১
তাওহীদ পুনরুদ্ধার
লেখকঃ আবদুল্লাহ্ আল কাফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৩
৩- নেক লোকের দুআর উসীলা করাঃ
অর্থাৎ এমন একজন নেক ব্যক্তির কাছে দুআর আবেদন করা যিনি জীবিত আছেন এবং তিনি দুআর আবেদনকারীর সামনে উপস্থিত আছেন। মৃত কোন নবী বা ওলীর কাছে যেমন দুআর আবেদন রাখা যাবে না অনুরূপ জীবিত কিন্তু অনুপস্থিত এরকম কোন ওলী-আউলিয়ার কাছেও দুআর আবেদন করা যাবে না।
আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে দুর্ভিক্ষ দেখা গেল। তিনি একদা জুমআর দিন খুতবা দিচ্ছিলেন এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে প্রবেশ করল। সে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সম্মুখে দন্ডায়মান হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (বৃষ্টির অভাবে) সম্পদ বিনষ্ট হয়ে গেল, পরিবার-পরিজন ক্ষুধার্থ হয়ে গেল (অন্য বর্ণনায়, ঘোড়া, ছাগল মারা যাওয়ার উপক্রম হল।) তাই আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করুন। তিনি দুহস্ত উপরে উত্তোলন করলেন। এমনকি আমি তাঁর বগলের শুভ্র অংশ দেখতে পেলাম। তিনি দুআ করলেন, হে আল্লাহ্ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন! হে আল্লাহ্ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন!! হে আল্লাহ্ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন!!! লোকেরাও তাঁর সাথে হাত উঠিয়ে দুআ করলেন। [এসময় তিনি চাদর উল্টিয়েছেন কিম্বা কিবলামুখী হয়েছেন এরকম কথা বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়নি।] তিনি বলেন, আল্লাহ্র শপথ আমরা আকাশে ছোট-বড় কোন ধরণের মেঘমালা দেখিনি। আামদের এবং সালা পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে বাড়ী-ঘরের উপর মেঘমালার কোন কিছুই ছিলনা। আকাশ ছিল কাঁচের মত পরিস্কার। তিনি বলেন, ধনুকের মত মেঘমালা পাহাড়ের পিছনে দেখা গেল। তা আকাশের মাঝমাঝি স্থানে পৌঁছেই ছড়িয়ে পড়ল এবং বৃষ্টি হতে লাগল। আল্লাহ্র শপথ বৃষ্টি বন্ধ হল না বরং মেঘমালা পাহাড়ের বিশাল আকার ধারণ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করার পূর্বেই মুষল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হল, আমি দেখলাম বৃষ্টির পানি তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়ি মোবারক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করে সালাত আদায় করলেন। আমরা পানি ভেঙ্গে বাড়ি পৌঁছলাম। (অন্য বর্ণনায় রয়েছে, অধিক বৃষ্টির কারণে বাড়ী পৌঁছতে আমাদের কষ্ট হচ্ছিল।) সেই দিন, পরবর্তী দিন, তার পরবর্তী দিন এভাবে পরের জুমআ পর্যন্ত বিরামহীন বৃষ্টি হল, এমনকি মদীনায় বন্যা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। (অন্য বর্ণনায়, আল্লাহ্র শপথ আমরা ছয় দিন সূর্য দেখিনি।) পরবর্তী জুমআয় উক্ত গ্রাম্য ব্যক্তি অথবা অন্য একজন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! -তিনি তখন খুতবা দিচ্ছিলেন- বৃষ্টির পানিতে তো ঘর-বাড়ি ধ্বসে পড়ল রাস্তা-ঘাট বন্ধ হয়ে গেল, মাল-সম্পদ ডুবে গেল, পশু-পাখি ধ্বংস হয়ে গেল। তাই বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুচকী হাঁসলেন। তারপর দুহাত উত্তোলন করে দুওআ করলেন, হে আল্লাহ্! আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, ইল্ব্লপষ ঊভষ বুঁ হে আল্লাহ্! পাহাড়ের চুঁড়ায়, বধ্য ভুমিতে, ছোট ছোট টিলার