১- আমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের দায়ী ও ধর্মানুসারীরা আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তার ধর্মের জন্য কতখানি ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার একটি চিত্র হল এ হাদীস। এটা ইসলামপূর্ব যুগের কয়েকজন খৃষ্টানের ঘটনা। আমাদের সকলেরই জানা যে, ইসলাম আগমনের পূর্বে খৃষ্ট ধর্ম বাতিল ধর্ম ছিল না।
২- আল-কুরআনের সূরা আল-বুরুজে উল্লেখিত আসহাবুল উখদূদের আলোচনার ব্যাখ্যা হল এ হাদীস।
৩- রোগ থেকে আরোগ্য ও সুস্থতা দান করেন আল্লাহ রাববুল আলামীন। তিনি ছাড়া এ ক্ষমতা অন্য কারো নেই। ডাক্তার, ঔষধ ইত্যাদি বাহ্যিক উপকরণ মাত্র।
৪- আল্লাহর অলীদের কারামত একটি সত্য বিষয়।
৫- অন্তরে দৃঢ় ঈমান থাকার পর কারো অত্যাচার উৎপীড়নের ভয়ে, জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে ঈমান গোপন করা অথবা ঈমান - ইসলাম গ্রহণের কথা অস্বীকার করার অনুমতি আছে। যেমন আল্লাহ রাববুল আলামীন ইরশাদ করেনঃ
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ . (
النحل : 106)
‘‘কেহ ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরীর জন্য হৃদয় উম্মুক্ত রাখলে তার উপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরীর জন্য বাধ্য করা হয়েছে কিন্তু তার হৃদয় ঈমানে অবিচল।’’ (সূরা আন- নাহল : ১০৬)
কিন্তু হাদীসে বর্ণিত এ তিন ব্যক্তি তাদের জীবন রক্ষার জন্য ঈমানের কথা অস্বীকার করতে পারতেন, কিন্তু কেন করলেন না?
বাধ্য হয়ে ঈমানের কথা অস্বীকার করার দুটো অবস্থা হতে পারে। এক. যদি ঈমানের কথা অস্বীকার করা হয় তাহলে এর প্রভাব শুধু নিজের উপর বর্তায়। অন্যের উপর বা সমাজে এর প্রভাব পড়ে না। ঈমানের বিষয়টি গোপন রাখার কারণে অন্য লোকেরা ধর্ম থেকে ফিরে যায় না।
দুই. যদি ঈমানের কথা অস্বীকার করা হয়, তা হলে সমাজে এর প্রভাব পড়ে। অন্য লোকেরা বলবে, অমুক মহান ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করেছে আমরা করলে দোষের কী?
প্রথম অবস্থায় ঈমান বা ইসলামের কথা গোপন করা বৈধ। কিন্তু দ্বিতীয় অবস্থায় ঈমান বা ইসলামের কথা গোপন করা উচিত নয়। কারণ এতে অন্যের ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা - না থাকার প্রশ্ন জড়িত। বর্ণিত হাদীসে দেখা যায়, যদি ধর্ম যাজক বা বালকটি ঈমানের কথা অস্বীকার করত, তাহলে অনেক মানুষ -যারা গোপনে আল্লাহ ও তাঁর মনোনীত ধর্মের প্রতি ঈমান এনেছিল তারা - ঈমান ত্যাগ করত। যেমন আমরা বালকটির আত্নত্যাগের কারণে দেখতে পেলাম, উপস্থিত লোকেরা তাদের ঈমানের ঘোষণা দিয়েছে।
কাজেই ঈমান ও ইসলামের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী বা অনুসরনীয় ব্যক্তিবর্গ কোন প্রতিকুল অবস্থায় নিজেদের ঈমান ও ইসলামের কথা গোপন করতে পারেন না বা ইসলামকে অস্বীকার করা হয় এমন কোন কথা বলতে পারেন না।
আল্লাহ তাআলার লাখো-কোটি প্রশংসা যে, তিনি পূর্ববর্তী উম্মতের মত এ উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যেও হাজার হাজার নিবেদিত প্রাণ আলেম-উলামা, ইমাম-ফকীহ, মুজাদ্দিদ-দায়ী সৃষ্টি করেছেন। যারা ইসলামের সামান্য বিষয়েও নিজেরদের জীবন বাজি রেখেছেন। তাগুতকে কোন রকম ছাড়ই দেননি। ফাঁসীর মঞ্চে উঠে কিংবা নিশ্চিত
মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও বুক উচু করে আল্লাহর দীনের কথা বলে গেছেন। আল্লাহ রাববুল আলামীন তাদের আত্ন-ত্যাগ কবুল করুন। ইসলাম ও তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে তাদের তিনি উত্তম প্রতিদানে ভুষিত করুন।
