hadith book logo

প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে চল্লিশ আসর

লেখকঃ আদেল বিন আলী আশ-শিদ্দী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৮

ষোলতম আসর : রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুওয়তপ্রাপ্তি এবং স্ব গোত্রকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়ত প্রাপ্ত হন। এটা মানুষের জ্ঞানে-অভিজ্ঞতায় পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়স। রমযান মাসের সতের তারিখ সোমবার দিন তিনি যখন হেরা গুহায় তখন ফেরেশতা তার নিকট অবতীর্ণ হন। (যখন ওহী নাযিল হত তার কাছে খুব কঠিন লাগত। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যেত, ঘর্দমাক্ত হয়ে যেত কপাল।)

যখন ফেরেশতা এসে বললেন, আপনি পড়ুন, তিনি বললেন, আমি পড়তে পারি না। ফেরেশতা তাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন - তাতে তার খুব কষ্ট হল-। ফেরেশতা আবার বললেন, পড়ুন, তিনি বললেন, আমি পড়তে পারি না। এভাবে তিনবার হল। অতঃপর ফেরেশতা বললেন,

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ . خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ . اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ . الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ . عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ﴿العلق ১-৫﴾

পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে। পড় আর তোমার রব মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন- তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। ( সূরা আলাক: ১-৫)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁপতে কাঁপতে খাদিজার নিকট ফিরে এলেন। যা দেখলেন তাকে জানালেন। খাদিজা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন : এটা আপনার জন্য শুভ সংবাদ। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি আপনাকে অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখেন। সত্য কথা বলেন। বিধবাদের অন্নের ব্যবস্থা করেন। অসহায়দের রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করেন। মেহমানদারী করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য করেন।

অতঃপর খাদিজা রাসূলকে নিয়ে চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফেল এর নিকট গেলেন - তিনি ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। হিব্রু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং তা লিখতে পারতেন। ইঞ্জিলের বিশেষ কিছু অংশ তিনি আরবীতে অনুবাদ করেছিলেন। তখন তিনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন- খাদিজা তাকে বললেন : ভাই, আপনার এ ভাইয়ের ছেলের ঘটনাটি শোনেন। ওরাকা তাকে বললেন, ভাতিজা! কি দেখছ তুমি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘটনাটি বিস্তারিত বললেন। ওরাকা শুনে বললেন : এ তো সে নামুস যা আল্লাহ তাআলা নবী মুসা আ. এর প্রতি অবতীর্ণ করেছিলেন। আফসোস! আমি যদি সে সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতাম, যখন আপনার জাতি আপনাকে দেশ হতে বের করে দেবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা কি আমাকে দেশ হতে বের করে দেবে? তিনি বললেন : হ্যা, আপনার মতো দায়িত্ব নিয়ে যে কেউই এসেছে, তার সাথে শত্রুতা করা হয়েছে। যদি আপনার সেদিনটি আমার জীবদ্দশায় আসে, আমি আপনাকে সাহায্য করব। এরপর ওরাকা আর বেশি দিন বাঁচেননি।

এরপর বেশ কিছু দিন ওহী বন্ধ ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক দিন অপেক্ষা করেছেন, কোন কিছুই দেখতে পাননি। এ জন্য রাসূল খুব চিন্তিত হলেন। অধীর আগ্রহে ওহীর প্রতীক্ষায় রইলেন।

এরপর একদিন আসমান-জমিনের মাঝখানে একটি চেয়ারের উপর ফেরেশতা দৃশ্যমান হলেন। তাকে সান্ত্বনা দিলেন ও শুভ সংবাদ শোনালেন - আপনি সত্যিকারার্থেই আল্লাহর রাসূল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে ভয় পেলেন। খাদিজার কাছে আবার গেলেন এবং বললেন, আমাকে কম্বলাবৃত কর, আমাকে কম্বলাবৃত কর। এ সময় আল্লাহ তার উপর নাযিল করলেন :

يَاأَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ . قُمْ فَأَنْذِرْ . وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ . وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ﴿المدثر ১-৪﴾

