hadith book logo

মন দিয়ে নামায পড়ার উপায়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৫

তাহাজ্জুদ নামাযের ফযীলত ও উপকারিতা

তাহাজ্জুদ নামাযের অনেক গুরুত্ব ও ফযীলত রয়েছে। কুরআন মাজীদে ফরয নামাযের পর সবচেয়ে বেশি তাহাজ্জুদ নামাযের আলোচনা এসেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা তাহাজ্জুদ নামাযের নির্দেশ প্রদান করে বলেন,

﴿وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهٖ نَافِلَةً لَّكَۗ عَسٰىۤ اَنْ يَّبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا﴾

রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, এটা তোমার জন্য একটি অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে। (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭৯)

আল্লাহর নেক বান্দারা সিজদারত অবস্থায় রাত কাটায় :

﴿وَالَّذِيْنَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا﴾

তারা তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দন্ডায়মান অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করে। (সূরা ফুরক্বান- ৬৪)

শেষ রাতে ইবাদাত করা জান্নাতী লোকদের বিশেষ গুণ :

﴿اَلصَّابِرِيْنَ وَالصَّادِقِيْنَ وَالْقَانِتِيْنَ وَالْمُنْفِقِيْنَ وَالْمُسْتَغْفِرِيْنَ بِالْاَسْحَارِ﴾

তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, আনুগত্যশীল, (আল্লাহর পথে) দানকারী এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী। (সূরা আলে ইমরান- ১৭)

﴿تَتَجَافٰى جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَّطَمَعًا وَّمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ ‐ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّاۤ اُخْفِيَ لَهُمْ مِّنْ قُرَّةِ اَعْيُنٍۚ جَزَآءً ۢبِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ﴾

তাদের দেহ বিছানা থেকে এমনভাবে আলাদা হয়ে যায় যে, তারা তাদের প্রতিপালককে আহবান করতে থাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। কেউই জানে না যে, তাদের কৃতকর্মের প্রতিদানস্বরূপ তাদের জন্য নয়ন জুড়ানো কী কী সামগ্রী লুকিয়ে রাখা হয়েছে। (সূরা সাজদা- ১৬, ১৭)

﴿اِنَّ الْمُتَّقِيْنَ فِيْ جَنَّاتٍ وَّعُيُوْنٍ ‐ اٰخِذِيْنَ مَاۤ اٰتَاهُمْ رَبُّهُمْؕ اِنَّهُمْ كَانُوْا قَبْلَ ذٰلِكَ مُحْسِنِيْنَ ‐ كَانُوْا قَلِيْلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ ‐ وَبِالْاَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ﴾

সেদিন মুত্তাক্বীরা জান্নাত ও ঝর্ণার মধ্যে থাকবে, যা তাদের প্রতিপালক তাদেরকে প্রদান করবেন; তা তারা গ্রহণ করবে। নিশ্চয় তারা ইতিপূর্বে সৎকর্মপরায়ণ ছিল। তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রাবস্থায় অতিবাহিত করত এবং রাত্রির শেষ প্রহরে ক্ষমাপ্রার্থনা করত। (সূরা যারিয়াত : ১৫-১৮)

আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক রাতের দুই তৃতীয়াংশের পর প্রথম আকাশে নেমে আসেন :

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক রাতের দুই তৃতীয়াংশের পর প্রথম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব, কে আমার নিকট চাইবে আমি তাকে দান করব, কে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করব। [মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৪৯৮; সহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮০৮।]

ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো মধ্য রাতের নামায :

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, ফরয নামাযের পর সবচেয়ে উত্তম নামায কোন্টি এবং রমাযান মাসের সিয়ামের পর সবচেয়ে উত্তম সিয়াম কোন্টি? উত্তরে তিনি বলেন, ফরয নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হলো মধ্য রাতের নামায। আর রমাযান মাসের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সিয়াম হলো মুহাররম মাসের সিয়াম। [সহীহ মুসলিম, হা/২৮১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮০১৩; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১১৩৪।]

রাতে জাগ্রত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করলে শয়তানের গিঁঠ খুলে যায় :

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন শয়তান তার ঘাড়ের পেছনে তিনটি গিঁঠ দেয়। প্রতিটি গিঁঠে সে এই বলে চাপড়ায়- তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব তুমি শুয়ে থাকো। অতঃপর সে যদি জাগ্রত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, একটি গিঁঠ খুলে যায়। পরে অযু করলে আরো একটি গিঁঠ খুলে যায়। অতঃপর নামায আদায় করলে আরো একটি গিঁঠ খুলে যায়। তখন তার সকাল হয় উৎফুল্ল মনে ও অনাবিল চিত্তে। অন্যথায় সে সকালে উঠে কলুষতা ও আলস্য সহকারে। [মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হা/৪২৪; সহীহ বুখারী, হা/১১৪২; সহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৫; আবু দাউদ, হা/১৩০৮; নাসাঈ, হা/১৬০৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৩০৬; ইবনে মাজাহ, হা/১৩২৯; মিশকাত, হা/১২১৯।]

পূর্ববর্তী সকল নেক বান্দাদের অভ্যাস ছিল তাহাজ্জুদের নামায পড়া :

আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা তাহাজ্জুদ নামায আদায়ে অভ্যাসী হও। কারণ তা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক বান্দাদের অভ্যাস ছিল, এটা তোমাদের প্রভুর নৈকট্য লাভের উপায়, পাপ মোচনকারী এবং গোনাহ থেকে বিরতকারী আমল। [তিরমিযী, হা/৩৫৪৯; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/১১৩৫।]

নবী ﷺ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন :

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ রাত্রিকালীন নামাযে এত দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর পদযুগল বা পায়ের গোছা ফুলে যেত। একদা আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- কেন আপনি এতক্ষণ ধরে নামায আদায় করছেন, অথচ আপনার পেছনের এবং সামনের সব গোনাহ তো ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, তাই বলে কি আমি একজন শুকরিয়া আদায়কারী বান্দা হব না? [সহীহ বুখারী, হা/৪৮৩৭; সহীহ মুসলিম, হা/৭৩০২-০৪; তিরমিযী, হা/৪১২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৮৮৮; মিশকাত, হা/১২২০।]

বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আগের এবং পরের সব গোনাহ আল্লাহ রাববুল আলামীন ক্ষমা করে দিয়েছেন। তারপরও তিনি আবাসে-প্রবাসে কখনই তাহাজ্জুদ নামায আদায় থেকে বিরত থাকেননি। যদি কখনো কোন কারণে রাত্রে এ নামায বাদ পড়ত, তাহলে তিনি তা দিনের বেলা কাযা আদায় করে নিতেন।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসকল মুসলিম তাহাজ্জুদের সময় জাগ্রত হয়, তারা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় না। সুতরাং নৈরাশ্য রোগের অন্যতম চিকিৎসা হলো তাহাজ্জুদের সময় জাগ্রত হওয়া। উক্ত সময় যিকির-আযকার করা, নামায আদায় করা, কুরআন বুঝে বুঝে পড়া, জ্ঞান চর্চা করা ইত্যাদি আমলসমূহের মধ্যে কত যে উপকার ও বরকত রয়েছে তা বাস্তবে আমল না করা পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারবে না।