১
সুন্নাত ও বিদয়াত
লেখকঃ মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (র.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩২
পীরবাদ বা বায়‘আত গ্রহণ রীতি
বর্তমান পীর মুরীদী ক্ষেত্রে মুরীদকে বায়’আত করা, মুরীদের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ এবং মুরীদের পক্ষে পীরের নিকট বায়’আত করা এক মৌলিক ব্যাপার। বস্তুত বায়’আত করা সুন্নাত মোতাবিক কাজ বটে; কিন্তু পীর-মুরীদীর বায়’আত সম্পূর্ণ বিদয়াত, যেমন বিদয়াত স্বয়ং পীর-মুরীদী।
‘বায়’আত’ (আরবি) শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো ক্রয় বা বিক্রয় করা। এ শব্দটি বললেই দুটি পক্ষের কথা মনে জাগে। একপক্ষ বায়’আত করে আর অপরপক্ষ বায়’আত কবুল করে। একজন বিক্রেতা, অপরজন ক্রেতা। এই ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারটি বড়ই সঙ্গীন। ইসলামে এর স্থান কোথায়, কি এর প্রকৃত ব্যাপার এবং সে ক্ষেত্রে সু্ন্নাত তরীকাই বা কি তা আমাদের বিস্তারিত জানতে হবে।
‘বায়’আত’, শব্দের ব্যাখ্যাদান প্রসঙ্গে ইমাম রাগেব ইসফাহানী লিখেছেনঃ
যখন কেউ কোনো সার্বভৌমত্বের আনুগত্য স্বীকার করে তাকে মেনে চলার স্বীকৃতি দেয়, তখন এ কাজকে বলা হয় ‘বায়’আত’ করা বা পারস্পরিক বায়’আত গ্রহণ। আর এ থেকেই বলা হয়ঃ সে সার্বভৌমের নিকট বায়’আত করেছে বা দুজন পারস্পরিক বায়’আত করেছে।
কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা রাসূল(সা) এর নিকট সাহাবাদের বায়’আত করার কথা উল্লেখ করেছেন নানা জায়গায়। প্রথমত যেসব লোক প্রথম ঈমান এনে ইসলাম কবুল করতো, তারা রাসূলের নিকট বায়’আত করতো, রাসূল তাদের নিকট বায়’আত কবুল করতেন। সূরা আল ফতহুর আয়াতে হুদায়বিয়ার গৃহীত ‘বায়’আতের’ উল্লেখ প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ۚ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَىٰ نَفْسِهِ ۖ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا [ ٤٨ : ١٠ ]
-হে নবী, যারা তোমার নিকট বায়’আত করে তারা আসলে বায়’আত করে আল্লাহরই নিকটে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর সংস্থাপিত। অতঃপর যেই এই এ বায়’আত ভঙ্গ করে, এ বায়’আত ভঙ্গের ক্ষতি তার নিজের ওপরই চাপবে। আর যে তা পুরো করবে, যা সে আল্লাহর সাথে ওয়াদা করছে, তাকে অবশ্যই বিরাট প্রতিফল দেয়া হবে।
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বায়’আত ইসলামী জীবনধারার এক মৌল ব্যাপার। কিন্তু সে বায়’আত রাসূলের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় স্বয়ং আল্লাহর সাথে এবং সে বায়’আত হলো খালিস ও পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর দাসত্ব কবুল করার বায়’আত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে চলার বায়’আত, আল্লাহর পথে তাঁর দ্বীন কায়েমের লক্ষ্যে আত্মদানের বায়’আত, জিহাদে শরীক হওয়ার বায়’আত।
এ হলো সাধারণ পর্যায়ে বায়’আত। এ পর্যায়ের আর এক বায়’আতের কথা উল্লেখ হয়েছে, যা রাসূলে করীম(স) গ্রহণ করতেন মুমিন মহিলাদের নিকট থেকে।
সূরা মুমতাহিনায় বলা হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ ۙ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [ ٦٠ : ١٢ ]
