hadith book logo

হজ পালন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নান্দনিক আচরণ

লেখকঃ ফায়সাল বিন আলী আল বা’দানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪

সাত. অধিক পরিমাণে ভালো কাজ করা

তাকওয়ায় নিজেদেরকে সজ্জিত করতে ও সৎকাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় নামতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এরশাদ হয়েছে :‘‘ তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো, নিশ্চয়ই উত্তম পাথেয় - তাকওয়া, আর আমাকে ভয় করো হে জ্ঞানীরা।’’ আরো এরশাদ হয়েছে :

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ

‘‘ধাবমান হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের প্রতি, যার বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর ন্যায় এবং যা প্রস্ত্তত করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।’’ হজে এরূপ অবস্থায় নিজেকে জড়িয়ে রাখাই ছিল রাসূলুল্লাহর আদর্শ ও অভ্যাস। নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো থেকে এর ইঙ্গিত মিলে:

হজের মুস্তাহাব বিষয়গুলোর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আগ্রহ। যেমন এহরামের জন্য গোসল করা, হজে প্রবেশের পূর্বে ও হজ থেকে বের হয়ে সুগন্ধি মাখানো , কোরবানির পশু চিহ্নিত করণ ও মালা পরানো জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ পর্যন্ত বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ ও এ-সময় আওয়াজ উঁচু করা। তোওয়াফের মাধ্যমে বায়তুল্লায় পূণ্যকৃত্য শুরু, এবং সেখানে রমল করা , য়ামানী দুই কোণ স্পর্শ করা মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে তোওয়াফের দুই রাকাত নামাজ আদায়, সাফা মারওয়ার পৃষ্ঠে দোয়া, এবং বাতনুলওয়াদীতে খুব দ্রুত চলা, কাবা শরীফের দুই কোণ স্পর্শের ও কঙ্কর নিক্ষেপের সময় যিকির , ও এ-জাতীয় বহু কাজ রাসূল ﷺ কর্তৃক সম্পাদন।

মুযদালিফা থেকে সূর্যোদয়ের পূর্বে দিগন্ত অত্যন্ত উদ্ভাসিত হওয়ার পর প্রস্থানও এর একটি উদাহরণ, যদিও এর পূর্বেই রাসূলুল্লাহর পক্ষে প্রস্থান করা বৈধ ছিল; কেননা তাঁর পরিবারের সদস্যদের দুর্বল লোকেরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

একশত উট কোরবানি করাও এ পর্যায়ে পড়ে, কেননা এ সবের জায়গায় একটি উট অথবা গরুর একসপ্তমাংশ অথবা একটি মেষ-ই যথেষ্ট ছিল।

উল্লেখ্য হজকৃত্যের সকল কাজ রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই করেছেন যদিও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি দিয়ে কর্ম সম্পাদন বৈধ রয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ক্ষেত্রে স্বয়ং পবিত্র হাতে তিনি তেষট্টিটি কোরবানী জবেহ করেন, আর বাকিগুলো হজরত আলীকে প্রতিনিধি করে জবেহ করান। বর্ণনায় এসেছে - তিনি হজরত আলীকে কোরবানীতে শরীক করেন, এ-হিসেবে তিনি কাউকে সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিও করেন নি।

রাসূলুল্লাহ ﷺ খাদেম অবলম্বন করেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের সহায়তা নিয়েছেন একথা বলে এ-আদর্শের ব্যাপকতার বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা চলে না, যেমন কোরবানির কিছু পশু চিহ্নিত করা, ও নামিরায় তাবু খাটানো, মুযদালিফা থেকে কঙ্কর কুড়ানো তাঁর আরোহী জন্তু সেবা যত্ন ও বসার গদি ঠিক করানো ইত্যাদি; কেননা এসব বিষয় হয়তো মূল হজকৃত্যের মধ্যে প্রবিষ্ট নয় অথবা এগুলো সরাসরি হজকৃত্যের অংশ নয়।

মোটের ওপর কথা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হজ মনোযোগসহ ভেবে দেখলে মূর্ত হয়ে ধরা পড়বে যে, তিনি হজকৃত্য যথার্থভাবে পালনে প্রচন্ডভাবে আগ্রহী ছিলেন। সমানভাবে আগ্রহী ছিলেন সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন কর্ম সম্পাদন করতে, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কোনো কল্যাণের দাবি ব্যতীত এ অবস্থান থেকে না সড়তে, যেমন আরোহণ অবস্থায় বায়তুল্লাহর তোওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সাঈ করা জনতার ভিড়ের সময় হাজরে আসওয়াদ লাঠি দিয়ে স্পর্শ করা এটা এজন্য করেছেন যে জনতা যেন তাঁকে দেখতে পায় - প্রয়োজনে প্রশ্ন করা ও হজ্বকৃত্যর সঠিক কর্মধারা জেনে নেয়ার জন্য।

তাই হজ মৌসুমে ভালো কাজ করতে আপনিও স্থিরচিত্ত হন। যেসব বিষয় আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সহায়ক সেগুলো বেশি বেশি করুন। আপনি সর্বোত্তম দিবসসমূহ অতিক্রম করছেন, এবং এমন এক মৌসুমে রয়েছেন যখন আল্লাহর তাকওয়া চর্চিত হয়, তাঁর নিমিত্তে সৎকর্ম সম্পাদিত হয়, যিকির ও মোনাজাত করা হয়, আর আল্লাহ তাঁর কাছে তো কেবল আপনার তাকওয়াটাই পৌঁছোয়, আপনার অর্থ-কড়ি ও চেহারা আকৃতির প্রতি তিনি দৃষ্টি দেন না, বরং দেখেন হৃদয় ও কর্ম। তাই কোমর বেঁধে লেগে যান, উচ্চাভিলাষী হন, শৈথিল্য ও আলস্য থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন, বয়স স্রোতের মতো চলে যাচ্ছে, অতীত ফিরে আসছে না কখনো । আর মনে রাখুন যে, আজকে কাজ আর কাজ, আর আগামীকাল কেবলই হিসেব দেয়ার সময়। তাই যে ব্যক্তি কাজ করল সে পরিত্রাণ পেলো, আর যে হেলায় কাটাল সে ধ্বংস হলো। হাদিসে এসেছে :‘‘ কর্ম যাকে পিছিয়ে দিল, বংশ তাকে এগিয়ে দিতে পারল না।’’