hadith book logo

শিরক

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৬

‘রিয়া’ এর ক্ষতিকর দিকসমূহ

নিমেণ ‘রিয়া’ এর কিছু ক্ষতিকর দিকসমূহ আলোচনা করা হলো:

১। ঈমান এবং তাওহীদ দূর্বল করে :

‘রিয়া’ এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্যকে নষ্ট করে, অর্থাৎ সত্যিকারভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের পরিবর্তে সে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাতের ভান করে।

২। ছোট আকারের শিরক :

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

اَلشِّرْكُ الْخَفِيُّ أَنْ يَقُوْمَ الرَّجُلُ يُصَلِّيْ فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهٗ لِمَا يَرٰى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ

গোপন শিরক হলো- এক ব্যক্তি সালাতে দাঁড়ায় এবং সে তার সালাতকে সুন্দর করে; কারণ সে দেখছে যে লোকজন তাকে লক্ষ্য করছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৪২০৪)

৩। পথভ্রষ্টতা বৃদ্ধি পায় :

কোন সন্দেহ নেই যে, যে ব্যক্তি ‘রিয়া’ করে তার অন্তরে রোগ আছে এবং যদি এই রোগ থেকে আরোগ্য না হয়, তাহলে এটা পরবর্তীতে সমস্যা সৃষ্টি করবে।

৪। কল্যাণমূলক কাজ থেকে বঞ্চিত হওয়া :

হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالٰى أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيْهِ مَعِىَ غَيْرِىْ تَرَكْتُهٗ وَشِرْكَهٗ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি সকল অংশীদার থেকে নিজেই সম্পূর্ণ যথেষ্ট, আমার কোনও অংশীদারের প্রয়োজন নেই। যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে, যার মধ্যে সে আমার সাথে অন্যকে অংশীদার করে, আমি তাকে এবং তার শিরককে প্রত্যাখ্যান করি। (সহীহ মুসলিম ৭৬৬৬)

৫। আল্লাহ্ কর্তৃক অবমাননা ও লাঞ্চনা :

হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ مَنْ سَمَّعَ النَّاسَ بِعَمَلِهٖ سَمَّعَ اللهُ بِهٖ سَامِعَ خَلْقِهٖ وَحَقَّرَهٗ وَصَغَّرَهٗ

আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করে, আল্লাহ তা‘আলা বিচার দিবসে তাঁর সকল সৃষ্টিলোকের সম্মুখে তাকে হীন ও অপদস্থ করবেন। (মুসনাদে আহমদ ৭০৮৫)

৬। জাহান্নামের আগুনে প্রবেশের জন্য প্রথম কারণ :

সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضٰى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأُتِىَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا قَالَ قَاتَلْتُ فِيْكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُّقَالَ جَرِىءٌ . فَقَدْ قِيْلَ . ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ حَتّٰى أُلْقِىَ فِى النَّارِ وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهٗ وَقَرَأَ الْقُرْاٰنَ فَأُتِىَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا قَالَ تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهٗ وَقَرَأْتُ فِيْكَ الْقُرْ اٰنَ . قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ عَالِمٌ . وَقَرَأْتَ الْقُرْ اٰنَ لِيُقَالَ هُوَ قَارِئٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ حَتّٰى أُلْقِىَ فِى النَّارِ . وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهٖ فَأُتِىَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا قَالَ مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيْلٍ تُحِبُّ أَنْ يُّنْفَقَ فِيْهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيْهَا لَكَ قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ هُوَ جَوَادٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ ثُمَّ أُلْقِىَ فِى النَّارِ

আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: ক্বিয়ামাতের দিন প্রথম এক শহীদ ব্যক্তির ব্যাপারে ফয়সালা দেয়া হবে। হাশরের ময়দানে তাকে পেশ করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তাকে দেয়া তার সকল নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। ফলে তার এসব নিয়ামতের কথা স্মরণ হয়ে যাবে। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে বললেন, তুমি এসব নিয়ামত পাওয়ার পর তার কৃতজ্ঞতা স্বীকারে কী কী কাজ করেছ? সে উত্তরে বলবে, আমি তোমার রাস্তায় (কাফিরদের বিরুদ্ধে) লড়াই করেছি, এমনকি আমাকে শহীদ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি লড়াই করেছো এজন্য যে, যাতে তোমাকে বীর বাহাদুর বলা হয়; এমনকি তা বলাও হয়েছে (তাই তোমার উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে)। তখন তার ব্যাপারে হুকুম দেয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে। তারপর দ্বিতীয় ব্যক্তি যে জ্ঞানার্জন করেছে, অন্যকে জ্ঞানের শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন পড়েছে, তাকে উপস্থিত করা হবে। তারপর তাকে দেয়া সব নিয়ামত তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে। ফলে এসব নিয়ামত তার স্মরণ হবে। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এসব নিয়ামতের জন্য তুমি কি শোকর আদায় করেছ? সে উত্তরে বলবে, আমি ‘ইলম অর্জন করেছি, মানুষকে ইলম শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার জন্য কুরআন পড়েছি। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তোমাকে যাতে আলিম অথবা ক্বারী বলা হয়, এজন্য তুমি এসব কাজ করেছো; এমনকি দুনিয়াতে তোমাকে এসব বলাও হয়েছে। তারপর তার ব্যাপারে হুকুম দেয়া হবে এবং মুখের উপর উপুড় করে টেনে হেচঁড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তৃতীয় ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন ধরনের মাল দিয়ে সম্পদশালী করেছেন। তাকেও আল্লাহর সামনে আনা হবে। তখন আল্লাহ তাকে দেয়া সব নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। ফলে এসব তারও মনে পড়ে যাবে। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এসব নিয়ামতের শুকরিয়া কি আমল দিয়ে আদায় করেছ? সে ব্যক্তি উত্তরে বলবে, আমি এমন কোন খাতে খরচ করা বাকী রাখিনি, যে খাতে খরচ করাকে তুমি পছন্দ কর। আল্লাহ তা’য়ালা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি খরচ করেছ এজন্য যে, যাতে মানুষ তোমাকে দানবীর বলে; এমনকি দুনিয়াতে তুমি সে খিতাব পেয়েও গেছো। তারপর তার ব্যাপারে হুকুম দেয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম ৫০৩২)

৭। আল্লাহ তা‘আলা-কে সিজদা করতে অক্ষম :

এটি লাঞ্চনার অন্য একরূপ। যারা লোক দেখানো ইবাদত করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তাঁকে সিজদা করা থেকে বিরত রাখবেন- যখন তারা তা করতে চাইবে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ سَعِيْدٍ قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ يَقُوْلُ يَكْشِفُ رَبُّنَا عَنْ سَاقِهٖ فَيَسْجُدُ لَهٗ كُلُّ مُؤْمِنٍ وَّمُؤْمِنَةٍ فَيَبْقٰى كُلُّ مَنْ كَانَ يَسْجُدُ فِي الدُّنْيَا رِيَاءً وَّسُمْعَةً فَيَذْهَبُ لِيَسْجُدَ فَيَعُوْدُ ظَهْرُهٗ طَبَقًا وَّاحِدًا

আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ যখন তার পেন্ডুলিকে (পায়ের নিম্নাংশ) প্রকাশ করবেন তখন সকল মু’মিন পুরুষ ও মহিলারা আল্লাহকে সিজদা করবে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি ব্যতিত, যে দুনিয়াতে মানুষদের দেখানোর জন্য সিজদা করত। অতঃপর সে সিজদা করতে চেষ্টা করবে, কিন্তু তার পিঠ শক্ত তখতার ন্যায় হয়ে যাবে। (সহীহ বুখারী ৪৯১৯)

৮। অভিশপ্ত কাজ :

হাদীসে এসেছে,

عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ إِذَا تَزِيْنُ الرَّجُلُ لِعَمَلِ الْاٰخِرَةِ وَهُوَ لَا يُرِيْدُهَا وَلَا يَطْلُبُهَا لَعَنَ فِيْ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِيْنَ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি পরলৌকিক আমলের ভূষণে ভূষিত হয়; অথচ পরলৌকিক কল্যাণ তার অভিষ্ট নয় বা পরকাল সে চায়ও না, আসমানে ও যমীনে তাকে অভিসম্পাত করা হয়। (মু’জামূল আউসাত ৪৭৭৬)