–হে নবী, মুমিন মহিলারা যদি তোমার নিকট এসে বায়’আত করে এসব কথার ওপর যে, তারা আল্লাহর সাথে একবিন্দু শিরক করবেনা, তারা চুরি করবেনা, তারা যিনা-ব্যভিচার করবেনা, তারা তাদের সন্তান হত্যা করবেনা, তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যামিথ্যি কোনো অমূলক কাজের দোষ কারো ওপর আরোপ করবেনা, আর তারা ভালো পরিচিত কাজে তোমার নাফরমানী করবেনা, তাহলে তুমি তাদের নিকট থেকে এ বায়’আত গ্রহণ করো, আর আল্লাহর নিকট তাদের জন্যে মাগফিরাতের দো’আ করো, আল্লাহ নিশ্চিতই বড় ক্ষমাশীল এবং অতীব করুণাময়। (মুমতাহিনাঃ১২)
এ আয়াত স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে, নবী করীম(স) কি কি বিষয়ে মুসলিম মেয়েদের নিকট থেকে বায়’আত গ্রহণ করেছেন। বিষয়গুলো যে ইসলামী ঈমান ও আমলের একেবারে মৌলিক,- কবীরা গুনাহ না করার প্রতিশ্রুতিতেই যে বায়’আত গ্রহণ করা হয়েছে-তা স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। কাজেই সু্ন্নাত অনুযায়ী ‘বায়’আত’ হলো শুধু তাই, যা এসব বিষয়ে এবং এ ধরনের মৌলিক বিষয়েই করা হবে বা গ্রহণ করা হবে। এক কথায়, ইসলামের হুকুম আহকাম পুরোপুরি পালন করার এবং শরীয়তের বরখেলাপ কোনো কাজ না করার ওয়াদা দিয়ে ও নিয়ে-ই যে বায়’আত করা বা গ্রহণ করা হয় তা-ই হলো সুন্নাত মোতাবিক বায়’আত। এরূপ বায়’আত গ্রহণই সুন্নাত হতে পারে অন্য কোনোরূপ বায়’আত নয়।
দ্বিতীয়, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুসারে নবী করীম(স) মুসলমানদের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ করেছেন। এ পর্যায়েরই বায়’আত হলো বায়’আতে রেজওয়ান। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا [ ٤٨ : ١٨ ]
–যেসব মু’মিন লোক গাছের তলায় বসে হে নবী! তোমার নিকট বায়’আত করেছিল, আল্লাহ তাদের প্রতি রাজি ও খুশি হয়েছেন। তাদের মনের আবেগ ও দরদের ভাবধারা তিনি ভালোভাবেই জেনেছিলেন এবং তাদের প্রতি পরম গভীর শান্তি নাযিল করেছিলেন এবং নিকটতর বিজয় দানেও তাদের ভূষিত করেছিলেন।(আল ফাতহঃ১৮)
হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, এরূপ বায়’আত করার জন্য নবী করীম(স) সমস্ত সাহাবীদের আহবান করেছিলেন। এই বায়’আত সম্পর্কে তখনকার লোকেরা বলতোঃ নবী করীম (স) তো লোকদের নিকট হতে মৃত্যু কবুল করার বায়’আত গ্রহণ করেছিলেন।
আর হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বলেনঃ
নবী করীম(স) ঠিক মৃত্যু কবুলের জন্য বায়’আত গ্রহণ করেননি। বরং আমরা বায়’আত গ্রহণ করেছি এর ওপর যে, আমরা কেউ-ই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাবনা। ফলে লোকেরা বায়’আত করেছিল এবং উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে কেবল বনী সালমা গোত্র সরদার জা্দ্দ ইবনে কায়স ছাড়া কেউই পালিয়ে যায়নি।(তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খন্ড)।
‘বায়’আতে রেজওয়ান’ যে কঠিন মুহুর্তে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কি গুরুতর ব্যাপার নিয়ে তা গ্রহণ করা হয়েছিল, এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট জানা গেল। অনুরূপভাবে জিহাদের ক্ষেত্রেও নবী করীম(স) বায়’আত গ্রহণ করতেন।
হযরত আনাস ইবনে মালিক(রা) বলেনঃ আনসার লোকেরা বলতো-আমরা খন্দকের দিন নবীর নিকট জিহাদের জন্য বায়’আত করেছি, যদ্দিন আমরা বেঁচে থাকব তদ্দিনের জন্য।
