hadith book logo

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক্ক

লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আহমদ আব্দুল কাদির মালকাবী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

১. ২. ২. যিহোশূয়ের পুস্তক (The Book of Joshua)

উপরের আলোচনা থেকে পাঠক ইস্রায়েলী ধর্মের মূল ভিত্তি তাওরাত (Torah or Pentateuch) -এর অবস্থা জানতে পারলেন। এখন আমরা তাওরাতের পরেই যে গ্রন্থের স্থান সেই ‘যিহোশূয়ের পুস্তক’-এর অবস্থা আলোচনা করব। প্রথমেই যে কথা উল্লেখ করা দরকার তা হলো, এখন পর্যন্ত ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ নিশ্চিতরূপে জানেন না যে, গ্রন্থটির লেখক কে এবং কোন্ যুগে তা লেখা হয়েছে। এই গ্রন্থটির বিষয়ে তাদের পাঁচটি মত রয়েছে:

কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (মোশির শিষ্য) যিহোশূয়ের লিখিত।

কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (হারোণের পৌত্র) পীনহস কর্তৃক লিখিত।

কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি (হারোণের পুত্র, পীনহসের পিতা) ইলিয়াসর কর্তৃক প্রণীত। [পীনহস ও ইলিয়াসরের পরিচয় দেখুন: ১ বংশাবলী ৬/৩-৪।]

কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি শমূয়েল কর্তৃক রচিত।

কেউ কেউ বলেন, গ্রন্থটি যিরমিয় কর্তৃক রচিত।

উল্লেখ্য যে, যিহোশূয় এবং যিরমিয়র মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলো কমবেশি প্রায় ৮৫০ বৎসর। [যিরমিয় ভাববাদী খৃস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকের মানুষ। আর মোশির শিষ্য যিহোশূয়ের সময়কাল নিয়ে ইহূদী-খৃস্টান পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মোশির মৃত্যুর পরে খৃস্টপূর্ব ১৬শ, ১৫শ বা ১৩শ শতকে তিনি ইহূদীদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। উভয়ের মধ্যে ৭, ৮ বা ৯ শতকের ব্যবধান।] তাদের নিজেদের ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থের লেখকের বিষয়ে এ ব্যাপক মতভেদ পূর্ণরূপে প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটির লেখক সম্পর্কে তাদের নিকট কোনো সূত্র নেই। প্রত্যেক গবেষক তার নিজের ধারণা ও অনুমানের উপর নির্ভর করে মতামত প্রকাশ করেছেন। প্রত্যেকে পারিপার্শ্বিক কিছু নির্দেশনার উপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বলেছেন যে, অমুকই বোধহয় এই গ্রন্থের লেখক। এ আন্দাজই তাদের একমাত্র সনদ বা সূত্র।

যিহোশূয়ের পুস্তকের মধ্যে কিছু শ্লোক ও অনুচ্ছেদ রয়েছে যেগুলি কখনোই যিহোশূয়ের বক্তব্য বা তাঁর নিজের লেখা হতে পারে না। অনুরূপভাবে এ পুস্তকের মধ্যে এমন কিছু অনুচ্ছেদ বিদ্যমান যেগুলি দাউদ আলাইহিস সালাম-এর সমসাময়িক কোনো ব্যক্তির লেখা বলে প্রমাণিত। এ সকল অনুচ্ছেদ সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, এ গ্রন্থটি কখনোই যিহোশূয়ের লেখা নয়।

প্রচলিত তাওরাতের কিছু বর্ণনা ও বিধানের সাথে যিহোশূয়ের পুস্তকের কিছু বর্ণনা ও বিধানের সুস্পষ্ট বৈপরীত্য ও সংঘর্ষ রয়েছে। ইয়াহূদী-খৃস্টানদের দাবি অনুসারে যদি প্রচলিত তোরাহ মোশির রচিত হতো অথবা যিহোশূয়ের পুস্তকটি তার নিজের রচনা হতো তাহলে কখনোই মোশির শিষ্য যিহোশূয় মোশির তাওরাতের বিরোধিতা করতেন না এবং তার নিজের উপস্থিতিতে মোশি যে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন তা পাল্টে দিতেন না।

উপরের আলোচনা থেকে পাঠক পুরাতন নিয়মের মূল ৬টি গ্রন্থ- তাওরাত ও যিহোশূয়ের পু্স্তকের অবস্থা জানতে পেরেছেন। পুরাতন নিয়মের অবশিষ্ট ৩৩টি বা ৪০টি পুস্তকের অবস্থা এ ছয়টি পুস্তকের চেয়ে মোটেও ভাল নয়। এগুলির লেখকদের নাম, পরিচয় ও সংকলনের সময়কালের বিষয়ে ইয়াহূদী-খৃস্টান গবেষকদের মতভেদ আরো বেশি ব্যাপক। অনেক গবেষক পুরাতন নিয়মের অনেকগুলি পুস্তক পুরাতন নিয়মের অংশ নয় বলে উল্লেখ করেছেন এবং এগুলিকে একেবারেই বাতিল ও কল্পকাহিনী বলে গণ্য করেছেন। তারা দাবি করেছেন যে, প্রাচীন ইয়াহূদীগণ অনেক জাল কাহিনী ও জাল পুস্তক ধর্মগ্রন্থের মধ্যে সংযুক্ত করেছেন, যেগুলি মূলত বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত।

এগুলি সবই সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণের নিকট বাইবেলের কোনো গ্রন্থেরই অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরা নেই। তারা যা কিছু বলেন সবই আন্দাজ ও কল্পনা মাত্র। আর কোনো গ্রন্থকে কোনো নবী, ভাববাদী বা ইলহামপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামে প্রচার করলেই তা ঐশ্বরিক বা ঐশী গ্রন্থরূপে স্বীকৃত হয় না, বরং গ্রন্থটি সত্যই উক্ত ব্যক্তি লিখেছেন বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়।