উপর, উপত্যকায়, গাছ-পালায়। তিনি একদিকে ইঙ্গিত করতেই মেঘমালা সেদিকে সরে গেল এবং আকাশ পরিস্কার হয়ে গেল। মদীনার চতুর্পার্শ্বে বৃষ্টি হতে থাকল। দেখে মনে হচ্ছিল মদীনা যেন একটি প্রশস্থ গর্ত। এক ফোটা পানিও মদীনায় পড়ল না। আমরা সূর্যের রোদের মধ্যে মসজিদ থেকে বের হলাম। আল্লাহ্ তাঁর নবীর কারামত দেখালেন এবং তাঁর দুওআ কবুল করলেন। প্রায় একমাস উপত্যকা সমূহে পানি প্রবাহিত হতে থাকল। যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউই এল সবাই মুষলধারে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কথা বলতে থাকল। (সহীহ্ বুখারী)
এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হল যে, সাহাবীরা (রাঃ) নবীজীর কাছে উপস্থিত হয়ে তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি যেন তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করেন এই আবেদন করেছেন। কিন্তু নবীজীর মৃত্যুর পর তাঁরা আর নবীজীর কবরের কাছে দাঁড়িয়ে তাদের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন নি এবং তাঁর কাছে দুআরও আবেদন রাখেননি।
আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ওমার বিন খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খেলাফতকালে দুর্ভিক্ষের সময় আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের দুআর মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতেন। তিনি দুআয় বলতেন, হে আল্লাহ্ আমরা ইতোপূর্বে আমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাধ্যমে তোমার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করতাম, তুমি আমাদেরকে বৃষ্টি প্রদান করতে। এখন আমাদের নবীর চাচা (আব্বাসের) মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি প্রদান করুন। (সহীহ বুখারী)
শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেনঃ এর অর্থ হচ্ছে, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট যেতাম, তাঁকে অনুরোধ করতাম দুওআ করার জন্য। এখন তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন, সুমহান বন্ধুর দরবারে চলে গেছেন। তিনি আমাদের জন্য দুওআ করবেন এটা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা নবী এর চাচা আব্বাসের স্মরণাপন্ন হয়েছি, তাঁকে অনুরোধ করছি, তিনি আমাদের জন্য দুওআ করবেন। [. দ্রঃ আত্তাওয়াস্সুল আন্ওয়াউহু ও আহ্কামুহু- আলবানী ৪৪ পৃঃ।]
নেক লোকের উসীলা করা বৈধ হলে তো সাহাবীদের আব্বাস (রাঃ)এর কাছে যাওয়ার প্রশ্নই উঠত না। অথবা আগের হাদীছে অনাবৃষ্টির জন্যে লোকদের নবীজীর কাছে উপস্থিত হয়ে দুআর আবেদন করারও দরকার ছিল না, নিজেরা ঘরে বসে নবীজীকে উসীলা করে দুআ করলেই হত। কিন্তু এরূপ প্রমাণ আমরা সাহাবীদের (রাঃ) আমল থেকে পাই না।
এজন্যে একজন মুমিন আরেক মুমিনের জন্যে সর্বোচ্চ যা করতে পারেন তা হচ্ছে তিনি তার জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করবেন। এই দুআ যে কেউ যে কারো জন্যে করতে পারে। কিন্তু একথা বলার অধিকার কারো নেই যে, আমি তোমাকে আল্লাহর কাছে মাফ করিয়ে দিব বা তাঁর দরবারে কবুল করিয়ে দিব। কেননা কাউকে মাফ করা না করা, কবুল করা না করা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি যাকে ইচ্ছা কবুল করতে পারেন, যাকে ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। তাঁর উপর দাবী করার মত কারো কোন অধিকার নেই। কেননা فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। (সূরা বুরূজঃ ১৬) لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তাঁকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। কিন্তু তারা যা করবে সে সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা আম্বিয়াঃ ২৩)