অন্য হাদীস থেকে এ প্রমাণও পাওয়া যায় যে, নবী করীম(স) সাধারণভাবে আনুগত্যের বায়’আতও গ্রহণ করতেন এবং লোকেরা তা করতো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রা) বলেনঃ (আরবি)
-আমরা রাসূলে করীম (স) এর নিকট শোনা ও মেনে চলার(আনুগত্য করার জন্য) বায়’আত করতাম। রাসূল(স) সে বায়’আত গ্রহণ করতেন। তবে এ বায়’আতে নবী করীম(স) আমাদেরকে ‘যতদূর আমাদের ক্ষমতা কুলায়’ বলে একটি শর্ত আরোপ করেছেন।
রাসূল (স) এর জামানায় এই ছিল তাৎপর্য্ ও ব্যবহার। পরবর্তীকালে সাহাবীদের যুগেও এই বায়’আত ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তা হয়েছে শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে খলীফার আনুগত্য করার শপথ বা প্রতিশ্রুতি দেয়ার জন্য। যেমন নবী করীম(স) এর ইন্তিকালের পর খলীফা নির্বাচনী সভায় হযরত উমর ফারূক(রা) সর্বপ্রথম বায়’আত করলেন হযরত আবু বকর(রা) এর হাতে।
এ সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবি)
-হযরত উমর আবু বকরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ না, আমরা তো আপনার হাতে বায়’আত করবো, আপনিই আমাদের সরদার, আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি এবং নবী করীমের নিকট আমাদের অপেক্ষা সর্বাধিক প্রিয় লোক। অতঃপর উমর ফারূক (রা) তাঁর হাত ধরলেন এবং বায়’আত করলেন, আর সেই সঙ্গে উপস্থিত সব লোকই বায়’আত করলো।
এ ঘটনা থেকে একথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, বায়’আত করা এবং বায়’আত গ্রহণ করা মুসলিম সমাজে একটি সুন্নাত হিসেবেই চালু রয়েছে। নবী করীম (স) এর পরেও কিন্তু সে বায়’আত ছিল হয় জিহাদে যোগদান করার জন্য, না হয় রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রকাশের জন্য।
কিন্তু পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে- চিশতীয়া, নকশবন্দীয়া মুজাদ্দিদীয়া ও মুহাম্মদীয়া তরীকায় ফকীর-হাকীরের হাতে বায়’আত নেয়ার বর্তমানে প্রচলিত এই সিলসিলা এল কোথ্থেকে, এ বায়’আতের সাথে নবী করীম(স) ও সাহাবাদের বায়’আতের সম্পর্ক কি?-মিল কোথায়? আসলে এ হচ্ছে একটি ভালো কাজকে খারাপ উদ্দেশ্যে ও খারাপ ক্ষেত্রে ব্যবহার করার মতো ব্যাপার। কাজটা ভালো, কিন্তু তা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এ কারণেই পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে হাতে হাতে কিংবা পাগড়ী ধরে অথবা পাগড়ী ধরা লোকের গায়ে গা মিলিয়ে বায়’আত করা, বায়’আত করা নানা তরীকায় মুরাকাবা করার জন্য-সম্পূর্ণ বিদয়াত। আরো বড় বিদয়াত হলো কুরআন বাদ দিয়ে মুরীদ ও পীরের ‘দালায়েলুল খয়রাত’ নামে এক বানানো দুরুদ সম্বলিত কিতাবের তিলাওয়াতে মশগুল হওয়া। মনে হয় এর তিলাওয়াত যেন একেবারে ফরয। কিন্তু শরীয়তে কুরআন ছাড়া আর কিছু তিলাওয়াত করা বড় সওয়াবের কাজ মনে করা, কুরআন অপেক্ষা অন্য কোনো মানবীয় কিতাবকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা সুস্পষ্টরূপে এক বড় বিদয়াত।
শুধু তা-ই নয়, বায়’আত শব্দের আভিধানিক অর্থ বিক্রয় করা। যে লোকই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ পড়েছে ও বিশ্বাস করেছে, সে তো নিজেকে আল্লাহর নিকট বিক্রয় করেই দিয়েছে, সে নতুন করে নিজেকে কোনো পীরের নিকট বিক্রয় করতে পারে কোন অধিকারে?
আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
–নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের নিকট হতে তাদের জান ও মালকে ক্রয় করে নিয়েছেন এ শর্তে যে, তিনি এর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করবেন।(আত তাওবাঃ১১১)
(এ আয়াত অনুযায়ী ক্রেতা হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ, বিক্রেতা হচ্ছে মুমিন ব্যক্তি। বিক্রয়ের জিনিসগুলো হলো মুমিন ব্যক্তির নিজ সত্তা এবং তার মূল্য হচ্ছে জান্নাত দানের ওয়াদা। এ ক্রয়-বিক্রয় যথারীতি সম্পন্ন হয়ে গেছে, যখনই একজন লোক সচেতন মনে পড়ছেঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।)
কাজেই আল্লাহর নিকট জান মাল বিক্রয় করার পর তা যদি কোনো পীরের হাতে পুনরায় বিক্রয় (বায়’আত) করে তবে তা হবে অনধিকার চর্চা, সুস্পষ্ট শিরক।
(উপরন্তু আল্লাহ ও রাসূলের নিকট বায়’আত করার উদ্দেশ্য যে দ্বীনের জন্য জিহাদ করা, তা আয়াতের পরবর্তী শব্দগুলোতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। অথচ পীরদের নিকট বায়’আত করার উদ্দেশ্য হলো চোখ বন্ধ করে মুরাকাবা মুশাহিদা করা, যিকির করা, কল্পনার জগতে উড়ে বেড়ানো। এ ধরনের বায়’আতের মধ্যে আসমান জমীনের পার্থক্য।)
কিন্তু তা সত্ত্বেও সায়্যিদ আহমদ শহীদ কোনো পীর-মুরীদী করেছিলেন তা বলিষ্ঠভাবে প্রমাণিত নয়। বরং তাঁর প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থে এই কথাগুলো বলিষ্ঠভাবে উদ্ধৃত পাওয়া যায়।
তিনি যখন দিল্লীতে অবস্থানকারী শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভীর সুযোগ্য পুত্র এবং কুরআন-হাদীস ও সমসাময়িক যুগের সকল সূক্ষ্ম জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভীর নিকট মৌখিকভাবে কুরআন হাদীসের শিক্ষা লাভ করে বেরেলী ফিরে আসলেন, তখন তিনি নিজের বাসগৃহে বসবাস না করে মসজিদে অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং কুরআন হাদীসের ভিত্তিতে জনগণকে ওয়াজনসীহত করতে শুরু করলেন। তখন বিপুল সংখ্যক জনতা তাঁর হাতে বায়’আত করে তাঁর মুরীদ হওযার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করলো এবং তাঁকে সেজন্য বাধ্য করতে চেষ্টা করতে লাগলো। তিনি মুরীদ বানাতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করলেন এবং বললেন-মুসলমানদের পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূরের মুরীদ হওয়াই যথেষ্ট। মিথ্যা বলবেনা, ধোঁকা দিবেনা, নিজের স্বার্থের খাতিরে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেনা-এটাই তোমাদের প্রতি নসীহত। তোমরা যদিও কারো মুরীদ হলে এবং তারপরেও এসব কাজ করতে থাকলে, তাহলে সে মুরীদী তোমাকে কোনো ফায়দা দিবেনা। আর যদি নেক নিয়্যতে এসব নেক আমল পাবন্দীর সাথে করলে তাহলে তোমাকে কারো নিকট মুরীদ হবার প্রয়োজন হবেনা। তখন তোমরা নিজেরাই নিজেদের পীর হবে এবং স্বীয় বিদ্রোহী নফসকে তোমাদের মুরীদ বানিয়ে দিবে। তোমরা তোমাদের নফসের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ করো, যেন তা কোনোদিনই শয়তানী ওয়াসওয়াসার অনুসরণকারী না হয়। পরকালের নাজাত পাওয়ার এটাই হচ্ছে যথেষ্ট পন্থা।
