পরিচ্ছেদঃ ৯
দ্বীনদারির ব্যাপকতা:
মানুষ পরহেজগারি ও দ্বীনদারির বিবেচনায় চার শ্রেণীতে বিভক্ত। ইব্রাহিম ইবনে আদহাম রহ. বলেন, দ্বীনদারির বিবেচনায় মানুষ চার প্রকার। এক শ্রেণীর লোক যারা অল্প ও বেশি উভয় প্রকার বস্তু থেকে পরহেজগারি বা দ্বীনদারি অবলম্বন করে। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক আছে, যারা শুধু অল্প বস্তু থেকে বেঁচে থাকে। কিন্তু যখন তাদের সামনে বেশি বা মোটা অংকের কোন বস্তু আসে, তখন তা থেকে তারা বেঁচে থাকে না। তৃতীয় শ্রেণির লোক, যারা অধিক থেকে বেঁচে থাকে, কিন্তু কম বস্তুকে তারা ছোট ও তুচ্ছ মনে করায়, তা থেকে বেঁচে থাকে না। চতুর্থ শ্রেণীর লোক, যারা কম ও বেশি কোন কিছু থেকে তারা তাদের নিজেদের বিরত রাখে না [তারিখে বাগদাদ: ১৯৯/৬.]।
প্রথম শ্রেণীর লোক: এরা হল, তারা যারা ছগীরা ও কবিরা উভয় প্রকার গুনাহ হতে নিজেদের বিরত রাখেন। তারা কোন ছগীরাগুণাহ করে না এবং কবিরা গুনাহও করে না।
দ্বিতীয় প্রকার লোক: সাধারণ মানুষের মত, তারা মানুষের অল্প সম্পদ ভক্ষণ করা হতেও বিরত থাকে। কিন্তু যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে মানুষের উপর ক্ষমতা বা সুযোগ দেয়, তখন সে মানুষের বড় বড় সম্পদ হনন করে। তারা বলে অল্প খেয়ে দুর্নাম কামানোর প্রয়োজন নাই।
তৃতীয় প্রকার: এ শ্রেণীর লোকের সংখ্যা অধিক। তারা কোন ব্যভিচার করে না, চুরি ডাকাতি ও হত্যা রাহাজানি করে না, কবিরা গুনায় লিপ্ত হয় না এবং সুদ-ঘোষ খায় না। কিন্তু তারা ছগীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে না। তারা ছগীরা গুনাহ করতে থাকে। যেমন- তারা তাদের দৃষ্টির হেফাজত করে না, কানের হেফাজত করে না, রাস্তা ঘাটে তারা নারীদের দিকে তাকায় এবং গান-বাজনা ইত্যাদি তারা শ্রবণ করে। সমাজের বেশির ভাগ লোক এ ধরনেরই হয়ে থাকে।
চতুর্থ প্রকার লোক: যারা ছগীরা গুনাহ ও কবিরা গুনাহ কোন কিছু থেকেই বেঁচে থাকে না। তারা সব ধরনের গুনাহ করে এবং সব ধরনের অন্যায় তারা করতে পারে।
পরহজেগারি ও দ্বীনদারির বাস্তবতা হল, তা সমগ্র দিকগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। কোন একটি দিক যদি অপূর্ণ থাকে, তবে তাকে দীনদার ও পরহেজগার বলা যাবে না। মোটকথা, মুত্তাকী হল, সে লোক যে তার উপর অর্পিত সব দায়িত্ব ও ওয়াজিবসমূহ পালন করে। আর যেসব নিষিদ্ধ কাজ হতে তাদের বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা থেকে বিরত থাকে। এ ছাড়াও যাবতীয় সন্দেহ ও সংশয়যুক্ত বিষয় হতে তারা বিরত থাকে। সুতরাং, এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, দ্বীনদারি একটি ব্যাপক অর্থকে সামিল করে। একজন ব্যক্তি যখন ইসলামের আদেশ-নিষেধ ও হারাম-হালাল বেঁচে চলবে, তাকে মুত্তাকী বা পরহেজগার বলা হবে না। তাকে এর সাথে সাথে এমন সব বিষয় হতে বেঁচে থাকতে হবে, যেগুলোর বিষয়ে সরাসরি আদেশ নিষেধ না থাকলেও কিন্তু তার সাথে মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব জড়িত।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, যদি কোন ব্যক্তি একশটি বস্তু হতে নিজেকে বিরত রাখল, কিন্তু একটি হতে সে নিজেকে বিরত রাখতে সক্ষম হল না, তাহলে তাকে মুত্তাকী ও পরহেজগার বলা যাবে না [হুলিয়াতুল আওলিয়া ১৬৭.]। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, তোমরা পরিপূর্ণ দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ কর এবং পূর্ণ মুসলিম হও। এমন লোকদের মত হইয়ো না, যারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকেও খুশি রাখে এবং শয়তানকেও খুশি রাখে।
