hadith book logo

হিযবুল্লাহ সম্পর্কে কী জানেন

লেখকঃ আলী আস-সাদিক • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৫

হিযবুল্লাহর নিকট বন্দী লেবানন কি ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকবে?

‘অদ্দাহ শারারাহ’ এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন: “লেবানন যেরূপ খোমেনি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ময়দান হিসেবে পরিণত হয়েছে, সেরূপ লেবাননকে খোমেনি আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নেও জ্বলতে-পুড়তে হবে। হিযবুল্লাহর সাবেক মুখপাত্র ইবরাহিম সায়্যেদ বলেন: “আমাদের দৃষ্টিতে লেবানন ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের ভূমি ও তার ময়দান, ইসলামি স্বার্থে লেবাননের এরূপ হওয়াই উচিত”। [দেখুন: অদ্দাহ শারারাহ রচিত دولة حزب الله (পৃ.৩৩৬)]

হিযবুল্লাহ যখন দু’জন ইসরাইলি সৈন্য অপহরণ করে, আর তার অনুসারীরা এ নাটকটি সত্য বলে স্বীকার করে, তখন ১৪ জুলাই ২০০৬ই. সালের জুমাবার হাসান নাসরুল্লাহ লেবাননি টিভি চ্যানেল “আল-মানার” এর পর্দায় দৃশ্যমান হন ও ঘোষণা করেন: “আজ থেকে যদি তোমরা উন্মুক্ত যুদ্ধ চাও, তাহলে উন্মুক্ত যুদ্ধই। যদি তোমরা ও তোমাদের সরকার খেলনার গুটি পরিবর্তন করতে চাও, তাহলে পরিবর্তন করে দেখ। তোমরা জান না, আজ কাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, তোমরা যুদ্ধ করছ মুহাম্মদের পরিবারের সাথে, আলি, হাসান, হুসাইন ও আহলে বাইত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের সাথে। তোমরা এমন জাতির সাথে যুদ্ধ করছ, যারা ঈমানের ধারক, যে ঈমান দুনিয়ার বুকে কারো নেই। তোমরা এমন কওমের সাথে উন্মুক্ত যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছ, যারা তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রগতি নিয়ে গর্ব করে। আরো রয়েছে তাদের পার্থিব শক্তি, যুদ্ধের ক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, সুনির্দিষ্ট চিন্তা শক্তি, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও সাহস। সামনের দিনগুলোয় আমাদের ও তোমাদের মাঝে সাক্ষাত হবে, ইনশাআল্লাহ”।

তার গলাবাজির সমাপ্তিতে সে বলে: “হে আরব সরকারসমূহ, আমি আপনাদের নিকট আপনাদের ইতিহাস জানতে চাই না, একটি সংক্ষিপ্ত কথা, আমরা আত্মত্যাগী, হিযবুল্লাহর অধীন আমরা আত্মত্যাগী, আমরা ১৯৮২ই. সাল থেকে ত্যাগ স্বীকার করে আসছি। আমরা আমাদের দেশকে, বিজয়, স্বাধীনতা, ইজ্জত ও উঁচু স্থান প্রদান করেছি। এটাই আমাদের ইতিহাস, এটাই আমাদের অভিজ্ঞতা, এটাই আমাদের ত্যাগ স্বীকার”।

এ ঘটনার পর যখন ইসরাইল ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ও বেশুমার মানুষ হত্যা করে লেবাননের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ক্ষতি করল, তখন সোমবার ৩/০৮/১৪২৮হি. মোতাবেক: ২৭/০৮/২০০৬ই. তারিখে লেবাননি টিভি চ্যানেল New TV এর পর্দায় উপস্থিত হয় ও বলে: “আমি যদি জানতাম যে, দু’জন ইসরাইলি সৈন্য অপহরণ করার ফলে লেবাননের এ পরিমাণ ক্ষতি হবে, তাহলে কখনো তার নির্দেশ দিতাম না”।

হাসান নাসরুল্লাহ আরো স্পষ্ট বলেছে যে, দু’জন ইসরাইলি সৈন্য অপহরণ করার ফলে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার ১% পার্সেন্ট ক্ষতিরও আশঙ্কা করিনি, কারণ যুদ্ধের ইতিহাসে এরূপ ক্ষয়ক্ষতির রেকর্ড নেই। তিনি নিশ্চিত বলেন: দ্বিতীয়বার কখনো হিযবুল্লাহ ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের ইচ্ছা রাখে না। হিযবুল্লাহর এ নাটকের ফলাফল: লেবাননি কয়েদি ও হত্যার সংখ্যা বর্ধিত হল, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পেল এবং তারা লেবাননকে সমুদ্র ও স্থল পথে বেষ্টন করে নিলো!