অনুরূপভাবে একজন মানুষ কোন নেক ও পরহেজগার ব্যক্তির কাছে সর্বোচ্চ এই আশা করতে পারে যে, তিনি তার জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করবেন। সে ঐ নেক ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হয়ে তার আবেদন পেশ করবে তিনি যেন তার জন্যে দুআ করেন। যেমন সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) বিভিন্ন সময় বৃষ্টির জন্যে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্যে নবী (সাঃ)এর কাছে গিয়ে দুআর আবেদন করতেন। কিন্তু ঐ নেক ব্যক্তির প্রতি এই বিশ্বাস করে বসে থাকবে না যে, তিনি দুআ করলেই আমার গুনাহ আল্লাহ্ মাফ করে দিবেন বা আমার কাজ হয়ে যাবে। আমাকে আল্লাহর কাছে কিছুই বলতে হবে না; বরং সে নিজেও আল্লাহর কাছে দুআ করবে। আমরা জানি নবী (সাঃ) দুআ করলেই নিশ্চিতভাবে কবুল হয়ে যাবে, কিন্তু তারপরও তিনি সাহাবীদেরকে তাঁর দুআর উপর ভরসা করে বসে থাকতে বলেননি। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করে তাঁর গুনাহগার উম্মতকে কবুল করিয়ে নিবেন এরকম কোন আশা দেননি; বরং তিনি তাঁদেরকে আমলের তাগিদ দিয়েছেন, আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্যে তাঁদেরকে শত শত দুআ শিখিয়েছেন। কোন্ আমল কোন্ সময় কিভাবে করলে গুনাহ মাফ হয় এরকম হাজারো আমলের বিবরণ দিয়েছেন। বিশেষ প্রয়োজনে কেউ দুআর আবেদন করলে তার জন্যে তিনি দুআ করেছেন সেই সাথে কি বলে দুআ করতে হবে তাও তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেনঃ ( مَنْ لَمْ يَدْعُ اللَّهَ سُبْحَانَهُ غَضِبَ عَلَيْهِ ) যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দুআ করে না, আল্লাহ তার উপর রাগ করেন। [. ইবনে মাজাহ, হাদীছটি হাসান দ্রঃ ছহীহ ইবনে মাজাহ হা/৩৮২৭ সিলসিলা সহীহা হা/২৬৫৪]
নেক লোকেরা যেমন অন্য মানুষের জন্যে দুআ করবেন, তাদের জন্যেও অন্যরা দুআ করবে। সাধারণ মানুষের যেমন আল্লাহর নৈকট্য দরকার। বাহ্যিকভাবে সমাজে পরিচিত ঈমানদার নেক ও সৎ লোকেরা জীবিত হলে তাদের যাবতীয় আমল কবুল হওয়ার জন্য, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে, তাদের আমলে যেন ওরিয়া প্রবেশ না করে, আত্মগরিমায় পতিত হয়ে যেন তাদের নেক আমল ধ্বংস না হয়ে যায় ইত্যাদির জন্যে অন্যের দুআর দরকার। তারা মৃত হলে তাদের মাগফিরাতের জন্যে, তাদের উপর করুণা বর্ষণ করার জন্যে, আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা উন্নীত করার জন্যে তারা জীবিতদের দুআর মুখাপেক্ষী থাকেন। এই কারণেই তো আমরা সাহাবায়ে কেরামের জন্য সর্বক্ষণ দুআ করি রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম (আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন) বলে। সাহাবায়ে কেরামও একজন অপরজনের নিকট দুআর আবেদন করতেন। [. তাবেঈ গুযাইফ বিন হারেছ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ওমার বিন খাত্তাব (রাঃ)এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমি বালক ছিলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেনঃ বালকটি খুবই ভাল। তখন