বস্তুত নবী করীম(স) এর বায়’আত গ্রহণের অন্তর্নিহিত মৌল ভাবধারার সাথে সায়্যিদ আহমদ শহীদের উপরোক্ত কথাগুলোর যে মিল রয়েছে তা সহজেই বুঝতে পারা যায় । তিনি স্বভাবতই পীর মুরীদী পছন্দ করতেননা। লোকেরা তাঁর সম্মুখে মাথা নত করে বসে থাকবে ও তাঁর তাজীম করবে, তাঁর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জাহির করবে তা তিনি খুবই অপছন্দ করতেন। তাই এসব কিছু প্রত্যাখ্যান করে তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরী গ্রহণ করে বহু দূরে চলে যান। উত্তরকালে তিনি জিহাদের জন্য যে বায়’আত গ্রহণ করতেন তা অনস্বীকার্য্।
‘বায়’আত’ (আরবি) শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো ক্রয় বা বিক্রয় করা। এ শব্দটি বললেই দুটি পক্ষের কথা মনে জাগে। একপক্ষ বায়’আত করে আর অপরপক্ষ বায়’আত কবুল করে। একজন বিক্রেতা, অপরজন ক্রেতা। এই ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারটি বড়ই সঙ্গীন। ইসলামে এর স্থান কোথায়, কি এর প্রকৃত ব্যাপার এবং সে ক্ষেত্রে সু্ন্নাত তরীকাই বা কি তা আমাদের বিস্তারিত জানতে হবে।
‘বায়’আত’, শব্দের ব্যাখ্যাদান প্রসঙ্গে ইমাম রাগেব ইসফাহানী লিখেছেনঃ
যখন কেউ কোনো সার্বভৌমত্বের আনুগত্য স্বীকার করে তাকে মেনে চলার স্বীকৃতি দেয়, তখন এ কাজকে বলা হয় ‘বায়’আত’ করা বা পারস্পরিক বায়’আত গ্রহণ। আর এ থেকেই বলা হয়ঃ সে সার্বভৌমের নিকট বায়’আত করেছে বা দুজন পারস্পরিক বায়’আত করেছে।
কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা রাসূল(সা) এর নিকট সাহাবাদের বায়’আত করার কথা উল্লেখ করেছেন নানা জায়গায়। প্রথমত যেসব লোক প্রথম ঈমান এনে ইসলাম কবুল করতো, তারা রাসূলের নিকট বায়’আত করতো, রাসূল তাদের নিকট বায়’আত কবুল করতেন। সূরা আল ফতহুর আয়াতে হুদায়বিয়ার গৃহীত ‘বায়’আতের’ উল্লেখ প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ۚ فَمَن نَّكَثَ فَإِنَّمَا يَنكُثُ عَلَىٰ نَفْسِهِ ۖ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا [ ٤٨ : ١٠ ]
-হে নবী, যারা তোমার নিকট বায়’আত করে তারা আসলে বায়’আত করে আল্লাহরই নিকটে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর সংস্থাপিত। অতঃপর যেই এই এ বায়’আত ভঙ্গ করে, এ বায়’আত ভঙ্গের ক্ষতি তার নিজের ওপরই চাপবে। আর যে তা পুরো করবে, যা সে আল্লাহর সাথে ওয়াদা করছে, তাকে অবশ্যই বিরাট প্রতিফল দেয়া হবে।
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বায়’আত ইসলামী জীবনধারার এক মৌল ব্যাপার। কিন্তু সে বায়’আত রাসূলের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় স্বয়ং আল্লাহর সাথে এবং সে বায়’আত হলো খালিস ও পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর দাসত্ব কবুল করার বায়’আত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে চলার বায়’আত, আল্লাহর পথে তাঁর দ্বীন কায়েমের লক্ষ্যে আত্মদানের বায়’আত, জিহাদে শরীক হওয়ার বায়’আত।
এ হলো সাধারণ পর্যায়ে বায়’আত। এ পর্যায়ের আর এক বায়’আতের কথা উল্লেখ হয়েছে, যা রাসূলে করীম(স) গ্রহণ করতেন মুমিন মহিলাদের নিকট থেকে।
সূরা মুমতাহিনায় বলা হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَىٰ أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ ۙ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [ ٦٠ : ١٢ ]
