hadith book logo

প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে চল্লিশ আসর

লেখকঃ আদেল বিন আলী আশ-শিদ্দী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৬

চৌত্রিশতম আসর: ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থান

আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এসে সেখানকার ইহুদীদের সাথে একটি শান্তিচুক্তি করে করেছিলেন। যে, কেউ কারো উপর আক্রমণ করবে না, জুলুম করবে না। কিন্তু তারা অতি দ্রুতই সে চুক্তি ভঙ্গ করল। এবং তাদের পূর্ব খ্যাতি অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে দিল।

বনী কায়নুকার ইহুদীদের একটি ষড়যন্ত্রের উদাহরণ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের নিয়ে বদর যুদ্ধে ব্যস্ত। এ সুযোগে তাদের এক লম্পট জনৈকা মুসলিম নারীকে উত্ত্যক্ত করল। বাজারে মানুষের সামনে তার কাপড় খুলে ফেলল। মহিলা চিৎকার করে উঠলেন। একজন মুসলমান তার সাহায্যে ছুটে এসে ইহুদীকে হত্যা করলেন। এরপর সকল ইহুদী মিলে তাকেও হত্যা করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর থেকে ফিরে এসে তাদের ডাকলেন এবং সংঘটিত ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। প্রতি উত্তরে তারা খুব কড়া ভাষা ব্যবহার করল। বাড়াবাড়ির এক পর্যায়ে চুক্তি পত্রটি ফেরত পাঠাল এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ঘেরাও করলেন। যখন তারা দেখল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আরজি পেশ করে বলল: আমাদের ছেড়ে দিন। বিনিময়ে আমাদের সকল সম্পদ আপনাকে দিয়ে দেব। আর আমরা স্ত্রী সন্তানাদি নিয়ে এখান থেকে চলে যাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। তাদেরকে মদীনা হতে তাড়িয়ে দিলেন। মুসলমানরা তাদের দুর্গ হতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সম্পদ সংগ্রহ করল।

ইহুদী বনী নযীরও সম্পাদিত শান্তিচুক্তি ভঙ্গ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। হিজরতের চতুর্থ বছর একটি দিয়ত তথা রক্ত বিনিময় ব্যাপারে সাহায্যের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী নযীর গোত্রে গমন করেন। তিনি সেখানে গিয়ে একটি দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে বসলেন, আর এ সুযোগে তারা তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা করল। এভাবে যে, আমর বিন জাহ্‌হাশ একটি চাক্কি নিয়ে দেয়ালের উপর উঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ছেড়ে দেবে।

এ দিকে আকাশ হতে আল্লাহর দূত এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করে দিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রুত সরে পড়লেন এবং মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শাস্তি স্বরূপ খায়বারে নির্বাসনে পাঠান। ছয় শত উট বোঝাই করে তারা অর্থ-সম্পদ নিয়ে যায় এবং নিজেদের ঘর বাড়ি নিজ হাতে ধ্বংস করে খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

আর ইহুদী বনী কুরাইযা! পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে তারাও চুক্তি ভংগ করেছিল। খন্দকের যুদ্ধে মুশরিকদের সাথে যুক্ত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছিল। আল্লাহ মুশরিকদের অপমানিত করলেন, এবং তাদের ঐক্য ছিন্ন-ভিন্ন করে দিলেন। অবশেষে তারা ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফিরে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন হাজার সৈন্য নিয়ে বনী কুরাইযার বিরুদ্ধে অভিযানে বের হলেন এবং অবরুদ্ধ করে সংকীর্ণ করে দিলেন তাদের জীবন। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রস্তাব পাঠাল যে, আমরা সাদ বিন মুয়াযের ফায়সালায় সম্মত আছি। সাদ বিন মুয়ায রা. ফয়সালা করলেন : যুদ্ধের ক্ষমতা সম্পন্ন পুরুষদের হত্যা করা হবে, নারী ও বাচ্চাদের গ্রেফতার করা হবে এবং তাদের সম্পদ বণ্টন করে দেয়া হবে। সে হিসেবে পুরুষদের হত্যা করা হয়েছে। তবে কতিপয় লোককে এ রায়ের বাহিরে রাখা হয়েছে।

এ রায়টি মূলত: তারা নিজেরাই বেছে নিয়েছিল। কারণ, তারা প্রার্থনা করেছিল যেন সাদ বিন মুয়ায তাদের ব্যাপারে ফায়সালা করেন। তাদের ধারণা ছিল, আউসের সাথে সম্পর্কের কারণে হয়তো সাদ তাদের প্রতি কিছুটা দয়াশীল হবেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় : ইহুদীরা তাদের বন্দীদের সাথে এর চেয়েও নির্মম ব্যবহার করেছে। তাওরাতের এক জায়গায় আছে, বনী ইসরাঈল মাদায়েন সম্প্রদায়ের নারী ও বাচ্চাদের বন্দী করে, তাদের জীবজন্তু ও সম্পদ লুটে নেয়। তাদের ঘর বাড়ি ও দুর্গগুলো আগুন দ্বারা পুড়িয়ে দেয়। মূসা আ. রাগান্বিত হয়ে বলেন : তোমরা কি নারীদের জীবিত রেখেছো? এখন শিশুদের ভিতর যারা ছেলে তাদের নির্মূল করে ফেল। এবং যে সকল নারী সহবাস সম্পর্কে ধারণা রাখে তাদেরকে হত্যা কর, আর যারা এখনও সে সম্বন্ধে জানে না তাদেরকে জীবিত রাখ তোমাদের জন্যে। মাআজাল্লাহ, (আল্লাহর পানাহ!) আল্লাহর নবী মুসা আ. সহবাস নির্মূল বিষয়ক এ ধরনের প্রকৃতি-বিরোধী সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। কিন্তু তারা এভাবেই তাওরাতকে বিকৃত করেছে। এটা নিজ বন্দীদের ব্যাপারে তাদেরই সিদ্ধান্ত।