hadith book logo

সংক্ষেপিত ইযহারুল হক্ক

লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আহমদ আব্দুল কাদির মালকাবী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৭

৩. ১. ২. কুরআন বিষয়ক তিনটি প্রশ্ন ৩. ১. ২. ১. সাহিত্যিক অলৌকিকতব

প্রথম প্রশ্ন হলো, সাহিত্য ও আলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্যকে আমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অলৌকিক চিহ্নের অন্তর্ভুক্ত করা হলো কেন?

বিভিন্ন যুগে নবীদেরকে তাদের যুগের চাহিদা অনুসারে অলৌকিক চিহ্নাদি প্রদান করা হয়। যুগের মানুষের মধ্যে যে বিষয়ে প্রতিযোগিতা ও উন্নতি বেশি সে যুগের নবীকে সেই জাতীয় অলৌকিক নিদর্শন প্রদান করা হয়। মানুষেরা তাদের মানবীয় বুদ্ধি ও যোগ্যতা দিয়ে উক্ত বিষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে অনুভব করতে পারে যে, তাদের বুদ্ধি ও জ্ঞান অনুসারে কোনো মানুষের পক্ষে উক্ত পর্যায় অতিক্রম করা সম্ভব নয়। যখন সেই পর্যায় ও সীমা অতিক্রান্ত কোনো বিষয় তারা দেখতে পান তখন সহজেই সে বিষয়ের অলৌকিকত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হন। তারা বুঝতে পারেন যে, বিষয়টি মানবীয় নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত।

মূসা আলাইহিস সালাম-এর সময়ে মিশরীয়দের মধ্যে যাদুর চর্চা ছিল খুবই বেশি। এ বিদ্যায় তারা বিশেষ অগ্রগতি ও পূর্ণতা লাভ করে। এ সকল শীর্ষস্থানীয় যাদুকর যখন দেখলেন যে, মূসার লাঠির প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে সত্যিকারে সাপে পরিণত হলো এবং তাদের লাঠিগুলি প্রকৃতপক্ষেই গলাধঃকরণ করল তখন তারা বুঝতে পারল যে, মূসার কর্ম যাদু নয়, বরং যাদুর সর্বোচ্চ সীমার উর্দ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত অলৌকিক একটি বিষয়। একারণে তারা ঈমান গ্রহণ করে।

