১
সুন্নাত ও বিদয়াত
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩
দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা
আমার লিখিত ‘সুন্নাত ও বিদয়াত’ গ্রন্থখানি ১৯৬৭ সনের সেপ্টেম্বর মাসে সর্ব প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। অতঃপর অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর সমস্ত কপি নিঃশেষ হয়ে যায়। গ্রন্থখানি যে বিদগ্ধ সমাজের নিকট সমাদৃত হয়েছে এবং চিন্তার জগতে তা যে বিশেষ আলোড়নের সৃষ্টি করেছে, তা তখনই স্পষ্ট বুঝতে পারা গিয়েছিল। বস্তুত আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে সিঞ্চিত ও পুঞ্জীভূত বিদয়াতের উপর এ গ্রন্থখানি এক প্রচন্ড আঘাত হেনেছিল এবং বিদয়াতের পূজীরী ও বিদয়াত আশ্রিত গোষ্ঠী এ আঘাতে হতচকিত ও ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছিল। চারদিকে ‘গেল গেল’ রব ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল। চলমান বিদয়াতের এটা ছিল আমার একটা চ্যালেঞ্জ।স্বভাবতই আমি আশা করেছিলাম, বিদয়াত পন্থীদের পক্ষ হতে এর প্রতিবাদ হয়তো আসবে।
কিন্তু কার্যত দেখা গেল, এ গ্রন্থের অকাট্য শাণিত ও অমোঘ আঘাতের জবাবে বিদয়াত পন্থীদের নিকট বলার মতো কোন কথা নেই। যদিও তারা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে ত্রুটি করেনি। অতঃপর সংশ্লিষ্ট মহলসমূহ নীরবতা অবলম্বন ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে পায়নি। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছি এ দেখে যে, আমি পর্বত সমান বিদয়াতের বিরুদ্ধে যে কথা বলেছি, কোন অকাট্য দলীল দ্বারা তা রদ করার সাধ্য কোন মহলেরই নেই। আমি মহান আল্লাহর শোকর আদায় করছি এ জন্য যে, এ কালের পুঞ্জীভূত বিদয়াতের বিরুদ্ধে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সুন্নাত আদায় করা এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও মুজাদ্দিদে আলফেসানী (র)-র আদর্শ অনুসরণের কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়েছে তা যত সামান্য ও যত ক্ষুদ্রই হোকনা কেন।
এই প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমি পীর-মুরীদী ব্যবস্থাকে ‘সুন্নাত’ বিরোধী ও বিদয়াত প্রমাণ করেছি, কিন্তু এদেশে আলিম ও পীরসাহেবান আবহমানকাল ধরে ইসলামের যে বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, এ দেশে এখনো যে দ্বীন ইসলামের নাম নিশানা রয়েছে তার পেছনে তাঁদের যে অপরিসীম অবদান রয়েছে, আমি তা অবশ্যই স্বীকার করেছি।
বিগত প্রায় দশটি বছর যাবত গ্রন্থটি পূর্ণমুদ্রণ সম্ভবপর হয়নি কোনো দুঃসাহসী প্রকাশক পাওয়া যায়নি বলে। বর্তমানে জনাব মোঃ আতাউর রহমান কর্তৃক তা নতুনভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এতে অনেক কয়টি নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে এবং প্রথম সংস্করণের অনেক কথা অধিকতর বলিষ্ঠ ও যুক্তিসহ পুনর্লিখিত হয়েছে। তত্ত্ব ও তথ্যের তুলনায় পূর্বের তুলনায় যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে এ সংস্করণটি।
তাই সহজেই আশা করতে পারি, প্রথম সংস্করণের তুলনায় এই সংস্করণ বিদগ্ধ পাঠক সমাজের নিকট অনেক বেশি সমাদৃত হবে। নতুন করে গ্রন্থখানি পাঠক সমাজের নিকট উপস্থাপিত করতে পারলাম দেখে মহান আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি।
মুহাম্মদ আবদুর রহীম
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
