hadith book logo

সুন্নাত ও বিদয়াত

লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

হাদীসের সুন্নাতের প্রমাণ

হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন(রা) বলেন, কুরআন নাযীল হলো এবং রাসূল(স) সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত করলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা আমার অনুসরণ করো। আল্লাহর কসম, যদি তা না করো, তবে তোমরা গোমরাহ হয়ে যাবে।

অর্থাৎ কুরআন অনুযায়ী জীবন যাপনের যে নিয়ম, পথ ও আদর্শ তা-ই সুন্নাত। রাসূলে করীম(স) এই সুন্নাতকেই উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তা-ই অনুসরণ করে চলার নির্দেশ দিয়েছেন সব মানুষকে। আর শেষ ভাগে বলেছেন, এ সুন্নাতের অনুসরণ করা না হলে স্পষ্ট ভ্রষ্টতা ও গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। বস্তুত এ ভ্রষ্টতাই হচ্ছে বিদয়াত-যা সুন্নাতের বিপরীত।

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ(রা) বলেনঃ আমরা একদা রাসূলে করীম(স) এর নিকট বসা ছিলাম। তিনি তাঁর সামনে একটি রেখা আঁকলেন এবং বললেনঃ এই হচ্ছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পথ। অতঃপর তার ডান দিকে ও বাম দিকে দুটো রেখা আঁকলেন এবং বললেন এ হচ্ছে শয়তানের পথ। তারপর তিনি মাঝখানে রেখার উপর হাত রাখলেন এবং কুরআনের এ আয়াতটি পড়লেনঃ(যার মানে হলো)“এই হচ্ছে আমার পথ সুদৃঢ়, সোজা ও সরল, অতএব তোমরা তা-ই অনুসরণ করে চল। আর এছাড়া যত অন্যান্য যত পথ-রেখা দেখতে পাচ্ছ, এর কোনোটাই অনুসরণ করোনা। অন্যথায় তোমরা আল্লাহর পথ হতে দূরে সরে যাবে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। আল্লাহ তোমাদের এরই নির্দেশ দিয়েছেন, সম্ভবত তোমরা আল্লাহকে ভয় করে এই নির্দেশ অবশ্যই পালন করবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) হতেও এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তবে উভয়ের ভাষায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। (দারেমী, মুসনাদে আহমদ)

হযরত ইবরাজ ইবনে সারিয়াতা বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ তোমাদের অবশ্যই অনুসরণ করে চলতে হবে আমার সুন্নাত এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত সত্যপন্থী খলীফাদের সুন্নাত। তোমরা তা শক্ত করে ধরবে, দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে থাকবে(যেন কোন অবস্থায়ই তা হাতছাড়া হয়ে না যায়, তোমরা তা হতে বিচ্যূত ও বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়)।

[ব্যাখ্যাঃ উপরোক্ত হাদীসে নবী করীম(স) নিজের সুন্নাতের সঙ্গে সঙ্গে খুলাফায়ে রাশেদীন এর সুন্নাতকেও অনুসরণ করার তাগিদ দিয়েছেন। কেননা তারা পুরোপুরিভাবেই রাসূলের সুন্নাতকে অনুসরণ করেছেন, সে অনুযায়ীই তাঁরা কাজ করেছেন এবং কোনো ক্ষেত্রেই রাসূলের সুন্নাতের বিপরীত কোনো কাজ তাঁরা করেননি। তা হলে সে সুন্নাতকে ‘খুলাফায়ে রাশেদূন এর সুন্নাত’ বলা হলো কেন? বলা হয়েছে এজন্য যে, তাঁরা রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ীই আমল করেছেন, তাঁরা রাসূলের কথা ও কাজ থেকে তা-ই বুঝতে পেরেছেন এবং তা-ই তাঁরা গ্রহণ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকটি ব্যাপারে রাসূলের সুন্নাত অনুযায়ী আমল করার জন্য অতিশয় উদগ্রীব থাকতেন এবং তাঁর বিরুদ্ধতা হতে তাঁরা সবাই দূরে থাকতেন। কেবল বড় বড় ব্যাপারেই নয়, ছোট ছোট ব্যাপারেও তাঁরা তাই করতেন। কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত থেকে কোনো বিষয়ে কোনো দলীল পেলে তাঁরা তা-ই আঁকড়ে ধরেছেন, কিছুতেই তা ত্যাগ করতেননা। অবশ্য যে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো নির্দেশ পেতেননা, সেক্ষেত্রে তাঁরা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা, পর্যালোচনা ও পারস্পরিক পরামর্শ করে একটা মত ঠিক করতেন এবং তদনুযায়ী আমল করতেন। এখানে প্রশ্ন হতে পারে, খোলাফায়ে রাশেদূন যদি নিজেদের মতো কাজই করে থাকেন তাহলে ‘খুলাফায়ে রাশেদূন এর সুন্নাত’ বলার কি তাৎপর্য থাকতে পারে। এর জবাব হলো এই যে, এমন অনেক লোকই ছিল যারা রাসূলের সময় ছিলনা, খলীফাদের সময় ছিল কিংবা এ উভয় কালেই জীবিত ছিল; কিন্তু উত্তরকালে অনেক নতুন অবস্থার উদ্ভব হওয়ার কারণে খুলাফায়ে রাশেদূনকে এ ব্যাপারে একটা নীতি নির্ধারণ করতে হয়েছে। তা দেখে এ পর্যায়ে লোকদের মনে নানা সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। সে কারণে এ কথাটি বলে রাসূলে করীম(স) এ সন্দেহ দূর করার ব্যবস্থা করে দিলেন। বলে দিলেন, তাঁরা যে কাজ করবে তাতে আমারই সুন্নাত অনুসৃত হয়েছে বলে তোমরাও তা মেনে নেবে।]

