hadith book logo

প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে চল্লিশ আসর

লেখকঃ আদেল বিন আলী আশ-শিদ্দী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২১

উনিশতম আসর: রাসূলের মহব্বত

রাসূলের মহব্বত ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে মুসলমান তার মাধ্যমে হেদায়েতের আলো ও ঈমানের সন্ধান পেয়েছে, কুফর থেকে বের হয়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে, সে মুসলমান কিভাবে তাকে মহব্বত না করে পারে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন বলে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার সন্তান, পিতা-মাতা এবং সকল মানুষে হতে অধিক প্রিয় হব।

বরং রাসূলের মহব্বত তো নিজ সত্তার মহব্বতকেও অতিক্রম করে যেতে হবে। একদিন ওমর রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন , ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি আমার নিকট, আমি ব্যতীত, সব থেকে বেশি প্রিয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, ওমর, আমার প্রাণের মালিক আল্লাহর শপথ, আমার প্রতি তোমার মহব্বত তোমার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি হতে হবে। ওমর বললেন : হ্যাঁ, এখন আপনি আমার নিকট আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখন হয়েছে, ওমর। অর্থাৎ এখন তুমি বুঝতে পেরেছ, অতঃপর যা ওয়াজিব তাই উচ্চারণ করেছ।

সকলেই রাসূলের মহব্বতের দাবি করে। বেদআতি, প্রবৃত্তি পূজারি, কবর পূজারি, জাদুকর, ভেলকিবাজ ও জ্যোতিষীরা পর্যন্ত রাসূলের মহব্বতের দাবি করে। গুনাহ্‌গার ও ফাসেক ব্যক্তিরাও রাসূলের মহব্বতের দাবিদার। তবে, শুধু দাবিতেই সব কিছু হয় না, প্রমাণ দিতে হয়। রাসূলের মহব্বতের প্রমাণ হল. তার নির্দেশিত পথে চলা, নিষিদ্ধ বিষয় পরিহার করা। এবং শুধু তার দেখানো পদ্ধতি ও নিয়ম অনুসারে আল্লাহর ইবাদত করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের সকলেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কেবল অস্বীকারকারী ব্যতীত, লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, অস্বীকারকারী কে? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করল। আর যে অবাধ্য হল, সে অস্বীকার করল।

ঈদে মিলাদুন্নবী, তাজিয়া, মর্সিয়া, তাঁর প্রশংসায় কবিতা রচনা ও এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করলেই রাসূলের মহব্বত প্রকাশ পায় না। বরং তার মহব্বত প্রকাশ পায় সুন্নতের উপর আমল, তার আনীত শরীয়তের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, তার আদর্শ জীবিতকরণ, তার উপর ও তার সুন্নতের উপর উত্থাপিত অপবাদ প্রতিহত করণ, তাঁর দেয়া সংবাদকে সত্য জ্ঞানকরণ, তাঁর ব্যাপারে কথা বলার সময় অন্তরে শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা, তাঁর নাম শোনার সাথে সাথে দরূদ পড়া, তাঁর শরীয়তে নতুন কোন বিষয়ের প্রবেশ প্রত্যাখ্যান করা অর্থাৎ যাবতীয় বেদআত প্রত্যাখ্যান করা, তাঁর সাহাবীদের মহব্বত করা ও তাদের পক্ষ নেয়া, তাদের ফযীলত সম্পর্কে অবগত হওয়া, তার সুন্নতের বিরুদ্ধাচরণকারী, তার শরীয়তের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী এবং যারা তাঁর দীনকে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন, তাদের অবমাননাকারীকে ঘৃণা করা। এসব কিছুই রাসূলের মহব্বতের অন্তর্ভুক্ত। যে এর বিরোধিতা করবে বিরোধিতা অনুপাতে দীন থেকে দূরে সরে যাবে।

উদাহরণত : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আমার এ দীনে ভিন্ন কিছুর আবিষ্কার করবে, তা পরিত্যক্ত বলে গণ্য হবে।

তিনি আরো বলেছেন, সাবধান! তোমরা দীনে নতুন আবিষ্কৃত বিষয় হতে দূরে থাক। কারণ, প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বস্তুই বেদআত।

বেদআতের ব্যাপারে এতো কঠোর বাণী সত্ত্বেও অনেকেই আছে, যারা আল্লাহর দীনে নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করে- যা ধর্ম বলে স্বীকৃত নয়- বরং এসবকে তারা খুব ভাল ও উপকারী মনে করে এবং রাসূলের মহব্বতের বস্তু হিসেবে জ্ঞান করে। অনেক সময় রাসূলের উপর মিথ্যা হাদীস তৈরি করে রাসূলের নামের সাথে যুক্ত করে দেয়। আর বলে, আমরা রাসূলের স্বার্থে মিথ্যা বলেছি, তাঁর বিরুদ্ধে নয়। এটা তাদের সব চেয়ে বড় গোমরাহী, বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতা। কারণ, আল্লাহর দীন পরিপূর্ণ, তাদের মনগড়া মিথ্যাচারের মুখাপেক্ষী নয়।

রাসূলের মহব্বতের আরো একটি আলামত হল: তার সাহাবাদের গালমন্দ না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালমন্দ কর না। তোমাদের কেউ উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ সদকা করলেও, তাদের খরচকৃত এক অঞ্জলি কিংবা তার অর্ধেকেরও সমান হবে না।

তা সত্ত্বেও এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হয়েছে, যারা রাসূলের সাহাবাদের গালমন্দ করে। আবু বকর, ওমরকে অভিসম্পাত করে। পবিত্র কুরআনে আয়েশা রা. কে সতী-সাধ্বী ও নিষ্কলুষ ঘোষণা করার পরও তারা অপবাদ দেয়। আর এসব ক্ষেত্রেও তাদের হাস্যকর দাবি, আমরা রাসূলের মহব্বত এবং আহলে বাইতের মহব্বতের কারণেই এমনটি করি।

রাসূলের মহব্বতের আরেকটি আলামত : তাঁর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার প্রশংসায় সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না, যেমন খ্রিস্টান সম্প্রদায় মারিয়াম পুত্র ঈসার ব্যাপারে করেছে। আমি আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে তাঁর রাসূল এবং বান্দাই বল।

এতদসত্ত্বেও এমন অনেক লোকের আগমন ঘটেছে, যারা ইহুদি খ্রিস্টানদের অনুসরণ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন এমন গুণে গুণান্বিত করে, যা কেবল আল্লাহর সাথেই সামঞ্জস্যশীল।

উদাহরণস্বরূপ: রাসূলের নিকট রিযিক চায়, তাঁর নিকট অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা কামনা করে, আপদ-বিপদ ও ধ্বংস হতে মুক্তি চায়, আরো এমন কিছু প্রার্থনা করে, যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট প্রার্থনা করা যায় না। এরপরও তাদের ধারণা এগুলো রাসূলের মহব্বতের প্রমাণ। বাস্তবতা হচ্ছে, এগুলো মূর্খতা, শিরক ও রাসূলের বিরোধিতার আলামত।