hadith book logo

গীবত থেকে বাঁচার উপায়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৪

পাপ সম্পর্কে মুমিনের অনুভূতি

প্রতিটি মুমিনের পাপকে ভয় করা উচিত। যেকোন পাপ কাজকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। যদি পাপ সংঘটিত হয়েই যায়, তবে তার মাঝে আল্লাহভীতির অনুভূতি জাগ্রত হওয়া উচিত। কিন্তু যারা এ অনুভূতিটুকুও অনুভব করে না তারা বড় ধরনের পাপীষ্ঠ।

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ حَدِيثَيْنِ اَحَدُهُمَا ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْاٰخَرُ عَنْ نَفْسِهٖ قَالَ اِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرٰى ذُنُوبَهٗ كَاَنَّهٗ قَاعِدٌتَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ اَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ وَاِنَّ الْفَاجِرَ يَرٰى ذُنُوبَهٗ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلٰى اَنْفِهٖ

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুমিন ব্যক্তি তার পাপসমূহকে এরূপ মনে করে, যেন সে পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং এমন ভয় পাচ্ছে যে, পাহাড়টি ভেঙ্গে তার উপর পড়ে যায় কি না! আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার পাপসমূহকে এরূপ মনে করে, যেন তার নাকের উপর মাছি বসে আছে এবং সে এটাকে হাত দ্বারা তাড়িয়ে দিল। (বুখারী হা: ৬৩০৮)

আলোচ্য হাদীস দ্বারা বুঝা গেল যে, পাপীষ্ঠ ব্যক্তি গুনাহকে সাধারণ বিষয় মনে করে থাকে। এটা তার মধ্যে কোন ভয় সৃষ্টি করে না। পক্ষান্তরে মুমিন ব্যক্তির পাপ সংঘটিত হয়ে গেলে অস্থির হয়ে পড়ে এবং এত ভয় পায় যে, সে মনে করে, এখনই তার উপর পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে। প্রকৃতপক্ষে মুমিনদের গুণ এগুলোই যা সাহাবাগণের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল।

সাহাবাগণ যেকোন পাপকে এমনভাবে ভয় করতেন যে, তাঁদের দ্বারা যদি কোন পাপকর্ম সংঘটিত হয়েই যেত তখন তাঁরা অস্থির হয়ে পড়তেন। এমনকি তাঁরা নবী ﷺ এর কাছে গিয়ে পাপের প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি পেতেন না।

عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ اَنَّ رَجُلاً مِنْ اَسْلَمَ جَاءَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاعْتَرَفَ بِالزِّنَا فَاَعْرَضَ عَنْهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم حَتّٰى شَهِدَ عَلٰى نَفْسِهِ اَرْبَعَ مَرَّاتٍ قَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَبِكَ جُنُونٌ قَالَ : لاَ قَالَ اٰحْصَنْتَ قَالَ نَعَمْ فَاَمَرَ بِهٖ فَرُجِمَ بِالْمُصَلَّى فَلَمَّا اَذْلَقَتْهُ الْحِجَارَةُ فَرَّ فَاُدْرِكَ فَرُجِمَ حَتّٰى مَاتَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْرًا وَصَلَّى عَلَيْهِ .

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আসলাম সম্প্রদায়ের এক লোক নবী ﷺ এর কাছে এসে বলল যে, সে ব্যভিচার করেছে। (এ কথা শুনে) তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সে ঘুরে গিয়ে নবী ﷺ এর সম্মুখে এসে নিজের বিরুদ্ধে চারবার (ব্যভিচারের) সাক্ষ্য দিল। তিনি লোকটিকে ডেকে বলেন, তুমি কি পাগল হয়েছ? সে বলল, না। নবী ﷺ বললেন, তুমি কি বিবাহিত? সে বলল, হ্যাঁ! অতঃপর নবী ﷺ লোকটিকে পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। যখন লোকটি মারা গেল তখন নবী ﷺ বললেন, এটাই তার জন্য মঙ্গল জনক। অতঃপর তিনি ﷺ তার জানাযা পড়লেন।