‘সুন্নাত’ ও ‘বিদয়াত’ দুটোই (আরবি) শব্দ। তা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজে এ দুটো শব্দ ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং ইসলামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এ শব্দ দুটো বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু যতদূর বোঝা যাচ্ছে, এ দুটো পরিভাষার সঠিক তাৎপর্য অনেকেই অনুধাবন করতে সক্ষম নয়। অথচ ইসলামী সংস্কৃতির যতোগুলো মৌলিক পরিভাষা রয়েছে, যে-সব পরিভাষার উপর ইসলামী জীবন-ব্যবস্থার সম্যক অনুধাবন নির্ভরশীল, এ দুটো শব্দ তার মধ্যেই গণ্য। অতএব এ দুটো শব্দের সঠিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ এবং এ দুটোর দৃষ্টিতে বর্তমান বিশ্ব-মুসলিম এর আকীদা, আমল ও আখলাক যাচাই ও পরখ করা একান্তই জরুরী, যদিও বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষ।
এ বিষয় আলোচনার প্রয়োজনীয়তা আরো অধিক তীব্র হয়ে দেখা দেয়, যখন আমরা দেখতে পাই যে, বর্তমান মুসলিম সমাজে কার্যত সুন্নাত ও বিদয়াতের মাঝে কোন পার্থক্য করা হয়না। শুধু তাই নয়, বহু রকমের সুন্নাত সমর্থিত ও সুন্নাতের দৃষ্টিতে অপরিহার্য-অবশ্য করণীয় কাজ আজ্ও মুসলিম সমাজেই সাধারণভাবে পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে এবং বহু প্রকারের বিদয়াত সুন্নাতের মতই গুরু্ত্ব লাভ করে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে এবং শাখা প্রশাখায়, পত্র ও ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে বসে আছে। এখন অবস্থা এই যে, বর্তমান মুসলিম সমাজের চেহারা দেখে, তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সামগ্রিক কার্যক্রম দেখে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বাস্তব ভূমিকা লক্ষ্য করে বুঝবার কোন উপায় নেই যে, কোনটি সুন্নাত আর কোনটি বিদয়াত।আজকের মুসলিম জীবনে সুন্নাতের দিকপ্লাবী নির্মল আলোকচ্ছটা ম্লান হয়ে এসেছে এবং তদস্থলে বিদয়াতের কালো আঁধার সর্বত্র ছেয়ে আছে, গ্রাস করে ফেলেছে সমগ্র মুসলিম জীবনকে। বিদয়াতের এ রাহুগ্রাস হতে মুক্তি পাওয়া না পর্যন্ত সুন্নাতের স্বচ্ছ আলোকধারায় মুসলিম জীবনকে উদ্ভাসিত করে তোলা কিছুতেই সম্ভবপর হবেনা, হতে পারেনা। ঠিক এ উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে-ই আমরা এ আলোচনায় প্রবৃত হয়েছি।
কিন্তু কার্যত দেখা গেল, এ গ্রন্থের অকাট্য শাণিত ও অমোঘ আঘাতের জবাবে বিদয়াত পন্থীদের নিকট বলার মতো কোন কথা নেই। যদিও তারা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে ত্রুটি করেনি। অতঃপর সংশ্লিষ্ট মহলসমূহ নীরবতা অবলম্বন ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে পায়নি। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছি এ দেখে যে, আমি পর্বত সমান বিদয়াতের বিরুদ্ধে যে কথা বলেছি, কোন অকাট্য দলীল দ্বারা তা রদ করার সাধ্য কোন মহলেরই নেই। আমি মহান আল্লাহর শোকর আদায় করছি এ জন্য যে, এ কালের পুঞ্জীভূত বিদয়াতের বিরুদ্ধে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সুন্নাত আদায় করা এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও মুজাদ্দিদে আলফেসানী (র)-র আদর্শ অনুসরণের কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়েছে তা যত সামান্য ও যত ক্ষুদ্রই হোকনা কেন।