জনৈক ব্যক্তি আমার কাছে উঠে এলেন অতঃপর বললেন, ভাতিজা! আমার জন্যে আল্লাহর কাছে কল্যাণের দু’আ কর। আমি বললাম, কিন্তু আপনি কে? তিনি বললেন, আমি আবু যার্ রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাহাবী। একথা শুনে আমি বললাম, আল্লাহ্ আপনাকে মাফ করুন, আপনিই তো আমার চাইতে বেশী উপযুক্ত; বরং আপনি আমার জন্যে দু’আ করবেন। তিনি বললেন, তা ঠিক আছে ভাতিজা। কিন্তু আমি একটু আগে শুনেছি ওমার (রাঃ) তোমার সম্পর্কে বলেছেন, ছেলেটা খুবই ভাল। আর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)এর নিকট শুনেছি, ‘‘নিশ্চয় ওমার যে কথা বলে আল্লাহ্ তার মধ্যে সত্য নিহিত রেখেছেন।’’ (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, ঘটনাটি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ফাযায়েলে সাহাবা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন ১/৬ পৃঃ)উবাইদুল্লাহ্ বিন আবু সালেহ বলেনঃ একদা ত্বাউস (প্রখ্যাত তাবেঈ) আমার শুশ্রূষা করার জন্যে এলেন। আমি তাঁকে বললাম, হে আবু আবদুর রহমান! আপনি আমার জন্যে দু’আ করুন। তিনি বললেনঃ তুমি নিজে নিজের জন্যে দু’আ কর। কেননা কোন বিপদগ্রস্ত লোক যখন আল্লাহকে ডাকে তখন তিনি তার ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন।’’ ওয়াহাব বিন মুনাবেবহ (রহঃ) বলেনঃ পূর্ব যুগের কিতাবে আমি পড়েছিঃ আল্লাহ্ বলেন, ‘আমি আমার ইজ্জতের শপথ করে বলছিঃ যে ব্যক্তি আমাকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, যদি আকাশ ও তার অধিবাসীরা এবং পৃথিবী ও তার অধিবাসীরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, তবে আমি সেখান থেকে তার উদ্ধারের ব্যবস্থা করে দিব। আর যে ব্যক্তি আমাকে আঁকড়ে না থাকবে, আমি তার পায়ের নীচের মাটি দাবিয়ে তাকে ধ্বসিয়ে দিব অথবা তাকে শুন্যে উড়িয়ে দিব অথবা তাকে তার নিজের উপর সোপর্দ করে দিব।’ (তাফসীর ইবনে কাছীর ৬/২০৪ পৃঃ)]
আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে দুর্ভিক্ষ দেখা গেল। তিনি একদা জুমআর দিন খুতবা দিচ্ছিলেন এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে প্রবেশ করল। সে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সম্মুখে দন্ডায়মান হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (বৃষ্টির অভাবে) সম্পদ বিনষ্ট হয়ে গেল, পরিবার-পরিজন ক্ষুধার্থ হয়ে গেল (অন্য বর্ণনায়, ঘোড়া, ছাগল মারা যাওয়ার উপক্রম হল।) তাই আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করুন। তিনি দুহস্ত উপরে উত্তোলন করলেন। এমনকি আমি তাঁর বগলের শুভ্র অংশ দেখতে পেলাম। তিনি দুআ করলেন, হে আল্লাহ্ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন! হে আল্লাহ্ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন!! হে আল্লাহ্ আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন!!! লোকেরাও তাঁর সাথে হাত উঠিয়ে দুআ করলেন। [এসময় তিনি চাদর উল্টিয়েছেন কিম্বা কিবলামুখী হয়েছেন এরকম কথা বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়নি।] তিনি বলেন, আল্লাহ্র শপথ আমরা আকাশে ছোট-বড় কোন ধরণের মেঘমালা দেখিনি। আামদের এবং সালা পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে বাড়ী-ঘরের উপর মেঘমালার কোন কিছুই ছিলনা। আকাশ ছিল কাঁচের মত পরিস্কার। তিনি বলেন, ধনুকের মত মেঘমালা পাহাড়ের পিছনে দেখা গেল। তা