(বুখারী হা: ৬৮২০)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি কোন একজন অপরিচিতা নারীকে চুম্বন করে ফেলেন। তারপর রাসূল ﷺ এর নিকট এসে তার কৃতকর্মের কথা জানালে আললাহ তা‘আলা এ আয়াতটি নাযিল করেন-

اَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ اِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذٰلِكَ ذِكْرٰى لِلذَّاكِرِيْنَ

‘‘আর তুমি দিনের দু’প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে নামায কায়েম কর, নিশ্চয় সৎকর্ম পাপকর্মকে মিটিয়ে দেয়। উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য এটি একটি মহাউপদেশ।’’ (সূরা হূদ- ১১৪)

এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর সে ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এ উপহার কি শুধু আমার জন্য? তখন রাসূল ﷺ বললেন, আমার উম্মতের সকলের জন্য। (বুখারী হা: ৪৬৮৭, মুসলিম হা: ৭১৮০)

এ হাদীসে যার কথা বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন একজন ঈমানদার লোক। স্বেচ্ছায় তিনি কোন পাপ কাজ করতেন না। তারপরও মানুষ হিসেবে স্বাভাবিক প্রবৃত্তির তাড়নায় একদিন পথিমধ্যে একটি পাপকর্ম করে ফেলেন। এ পাপকর্ম ঘটে যাওয়ার পর তাঁর অনুভূতি ফিরে এল। তিনি তীব্র অনুশোচনা করতে লাগলেন। আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার উপায় বের করার আশায় রাসূল ﷺ এর নিকট এসে বললেন, ‘‘আমি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। আমার শাস্তি হওয়া চাই।’’ তাঁর পাপের বিবরণ শুনে রাসূল ﷺ সূরা হুদের এ আয়াতটি পাঠ করে শুনালেন। আয়াতের মধ্যে মুমিন ব্যক্তিকে দিনে রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায কায়েমের হুকুম দেয়া হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে, ‘‘নিশ্চয় সৎকর্ম পাপকে মিটিয়ে দেয়।’’ এ কথা শুনার পর তাঁর মনে শান্তি ফিরে এল এবং উদ্বেগ দূর হয়ে গেল।

এ হাদীস দ্বারা এটা পরিমাপ করা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাগণকে কত উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। যার ফলে তারা কোন পাপকাজ করে ফেললে অস্থির হয়ে যেতেন।

কতিপয় পাপের পার্থিব শাস্তি :

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّه ̒ قَالَ مَا ظَهَرَ الْغُلُوْلُ فِيْ قَوْمٍ قَطُّ إِلَّا أُلْقِيَ فِيْ قُلُوْبِهِمُ الرُّعْبُ وَلَا فَشَا الزِّنَا فِيْ قَوْمٍ قَطُّ إِلَّا كَثُرَ فِيْهِمُ الْمَوْتُ وَلَا نَقَصَ قَوْمٌ الْمِكْيَالَ وَالْمِيْزَانَ إِلَّا قُطِعَ عَنْهُمُ الرِّزْقُ وَلَا حَكَمَ قَوْمٌ بِغَيْرِ الْحَقِّ إِلَّا فَشَا فِيْهِمُ الدَّمُ وَلَا خَتَرَ قَوْمٌ بِالْعَهْدِ إِلَّا سَلَّطَ اللهُ عَلَيْهِمُ الْعَدُوَّ

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

১. কোন জাতির মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের প্রবণতা বেড়ে গেলে আল্লাহ তা‘আলা ঐ জাতির অন্তরে শত্রুর ভয় সঞ্চারিত করে দেন।

২. কোন জাতির মধ্যে যদি ব্যভিচার ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদের মধ্যে মৃত্যু বেড়ে যায়।

৩. যখন কোন জাতি মাপে ও ওজনে কম দেয় তখন আল্লাহ তাদের রিযিক কমিয়ে দেন।

৪. যে জাতি অন্যায়ভাবে শাসন ও বিচারকার্য চালায় তাদের মধ্যে খুন বেড়ে যায়।

৫. আর কোন জাতি বিশ্বাসঘাতকতা করলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের শত্রুকে তাদের উপর চাপিয়ে দেন। (মুয়াত্তা মালেক হা: ১৩২৩)