–হে নবী, মুমিন মহিলারা যদি তোমার নিকট এসে বায়’আত করে এসব কথার ওপর যে, তারা আল্লাহর সাথে একবিন্দু শিরক করবেনা, তারা চুরি করবেনা, তারা যিনা-ব্যভিচার করবেনা, তারা তাদের সন্তান হত্যা করবেনা, তারা প্রকাশ্যভাবে মিথ্যামিথ্যি কোনো অমূলক কাজের দোষ কারো ওপর আরোপ করবেনা, আর তারা ভালো পরিচিত কাজে তোমার নাফরমানী করবেনা, তাহলে তুমি তাদের নিকট থেকে এ বায়’আত গ্রহণ করো, আর আল্লাহর নিকট তাদের জন্যে মাগফিরাতের দো’আ করো, আল্লাহ নিশ্চিতই বড় ক্ষমাশীল এবং অতীব করুণাময়। (মুমতাহিনাঃ১২)
এ আয়াত স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে, নবী করীম(স) কি কি বিষয়ে মুসলিম মেয়েদের নিকট থেকে বায়’আত গ্রহণ করেছেন। বিষয়গুলো যে ইসলামী ঈমান ও আমলের একেবারে মৌলিক,- কবীরা গুনাহ না করার প্রতিশ্রুতিতেই যে বায়’আত গ্রহণ করা হয়েছে-তা স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। কাজেই সু্ন্নাত অনুযায়ী ‘বায়’আত’ হলো শুধু তাই, যা এসব বিষয়ে এবং এ ধরনের মৌলিক বিষয়েই করা হবে বা গ্রহণ করা হবে। এক কথায়, ইসলামের হুকুম আহকাম পুরোপুরি পালন করার এবং শরীয়তের বরখেলাপ কোনো কাজ না করার ওয়াদা দিয়ে ও নিয়ে-ই যে বায়’আত করা বা গ্রহণ করা হয় তা-ই হলো সুন্নাত মোতাবিক বায়’আত। এরূপ বায়’আত গ্রহণই সুন্নাত হতে পারে অন্য কোনোরূপ বায়’আত নয়।
দ্বিতীয়, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুসারে নবী করীম(স) মুসলমানদের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ করেছেন। এ পর্যায়েরই বায়’আত হলো বায়’আতে রেজওয়ান। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا [ ٤٨ : ١٨ ]
–যেসব মু’মিন লোক গাছের তলায় বসে হে নবী! তোমার নিকট বায়’আত করেছিল, আল্লাহ তাদের প্রতি রাজি ও খুশি হয়েছেন। তাদের মনের আবেগ ও দরদের ভাবধারা তিনি ভালোভাবেই জেনেছিলেন এবং তাদের প্রতি পরম গভীর শান্তি নাযিল করেছিলেন এবং নিকটতর বিজয় দানেও তাদের ভূষিত করেছিলেন।(আল ফাতহঃ১৮)
হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, এরূপ বায়’আত করার জন্য নবী করীম(স) সমস্ত সাহাবীদের আহবান করেছিলেন। এই বায়’আত সম্পর্কে তখনকার লোকেরা বলতোঃ নবী করীম (স) তো লোকদের নিকট হতে মৃত্যু কবুল করার বায়’আত গ্রহণ করেছিলেন।
আর হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বলেনঃ
নবী করীম(স) ঠিক মৃত্যু কবুলের জন্য বায়’আত গ্রহণ করেননি। বরং আমরা বায়’আত গ্রহণ করেছি এর ওপর যে, আমরা কেউ-ই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাবনা। ফলে লোকেরা বায়’আত করেছিল এবং উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে কেবল বনী সালমা গোত্র সরদার জা্দ্দ ইবনে কায়স ছাড়া কেউই পালিয়ে যায়নি।(তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খন্ড)।
‘বায়’আতে রেজওয়ান’ যে কঠিন মুহুর্তে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কি গুরুতর ব্যাপার নিয়ে তা গ্রহণ করা হয়েছিল, এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট জানা গেল। অনুরূপভাবে জিহাদের ক্ষেত্রেও নবী করীম(স) বায়’আত গ্রহণ করতেন।
হযরত আনাস ইবনে মালিক(রা) বলেনঃ আনসার লোকেরা বলতো-আমরা খন্দকের দিন নবীর নিকট জিহাদের জন্য বায়’আত করেছি, যদ্দিন আমরা বেঁচে থাকব তদ্দিনের জন্য।