আকাশের মাঝমাঝি স্থানে পৌঁছেই ছড়িয়ে পড়ল এবং বৃষ্টি হতে লাগল। আল্লাহ্র শপথ বৃষ্টি বন্ধ হল না বরং মেঘমালা পাহাড়ের বিশাল আকার ধারণ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করার পূর্বেই মুষল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হল, আমি দেখলাম বৃষ্টির পানি তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়ি মোবারক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তিনি মিম্বর থেকে অবতরণ করে সালাত আদায় করলেন। আমরা পানি ভেঙ্গে বাড়ি পৌঁছলাম। (অন্য বর্ণনায় রয়েছে, অধিক বৃষ্টির কারণে বাড়ী পৌঁছতে আমাদের কষ্ট হচ্ছিল।) সেই দিন, পরবর্তী দিন, তার পরবর্তী দিন এভাবে পরের জুমআ পর্যন্ত বিরামহীন বৃষ্টি হল, এমনকি মদীনায় বন্যা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। (অন্য বর্ণনায়, আল্লাহ্র শপথ আমরা ছয় দিন সূর্য দেখিনি।) পরবর্তী জুমআয় উক্ত গ্রাম্য ব্যক্তি অথবা অন্য একজন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! -তিনি তখন খুতবা দিচ্ছিলেন- বৃষ্টির পানিতে তো ঘর-বাড়ি ধ্বসে পড়ল রাস্তা-ঘাট বন্ধ হয়ে গেল, মাল-সম্পদ ডুবে গেল, পশু-পাখি ধ্বংস হয়ে গেল। তাই বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুচকী হাঁসলেন। তারপর দুহাত উত্তোলন করে দুওআ করলেন, হে আল্লাহ্! আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, ইল্ব্লপষ ঊভষ বুঁ হে আল্লাহ্! পাহাড়ের চুঁড়ায়, বধ্য ভুমিতে, ছোট ছোট টিলার উপর, উপত্যকায়, গাছ-পালায়। তিনি একদিকে ইঙ্গিত করতেই মেঘমালা সেদিকে সরে গেল এবং আকাশ পরিস্কার হয়ে গেল। মদীনার চতুর্পার্শ্বে বৃষ্টি হতে থাকল। দেখে মনে হচ্ছিল মদীনা যেন একটি প্রশস্থ গর্ত। এক ফোটা পানিও মদীনায় পড়ল না। আমরা সূর্যের রোদের মধ্যে মসজিদ থেকে বের হলাম। আল্লাহ্ তাঁর নবীর কারামত দেখালেন এবং তাঁর দুওআ কবুল করলেন। প্রায় একমাস উপত্যকা সমূহে পানি প্রবাহিত হতে থাকল। যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউই এল সবাই মুষলধারে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কথা বলতে থাকল। (সহীহ্ বুখারী)
এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হল যে, সাহাবীরা (রাঃ) নবীজীর কাছে উপস্থিত হয়ে তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি যেন তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করেন এই আবেদন করেছেন। কিন্তু নবীজীর মৃত্যুর পর তাঁরা আর নবীজীর কবরের কাছে দাঁড়িয়ে তাদের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন নি এবং তাঁর কাছে দুআরও আবেদন রাখেননি।
আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ওমার বিন খাত্তাব (রাঃ) তাঁর খেলাফতকালে দুর্ভিক্ষের সময় আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের দুআর মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতেন। তিনি দুআয় বলতেন, হে আল্লাহ্ আমরা ইতোপূর্বে আমাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাধ্যমে তোমার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করতাম, তুমি আমাদেরকে বৃষ্টি প্রদান করতে। এখন আমাদের নবীর চাচা (আব্বাসের) মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি প্রদান করুন। (সহীহ বুখারী)
শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেনঃ এর অর্থ হচ্ছে, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট যেতাম, তাঁকে অনুরোধ করতাম দুওআ করার জন্য। এখন তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন, সুমহান বন্ধুর দরবারে চলে গেছেন। তিনি আমাদের জন্য দুওআ করবেন এটা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা নবী এর চাচা আব্বাসের স্মরণাপন্ন হয়েছি, তাঁকে অনুরোধ করছি, তিনি আমাদের জন্য দুওআ করবেন। [. দ্রঃ আত্তাওয়াস্সুল আন্ওয়াউহু ও আহ্কামুহু- আলবানী ৪৪ পৃঃ।]
নেক লোকের উসীলা করা বৈধ হলে তো সাহাবীদের আব্বাস (রাঃ)এর কাছে যাওয়ার প্রশ্নই উঠত না। অথবা আগের হাদীছে অনাবৃষ্টির জন্যে লোকদের নবীজীর কাছে উপস্থিত হয়ে দুআর আবেদন করারও দরকার ছিল না, নিজেরা ঘরে বসে নবীজীকে উসীলা করে দুআ করলেই হত। কিন্তু এরূপ প্রমাণ আমরা সাহাবীদের (রাঃ) আমল থেকে পাই না।
এজন্যে একজন মুমিন আরেক মুমিনের জন্যে সর্বোচ্চ যা করতে পারেন তা হচ্ছে তিনি তার জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করবেন। এই দুআ যে কেউ যে কারো জন্যে করতে পারে। কিন্তু একথা বলার অধিকার কারো নেই যে, আমি তোমাকে আল্লাহর কাছে মাফ করিয়ে দিব বা তাঁর দরবারে কবুল করিয়ে দিব। কেননা কাউকে মাফ করা না করা, কবুল করা না করা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি যাকে ইচ্ছা কবুল করতে পারেন, যাকে ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। তাঁর উপর দাবী করার মত কারো কোন অধিকার নেই। কেননা فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। (সূরা বুরূজঃ ১৬) لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তাঁকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। কিন্তু তারা যা করবে সে সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা আম্বিয়াঃ ২৩)
অনুরূপভাবে একজন মানুষ কোন নেক ও পরহেজগার ব্যক্তির কাছে সর্বোচ্চ এই আশা করতে পারে যে, তিনি তার জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করবেন। সে ঐ নেক ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হয়ে তার আবেদন পেশ করবে তিনি যেন তার জন্যে দুআ করেন। যেমন সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) বিভিন্ন সময় বৃষ্টির জন্যে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্যে নবী (সাঃ)এর কাছে গিয়ে দুআর আবেদন করতেন। কিন্তু ঐ নেক ব্যক্তির প্রতি এই বিশ্বাস করে বসে থাকবে না যে, তিনি দুআ করলেই আমার গুনাহ আল্লাহ্ মাফ করে দিবেন বা আমার কাজ হয়ে যাবে। আমাকে আল্লাহর কাছে কিছুই বলতে হবে না; বরং সে নিজেও আল্লাহর কাছে দুআ করবে। আমরা জানি নবী (সাঃ) দুআ করলেই নিশ্চিতভাবে কবুল হয়ে যাবে, কিন্তু তারপরও তিনি সাহাবীদেরকে তাঁর দুআর উপর ভরসা করে বসে থাকতে বলেননি। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করে তাঁর গুনাহগার উম্মতকে কবুল করিয়ে নিবেন এরকম কোন আশা দেননি; বরং তিনি তাঁদেরকে আমলের তাগিদ দিয়েছেন, আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্যে তাঁদেরকে শত শত দুআ শিখিয়েছেন। কোন্ আমল কোন্ সময় কিভাবে করলে গুনাহ মাফ হয় এরকম হাজারো আমলের বিবরণ দিয়েছেন। বিশেষ প্রয়োজনে কেউ দুআর আবেদন করলে তার জন্যে তিনি দুআ করেছেন সেই সাথে কি বলে দুআ করতে হবে তাও তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেনঃ ( مَنْ لَمْ يَدْعُ اللَّهَ سُبْحَانَهُ غَضِبَ عَلَيْهِ ) যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দুআ করে না, আল্লাহ তার উপর রাগ করেন। [. ইবনে মাজাহ, হাদীছটি হাসান দ্রঃ ছহীহ ইবনে মাজাহ হা/৩৮২৭ সিলসিলা সহীহা হা/২৬৫৪]
