hadith book logo

প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে চল্লিশ আসর

লেখকঃ আদেল বিন আলী আশ-শিদ্দী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৫

তেরতম আসর: বিবাহ

পঁচিশ বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চেয়ে প্রায় পনের বছরের বড় চল্লিশ বছর বয়সী খাদিজার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের ইতিবৃত্ত হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজার হয়ে তারই গোলাম মাইসারাকে নিয়ে সিরিয়ায় ব্যবসার উদ্দেশ্যে গমন করেন। পূর্ণ সফরে মাইসারা খুব কাছ থেকে তাঁর মহৎ গুণাবলি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ লাভ করে, ফলে তাঁর সততা, আমানতদারী, নিষ্ঠা, কর্ম তৎপরতা, বিচক্ষণতা ও চারিত্রিক মাধুর্য দেখে অভিভূত হয়ে যায়। সফর শেষে নিজ মালকীন খাদিজাকে সব খুলে বললে তিনি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং বান্ধবীর মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠান। তিনি নিজ গুরুজনদের সাথে পরামর্শের পর প্রস্তাব গ্রহণ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান।

খাদিজা রাদিয়াল্লহু আনহা হিজরতের তিন বছর পূর্বে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন সে সময় রাসূলুল্লাহর বয়স ছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর। এরই মাঝে তিনি নবীজীর সাথে পঁচিশ বছরের সাংসারিক জীবন অতিবাহিত করেন, তিনি জীবিত থাকাবস্থায় নবীজী আর কোন নারীকে বিবাহ করেননি।

তাঁর ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ বহু হিকমত ও নানাবিধ মহৎ উদ্দেশ্যে একাধিক নারীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। রাসূলুল্লাহর বৈবাহিক জীবনের এ প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণরূপে জানার পর একজন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ বলতে বাধ্য হবেন যে, বিভিন্ন প্রাচ্যবিদরা তাঁর সম্পর্কে যে অশালীন মন্তব্য করেছে -যেমন তিনি একজন কামবাদী ও নারী লোভী মানুষ ছিলেন- তাদের এসকল কথা সর্বৈব মিথ্যা ও অসৎ উদ্দেশ্যে প্রচারিত। তাদের কথা সত্য কি করে হয়!? পঁচিশ বয়সের একজন পরিপূর্ণ যুবক তার থেকে পনের বছরের বড় একজন প্রৌঢ়া নারীকে বিবাহ করে দীর্ঘ পঁচিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন, তার মৃত্যু অবধি অন্য কাউকে বিবাহ করেননি।

পরে যখন যৌবন শেষ হল এবং কাম তাড়না বিদায় নিল তখন গিয়ে বিবাহ করলেন। তাহলে এ দীর্ঘ সময়ে তাঁর তাড়না ও চাহিদা কি নির্বাপিত ও নিস্তব্ধ ছিল(!) অতঃপর পঞ্চাশ বছর বয়সে হঠাৎ একসাথে সব জেগে উঠল(!)? কোন ন্যূনতম বিবেক সম্পন্ন মানুষ এসব কথা মুখেও আনতে পারে না।

মজার ব্যাপার হচ্ছে অনেক পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবী ও গবেষকরাও এসব অসার কথা পরিহাস ভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইটালীয় গবেষক ড. লূরা ফিশিয়া ফ্যাগলীরী বলেন:

