hadith book logo

রাফ‘উল মালাম সম্মানিত ঈমামগণের সমালোচনার জবাব

লেখকঃ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন আবদুল হালীম ইবন তাইমিয়্যাহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৯

শাস্তির হুমকি-ধমকি সংক্রান্ত ব্যাপক (عام) হাদীসের অনুরূপ বিশেষ (خاص) হাদীসেরও একই ধরণের বিধান:

অনুরূপভাবে [অর্থাৎ উপরোক্ত আলোচনাটি ছিল শাস্তির হুমকি-ধমকি সংক্রান্ত সাধারণ তথা ব্যাপক ( عام ) নির্দেশনা সংক্রান্ত। সেখানে মতভেদ থাকলেও শাস্তির ধমকি সংক্রান্ত বিধান কার্যকর হওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে সাব্যস্ত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে যেখানে শাস্তির হুমকি-ধমকির বিষয়ে ( خاص ) বিশেষ নির্দেশনা এসেছে সেখানেও মতভেদ থাকার কারণে তা কার্যকর হবে, যদিও অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে বা কোনো শর্তের অনুপস্থিত থাকার কারণে সেটা সুনির্দিষ্ট কারও ব্যাপারে কার্যকর হতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।] লা‘নত ও জাহান্নামের শাস্তি ইত্যাদি সংক্রান্ত বিশেষ হুমকি-ধমকি সম্বলিত দলীলসমূহও বিভিন্ন স্থানে এসেছে, যদিও তাতে আমলের ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

যেমন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَعَنَ اللَّهُ زَوَّارَاتِ الْقُبُورِ» «وَالمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا المَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ»

“বেশি বেশি কবর যিয়ারতকারিণী মহিলা, কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণকারী এবং কবরের ওপর বাতি প্রজ্জলনকারীদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপ”। ইমাম তিরমিযী এটাকে ‘হাসান’ হাদীস বলেছেন। [শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহেমাহুল্লাহ যেভাবে বলেছেন, মূলত তিরমিযীতে হাদীসটি এভাবে নয়। তিরমিযীতে হাদীসটির শব্দ হচ্ছে, «لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ القُبُورِ، وَالمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا المَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ» যার অর্থ হচ্ছে, “মেয়েদের মধ্যে যারা কবর যিয়ারত করে এবং আর অন্যান্য যারাই কবরগুলোকে মসজিদ বানায় ও তাতে বাতি লাগায় তাদের সবাইকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা‘নত করেছেন”। যা সনদের দিক থেকে শাইখুল আলবানীর নিকটি দুর্বল বর্ণনা। তবে শাইখ ওপরে যে শব্দ ব্যবহার করেছেন তার প্রথম অংশ কেবল মুসনাদে তায়ালাসীতেই এসেছে। অন্য অংশ সহ সেটি বাইহাকীতে এসেছে। প্রথম অংশের অপর শব্দ হচ্ছে, «أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ زَوَّارَاتِ القُبُورِ» “রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা‘নত করেছেন বেশি বেশি কবর যিয়ারতকারীনী মহিলাদেরকে”। মোটকথা, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ উল্লিখিত হাদীসের প্রথম অংশের সনদ হাসান। দ্বিতীয় অংশের সনদ দুর্বল।]

অথচ মেয়েদের জন্য কবর যিয়ারতকে কেউ অনুমতি দিয়েছেন, আবার কেউ মাকরূহ বলেছেন, হারাম বলেন নি।

অনুরূপভাবে উক্কবাহ ইবন আমের রাদিয়াল্লাহুর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি “সে সকল লোকদের লা‘নত করেছেন, যারা স্ত্রীলোকের পিছনের রাস্তায় সঙ্গম করে” [মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবন মাজাহ।]।

তদ্রূপ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসও তার উদাহরণ। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«الْجَالِبُ مَرْزُوقٌ، وَالْمُحْتَكِرُ مَلْعُونٌ»

“যে দ্রব্যাদি বিক্রয়ের জন্য বাজারে নিয়ে যায়, আল্লাহ কর্তৃক সে রুজিপ্রাপ্ত হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মালামাল বাজারজাত না করে মওজুদ করে রেখে দেয়, সে অভিশপ্ত। [সহীহ মুসলিম, ইবন মাজাহ।]”

তাছাড়া অন্য তিন ব্যক্তি সংক্রান্ত হাদীস, যাদের কথা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের সাথে কিয়ামতের দিবসে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের প্রতি তাকাবেন না ও তাদেরকে গুনাহ হতে পবিত্র করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি হলো, যে অতিরিক্ত পানি প্রদান হতে মানুষকে নিষেধ করে।

অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরাব বিক্রেতাকে অভিশাপ দিয়েছেন। অবশ্য পূর্ববর্তীগণের কেউ কেউ শরাব (মদ) (কাফেরদের কাছে) বিক্রি করেছেন।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিভিন্ন পন্থায় সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি অহঙ্কারপূর্বক পায়ের গিরার নিচে কাপড় পরিধান করে, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত দিবসে তার প্রতি তাকাবেন না [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ।]।”

তাছাড়া রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের প্রতি তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না, বরং তাদের জন্য ভীষণ শাস্তি রয়েছে। তারা হলো, যে গিরার নিচে কাপড় পরিধান করে, দানের বিনিময়ে বদলা আশা করে (বা খোটা দেয়) এবং মিথ্যা শপথ করে নিজস্ব দ্রব্য বাজারে বিক্রয় করে [সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবন মাজাহ।]।” এতদসত্ত্বেও, কতিপয় আলিম ও ফকীহ্‌ অহংকার করে গিরার নীচে কাপড় পরিধান করাকে মাকরূহ মনে করেন, হারাম বলেন না।

তদ্রূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেন: “পরচুলা পরিহিতা স্ত্রীলোক এবং পরচুলা তৈরিকারী স্ত্রী লোকের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার লা‘নত বা অভিশাপ” [আহমদ, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।]। এটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ সহীহ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। এতদসত্ত্বেও পরচুলা গ্রহণের ব্যাপারে আলিমগণের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্‌র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, “যে ব্যক্তি, রুপার পাত্রে পান করে, তার পেটে জাহান্নামের অগ্নি প্রবেশ করবে” [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।] অথচ কতিপয় আলিম এ কাজকে হারাম বলেন নি [অর্থাৎ উপরোক্ত মাসআলাগুলো খাস বা নির্দিষ্ট লোকদেরকে লা‘নত করা হয়েছে। আবার ব্যাপক লোকদেরকেও লা‘নত করা হয়েছে, তা সত্ত্বেও কোনো কোনো আলেম তা হারাম বলেন নি। সেটাতে তাদের হয়ত কোনো ওযর আছে। কিন্তু কাজগুলো আসলে হারাম এবং এর কারণে অন্যান্যদের বেলায় শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে সে সব আলিম বিভিন্ন কারণে শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে। মতপার্থক্য আছে বলেই সেটা হারাম হবে না বা সেগুলোতে উল্লেখিত শাস্তি প্রযোজ্য হবে না, এমনটি বলা যাবে না। তাই মতপার্থক্য হলেও হাদীস বিশুদ্ধ হলে (খবরে ওয়াহেদ হলেও) সেখানে যে শাস্তির কথা রয়েছে যে এ ধরনের কাজ করবে তাকে সে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। (যদি না তা বাস্তবায়নে কোনো প্রতিবন্ধক আসে, বা কোনো শর্ত পূর্ণতা না পায়)। [সম্পাদক]]।