hadith book logo

প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে চল্লিশ আসর

লেখকঃ আদেল বিন আলী আশ-শিদ্দী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২২

বিশতম আসর: নুবওয়তের বড় বড় আলামত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়তের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে, আল কুরআনুল কারিম। এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা কেয়ামত পর্যন্ত সকল আরব, অনারবদের সাথে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে, কারো সাধ্য থাকলে এর মত দ্বিতীয় আরেকটি পেশ করে দেখাও।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ .

আমি আমার বান্দার উপর যে কিতাব নাযিল করেছি, তোমরা যদি এর ব্যাপারে সন্দিহান হও, তাহলে এর মতো একটি সূরা বানিয়ে পেশ করে দেখাও। এবং এর জন্য আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সকল সহযোগীদের একত্রিত করে চেষ্টা কর, যদি তোমরা নিজেদের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাকো।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন :

أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ .

তারা কি এরূপ বলে যে, এটা সে নিজে তৈরি করে নিয়েছে? তুমি বলে দাও, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা এনে দেখাও। এবং আল্লাহ ব্যতীত যাকে পার ডেকে নাও, যদি তোমরা স্বীয় দাবিতে সত্যবাদী হও।

ইবনে জাওযি রহ. বলেন, আল কুরআনুল করিম বহু কারণে অলৌকিক ও অসাধারণ। যেমন,

এক. সংক্ষিপ্ত অথবা বিস্তারিত বর্ণনা উভয় ক্ষেত্রেই ফাসাহাত-বালাগাতের (সাহিত্য ও অলংকরণ) সুন্দরতম ব্যঞ্জনা ও মনোজ্ঞতা। একই ঘটনা একবার বিস্তারিত, অন্যবার সংক্ষেপে বর্ণনার পরও উভয়ের ভাব ও উদ্দেশ্যে-অর্থ প্রকাশে কোনো ব্যত্যয় ঘটে না।

দুই. আল কুরআন পদ্যও নয়, গদ্যও নয়, বরং এতে অনুসৃত হয়েছে সম্পূর্ণ এক ভিন্নতর পদ্ধতি। আর এ দুটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই পুরো আরব জাতির সাথে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। তারা অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, অপারগতা প্রকাশ করেছে এবং কুরআনের অলৌকিকতার স্বীকৃতিও দিয়েছে।

ওলীদ ইবনে মুগিরা বলেছে, আল্লাহর শপথ! কুরআনের রয়েছে নিশ্চিত স্বাদ, এবং এর রয়েছে নিশ্চিত লাবণ্য।

তিন. পূর্বেকার উম্মতদের সংবাদ এবং নবীদের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে পবিত্র কুরআনে। যা আহলে কিতাবগণ জানত। অথচ যিনি এ কুরআন নিয়ে এসেছেন তিনি নিরক্ষর। লেখতেও জানতেন না, পড়তেও পারতেন না। জ্যোতির্বিদ্যাও তার জানা ছিল না।

আরবদের মধ্যে যারা পড়া লেখা জানত, শিক্ষিত লোকদের সাথে বসত, আল কুরআনের এ শিক্ষা তাদেরও আয়ত্বের বাইরে ছিল।

চার. অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংবাদ প্রদান, যা হুবহু সেভাবেই বাস্তবায়িত হয়েছে যেভাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। আর এটিই তার সত্যতাকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে। উদাহরণত: ইহুদীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে:

فَتَمَنَّوُا الْمَوْتَ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ /. وَلَنْ يَتَمَنَّوْهُ أَبَدًا /. فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ .

وَلَنْ تَفْعَلُوا .

যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে মৃত্যু কামনা কর। এরপর বলা হয়েছে, তারা কক্ষনো মৃত্যু কামনা করবে না। আরো ইরশাদ হয়েছে, তোমরা এর মতো একটি সূরা এনে দেখাও। এর পর বলা হয়েছে, তারা এটা করে দেখাতে পারবে না। আর বাস্তবেও তারা করে দেখাতে পারেনি।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ .

তুমি কাফিরদের বলে দাও, তোমরা অবশ্যই পরাস্ত হবে। আর বাস্তবেও তারা পরাস্ত হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আল্লাহর ইচ্ছায়, তোমরা নিরাপদে মসজিদুল হারামে অবশ্যই প্রবেশ করবে।

আবু লাহাবের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, অনতিবিলম্বে সে লেলিহান অগ্নিতে প্রবেশ করবে, লাকড়ি বহনকারী তার স্ত্রীও। তার গলায় থাকবে পাকানো রশি। এর অর্থ তারা উভয়ে কাফির অবস্থায় মারা যাবে, আর সে অবস্থাতেই তারা মারা গিয়েছিল।

পাঁচ. আল কুরআন মতদ্বৈততা ও বৈপরীত্য হতে পবিত্র। আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি এ কুরআন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তারা এতে অবশ্যই অনেক বৈপরীত্য থাকত। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি এ কুরআন অবতীর্ণ করেছি, আমিই এর সংরক্ষণ করব।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قالَ : " مَا مِنَ الأنْبِياءِ مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا وَقَدْ أُعْطِي مِنَ الْآيَاتِ مَا آمَنَ عَلَيْهِ البَشَرُ , وَإِنَّمَا كَانَ الَّذِي أُوتِيتُ وَحْيًا أَوْحَى اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِليَّ , فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَكْثَرَهُمْ تَابِعًا يَوْمَ القِيَامَةِ ] متفقٌ علَيْه [

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক নবীকে এমন অনেক নির্দেশন প্রদান করা হয়েছে যা দেখে মানুষ তাদের উপর ঈমান এনেছে। আর আল্লাহ তাআলা আমাকে দিয়েছেন,ওহী,যা আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে। আমি আশাবাদী,তাদের সকলের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে।

ইবনে আকীল বলেছেন, আল- কুরআনের একটি মাত্র আয়াতের ব্যাপারেও এ পর্যন্ত কেউ এমন অভিযোগ আনতে পারেনি যে এটি অন্য কোনো গ্রন্থ হতে সংকলিত বা অন্য কারো রচিত। এটিও আল কুরআনের অলৌকিকত্বের একটি বিরাট প্রমাণ। কারণ, এক মানুষ অন্য মানুষ থেকে তথ্য নিয়ে লিখে থাকে। যেমন, মুতানাব্বির ব্যাপারে কথিত যে তিনি বুহতারী থেকে তথ্য নিয়ে রচনা করেছেন।

ইবনে জাওযী রহ. বলেন : আমি দুটি অপূর্ব অর্থ বের করেছি।

এক : অন্য সকল নবীদের মোজেজা, তাদের মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে গিয়েছে। বর্তমান যুগে যদি কোনো নাস্তিক এ প্রশ্ন করে বসে : মুহাম্মদ ও মুসা যে সত্য নবী তার প্রমাণ কি?

তাকে যদি এর উত্তরে বলা হয় : মুহাম্মদের নবুওয়তের প্রমাণ চাঁদ দুই টুকরা করা, আর মুসার নবুওয়তের প্রমাণ সমুদ্র চিরে পথের সৃষ্টি করা । সে বলবে : এটা অসম্ভব।

সুতরাং আল্লাহ তাআলা এ কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের প্রমাণ তথা মোজেজা বানিয়েছেন যা চিরকাল বিদ্যমান থাকবে। এ কুরআন রাসূলের মৃত্যুর পরও তার সত্যতার ঘোষণা করবে। রাসূল হলেন, পূর্ববর্তী নবীদের সত্যায়নকারী ও তাদের নবুওয়তের দলিল। তিনি সকল নবীর নবুওয়ত স্বীকার করেছেন এবং তাদের সত্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সংবাদ দিয়েছেন তাদের ঘটনা পঞ্জিরও।

দুই : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে কিতাব তথা ইহুদী খ্রিস্টানদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, তোমাদের নিকট রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পরিচয় বিদ্যমান আছে। (ভুলবশত কাফিরদের সাথে গোপনে আঁতাতকারী বদরি সাহাবি) হাতেব ইবনে আবি বোলতাআর ঈমান ও আয়েশার পবিত্রতার সাক্ষ্য রয়েছে পবিত্র কুরআনে। এগুলো ছিল গায়েবী সংবাদ। যদি কুরআন ও ইঞ্জিলের ভেতর তাঁর গুনাগুণ বিদ্যমান না থাকত, তারা ঈমান থেকে ফিরে যেত। এ দিকে হাতেব ও আয়েশা যদি জানতেন যে, কুরআন তাদের ব্যাপারে যে সাক্ষ্য দিয়েছে, তা মিথ্যা ও অলীক তবে তারাও ঈমান ত্যাগ করতেন।