অন্য হাদীস থেকে এ প্রমাণও পাওয়া যায় যে, নবী করীম(স) সাধারণভাবে আনুগত্যের বায়’আতও গ্রহণ করতেন এবং লোকেরা তা করতো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রা) বলেনঃ (আরবি)
-আমরা রাসূলে করীম (স) এর নিকট শোনা ও মেনে চলার(আনুগত্য করার জন্য) বায়’আত করতাম। রাসূল(স) সে বায়’আত গ্রহণ করতেন। তবে এ বায়’আতে নবী করীম(স) আমাদেরকে ‘যতদূর আমাদের ক্ষমতা কুলায়’ বলে একটি শর্ত আরোপ করেছেন।
রাসূল (স) এর জামানায় এই ছিল তাৎপর্য্ ও ব্যবহার। পরবর্তীকালে সাহাবীদের যুগেও এই বায়’আত ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তা হয়েছে শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে খলীফার আনুগত্য করার শপথ বা প্রতিশ্রুতি দেয়ার জন্য। যেমন নবী করীম(স) এর ইন্তিকালের পর খলীফা নির্বাচনী সভায় হযরত উমর ফারূক(রা) সর্বপ্রথম বায়’আত করলেন হযরত আবু বকর(রা) এর হাতে।
এ সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছেঃ (আরবি)
-হযরত উমর আবু বকরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ না, আমরা তো আপনার হাতে বায়’আত করবো, আপনিই আমাদের সরদার, আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি এবং নবী করীমের নিকট আমাদের অপেক্ষা সর্বাধিক প্রিয় লোক। অতঃপর উমর ফারূক (রা) তাঁর হাত ধরলেন এবং বায়’আত করলেন, আর সেই সঙ্গে উপস্থিত সব লোকই বায়’আত করলো।
এ ঘটনা থেকে একথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, বায়’আত করা এবং বায়’আত গ্রহণ করা মুসলিম সমাজে একটি সুন্নাত হিসেবেই চালু রয়েছে। নবী করীম (স) এর পরেও কিন্তু সে বায়’আত ছিল হয় জিহাদে যোগদান করার জন্য, না হয় রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রকাশের জন্য।
কিন্তু পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে- চিশতীয়া, নকশবন্দীয়া মুজাদ্দিদীয়া ও মুহাম্মদীয়া তরীকায় ফকীর-হাকীরের হাতে বায়’আত নেয়ার বর্তমানে প্রচলিত এই সিলসিলা এল কোথ্থেকে, এ বায়’আতের সাথে নবী করীম(স) ও সাহাবাদের বায়’আতের সম্পর্ক কি?-মিল কোথায়? আসলে এ হচ্ছে একটি ভালো কাজকে খারাপ উদ্দেশ্যে ও খারাপ ক্ষেত্রে ব্যবহার করার মতো ব্যাপার। কাজটা ভালো, কিন্তু তা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এ কারণেই পীর মুরীদীর ক্ষেত্রে হাতে হাতে কিংবা পাগড়ী ধরে অথবা পাগড়ী ধরা লোকের গায়ে গা মিলিয়ে বায়’আত করা, বায়’আত করা নানা তরীকায় মুরাকাবা করার জন্য-সম্পূর্ণ বিদয়াত। আরো বড় বিদয়াত হলো কুরআন বাদ দিয়ে মুরীদ ও পীরের ‘দালায়েলুল খয়রাত’ নামে এক বানানো দুরুদ সম্বলিত কিতাবের তিলাওয়াতে মশগুল হওয়া। মনে হয় এর তিলাওয়াত যেন একেবারে ফরয। কিন্তু শরীয়তে কুরআন ছাড়া আর কিছু তিলাওয়াত করা বড় সওয়াবের কাজ মনে করা, কুরআন অপেক্ষা অন্য কোনো মানবীয় কিতাবকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা সুস্পষ্টরূপে এক বড় বিদয়াত।
শুধু তা-ই নয়, বায়’আত শব্দের আভিধানিক অর্থ বিক্রয় করা। যে লোকই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ পড়েছে ও বিশ্বাস করেছে, সে তো নিজেকে আল্লাহর নিকট বিক্রয় করেই দিয়েছে, সে নতুন করে নিজেকে কোনো পীরের নিকট বিক্রয় করতে পারে কোন অধিকারে?
