hadith book logo

তাওহীদ পুনরুদ্ধার

লেখকঃ আবদুল্লাহ্‌ আল কাফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৮

মক্কার কাফেরদের ঈমান ও ইবাদতঃ

সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)কে আল্লাহ্‌ এমন জাতির কাছে প্রেরণ করেছিলেন, যারা আল্লাহকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বিশ্বাস করত, বিশ্বাস করত যে তিনিই সৃষ্টিকর্তা, হায়াত-মওতের মালিক, রিযিকদাতা, বৃষ্টিদাতা, তিনিই আরশের মালিক, তিনিই আশ্রয়দাতা। শুধু তাই নয় কাফেররা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত, তাঁর ইবাদত করত, কাবা ঘরের তওয়াফ ও সাফা-মারওয়া সাঈ করত, হজ্জ করত, দান-সাদকা করত। কিন্তু এত কিছুর পরও তারা কিছু লোককে তাদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতা নির্ধারণ করত। তারা যুক্তি পেশ করত যে, আমরা এই মধ্যস্থতাকারী লোকদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য চাই, আল্লাহর কাছে পৌঁছতে চাই। তারা আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন। এমনকি কাফেররা যে সকল মূর্তীর পূজা করত তারা সকলেই স্বীকার করত যে, এ মূর্তীগুলো সকলেই আল্লাহর রাজত্ব, কর্তৃত্ব ও আয়ত্বের মধ্যে।

আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান কেমন ছিল তার পরিচয় আল্লাহ্‌ পাক পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেনঃ

قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمْ مَنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ

(হে নবী ) আপনি তাদের জিজ্ঞেস করুনঃ কে তিনি, যিনি তোমাদেরকে আসমান ও যমিন হতে রিযিক পৌঁছিয়ে থাকেন? অথবা কে তিনি, যিনি কর্ণ ও চক্ষুসমূহের উপর পূর্ণ অধিকার রাখেন? আর তিনি কে, যিনি জীবন্তকে প্রাণহীন থেকে বের করেন, আর প্রাণহীনকে জীবন্ত হতে বের করেন? আর তিনি কে যিনি সমস্ত কাজ পরিচালনা করেন? তখন অবশ্যই তারা বলবে যে, (এসব কিছু একমাত্র) আল্লাহই (করে থাকেন)। অতএব আপনি বলুনঃ তবে কেন তোমরা শিরক হতে বেঁচে থাকছো না?চ (সূরা ইউনুসঃ ৩১)

আল্লাহ্‌ আরো বলেন,

قُلْ لِمَنِ الْأَرْضُ وَمَنْ فِيهَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ، سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ، قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ، قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ، سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ

(হে নবী ) আপনি কাফেরদের জিজ্ঞেস করুন, তোমাদের যদি জ্ঞান থাকে, তবে বল তো এই পৃথিবী এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা কার অধিকারে? তৎক্ষণাত তারা জবাবে বলবেঃ আল্লাহর অধিকারে। বলুন, তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? তাদেরকে আরো জিজ্ঞেস করুন, কে সপ্তাকাশ ও মহা আরশের অধিপতি? তারা জবাব দিবে, আল্লাহই এর অধিপতি। বলুন, তারপরও কি তোমরা সাবধান হবে না? ওদেরকে আরো প্রশ্ন করুন, তোমরা যদি জানো তবে বল তো, সবকিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে, যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যাঁর উপর কেউ আশ্রয়দাতা নেই? তারা বলবে, এসব কিছুর কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। আপনি তাদেরকে বলুন, এরপরও কেমন করে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো?চ (সূরা মু'মেনূনঃ ৮৪-৮৯) [. এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের এই আয়াতগুলোও দেখা যেতে পারে যে আল্লাহর উপর কাফেরদের কোন ঈমান ছিল কি না? সূরা ইউনুসঃ ৩১, আনকাবূতঃ ৬১, লোকমান ২৫, যুমারঃ ৩৮, যুখরুফঃ ৯ ও ৩৮।]

সূরা ফীলের তাফসীর পড়লে আমরা বুঝতে পারি আবরাহা বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য মুশরিকরা কিভাবে বিষয়টিকে মহান আল্লাহর উপর ন্যস্ত করেছিল। কি দৃঢ় বিশ্বাস ও অগাধ আস্থা ছিল তাদের আল্লাহর উপর। বলেছিল, আল্লাহর ঘর আল্লাহই রক্ষা করবেন। এখানে আমাদের করণীয় কিছু নেই।

শুধু তাই নয়, মুশরিকরা হজ্জের মওসুমে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধত তালবিয়া পড়ত। তাদের তালবিয়ার বাক্য ছিল এরূপঃ লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারীকা লাকা, ইল্লা শারীকান্‌ হুওয়া লাকা, তাম্‌লেকুহু ওয়ামা মালাক। (আমি হাজির, আমি হাজির হে আল্লাহ্‌, আমি হাজির, তোমার কোন শরীক নেই, তবে তোমার সেই শরীক ব্যতীত- তুমি যার মালিক এবং সে যা কিছুর মালিক তুমি তারও মালিক।) [. দেখুন ইবনে আববাস (রাঃ) এর বর্ণনায় সহীহ্ মুসলিমে অনুচ্ছেদ: ‘তালবিয়া ও তার পদ্ধতি’ হা/ ২০৩২।]

তারা হজ্জ করত বলেই তো প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) হাজীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার ফলশ্রুতিতে মদীনা (ততকালিন ইয়াছরেব) থেকে মুশরেক অবস্থায় হজ্জ করতে এসে কতিপয় গোপনে নবীজীর দাওয়াত পেয়ে মুসলমান অবস্থায় নিজ দেশে ফেরত গিয়েছেলেন। তাদের দ্বারাই ইসলামী সমাজের বীজ বপন হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ইসলামী রাষ্ট্রের মহিরূহ আকারে নবীজীর হিজরতের পর প্রকাশ পেয়েছিল।