সুন্নাতকে শক্ত করে ধারণ করার এবং অচল অটলভাবে তার অনুসরণ করার এবং তাগিদ অত্যন্ত তীব্র ও মজবুত। কেননা এ সুন্নাত হচ্ছে নবী করীম(স) এর বাস্তব কর্মনীতি। তার অনুসরণই হলো কার্যত ইসলাম পালন আর তা ত্যাগ করা হলে সুস্পষ্ট গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা। বলা হয়েছেঃ মূল সত্য বাদ দিলে গোমরাহী ছাড়া আর কি-ই বা অবশিষ্ট থাকে?

এজন্য রাসূলে করীম(স) এর ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপয্যপূর্ণ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসের শেষ বাক্যটি হলোঃ তোমরা যদি তোমাদের নবীর সুন্নাত পরিত্যাগ করো, তাহলে তোমরা নিঃসন্দেহে গোমরা হয়ে যাবে। তিনি অপর এক হাদীসে বলেছেনঃ যে লোক আমার সুন্নাত থেকে বিমুখ হয়ে যাবে-তা অনুসরণ করে চলবেনা, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়, নয় সে আমার পথের পথিক।

এক ব্যক্তি বসানো অবস্থায় উট জবাই করতে শুরু করেছিল। তখন আবদুল্লাই ইবনে উমর(রা) তাকে বলেনঃ উটটিকে বেঁধে দাঁড় করাও, তারপর নহর করো- এ-ই হচ্ছে হযরত আবুল কাসেম মুহাম্মদ(স) এর সুন্নাত।

মুসলিম সমাজে শরীয়ত মুতাবিক যে কর্মনীতি চালু রয়েছে, হাদীসে তাকেও সুন্নাত বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলে করীম(স) ইরশাদ করেছেনঃ যে লোক ঈদুল আযহার নামাজ পড়ে জন্তু জবাই করলো, সে তার কুরবানী পূর্ণ করে দিলো এবং মুসলমানদের রীতিনীতি ঠিক রাখল। ‘রাসূলের সুন্নাত’ মানে রাসূলের আদর্শ, রাসূলের কর্ম-বিধান। আর তা অনুসরণ না করার মানে হলো তার বিপরীত কর্মাদর্শ মেনে চলা। তাহলে যে লোক রাসূলে করীম(স) এর বিপরীত কর্মাদর্শ পালন ও অনুসরণ করে চলবে, সে কিছুতেই ইসলাম পালনকারী হতে পারেনা, হতে পারেনা সে মুসলিম। বস্তুত এ হাদীস হতে আরো বলিষ্ঠভাবে প্রমাণিত হলো যে, এ ‘সুন্নাত’ ফিকাহশাস্ত্রের পারিভাষিক নয়, নয় হাদীস শাস্ত্রবিদদের পারিভাষিক সুন্নাত। এসব হাদীসে ‘সুন্নাত’ বলে বোঝানো হয়েছে রাসূলে করীমের উপস্থাপিত ও বাস্তবে অনুসৃত জীবনাদর্শ। আর এ সুন্নাতই আমাদের আলোচ্য।