সুতরাং, মনে রাখতে হবে, মুত্তাকী হতে হলে, তাকে অবশ্যই যাবতীয় সব ধরনের অপরাধ থেকে বেচে থাকতে হবে। ছোট বড় কোন অপরাধ তার দ্বারা সংঘটিত হতে পারবে না। তবেই সে মুত্তাকী বা পরহেজগার বলে বিবেচিত হবে। এ ছাড়া একজন পরহেজগার বা দ্বীনদার লোক তাকে অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর সন্তুষ্টি অর্জনে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। তার থেকে যেন কোন নফল ইবাদতও যাতে না ছুটে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। তাকে হতে হবে একজন পরিপূর্ণ সুন্নাতের অনুসারী।
অনুরূপভাবে একজন লোককে মুত্তাকী বা পরহেজগার বলে আখ্যায়িত করতে হলে, তার আবশ্যক হল, যাবতীয় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেফাজত করা। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যাতে কোন প্রকার অপরাধে জড়িত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। পরহেজগার লোক তার অন্তর, লিসান, হাত, পা, চক্ষু ও কর্ণ সবকিছুকে মুত্তাকী বানাবে; অন্যথায় তাকে পরহেজগার বলা যাবে না। সুতরাং, যদি কোন ব্যক্তি তার কোন এক অঙ্গকে হেফাজত করল, আর বাকি অঙ্গ হেফাজত করল না, তাহলে তাকে দ্বীনদার ও পরহেজগার বলা যাবে না। যেমন- কোন ব্যক্তি অন্তরকে বাঁচিয়ে রাখল, কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অন্যায় অনাচার বা অপরাধ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারল না, তাহলে তাকে দ্বীনদার বলা যাবে না। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি তার লিসানকে হেফাজত করল, কিন্তু তার অন্যান্য অঙ্গকে যেমন- চোখ, কান, হাত, পা ইত্যাদিকে সে হেফাজত করতে পারল না, তাহলে তাকে দ্বীনদার ও পরহেজগার বলা যাবে না। সুতরাং, একজন মুসলিমকে এমন সব ধরনের কর্মকাণ্ড হতে বিরত থাকতে হবে, যেগুলো তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতির দিকে নিয়ে যায় এবং তার জন্য নিশ্চিত ধ্বংস ডেকে আনে। চাই সেগুলো চোখের কর্মকাণ্ড হোক বা হাত-পায়ের কর্মকাণ্ড। অনুরূপভাবে হাত, পা ও লজ্জা-স্থান ইত্যাদির কারণেও মানুষ নিশ্চিত ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে থাকে। সুতরাং মানুষের উপর কর্তব্য হল, তারা যাবতীয় অন্যায় ও অপকর্ম থেকে তার নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে হেফাজত করবে।
আর একটি কথা মনে রাখতে হবে, একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে বড় কঠিন ও কষ্টকর কাজ হল, জবানের হেফাজত করা এবং জবানকে বিভিন্ন ধরনের অন্যায়, অনাচার হতে বিরত রাখা। হাসান ইবন সালেহ রহ. বলেন, আমরা দ্বীনদারির অনুসন্ধান করে দেখতে পাই যে, জবান ছাড়া আর কোন কিছুতে তা এত দুর্বল নয়। জবানে দ্বীনদারির পরিমাণ একেবারেই কম [হুলিয়াতুল আওলিয়া ১৬৭.]।
আল্লামা ফুজাইল ইবন আয়াজ রহ. বলেন, সবচেয়ে বড় কঠিন পরহেজগারি ও দ্বীনদারি হল, মানুষের জবান [হুলিয়াতুল আওলিয়া ১৬৭.]। যে লোকের জবান ঠিক থাকবে তার অন্য সবকিছু এমনিতেই ঠিক থাকবে।
জুনাইদ রহ. বলেন, কথার মধ্যে দ্বীনদারি অবলম্বন করা অন্যান্য অঙ্গের বিষয়ে তাকওয়া বা দ্বীনদারি অর্জন করা হতে কঠিন [হুলিয়াতুল আওলিয়া ১৬৭.]।
আল্লামা ইসহাক ইবন খলফ রহ. বলেন, কথার মধ্যে পরহেজগারি ও দ্বীনদারি অবলম্বন করা স্বর্ণ, রুপা ও ধন-দৌলত বিষয়ে পরহেজগারি ও দ্বীনদারি অর্জন হতে অনেক কঠিন [তারিখে দামেশক ২০৫.]।