ঈসা আলাইহিস সালাম-এর যুগে চিকিৎসা বিদ্যার উন্নতি ঘটে। মানুষ এতে আগের চেয়ে অধিক যোগ্যতা অর্জন করে। তারা যখন দেখল যে, তিনি মৃতকে জীবিত করছেন, জন্মান্ধকে ও কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করছেন, তখন তারা বুঝতে পারল যে, মানবীয় চিকিৎসা বিদ্যা দিয়ে তা কখনোই সম্ভব নয়, কাজেই তা মানবীয় নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত অলৌকিক চিহ্ন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের মানুষেরা কাব্য, সাহিত্য ও সাহিত্যিক অলঙ্কারের ক্ষেত্রে উন্নতির শীর্ষে আরোহণ করে। এ সকল বিষয়ে অহঙ্কার ও প্রতিযোগিতা তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্যে তাঁর অলৌকিক চিহ্ন হিসেবে কুরআনকে উপস্থাপন করলেন এবং কবি-সাহিত্যিকগণ এর মুকাবিলা ও প্রতিযোগিতা করতে অক্ষম হলেন, তখন সকলেই বুঝতে পারলেন যে, তা নিশ্চিতরূপেই আল্লাহর বাণী। [সাহিত্য ও অলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কুরআনকে কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যতম অলৌকিক চিহ্ন হিসেবে দেওয়া হলো, এর ব্যাখ্যায় গ্রন্থকার যা বলেছেন তা তৎকালীন যুগের প্রেক্ষাপটে খুবই বাস্তব কথা। পাশাপাশি আমরা একথাও অনুভব করি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশ্বনবী ও সর্বকালের সকল মানুষের জন্য প্রেরিত রাসূল হওয়ার জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জরুরী বিষয়। এক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রথমত, পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলের অলৌকিক চিহ্ন (miracle) ছিল তাদের সমসাময়িকদের জন্য। তারা যেমন শুধু তাদের যুগের মানুষদের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন, তেমনি তাদের অলৌকিক চিহ্নও ছিল শুধু তাদের যুগের মানুষদের জন্য। তাদের তিরোধানের পরে তা ‘সংবাদে’ পরিণত হয়েছে। একজন খৃস্টান দাবি করতে পারেন যে, যীশু মৃতকে জীবিত করতেন। কিন্তু খৃস্ট সম্পর্কে আগ্রহী ব্যক্তিকে তিনি তা দেখাতে পারবেন না। শুধু তার বাইবেলের উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু ‘সংবাদ’ বলবেন। এমনকি এ সকল অলৌকিকত্বের পক্ষে ইতিহাস থেকেও কিছু তথ্য দিতে পারবেন না। ঐতিহাসিকভাবে যীশুর অস্তিত্বই প্রমাণিত নয়। যীশু নামে কোনো ব্যক্তি যিরূশালেমে ধর্মপ্রচার করেছেন এরূপ কোনো তথ্যই তাঁর সমসাময়িক কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেন নি, তাঁর অলৌকিকত্বের স্বীকৃতি তো অনেক দূরের কথা। অন্যান্য নবীদের অলৌকিত্বের অবস্থাও একই। পক্ষান্তরে কুরআন জীবন্ত ও অনন্ত অলৌকিক চিহ্ন। যে কোনো যুগে যে কোনো মুসলিম ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ব্যক্তির সামনে কুরআনকে অলৌকিক চিহ্ন হিসেবে পেশ করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, নবী-রাসূলদের অলৌকিক চিহ্ন বা মুজিযার উদ্দেশ্য হলো আগ্রহী ব্যক্তিকে বিশ্বাসের পথে অনুপ্রাণিত করা। যীশুর মৃতকে জীবিত করা, মোশির লাঠিকে সাপ বানানো ইত্যাদি কর্ম তৎকালীন কোনো কোনো মানুষকে বিশ্বাসের পথে অনুপ্রাণিত করলেও তাদের তিরোধানের পরে কেউ আর তা দেখে বিশ্বাসী হন না। পক্ষান্তরে কুরআনের অলৌকিকত্ব চিরস্থায়ী। সকল যুগেই এমন অনেক মানুষ পাওয়া যায় যারা কোনোরূপ প্রচার ছাড়াই শুধু কুরআন পাঠ করে তার অলৌকিকত্ব অনুধাবন করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অনেকে ইসলাম গ্রহণ না করলেও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি পর্যালোচনা করে কুরআনের অলৌকিকত্ব স্বীকার করেছেন। তৃতীয়ত, পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণকে যে সকল অলৌকিকত্ব বা মুজিযা প্রদান করা হয়েছিল সেগুলি ছিল মূর্ত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। পক্ষান্তরে কুরআনের অলৌকিকত্ব গ্রন্থভিত্তিক হওয়াতে তা বিমূর্ত ও জ্ঞানবুদ্ধিবৃত্তিক। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতশীল বিশ্বের সর্বজনীন ধর্মগ্রন্থ হওয়ার বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে বিদ্যমান। চতুর্থত, সকল ধর্মের ভিত্তিই হলো ‘আল্লাহর বাণী’ বা ধর্মগ্রন্থ। বিশ্বজনীন ধর্মের ধর্মগ্রন্থের সংরক্ষণতা অত্যাবশ্যক। কুরআনের সাহিত্যিক অলৌকিকত্বের ফলে তা কখনো বিকৃত করা সম্ভব হয় নি। একদিকে যেমন অগণিত মানুষ সহজেই তা মুখস্থ রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে কেউই এরমধ্যে কোনো সংযোগ করতে সক্ষম হয়নি। পঞ্চমত, কুরআনের ভাষা ও সাহিত্যগত অলৌকিকত্বের কারণে সকল মানুষের কাছে তা সহজপাঠ্য ও সহজবোধ্য। এ হলো তার বিশ্বজনীনতার বিশেষ দিক।]