hadith book logo

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক্ক

লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আহমদ আব্দুল কাদির মালকাবী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

১. ২. ৩. ইঞ্জিল বা সুসমাচারগুলির সূত্র পর্যালোচনা ১. ২. ৩. ১. মথিলিখিত সুসমাচার

সকল প্রাচীন খৃস্টান ধর্মবেত্তা পণ্ডিত ও অগণিত আধুনিক খৃস্টান পণ্ডিত একমত যে, মথিলিখিত সুসমাচারটি মূলত হিব্রু ভাষায় লেখা ছিল। খৃস্টান সম্প্রদায়গুলির বিকৃতির কারণে এবং প্রথম তিন শতাব্দীর সমস্যাদির কারণে মূল হিব্রু গ্রন্থটি হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত হিব্রু সংস্করণ গ্রন্থটির গ্রীক অনুবাদের অনুবাদ। বস্তুত সুসমাচারটির গ্রীক অনুবাদই গ্রন্থটির প্রাচীনতম সূত্র হিসেবে বিদ্যমান। এই গ্রীক অনুবাদটিরও কোনো সূত্র পরম্পরা তাদের নিকট নেই। এমনকি, এখন পর্যন্ত নিশ্চিতরূপে জানা যায়নি যে, এই গ্রীক অনুবাদটির অনুবাদক কে? প্রাচীন খৃস্টান ধর্মবেত্তা পণ্ডিত জীরোম (St. Jerome: ৩৪২-৪২০ খৃ) তা স্বীকার করেছেন। অনুবাদকের নামই যখন জানা যায়নি, তখন অনুবাদকের সততা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি অবস্থা জানার আর সুযোগ কোথায়!?

খৃস্টান ধর্মগুরু পণ্ডিতগণ সম্পূর্ণ আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বলেন যে, সম্ভবত অমুক বা তমুক হয়ত অনুবাদ করেছিলেন। এরূপ প্রমাণবিহীন আন্দাজ ও অনুমানের উপর নির্ভর করে কোনো পুস্তকের লেখকের নামও নির্ধারণ করা যায় না।

মথির নামে প্রচলিত ইঞ্জিলই প্রথম এবং প্রাচীনতন ইঞ্জিল। এ ইঞ্জিলটির বিষয়ে পঞ্চাশেরও অধিক খৃস্টান গবেষক পণ্ডিত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যীশুর শিষ্য মথি এর লেখক নন। নতুন নিয়মের সকল পুস্তক ও পত্র গ্রীক ভাষায় লেখা হয়েছে। কেবলমাত্র মথির ইঞ্জিল ও ইব্রীয়দের প্রতি পত্র। অগণিত অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণের আলোকে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে এ দুটি পুস্তক হিব্রু ভাষায় লেখা হয়েছে। সুসমাচার লেখকগণের মধ্যে একমাত্র মথিই তার সুসমাচার হিব্রু ভাষায় লিখেন। ফিলিস্তিনের হিব্রুভাষী ইয়াহূদীদের উদ্দেশ্যে এ সুসমাচারটি লেখা হয়, যারা ইব্রাহীম ও দাউদের বংশের একজন ত্রানকর্তার অপেক্ষা করছিলেন। এরপর বিভিন্ন অনুবাদক প্রত্যেকে নিজ নিজ বুঝ ও সাধ্য অনুসারের সুসমাচারটি অনুবাদ করেন। মথি নিজে তার সুসমাচারটি গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করেন নি। প্রচলিত গ্রীক সুসমাচারটির অনুবাদক কে বা তার পরিচয় কি তা কেউই জানেন না। অন্যান্য সুসমাচার গ্রীক ভাষায় লেখা হয়েছে। কেউ যদি বলেন যে, মথি তার সুসমাচারটি গ্রীক ভাষায় লিখেছিলেন তাহলে তিনি ভুল ও অসত্য বলবেন।

পণ্ডিত ও গবেষক নর্টন একটি বৃহদাকার পুস্তক রচনা করেছেন। এ পুস্তকে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রচলিত তোরাহ নিঃসন্দেহে ও নিশ্চিতরূপে জাল ও বানোয়াট। এগুলি কখনোই মোশির রচনা নয়। তিনি নতুন নিয়ম বা সুসমাচারের পুস্তকগুলির মূল অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। তবে সেগুলির মধ্যে অনেক বিকৃতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

তিনি এ পুস্তকে লিখেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে, মথি তাঁর সুসমাচারটি হিব্রু ভাষায় লিখেছিলেন। কারণ প্রাচীন যে সকল পণ্ডিত বিষয়টি আলোচনা করেছেন তাঁদের সকলেই ঐকমত্যের সাথে এই একই কথা বলেছেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, মথি হিব্রু ভাষায় সুসমাচার লিখেন। কেনো একজন প্রাচীন পণ্ডিতও তাঁদের বিপরীত কিছু বলেন নি। তাঁদের এ সাক্ষ্যের বিপরীতে একটি আপত্তিও পাওয়া যায় নি যে কারণে এ বিষয়ে কোনো গবেষণা বা পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে। এটি অত্যন্ত বড় সাক্ষ্য ও শক্তিশালী প্রমাণ। উপরন্তু প্রাচীন ধর্মগুরু ও পণ্ডিতগণ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, সেন্ট জিরোমের যুগ পর্যন্ত (মৃত্যু ৪২০ খৃ) মথির লিখিত হিব্রু সুসমাচারটি ইব্রীয় খৃস্টান বা ইয়াহূদী ধর্ম থেকে আগত খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারটি হারিয়ে যাওয়া মূল হিব্রু সুসমাচারটির অনুবাদ, তবে অনুবাদকের নাম, পরিচয় বা অন্য কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারের বর্ণনাভঙ্গি ও উপস্থাপনা প্রাচীন পণ্ডিতগণের বক্তব্য প্রমাণ করে। পুস্তকটির উপস্থাপনা ও বর্ণনা পদ্ধতি থেকে বুঝা যায় যে, পুস্তকটি মথির নিজের রচিত নয়। কারণ মথি যীশুর প্রেরিত ১২ শিষ্যের একজন ছিলেন। খৃস্টের অধিকাংশ অবস্থা ও ঘটনা তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি নিজে যদি এই সুসমাচারটি লিখতেন তবে পুস্তকটির কোথাও না কোথাও তাঁর উপস্থাপনা থেকে প্রকাশ পেত যে, তিনি তাঁর নিজে দেখা ঘটনাগুলি লিখছেন। এছাড়া তিনি নিজের কথা বলতে অবশ্যই উত্তম পুরুষের সর্বনাম ব্যবহার করতেন। প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত লেখকগণ এভাবেই লিখেন। এভাবে প্রচলিত মথিলিখিত সুসমাচারের ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে যে, গ্রন্থটি মথির নিজের লেখা নয়।

মানিকীয (Manichees) সম্প্রদায়ের চতুর্থ শতাব্দীর অস্ট্রীয় পণ্ডিত ফাস্টিস বলেন, মথির নামে প্রচলিত সুসমাচারটি তাঁর রচিত নয়।

মারসিওনের (Marcion) অনুসারিগণ এবং এবোনাইট (Ebionites) সম্প্রদায়ের মতে প্রচলিত গ্রন্থটির প্রথম দুটি অধ্যায় জাল ও সংযোজিত। ইউনিট্যারিয়ান (একত্ববাদী) খৃস্টান সম্প্রদায় এবং পাদ্রী উইলিয়ামসও অধ্যায় দুটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নর্টন এ দুটি অধ্যায় এবং এ সুসমাচারের অধিকাংশ বক্তব্য অনির্ভরযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।