লেবননিরা কি হিযবুল্লাহর প্রধানকে এ জন্য বিচারের সম্মুখীন করাবে? কেন সে লেবাননের জন্য এতো বড় মুসিবতের কারণ হল? লেবাননি সরকারের ভূমিকা দেখে তো আমার নিম্নের কবিতাই মনে পড়ে:

ويقضى الأمر حين تغيب تيم ولا يستأمرون وهم شهود

যখন তাইম চলে যায়, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তাদের উপস্থিতিতে তারা পরামর্শও করে না।

একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে অপর দেশের সাথে যুদ্ধের বিষয়, সেই যুদ্ধ যদি হয় দেশের কর্তা ব্যক্তিদের অজ্ঞতাসারে, তাদের পরামর্শও যদি গ্রহণ না করা হয় এবং তাদের পরামর্শ ব্যতীত যুদ্ধ শেষ হয়! তাহলে কে দেশ চালায়? কাকে কে চালায়? কোন্ সংবিধান ও নীতির বলে এরূপ ঘটে!!!?

লেবাননি সরকারের ভূমিকা কি, যার দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা প্রদান করা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করা, এত লোক হত্যা করা হল, এতো ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করা হল এবং অর্থনৈতিক এতো ক্ষতি হল, তবুও কি লেবাননি সরকার হাসান নাসরুল্লাহ কিংবা হিযবুল্লাহকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাবে না?!

আমরা আশঙ্কা করছি, এ জন্য হিযবুল্লাহ উল্টো সরকারকেই দায়ী করবে, অথবা দক্ষিণ লেবাননে আহলে সুন্নাহকে দায়ী করবে, অথবা ফিলিস্তিন শিবিরে বসবাসকারী কাউকে দায়ী করবে, যে কোনো অজুহাতেই হোক।

এখানে আমাদের কয়েকটি প্রশ্ন: ইসরাইল ও আমেরিকা কেন হামাসের সাথে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল? অথচ দেশের জনগণ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে হামাসকে গ্রহণ করেছে, যারা ছিল বৈধ সরকার!

পক্ষান্তরে তারা হিযবুল্লাহর সাথে সমঝোতা করে, যাকে লেবাননের সরকারের ভেতরে সরকার গণ্য করা হয়, অথবা যার কার্যক্রম একটি মাফিয়া চক্রের ন্যায়! দু’জন ইসরাইলি সৈন্য অপহরণ করে সে লেবাননের উপর ইসরাইলকে ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনার পথ সুগম করে দিয়েছে। এরূপ কাজ হাসান নাসরুল্লাহর পূর্বে তার উত্তরসূরি আব্বাস মুসাভিও করেছে। ১৯৮৬ই. সালে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে দু’জন ইসরাইলি সৈন্য অপহরণ করে লেবাননে তাদেরকে হামলার সুযোগ করে দিয়েছিল, যার ফলে তারা লেবাননি সামরিক শক্তি ও তাদের অর্থ-সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। [দেখুন: মুহাম্মদ আলি খানুন রচিত: أمير القاقلة (পৃ.১০১)]

আমাদের দৃষ্টিতে হিযবুল্লাহ দু’জন ইসরাইলি সৈন্য অপহরণ করে ইসরাইলকে যেভাবে ইচ্ছা লেবাননে হামলার সুযোগ করে দিল। আমরা আশ্চর্য ইহ না যে, তৃতীয়বার হাসান নাসরুল্লাহ কিংবা তার উত্তরসূরি কেউ এরূপ করবে না, যদি হিযবুল্লাহকে এভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়। যিনি বলেছেন, সত্যই বলেছেন: ইসরাইলের স্বার্থ হচ্ছে হিযবুল্লাহর বেঁচে থাকা এবং হিযবুল্লাহর স্বার্থ হচ্ছে ইসরাইলের বেঁচে থাকা!