hadith book logo

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক্ক

লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আহমদ আব্দুল কাদির মালকাবী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

ভূমিকা

কতিপয় জরুরী জ্ঞাতব্য

(১) প্রটেস্টান্ট [গোড়া থেকেই খৃস্টানগণ বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত। মধ্যযুগে ইউরোপে ভ্যাটিকানের পোপের নিয়ন্ত্রিত ‘রোমান ক্যথলিক’ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত ছিল। বর্তমান যুগেও খৃস্টানদের মধ্যে এই মতই সর্বাধিক প্রচলিত। ষষ্ঠদশ শতকে মার্টিন লুথার: Martin Luther (১৪৮২-১৫২৯ খৃ) পোপের আধিপত্য, অত্যাচার ও ধর্মীয় অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ক্রমান্বয়ে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরা প্রটেস্টান্ট নামে পরিচিত। ধর্মবিশ্বাস প্রায় একই, তবে এরা রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা ধর্মের উপর পোপের কতৃত্ব মানেন না। রাজনৈতিক কারণেই ইংল্যান্ডের রাজারা প্রটেস্টান্ট মত গ্রহণ করেন। উনবিংশ শতকের শুরুতে মূলত ইংল্যান্ডের প্রটেস্টান্ট খৃস্টানদের মিশনারীরাই ভারতে কাজ করছিল। এজন্য গ্রন্থকার এদের বিভ্রান্তি প্রমাণের জন্য তাদের পন্ডিতদের গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। (অনুবাদক। এখানে উল্লেখ্য যে, এ গ্রন্থের সকল পাদটীকা অনুবাদকের পক্ষ থেকে সংযোজিত।)] পণ্ডিতগণের গ্রন্থ থেকে যে সকল উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে শুধু তাদের কথা দ্বারা তাদের বিভ্রান্তি প্রমাণের জন্য, আমাদের বিশ্বাস প্রকাশের জন্য নয়।

(২) প্রটেস্টান্ট পণ্ডিতগণ সর্বদা তাদের লিখিত গ্রন্থগুলি বিষয়বস্তু পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন ইত্যাদির মাধ্যমে পাল্টে ফেলেন। ফলে আগের সংস্করণ ও পরের সংস্করণের মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। পাঠককে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।

(৩) ‘‘বাইবেল’’-এর মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন কাহিনীকে মিথ্যা বা ভুল বলায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এগুলি নবীগণের নামে বানানো জাল ও ভিত্তিহীন গল্প এবং আসমানী কিতাবের বিকৃতির অংশ। এ সকল কাহিনী কোনোটিই আল্লাহর কালাম নয়। আর এ সকল জাল কাহিনীকে মিথ্যা বা ভুল বললে ‘‘আসমানী কিতাবের’’ প্রতি বে-আদবী হয় না। বরং এ সকল আসমানী গ্রন্থে যে সকল বিকৃতি ও মিথ্যার অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেগুলি প্রকাশ করা ও সেগুলির নিন্দা করা মুসলিমের আবশ্যকীয় দায়িত্ব।

(৪) খৃস্টান পণ্ডিতগণের রীতি ও অভ্যাস হলো, তারা মুসলিম আলিমগণের লিখনির মধ্যে বিদ্যমান সামান্য দু-একটি দুর্বল বক্তব্য খুঁজে বের করে তাদের গ্রন্থে সেগুলির উল্লেখ করেন এবং সেগুলির প্রতিবাদ করেন। এভাবে তারা পাঠককে বুঝাতে চান যে, মুসলিম পণ্ডিতদের বইগুলি এরূপ দুর্বল কথায় ভরা। আর প্রকৃত বিষয় হলো, মুসলিম আলিমগণের গ্রন্থের মধ্যে বিদ্যমান অগণিত শক্তিশালী বক্তব্যগুলি তারা এড়িয়ে যান এবং সেগুলির কোনোরূপ উল্লেখ তারা করেন না। যদি কখনো এরূপ কোনো বক্তব্য তারা উল্লেখ করেন তবে পরিপূর্ণ অবিশ্বস্ততার সাথে বাড়িয়ে কমিয়ে বা বিকৃত করে সে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এ তাদের সবচেয়ে নিন্দনীয় অভ্যাসগুলির অন্যতম। জ্ঞানবৃত্তিক বিতর্কের মূলনীতি হলো প্রতিপক্ষের বক্তব্য পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে বিশুদ্ধভাবে উপস্থাপন করা; কিন্তু তারা এ মূলনীতি লঙ্ঘন করেন। পাদরি কার্ল গোটালেব ফান্ডার (Carl Gottaleb Pfander) এরূপ করেছেন আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবীর সাথে তার প্রকাশ্য বিতর্কের বিবরণে। ১২৭০ হি,/১৮৫৪ খৃ ভারতের আগ্রায় তাদের মধ্যে এ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। মি. ফান্ডার এ বিতর্কের বিবরণ সম্পূর্ণ বিকৃতভাবে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেন। এতে তিনি প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ বিকৃত করে উভয়পক্ষের বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেন। মি. ফান্ডার তার বিভিন্ন পুস্তকে কুরআন কারীমের বিভিন্ন শ্লোক নিজের মনমর্জি মত অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতেন। এরপর দাবি করতেন যে, তার অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় সঠিক এবং মুসলিম মুফাস্‌সিরগণের ব্যাখ্যা ভুল। অথচ প্রকৃত ও প্রমাণিত বিষয় যে, তিনি আরবী ভাষায় অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। এছাড়া কুরআন বিষয়ক প্রাসঙ্গিক জ্ঞানও তার ছিল না। এরপরও তিনি দাবি করতেন তার ভাষাজ্ঞান-বিহীন অশুদ্ধ অনুবাদ ও ব্যাখ্যাকে সঠিক বলে মানতে হবে এবং মুসলিম উম্মাহর সকল মুফাস্‌সিরের ব্যাখ্যাকে ভুল বলতে হবে!

হে আল্লাহ, আমাদেরকে সত্যকে সত্যরূপে বুঝার এবং তার অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আর বাতিল ও অসত্যের অসারত্ব আমাদের সামনে প্রতিভাত করুন এবং তা পরিহার করার তাওফীক আমাদেরকে দান করুন।