hadith book logo

তাওহীদ পুনরুদ্ধার

লেখকঃ আবদুল্লাহ্‌ আল কাফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪২

গ) মারেফতের পীরগণ বাহ্যিকভাবে ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান মানতে বাধ্য নন! ঘ) আল্লাহর শানে বেয়াদবী মূলক কথা মুখে উচ্চারণ করলেও মারেফতের পীরদের কোন অপরাধ নেই!

আল্লাহর বান্দারা সবাই এক সমান। সবাইকে আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রাসূলের বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। শুধুমাত্র তিন শ্রেণীর মানুষের উপর থেকে হিসাবের কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে। তাছাড়া সকলেই বাহ্যিকভাবে ও আভ্যন্তরীন ভাবে ইসলামী শরীয়তের বিধি-নিষেধ মানতে বাধ্য। উক্ত তিন শ্রেণী হচ্ছেঃ শিশু যতদিন না সে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়, পাগল- যতক্ষণ না তার সুস্থ বিবেক ফিরে আসে এবং ঘুমন্ত ব্যক্তি- যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়। [. আলী (রাঃ) থেকে আবু দাউদ ও তিরমিযী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।]

চরমোনাই পীর মাওলানা এছহাক সাহেবের কথা অনুযায়ী শামসুত্‌ তাবরিজী সাহেব পাগল ছিলেন। তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ্‌ পাকের দেওয়ানা বান্দাগণ এশ্‌কের চরম হালতে অন্তরের ভারসাম্য হারাইয়া একপ্রকার বেহুশ অবস্থায় কদাচিৎ এরূপ বলিয়া ফেলেন।... তাই আল্লাহ্‌ পাকের নিকট তাহা অপরাধ বলিয়া গণ্য হয়না। তাহলে তো পাগলের উপর শরীয়তের বিধি-নিষেধ প্রজোয্য হয় না। পীর সাহেব স্বীকার করেছেন যে, এধরনের কথা বলা আমাদের মত সাধারণ লোকদের জন্য পরিস্কার কুফরি বলিয়া গণ্য হইবে। তাই পাগল বা বেহুশের মুখ থেকে শির্কী-কুফরী কথা, আল্লাহর শানে বেয়াদবী মূলক কথা বের হলে বা যে কোন কাজ করলে তাতে অপরাধ হবে না। তার জন্য কলম ধরা হবে না- তার কোন গুনাহ লেখা হবে না। অতএব কিভাবে বাদশাহ্‌ শরীয়তের দোহাই দিয়ে বললেন, আপনি শেরেক করিয়াছেন, সেই অপরাধে আপনার শরীরের সমস্ত চামড়া খসাইয়া ফেলিতে হইবে? অথচ বাদশাহ্‌ মূর্খ ছিলেন না। চরমোনাই পীর সাহেবের উক্তি মতে বাদশা ছিলেন খাঁটি মুসলমান। পীর সাহেবের কথামতে আল্লাহ্‌ পাকের নিকট অপরাধ বলে গণ্য না হওয়ার পরও কিভাবে বাদশাহ তাকে শাস্তি দিতে চাইলেন? আর তাবরিজী সাহেবও বাদশার কথার প্রতিবাদ না করে শরীয়ত মেনে নিয়ে বিবেক বর্জিত কাল্পনিক হাস্যকর একটি কাজ করলেন- নিজের শরীরের চামড়া নিজে খুলে দিয়ে দিলেন? এথেকেই বুঝা যায় তিনি পাগল ছিলেন না- সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ ছিলেন।

আসলে (চরমোনাই) পীর সাহেব বুঝাতে চেয়েছেন যে, শরীয়ত ও মারেফত দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। শরীয়তী ধর্মে যা অপরাধ মারেফতী ধর্মে তা অপরাধ নয়। অর্থাৎ মারেফতী মতে উনি (তাবরিজী সাহেব) কোন অপরাধ করেননি কিন্তু শরীয়তী মতে অপরাধ করেছেন।

