতি, পথ, পন্থা ও পদ্ধতি বোঝায়। বস্তুত এ হিসেবে ‘সুন্নাত’ হলো সেই মূল আদর্শ, যা আল্লাহ তা’আলা বিশ্ব মানবের জন্য নাজিল করেছেন, যা রাসূলে করীম(সাঃ) নিজে তাঁর বাস্তব জীবনে দ্বীনি দায়িত্ব পালনের বিশাল ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন; অনুসরণ করার জন্য পেশ করেছেন দুনিয়ার মানুষের সামনে। মূল ইসলামেরই বিকল্প শব্দ হচ্ছে ‘সুন্নাত’ যা আমরা এখানে আলোচনা করেছি। কেননা নবী করীম(সাঃ) যা বাস্তবভাবে অনুসরণ করেছেন, তার উৎস হচ্ছে ওহী- যা আল্লাহর নিকট হতে তিনি লাভ করেছেন। এ ‘ওহী’ দু’ভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে আল্লাহর জানিয়ে দেয়া বিধান ও নির্দেশ। রাসূলে করীম (স) এর বাস্তব কর্মজীবন এ দুটোরই সমন্বয়, যেখানে এসবকিছুরই প্রতিফলন ঘটেছে পরিপূর্ণভাবে। রাসূলের বাস্তব জীবন বিশ্লেষণ করলে এ সব কটিরই প্রকটভাবে সন্ধান লাভ করা যাবে। আর তাই হচ্ছে ‘সুন্নাত’, তাই হচ্ছে পরিপূর্ণ দ্বীন ইসলাম। কুরআন মজীদে রাসূলের এ বাস্তব জীবনের সত্যিকার রূপ সুস্পষ্ট করে তুলবার জন্যেই তাঁর জবানীতে বলা হয়েছেঃ আমি কোন আদর্শই অনুসরণ করিনা; করি শুধু তাই যা আমার নিকট ওহীর সূত্রে নাযিল হয়।

ওহীর সূত্রে নাযিল হওয়া আদর্শই রাসূল করীম(স) বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করেছেন, তা-ই হচ্ছে আমাদের আলোচ্য ‘সুন্নাত’। এই সুন্নাতেরই অপর নাম ইসলাম।

কুরআন মজীদে এ সুন্নাতকেই ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলের জবানীতে কুরআন মজীদে ঘোষণা করা হয়েছেঃ

নিশ্চয়ই এ হচ্চে আমার সঠিক সরল দৃঢ় পথ। অতএব তোমরা এ পথই অনসরণ করে চলবে, এ ছাড়া অন্যান্য পথের অনুসরণ তোমরা করবেনা। তা করলে তা তোমাদের এ পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দূরে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাদের এরূপ-ই নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা ভয় করে চলো।

এ আয়াতে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলতে সে জিনিসকেই বুঝানো হয়েছে, যা বোঝায় ‘সুন্নাত’ শব্দ হতে। ইমাম শাতেবী ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ এর পরিচয় সম্পর্কে লিখেছেনঃ ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ হচে্ছ আল্লাহর সেই পথ, যা অনুসরণের জন্য তিনি দাওয়াত দিয়েছেন। আর তা-ই সুন্নাত; আর অন্যান্য পথ বলতে বোঝানো হয়েছে বিরোধ ও বিভেদপন্থীদের পথ, যা মানুষকে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ হতে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর তারাই হচ্ছে বিদয়াতপন্থী লোক। আরও মনে রাখতে হবে, সুন্নাত হচ্ছে তা-ই , যা বিদয়াতের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কেননা এ সুন্নাতের বিপরীতই হচ্ছে বিদয়াত।