hadith book logo

হজ পালন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নান্দনিক আচরণ

লেখকঃ ফায়সাল বিন আলী আল বা’দানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২২

৫- উম্মতের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বিচ্ছিন্নতা থেকে সতর্ক করণ :

মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি, তাদের সবার হৃদয়কে একসূত্রে বেঁধে দেয়া, বিচ্ছিন্ন টুকরো গুলো একত্রিত করা, তাদের কাতারসমূহ সুসংহত করা ইসলামের একটি বড়ো উদ্দেশ্য। আর তাই ঐক্য ও সংহতি বিষয়ে কোরআন সুন্নায় বহু বাণী বিধৃত রয়েছে যেখানে পারস্পরিক বিরোধ ও বিসংবাদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে: এরশাদ হয়েছে :

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

‘‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না;’’

وَإِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُونِ

‘‘নিশ্চয়ই তোমাদের এ উম্মত এক উম্মত, ও আমি তোমাদের প্রতিপালক অতঃপর আমাকে ভয় করো;’’

وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ ﴿৩১﴾ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ

‘‘তোমরা মুশরিকদের দলভুক্ত হয়েও না, যারা তাদের ধর্মকে বিভক্ত করল এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ে পরিণত হলো, প্রত্যেক দল যা তাদের রয়েছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট।’’ হাদীসে এসেছে : মুমিন মুমিনের জন্য প্রাসাদের মতো যার একাংশ অন্য অংশ ধরে রাখে, এই বলে তিনি আঙ্গুলসমূহ পরস্পরে প্রবিষ্ট করলেন।’’ রাসূলুল্লাহ r আরো বলেছেন : ‘‘আল্লাহর হাত জামাতের সাথে।’’

ফিতনা ও বিচ্ছিন্নতা থেকে পরিত্রাণ, সংহতি-ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি, ঐক্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির ক্ষেত্রে হজ্বের প্রতিটি পর্বে যেহেতু প্রেরণা ও অনুভূতি রয়েছে, তাই, এদিকটির ওপরও রাসূলুল্লাহ r সমধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো নিম্নরূপ-

ক. উম্মতের সদস্যদের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা ও তাকওয়া ব্যতীত অন্য কোনো ইস্যুতে পার্থক্য না করার তাগিদ। হাদীসে এসেছে : ‘‘তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক, জেনে রাখো আরবির আজমির ওপর কোনো মর্যাদা নেই। না রয়েছে আজমির আরবির ওপর, কালোর লালের ওপর, লালের কালোর উপর কোনো প্রাধান্য তবে কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতে।’’

খ. যারা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমল করে রাসূলুল্লাহ এমন কর্ণধারদের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর r উম্মতের বৃহৎ অংশের সাথে এঁটে থাকতে বলেছেন, ও গোটা উম্মতের জন্য কল্যাণ কামনা করতে বলেছেন, হাদীসে এসেছে : ‘যদি নত-নাশিকাসম্পন্ন কালো দাসকে তোমাদের আমীর বানিয়ে দেয়া হয়, যে কিতাবুল্লাহ অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করবে, তোমরা তার আনুগত্য করো ও কথা মেনে চলো,। তিনি মিনার খায়ফে বলেছেন, ‘‘তিন বিষয়ে মুমিনের হৃদয় খিয়ানত করতে পারে না: ধর্মকৃত্যে আল্লাহর জন্য ইখলাস ও ঐকান্তিকতা, মুসলমানদের সরকারপ্রধানদের জন্য শুভকামনা ও নসীহত, এবং মুসলমানদের বড়ো-জামাতের সাথে এঁটে থাকা, কেননা তাদের জিকির">দোয়া তাদের পরিবেষ্টিত করে আছে পশ্চাৎ থেকে।’’

গ. শয়তানের প্রবঞ্চনায় পতিত হওয়া থেকে তিনি সতর্ক করেছেন, বর্ণনায় এসেছে ‘‘জজিরায়ে আরাবিয়ার মুসল্লীদের কর্তৃক পূজিত হবে এ-বিষয়ে শয়তান নিরাশ হয়েছে , তবে সে তাদেরকে প্রবঞ্চনা দিবে।’’

ঘ. ধর্মে নতুন বিষয় সংযোজন করা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন : এই মর্মে তিনি উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন : ‘‘আমি কিছু মানুষকে নিষ্কৃতি দিবো এবং কিছু মানুষকে আমা হতে নিষ্কৃত করা হবে , অতঃপর আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক আমার সাথিরা ! আল্লাহ বলবেন জান না তারা তোমার পর কী করেছে।’’

ঙ. ফেরকা ও বিভিন্ন দলে বিভক্তির কারণ হয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এমন বিষয় থেকে তিনি বারণ করেছেন, যেমন পরস্পরে মারামারি কাটাকাটি ইত্যাদি, বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ r মানুষদেরকে চুপ করতে নির্দেশ দেয়ার পর তিনি বললেন : ‘‘ আমার পর তোমরা কুফরে ফিরে যেয়ো না যে একে অন্যের গ্রীবায় আঘাত করবে।’’