তাহলে প্রশ্ন উঠেঃ আল্লাহর কাছে কি নিয়ম দুরকম? তাঁর নিকট যা অপরাধ বলে গণ্য নয় শরীয়তে মুহাম্মাদীতে তা অপরাধ বলে গণ্য? কি আশ্চর্য সংঘর্ষময় কথা? তাহলে কি শরীয়তে মুহাম্মাদী যালেম-অত্যাচারী? নিরাপরাধকেও শাস্তি দেয়? নাকী এই শরীয়ত অন্য আল্লাহ্‌ থেকে এসেছে? (নাউযুবিল্লাহ্‌) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর শরীয়ত তাহলে আল্লাহর ওলীদেরকে চেনে না, তাদেরকে সম্মান দিতে জানে না? ইহুদী-খৃষ্টান কাফের-মুশরেকরা এঘটনা পড়ে কি বলবে না যে, মুহাম্মাদের ধর্মে আল্লাহর ওলীদের সম্মান দেয়া হয় না, তাদের উপর অত্যাচার করা হয়? এর কোন জবাব আছে কি জনাব চরমোনাই পীর সাহেবের কাছে বা তার মুরীদদের কাছে?

নাকী তাবরিজী সাহেব অন্য কোন ধর্মে আল্লাহর পাগল ছিলেন বা অন্য নবীর উম্মত ছিলেন, তাই তার পাগলামী মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ধর্মে গ্রহণীয় হয়নি, তাকে শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে? আল্লাহ্‌ বলেনঃ

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الإسْلاَمِ دِيْناً فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوِ فِيْ الآخِرَةِ مِنَ الْخاَسِرِيْنَ

যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের অম্বেষণ করবে তার থেকে তা গ্রহণ করা হবে না। আর সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভূক্ত হবে। (সূরা আলে ইমরানঃ ৮৫)

চরমোনাই পীর সাহেব ঘটনায় উল্লেখিত তাবরীজী সাহেবের আল্লাহর শানে বেয়াদবী মূলক আচরণের অযুহাত দেখাতে গিয়ে পিতার সাথে নিস্পাপ শিশুর বেয়াদবীর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ যেরূপ শিশু যদি পিতার মুখে থাপ্পড় মারে কিংবা দাড়ি ছিড়িয়া ফেলে, পিতার নিকট তাহা পীড়াদায়ক হয়না বরং তাহাতে আরো মহব্বতের জোয়ার উঠে।

এই উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি পরক্ষোভাবে তাবরীজী সাহেবের আল্লাহর শানে বেয়াদবীকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তার এই স্বীকারোw³ মোতাবেক কিন্তু তাবরীজী সাহেব কাফের প্রমাণিত হয়ে যায়। কিন্তু তাকে বাঁচাতে গিয়ে পীর সাহেব এমন একটি উদাহরণ পেশ করেছেন যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ কোন শিশু যখন পিতার মুখে থাপ্পড় মারে বা দাড়ী ছিড়ে তখন সে না বুঝেই তা করে থাকে। তার এই অনুভুতি নেই বা জ্ঞান নেই যে পিতার শানে এধরণের আচরণ চরম বেয়াদবী- অনেক বড় অন্যায়। একারণে পিতাও তার এ কাজকে অপরাধ মনে করেন না। তার হুঁশ হয়নি একথা বলে তাকে ক্ষমা করে দেন, আদর-সোহাগ করেন। আমরা পূর্বে হাদীছ উল্লেখ করেছি যে, শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তার কোন অপরাধই লিপিবদ্ধ করেন না। অতএব পিতা কিরূপে তার অপরাধ ক্ষমা না করে পারেন?

এখন প্রশ্ন তাবরীজী সাহেব কি ঐ শিশুর মত অনুভুতিহীন, অজ্ঞান ও হুঁশহারা যে আল্লাহর শানে তার বেয়াদবী মূলক আচরণ অপরাধ বলে গণ্য হবে না?