মুহাম্মাদ দীর্ঘ যৌবনে - যখন জৈবিক চাহিদা ও কাম তাড়না বিদ্যমান থাকে শক্তিশালী আকারে, উপরন্তু তিনি বসবাস করতেন এমন একটি সমাজে (ইসলাম পূর্ব আরব্য সমাজ) যেখানে বিবাহ-শাদী, নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন সামাজিক কর্ম হিসাবে ছিল অনুপস্থিত বা প্রায় বিলুপ্ত, আর একাধিক স্ত্রী থাকা ছিল একটি সর্ব-স্বীকৃত নিয়ম। তালাক বিচ্ছেদ ছিল সবচে সহজ কাজ - এ সময় একজনমাত্র নারী ব্যতীত অন্য কাউকে বিবাহ করেননি। যাকে বিবাহ করেন তিনি ছিলেন যুবক মুহাম্মাদ থেকে বয়সে অনেক বড়-খাদিজা। দীর্ঘ পঁচিশটি বছর একমাত্র তার স্বামী হিসেবেই কাটিয়ে দিয়েছেন, এর মাঝে আর কাউকে বিবাহ করেননি। বিবাহ করেছেন খাদিজার ইন্তেকালের পর যখন বয়স পঞ্চাশ অতিক্রম করেছিল।

তিনি একাধিক বিবাহ করেছেন ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকটি বিবাহের পেছনেই সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণ ছিল।

যেমন, তিনি যাদেরকেই বিবাহ করেছেন তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন স্বতন্ত্রভাবে তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সকল নারীদের মধ্য হতে, বিবাহের জন্যে তাদের নির্বাচিত করার মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয় যে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাকওয়া সংশ্ল্লিষ্ট নারীদের সম্মানিত করা। অথবা বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, যাতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে নিত্য-নতুন পথ বের করা যায়।

এছাড়া কেবলমাত্র আয়েশা - রাদিয়াল্লহু আনহা - ব্যতীত যত নারী মুহাম্মাদ বিবাহ করেছেন কেউই কুমারী ছিলেন না এবং যুবতীও না। এইটি কি কামুকতা ছিল? এর নাম কি নারী লিপ্সা?

তিনি ছিলেন ( রক্ত মাংসে গড়া ) মানুষ। তিনি কোন ইলাহ ছিলেন না। ছেলে সন্তানের প্রতি আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। খাদিজার গর্ভে জন্ম-নেয়া তাঁর সকল ছেলে শিশু বয়সে মারা যায়। তাই ছেলে-সন্তানের প্রতি মোহই তাঁকে নতুন ভাবে বিবাহ করতে আগ্রহী করে থাকতে পারে।

এছাড়াও অনেক কারণ থাকতে পারে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহৎ একটি পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এতদ সত্ত্বেও তাঁদের মাঝে পূর্ণাঙ্গ সমতা বজায় রেখেছিলেন সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে। তাদের কারো প্রতিই তিনি চুল পরিমাণ পার্থক্য করেননি কখনো। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ববর্তী নবী যেমন মূসা ও অন্যান্যদের অনুসরণ করে বহু বিবাহ করেছেন। কিন্তু কেউই তাদের সম্পর্কে কোন মন্তব্য বা সমালোচনা করেনি, তাহলে আমরা তাদের দৈনন্দিন জীবনাচার সম্পর্কে অজ্ঞ আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের পারিবারিক জীবন সম্পর্কে অবহিত বলেই কি এত সমালোচনা?

তাঁর সহধর্মিণীবৃন্দ

খাদিজা রাদিয়াল্লহু আনহার ইন্তেকালের পর তিনি আরো দশজন মহীয়সী নারীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। সর্ব প্রথম সাওদা বিনতে যামআহ রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিবাহ করেন, এর পর আয়েশা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লহু আনহাকে, তিনি ব্যতীত আর কোন কুমারী নারী রাসূলুল্লাহর জীবনে আসেনি। অতঃপর হাফসা বিনতে উমর বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লহু আনহাকে, এরপর যয়নব বিনতে খুযাইমা বিন হারেছকে, এরপর উম্মে সালামা হিন্দ বিনতে উমাইয়াকে, অতঃপর যয়নব বিনতে জাহশ, জুওয়াইরিয়া বিনতে হারেছ এবং উম্মে হাবীবাকে, খায়বর বিজয়ের পর পর বিয়ে করেন সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াইয়কে, সর্বশেষ মায়মূনা বিনতে হারেছকে আর তিনিই হচ্ছেন বিবাহের দিক থেকে রাসূলুল্লাহর সর্বশেষ সহধর্মিণী।