অন্যদের জান-মাল ও সম্মানের বিষয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ থেকে তিনি হুঁশিয়ার করেছেন। তিনি আরাফা, ১০ যিলহজ ও তাশরিকের দিনের খোতবায় তাগিদ করে বলেছেন : ‘‘তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের মাঝে হারাম। এই দিনের মতো এই মাসে ও এই অঞ্চলে।’’

অন্যায় ও অন্যের সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়া থেকেও তিনি বারণ করেছেন : ‘‘আমার কথা শোনো, তোমরা ভালোভাবে জীবনযাপন করবে, জুলুম করো না, জুলুম করো না , জুলুম করো না; কোনো মুসলমানের সম্পদ বৈধ হবে না যদি সে স্বেচ্ছায় না দেয়।’’

মুসলমানের গীবত ও তার সম্মানে হাত বাড়ানো থেকেও তিনি সতর্ক করেছেন : রাসুল্লাহ r কে যখন ১০ যিলহজের কার্যসমূহে আগে পিছে করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন ‘‘কোনো সমস্যা নেই , কোনো সমস্যা নেই তবে ওই ব্যক্তি সমস্যাগ্রস্ত ও ধ্বংস হলো যে মুসলমান ব্যক্তির ইজ্জতে অন্যায়ভাবে আঘাত হানল।’’

চ. দজ্জাল থেকে তিনি উম্মতকে সতর্ক করেছেন, তিনি r বলেছেন:‘‘আল্লাহর প্রেরিত সকল নবীই দজ্জাল থেকে সতর্ক করেছেন, ..সে তোমাদের মধ্যে বের হবে, তার পরিচয় যদি গোপন থাকে তাহলে তোমাদের প্রতিপালকের পরিচয় তো তোমাদের কাছে জানা, তোমাদের প্রতিপালক কানা নয়, পক্ষান্তরে দজ্জালের ডান চোখ হবে কানা, যেন ভাসমান আঙ্গুরের মতো।

আজ দেখা যায় মতানৈক্য, দ্বেষ, বাদানুবাদ ও দলাদলিতে উম্মতের শরীর হয়ে আছে বিক্ষত। খরগ হাতে ফেতনা তাদের সিনায় বসা। অন্য পক্ষে ধর্মদ্রোহীদের অভিলাষ-পরিকল্পনার কারণে, উম্মতের ঐক্যের প্রোগ্রাম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে বারংবার। আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা ব্যতীত বর্তমানে উম্মতের ঐক্য ও সংহতির অন্য কোনো পথ বাকি নেই; যা ইতিপূর্বে উম্মতের টুকরো অংশগুলোকে একত্রে রাখার দৃঢ় ইতিহাস গড়েছে । হজ্ব গন্তব্য পথে যাত্রা শুরুর একটি উপযুক্ত সময়। কেননা লক্ষ লক্ষ মানুষের মন ও শরীর অভিন্ন বাণীর ওপর একত্রে রয়েছে এখানে। যদিও ভাষা দেশ সংস্কৃতি বয়স আর্থসামাজিক অবস্থান ইত্যাদিতে একজন অপর জন থেকে ভিন্ন।

আপনি যদি হজ্বকারী হয়ে থাকেন তাহলে এ কাজে হাত দেয়ার এটাই সর্বোৎকৃষ্ট সময়, কেননা জাহিলিয়্যাতের সকল রসম রেওয়াজ থেকে আপনি এখানে নিজেকে পবিত্র করে নিতে পারেন। ওগুলোর স্পর্শ থেকে নিজেকে সরিয়ে দাঁড় করাতে পারেন সত্যের মহা সড়কে। আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্কে যোগ করতে পারেন নতুন মাত্রা। আল্লাহর সাথে আপনার প্রযুক্ততাকে করতে পারেন আরো গভীর-নিবিড়-মজবুত। তিনি যাকে ভালোবাসেন আপনি কেবল তাকেই ভালোবাসবেন, তিনি যাকে ঘৃণা করেন আপনিও তাকে ঘৃণা করবেন। এবং এ ভালোবাসাকে আপনি প্রকাশ করবেন ও ছড়িয়ে দিবেন হাজ্বীদের মাঝে। তাদেরকে আপনার মতোই পদক্ষেপ নিতে বলবেন, আপনি সারা জীবন এ মহববতের বলয়ে নিজেকে ধরে রাখবেন, তার দাবি অনুযায়ী আমল করবেন। মুমিনদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন, তাদের জন্য ঠিক তাই পছন্দ করবেন যা করে থাকেন নিজের জন্য। যদি আপনি এরূপ করতে পারেন, তবে মনে করতে হবে সরল পথের সন্ধান পেয়েছেন , কল্যাণের আঁচলে হাত রেখেছেন। বচন ও স্লোগানের পর্যায় পেরিয়ে এসেছেন কাজের বাস্তব ময়দানে, কদম রেখেছেন উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করার শিল্পিত সোপানে।