আল্লাহ ঘোষণা করেছেনঃ
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
–নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের নিকট হতে তাদের জান ও মালকে ক্রয় করে নিয়েছেন এ শর্তে যে, তিনি এর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করবেন।(আত তাওবাঃ১১১)
(এ আয়াত অনুযায়ী ক্রেতা হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ, বিক্রেতা হচ্ছে মুমিন ব্যক্তি। বিক্রয়ের জিনিসগুলো হলো মুমিন ব্যক্তির নিজ সত্তা এবং তার মূল্য হচ্ছে জান্নাত দানের ওয়াদা। এ ক্রয়-বিক্রয় যথারীতি সম্পন্ন হয়ে গেছে, যখনই একজন লোক সচেতন মনে পড়ছেঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।)
কাজেই আল্লাহর নিকট জান মাল বিক্রয় করার পর তা যদি কোনো পীরের হাতে পুনরায় বিক্রয় (বায়’আত) করে তবে তা হবে অনধিকার চর্চা, সুস্পষ্ট শিরক।
(উপরন্তু আল্লাহ ও রাসূলের নিকট বায়’আত করার উদ্দেশ্য যে দ্বীনের জন্য জিহাদ করা, তা আয়াতের পরবর্তী শব্দগুলোতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। অথচ পীরদের নিকট বায়’আত করার উদ্দেশ্য হলো চোখ বন্ধ করে মুরাকাবা মুশাহিদা করা, যিকির করা, কল্পনার জগতে উড়ে বেড়ানো। এ ধরনের বায়’আতের মধ্যে আসমান জমীনের পার্থক্য।)
কিন্তু তা সত্ত্বেও সায়্যিদ আহমদ শহীদ কোনো পীর-মুরীদী করেছিলেন তা বলিষ্ঠভাবে প্রমাণিত নয়। বরং তাঁর প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থে এই কথাগুলো বলিষ্ঠভাবে উদ্ধৃত পাওয়া যায়।
তিনি যখন দিল্লীতে অবস্থানকারী শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভীর সুযোগ্য পুত্র এবং কুরআন-হাদীস ও সমসাময়িক যুগের সকল সূক্ষ্ম জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভীর নিকট মৌখিকভাবে কুরআন হাদীসের শিক্ষা লাভ করে বেরেলী ফিরে আসলেন, তখন তিনি নিজের বাসগৃহে বসবাস না করে মসজিদে অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং কুরআন হাদীসের ভিত্তিতে জনগণকে ওয়াজনসীহত করতে শুরু করলেন। তখন বিপুল সংখ্যক জনতা তাঁর হাতে বায়’আত করে তাঁর মুরীদ হওযার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করলো এবং তাঁকে সেজন্য বাধ্য করতে চেষ্টা করতে লাগলো। তিনি মুরীদ বানাতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করলেন এবং বললেন-মুসলমানদের পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূরের মুরীদ হওয়াই যথেষ্ট। মিথ্যা বলবেনা, ধোঁকা দিবেনা, নিজের স্বার্থের খাতিরে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেনা-এটাই তোমাদের প্রতি নসীহত। তোমরা যদিও কারো মুরীদ হলে এবং তারপরেও এসব কাজ করতে থাকলে, তাহলে সে মুরীদী তোমাকে কোনো ফায়দা দিবেনা। আর যদি নেক নিয়্যতে এসব নেক আমল পাবন্দীর সাথে করলে তাহলে তোমাকে কারো নিকট মুরীদ হবার প্রয়োজন হবেনা। তখন তোমরা নিজেরাই নিজেদের পীর হবে এবং স্বীয় বিদ্রোহী নফসকে তোমাদের মুরীদ বানিয়ে দিবে। তোমরা তোমাদের নফসের নিকট হতে বায়’আত গ্রহণ করো, যেন তা কোনোদিনই শয়তানী ওয়াসওয়াসার অনুসরণকারী না হয়। পরকালের নাজাত পাওয়ার এটাই হচ্ছে যথেষ্ট পন্থা।
বস্তুত নবী করীম(স) এর বায়’আত গ্রহণের অন্তর্নিহিত মৌল ভাবধারার সাথে সায়্যিদ আহমদ শহীদের উপরোক্ত কথাগুলোর যে মিল রয়েছে তা সহজেই বুঝতে পারা যায় । তিনি স্বভাবতই পীর মুরীদী পছন্দ করতেননা। লোকেরা তাঁর সম্মুখে মাথা নত করে বসে থাকবে ও তাঁর তাজীম করবে, তাঁর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জাহির করবে তা তিনি খুবই অপছন্দ করতেন। তাই এসব কিছু প্রত্যাখ্যান করে তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরী গ্রহণ করে বহু দূরে চলে যান। উত্তরকালে তিনি জিহাদের জন্য যে বায়’আত গ্রহণ করতেন তা অনস্বীকার্য্।