৬- আল্লাহর দীনের জন্য এ বালকের আত্নত্যাগের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে অনেকে ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুদের বিরুদ্ধে আত্নঘাতী আক্রমনকে সমর্থন করেন। আজকে বিভিন্ন মুসলিম দেশে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে আত্নঘাতী হামলা লক্ষ করা যায়। আসলে এ হাদীসটিকে প্রমাণ হিসাবে নিয়ে বর্তমানের আত্নঘাতী হামলাগুলো সমর্থন করার অবকাশ নেই। কারণ, এ বালকটি আত্নত্যাগের কারণে অনেকগুলো মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। আর বালকটি নিজেকে নিজে হত্যা করেনি। অন্যের আঘাতে সে নিহত হয়েছে। যদি ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণের জন্য আত্নঘাতী হামলা করা হয়ে থাকে তাহলে অন্য কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় আত্নঘাতী হামলাগুলো ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনে। এর দ্বারা ইসলামের শত্রুরা আরো বেশী বর্বরতা, পাশবিকতা নিয়ে মুসলমানদের উপর হামলা করে। কাজেই বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় শত্রুদের বিরুদ্ধে আত্নঘাতী হামলা করা সঠিক নয়। এ হাদীস এবং ইসলামের প্রথম যুগেও
সাহাবায়ে কেরাম ও ইসলামের সৈনিকদের আত্নত্যাগের বিরল দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু কোথাও তারা নিজেদের অস্ত্র দিয়ে নিজেদের হত্যা করেননি। আর বর্তমানের আত্নঘাতী হামলায় নিরাপরাধ লোকজন হতাহত বেশী হয়ে থাকে। কোন অবস্থাতেই নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করা বা তা সমথর্ন করা ইসলাম অনুমোদন করে না। কোন কোন ইসলামী ব্যক্তিত্ব বর্তমানের আত্নঘাতী হামলাগুলো অনুমোদিত বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন ঠিকই। কিন্তু অধিকাংশ আলেম-উলামা শরীয়ত বিশেষজ্ঞদের অভিমত হল আত্নঘাতী হামলা বৈধ হওয়ার জন্য কতগুলো শর্তের প্রয়োজন। শর্তগুলো হলঃ
এক. আত্নঘাতী হামলা দিয়ে ইসলাম মুসলমানদের উপকার হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। দুই. কোন নিরাপরাধ লোক হতাহত হতে পারবে না। তিন. কোন গোপন ব্যক্তি বা সংগঠনের নির্দেশে আত্নঘাতী হামলা চালানো যাবে না। শুধুমাত্র দেশ ও জাতির বৈধ সরকার বা সরকারের অবর্তমানে সরকারের বিকল্প প্রতিষ্ঠান আত্নঘাতী হামলার নির্দেশ দেয়ার অধিকার রাখে। চার. আত্নঘাতী হামলা ছাড়া যখন লক্ষ্য অর্জনের কোন বিকল্প না থাকে, তখন হামলার বৈধতার প্রশ্ন আসবে। যখন বিভিন্নভাবে শত্রুর সাথে লড়াই করার পথ খোলা থাকে তখন আত্নঘাতী হামলার কোন যৌক্তিকতা থাকে না। এ চারটি শর্তের সবগুলো যখন উপস্থিত থাকবে তখনই দুশমনের বিরুদ্ধে আত্নঘাতী আক্রমন বৈধ বলে বিবেচিত হবে। এ সকল শর্তের প্রতিটির বিষয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের প্রমাণ রয়েছে।
৭- আলোচ্য বিষয়ের শিরোনাম হল
ধৈর্য ও সবর। এ হাদীসের প্রতিটি বাক্যে রয়েছে ধৈর্য-সবরের বিরল দৃষ্টান্ত। সর্বশেষে দেখা যায়, শিশুটি তার মাকে ধৈর্য ধারণ করে নিজের ঈমানের উপর অটল থেকে নিশ্চিত মৃত্যুকে বরণ করতে উপদেশ দিয়েছিল।
৮- ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, বালকটির নাম ছিল আব্দুল্লাহ বিন সামের।
৯- ইবনে আববাস বলেন, ‘বাদশা ছিল নাজরানের বাদশা।’ নাজরান হল বর্তমান সৌদী আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একটি প্রদেশ। এ ঘটনা সেখানে সংঘটিত হয়েছিল বলে অধিকাংশ তাফসীরবিদ মত প্রকাশ করেছেন।