hadith book logo

প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে চল্লিশ আসর

লেখকঃ আদেল বিন আলী আশ-শিদ্দী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৯

সাইত্রিশতম আসর: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওয়াদা রক্ষা

ইসলাম ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার ধর্ম, সন্ধি-চুক্তি, প্রতিজ্ঞা ও সংকল্পের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ধর্ম।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ ﴿المائدة :﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূরণ কর।

অন্যত্র বলেন :

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا ﴿الإسراء ৩৪﴾

আর তোমরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা কর, নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।

আল্লাহ তাআলা অন্যত্র প্রশংসা করে বলেন :

الَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَلَا يَنْقُضُونَ الْمِيثَاقَ ﴿الرعد ২০﴾

যারা আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষা করে এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

مَنْ كَانَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ قَوْمٍ عَهْدٌ؛ فَلَا يَحُلَّنَّ عُقْدَةً وَلَا يَشُدَّهَا حَتَّى يَمْضِيَ أَمَدُهُ، أَوْ يَنْبِذَ إلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ " [ رواه أبو داود والترمذي [

কোনো সম্প্রদায়ের সাথে যাদের সন্ধি থাকে, সে ঐ সন্ধি ভঙ্গ করবে না এবং তাতে কড়াকড়িও করবে না, যতক্ষণ না তার সময় শেষ হয় কিংবা চুক্তি ভঙ্গের ঘোষণা দেয়া হয়।

মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদার মুসাইলামাতুল কায্‌যাবের দুজন দূত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কথা শেষে বললেন, যদি দূত হত্যা করা নিষিদ্ধ না হতো, আমি তোমাদেরকে অবশ্যই হত্যা করতাম। তখন থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ চালু হল, দূতদেরকে হত্যা করা যাবে না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাফিরদের সাথে ওয়াদা রক্ষার আরো একটি উদাহরণ হুদাইবিয়ার সন্ধিতে পরিদৃষ্ট হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরাইশদের প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমরের সাথে চুক্তিনামা সম্পাদন করছেন, যার মধ্যে একটি ধারা ছিল, কুরাইশদের কেউ এ চুক্তিকালীন সময়ে নবী মুহাম্মদের নিকট আসলে নবীজী তাকে ফেরত দিয়ে দেবেন যদিও সে মুসলমান হয়, বাকি ধারাগুলো লেখার কাজ এখনও চলছে, আবু জান্দাল ইবনে আমর বিন সুহাইল শৃঙ্খলিত পা ও হাতকড়ি পরিহিত অবস্থায় এসে উপস্থিত হল। সে মক্কার নিম্ন অঞ্চল দিয়ে এসে, মুসলমানদের কাছে নিজেকে হাজির করল।

সুহাইল বলল : মুহাম্মদ, এই যে আবু জান্দাল, সর্বপ্রথম তার ব্যাপারে চুক্তি রক্ষা করার দাবি জানাচ্ছি আমি। তাকে আমার কাছে ফেরত দাও।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমরাতো এখনও চুক্তি সম্পাদন শেষ করিনি।

সে বলল: তবে আমি তোমার সাথে আর কোনো ব্যাপারেই চুক্তি করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: শুধু তাকে আমার জন্য ছাড় দাও।

সে বলল: আমি তোমার জন্যও তাকে ছাড় দেব না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: অবশ্যই তুমি তার ব্যাপারটি ছাড় দাও।

সে বলল: আমি ছাড় দিতে পারব না।

এ দিকে আবু জান্দাল খুব উচ্চ স্বরে চিৎকার করছিল, হে মুসলমান ভাইয়েরা! আমি কি মুশরিকদের নিকট প্রত্যর্পিত হব আর তারা আমাকে আমার দীনের ব্যাপারে কষ্ট দেবে? অথচ আমি মুসলমান হয়ে তোমাদের কাছে এসেছি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন : আবু জান্দাল! ধৈর্য ধারণ কর। উত্তম প্রতিদানের আশা রাখ। অবশ্যই আল্লাহ তোমার জন্য এবং তোমার সাথে থাকা সকল দুর্বল মুসলমানদের জন্য স্বস্তি ও মুক্তির পথ বের করে দেবেন। আমরা তাদের সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে গেছি। তারা আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমরাও তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এখন আমরা তাদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করতে পারি না।

তদ্রুপ কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ সাকীফ গোত্রের জনৈক আবু বশীর রা. পলায়ন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চলে আসেন। কুরাইশরা তার খোঁজে দুজন লোক পাঠায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়ার সন্ধি মোতাবেক তাকে ফেরত দিয়েদেন। এসব ঘটনাপঞ্জিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধি ও অঙ্গীকারের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাশীলতার বিষয়টি প্রকৃষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, যদিও সেসব অঙ্গীকার ও সন্ধিতে মুসলমানরা বাহ্যিকভাবে অন্যায়ের শিকার হয়েছে।

আরেকটি উদাহরণ :

বারা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ওমরা করার ইচ্ছা করলেন, মক্কায় প্রবেশ করার অনুমতি চেয়ে দূত পাঠালেন। তারা শর্ত করল : তিন দিনের বেশি থাকা যাবে না। তলোয়ার কোষবদ্ধ করা ব্যতীত প্রবেশ করা যাবে না। তাদের কাউকে দাওয়াত দেয়া যাবে না।

তিনি বলেন, আলী ইবনে আবী তালিব শর্তগুলো লিখছিলেন। তিনি লিখলেন, এটি সেই চুক্তি মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ যার ফয়সালা দিয়েছেন। তারা সাথে সাথে বলে উঠল: আমরা যদি তোমাকে আল্লাহর রাসূল মনেই করতাম, তবে তো মক্কায় প্রবেশ করতে নিষেধ করতাম না, এবং অবশই সকলে তোমার অনুসরণ করতাম। বরং এভাবে লিখ : এটা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহর ফয়সালা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আমি যেমন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ, তদ্রুপ আল্লাহর রাসূলও। অত:পর আলী রা. কে বললেন : রাসূলুল্লাহ শব্দটি মুছে ফেল। আলী রা. বললেন : না, আমি মুছতে পারব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আমাকে দেখিয়ে দাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখিয়ে দিলে তিনি স্বহস্তে তা মুছে দিলেন। মক্কায় প্রবেশ করার পর যখন তিন দিন হয়ে গেল, তারা আলীর নিকট এসে বলল, তোমাদের সঙ্গীকে চলে যেতে বল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের এ কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বললেন : ঠিক আছে। অতঃপর রওয়ানা হলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াদা মুতাবেক তিন দিনের বেশি অবস্থান করেননি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াদা খেলাপি ও বিশ্বাসঘাতকতা হতে সতর্ক করে বলেন। যে ব্যক্তি কাউকে নিরাপত্তা দিয়ে হত্যা করবে, আমি সে হত্যাকারী হতে মুক্ত, যদিও নিহত ব্যক্তি কাফির হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন : যে সম্প্রদায় চুক্তি ভঙ্গ করবে, তাদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ব্যাপকতা লাভ করবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াদা রক্ষার পরিপন্থী বিষয় খিয়ানত হতে পানাহ চেয়েছেন। তিনি বলেন : আমি তোমার নিকট খিয়ানত হতে পানাহ চাচ্ছি। কারণ, এটা খুবই নিকৃষ্ট স্বভাব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বাস ঘাতকতা ও খিয়ানতকে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। বলেন : কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাস ঘাতকের ওয়াদা খেলাপির জন্য ঝান্ডা থাকবে, যার মাধ্যমে তাকে চেনা যাবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ব্যাপারে বলেছেন : আমি ওয়াদা ভঙ্গ করি না।