হে কম্বল আচ্ছাদিত! ওঠ, সতর্ক কর। এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর। তোমার কাপড় পবিত্র কর।

এ আয়াতগুলোর ভেতর আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বীয় জাতিকে সতর্ককরণ, আল্লাহর প্রতি আহ্বান এবং তাঁর বড়ত্ব ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। স্বয়ং রাসূলকেও সকলপ্রকার অবাধ্যতা ও পাপাচার হতে নিজকে পবিত্র করার নির্দেশ দিয়েছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার জন্য কোমর বেঁধে লেগে গেলেন - পূর্ণ ইয়াকীনের সাথে জেনে নিলেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর আনুগত্য পূর্ণভাবে আদায়ে সচেষ্ট হলেন। ছোট-বড়, আযাদ-গোলাম, পুরুষ-মহিলা, সাদা-কালো সকলকেই তিনি আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানাতে লাগলেন। আল্লাহর তাওফীকে প্রত্যেক গোত্র হতেই কতক লোক -যাদের ভাগ্যে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতের কামিয়াবী রেখেছিলেন- রাসূলের ডাকে সাড়া দিলেন। ইসলামের আলোয় আলোকিত হলেন। মক্কার কতিপয় জাহেল লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদেরকে কেন্দ্র করে কষ্ট-নির্যাতন আরম্ভ করল। চাচা আবু তালেবের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে হেফাযত করলেন। তিনি ছিলেন ভদ্র, অনুকরণীয় ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তার বর্তমানে রাসূলের ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে সাহস পেত না। কারণ, তারা জানত মুহাম্মদ তার নিকট খুবই প্রিয়। আবার সে তাদের ধর্মের একজনও বটে। এ জন্যই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেনিম তার সাথে প্রকাশ্যে শত্রুতাও পোষণ করেনি।

ইবনে জাওযি রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন বছর যাবত গোপনে গোপনে দাওয়াত কার্য পরিচালনা করেন। অতঃপর আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী নাযিল হল :

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ ﴿الحجر ৯৪﴾

যে ব্যাপারে তোমাকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে তা দৃঢ়তার সাথে পালন কর,এবং মুশরিকদেরকে এড়িয়ে চল।

এর পর যখন আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী নাযিল হল :

وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ ﴿الشعراء ২১৪﴾

তোমার নিকটজনদের ভীতি প্রদর্শন কর।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করেন। অতঃপর উচ্চস্বরে ইয়া সাবাহাহ! বলে আওয়াজ দিলেন। তারা সকলে বলাবলি করল : কে ডাকছে? তাদের পক্ষ হতেই উত্তর আসল : মুহাম্মদ! সকলে তার নিকট গিয়ে উপস্থিত হল। তিনি বললেন, হে অমুকের বংশধরগণ, হে আবদে মানাফের বংশধরগণ, হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরগণ, অতঃপর সকলেই তাঁর নিকট জমায়েত হল। তিনি বললেন, আমি যদি তোমাদের বলি, এ পাহাড়ের পাদদেশে শত্রু পক্ষের একটি বড় ঘোড়ার বহর অপেক্ষা করছে, তবে কি তোমরা আমাকে সত্য বলে জানবে? তারা সমস্বরে বলল : আমরা কখনো তোমাকে মিথ্যা বলতে শুনিনি। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে এক কঠিন শাস্তি হতে সতর্ক করছি। এ কথা শোনা মাত্রই চাচা আবু লাহাব বলে উঠল : ধ্বংস হোক তোমার! এজন্যই কি তুমি আমাদের জমায়েত করেছ? এ বলে সে উঠে গেল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন :

تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ ﴿১﴾ مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ ﴿২﴾ سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ﴿৩﴾ وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ ﴿৪﴾ فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ ﴿৫﴾

ধ্বংস হয়ে গেছে আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হয়ে গেছে সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন উপকারে আসেনি। অচিরেই সে লেলিহান শিখাময় জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে, এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন কারী, তার গলদেশে শক্ত পাকানো রশি রয়েছে।