নেক লোকেরা যেমন অন্য মানুষের জন্যে দুআ করবেন, তাদের জন্যেও অন্যরা দুআ করবে। সাধারণ মানুষের যেমন আল্লাহর নৈকট্য দরকার। বাহ্যিকভাবে সমাজে পরিচিত ঈমানদার নেক ও সৎ লোকেরা জীবিত হলে তাদের যাবতীয় আমল কবুল হওয়ার জন্য, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে, তাদের আমলে যেন ওরিয়া প্রবেশ না করে, আত্মগরিমায় পতিত হয়ে যেন তাদের নেক আমল ধ্বংস না হয়ে যায় ইত্যাদির জন্যে অন্যের দুআর দরকার। তারা মৃত হলে তাদের মাগফিরাতের জন্যে, তাদের উপর করুণা বর্ষণ করার জন্যে, আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা উন্নীত করার জন্যে তারা জীবিতদের দুআর মুখাপেক্ষী থাকেন। এই কারণেই তো আমরা সাহাবায়ে কেরামের জন্য সর্বক্ষণ দুআ করি রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম (আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন) বলে। সাহাবায়ে কেরামও একজন অপরজনের নিকট দুআর আবেদন করতেন। [. তাবেঈ গুযাইফ বিন হারেছ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ওমার বিন খাত্তাব (রাঃ)এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমি বালক ছিলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেনঃ বালকটি খুবই ভাল। তখন জনৈক ব্যক্তি আমার কাছে উঠে এলেন অতঃপর বললেন, ভাতিজা! আমার জন্যে আল্লাহর কাছে কল্যাণের দু’আ কর। আমি বললাম, কিন্তু আপনি কে? তিনি বললেন, আমি আবু যার্ রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাহাবী। একথা শুনে আমি বললাম, আল্লাহ্ আপনাকে মাফ করুন, আপনিই তো আমার চাইতে বেশী উপযুক্ত; বরং আপনি আমার জন্যে দু’আ করবেন। তিনি বললেন, তা ঠিক আছে ভাতিজা। কিন্তু আমি একটু আগে শুনেছি ওমার (রাঃ) তোমার সম্পর্কে বলেছেন, ছেলেটা খুবই ভাল। আর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)এর নিকট শুনেছি, ‘‘নিশ্চয় ওমার যে কথা বলে আল্লাহ্ তার মধ্যে সত্য নিহিত রেখেছেন।’’ (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, ঘটনাটি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ফাযায়েলে সাহাবা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন ১/৬ পৃঃ)উবাইদুল্লাহ্ বিন আবু সালেহ বলেনঃ একদা ত্বাউস (প্রখ্যাত তাবেঈ) আমার শুশ্রূষা করার জন্যে এলেন। আমি তাঁকে বললাম, হে আবু আবদুর রহমান! আপনি আমার জন্যে দু’আ করুন। তিনি বললেনঃ তুমি নিজে নিজের জন্যে দু’আ কর। কেননা কোন বিপদগ্রস্ত লোক যখন আল্লাহকে ডাকে তখন তিনি তার ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন।’’ ওয়াহাব বিন মুনাবেবহ (রহঃ) বলেনঃ পূর্ব যুগের কিতাবে আমি পড়েছিঃ আল্লাহ্ বলেন, ‘আমি আমার ইজ্জতের শপথ করে বলছিঃ যে ব্যক্তি আমাকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, যদি আকাশ ও তার অধিবাসীরা এবং পৃথিবী ও তার অধিবাসীরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, তবে আমি সেখান থেকে তার উদ্ধারের ব্যবস্থা করে দিব। আর যে ব্যক্তি আমাকে আঁকড়ে না থাকবে, আমি তার পায়ের নীচের মাটি দাবিয়ে তাকে ধ্বসিয়ে দিব অথবা তাকে শুন্যে উড়িয়ে দিব অথবা তাকে তার নিজের উপর সোপর্দ করে দিব।’ (তাফসীর ইবনে কাছীর ৬/২০৪ পৃঃ)]