এই প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমি পীর-মুরীদী ব্যবস্থাকে ‘সুন্নাত’ বিরোধী ও বিদয়াত প্রমাণ করেছি, কিন্তু এদেশে আলিম ও পীরসাহেবান আবহমানকাল ধরে ইসলামের যে বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, এ দেশে এখনো যে দ্বীন ইসলামের নাম নিশানা রয়েছে তার পেছনে তাঁদের যে অপরিসীম অবদান রয়েছে, আমি তা অবশ্যই স্বীকার করেছি।
বিগত প্রায় দশটি বছর যাবত গ্রন্থটি পূর্ণমুদ্রণ সম্ভবপর হয়নি কোনো দুঃসাহসী প্রকাশক পাওয়া যায়নি বলে। বর্তমানে জনাব মোঃ আতাউর রহমান কর্তৃক তা নতুনভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এতে অনেক কয়টি নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে এবং প্রথম সংস্করণের অনেক কথা অধিকতর বলিষ্ঠ ও যুক্তিসহ পুনর্লিখিত হয়েছে। তত্ত্ব ও তথ্যের তুলনায় পূর্বের তুলনায় যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে এ সংস্করণটি।
তাই সহজেই আশা করতে পারি, প্রথম সংস্করণের তুলনায় এই সংস্করণ বিদগ্ধ পাঠক সমাজের নিকট অনেক বেশি সমাদৃত হবে। নতুন করে গ্রন্থখানি পাঠক সমাজের নিকট উপস্থাপিত করতে পারলাম দেখে মহান আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি।
মুহাম্মদ আবদুর রহীম
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
‘সুন্নাত’ ও ‘বিদয়াত’ দুটোই (আরবি) শব্দ। তা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজে এ দুটো শব্দ ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং ইসলামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এ শব্দ দুটো বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু যতদূর বোঝা যাচ্ছে, এ দুটো পরিভাষার সঠিক তাৎপর্য অনেকেই অনুধাবন করতে সক্ষম নয়। অথচ ইসলামী সংস্কৃতির যতোগুলো মৌলিক পরিভাষা রয়েছে, যে-সব পরিভাষার উপর ইসলামী জীবন-ব্যবস্থার সম্যক অনুধাবন নির্ভরশীল, এ দুটো শব্দ তার মধ্যেই গণ্য। অতএব এ দুটো শব্দের সঠিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ এবং এ দুটোর দৃষ্টিতে বর্তমান বিশ্ব-মুসলিম এর আকীদা, আমল ও আখলাক যাচাই ও পরখ করা একান্তই জরুরী, যদিও বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা সাপেক্ষ।
এ বিষয় আলোচনার প্রয়োজনীয়তা আরো অধিক তীব্র হয়ে দেখা দেয়, যখন আমরা দেখতে পাই যে, বর্তমান মুসলিম সমাজে কার্যত সুন্নাত ও বিদয়াতের মাঝে কোন পার্থক্য করা হয়না। শুধু তাই নয়, বহু রকমের সুন্নাত সমর্থিত ও সুন্নাতের দৃষ্টিতে অপরিহার্য-অবশ্য করণীয় কাজ আজ্ও মুসলিম সমাজেই সাধারণভাবে পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে এবং বহু প্রকারের বিদয়াত সুন্নাতের মতই গুরু্ত্ব লাভ করে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে এবং শাখা প্রশাখায়, পত্র ও ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে বসে আছে। এখন অবস্থা এই যে, বর্তমান মুসলিম সমাজের চেহারা দেখে, তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সামগ্রিক কার্যক্রম দেখে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বাস্তব ভূমিকা লক্ষ্য করে বুঝবার কোন উপায় নেই যে, কোনটি সুন্নাত আর কোনটি বিদয়াত।আজকের মুসলিম জীবনে সুন্নাতের দিকপ্লাবী নির্মল আলোকচ্ছটা ম্লান হয়ে এসেছে এবং তদস্থলে বিদয়াতের কালো আঁধার সর্বত্র ছেয়ে আছে, গ্রাস করে ফেলেছে সমগ্র মুসলিম জীবনকে। বিদয়াতের এ রাহুগ্রাস হতে মুক্তি পাওয়া না পর্যন্ত সুন্নাতের স্বচ্ছ আলোকধারায় মুসলিম জীবনকে উদ্ভাসিত করে তোলা কিছুতেই সম্ভবপর হবেনা, হতে পারেনা। ঠিক এ উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে-ই আমরা এ আলোচনায় প্রবৃত হয়েছি।