hadith book logo

হজ পালন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নান্দনিক আচরণ

লেখকঃ ফায়সাল বিন আলী আল বা’দানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৭

ঘ. মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহর দয়া ও করুণা

ইসলাম দয়া ও করুণার ধর্ম। এ ধর্মের শরীয়ত পুরোটাই-মূল ও শাখা উভয় ক্ষেত্রেই- স্নেহ-মায়া-মমতা ও করুণার ওপর দাঁড়িয়ে। এ-কারণে এটাই স্বাভাবিক যে রাসূলুল্লাহ r কেবলই রহমতস্বরূপ প্রেরিত হবেন। এরশাদ হয়েছে

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

‘‘আমি আপনাকে কেবলই রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’’ রাসূল r নিজেও তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন :‘‘ আমি তো নিছক রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছি।’’ তিনি আরো বলেছেন :‘‘ আমি মুহাম্মদ,... আমি তাওবা ও রহমতের নবী।’’ তাই তো রাসূলুল্লাহ r মানুষের সাথে - প্রতিপালক তাঁর সম্পর্কে যেমন বলেছেন ‘‘ দয়াময় করুণাশীল।’’ - সে রকমই আচরণ করেছেন। আর এভাবেই তাঁর রহমত পেয়েছে ব্যাপকতা,দয়া পেয়েছে বিস্তৃতি, ব্যাপ্তি পেয়েছে মায়ামমতা সকল কিছুতে। তাই মানুষের প্রতি দয়ায় তিনি সর্বোত্তম বলে ভূষিত হলেন। বরং তাঁর ব্যাপারে এরূপ সাক্ষীও এসেছে যে - মানুষ তার নিজের ওপর যতটুকু দয়াশীল তিনি তাদের ওপর তার থেকেও বেশি দয়াশীল। যেমন উমায়মা (রা) এর হাদীসে এসেছে, আমি কিছু মহিলার সাথে রাসূলুল্লাহর কাছে বাইয়াত নিলাম। তিনি আমাদেরকে বললেন : তোমরা যতটুকু পার ও ক্ষমতা রাখ । আমি বললাম : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের প্রতি আমাদের নিজেদের থেকেও বেশি দয়াময়’’। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন :‘‘ রাসূলুল্লাহ r দয়াময় ছিলেন ’’। আর এক ব্যক্তি বললেন : ‘‘ পরিবার পরিজনের প্রতি রাসূলুল্লাহ r থেকে অধিক দয়াবান আর কাউকে দেখিনি।’’ অন্য এক বর্ণনায় ‘বান্দাদের প্রতি’ শব্দ এসেছে। এ-সর্বব্যাপী দয়ার ফলেই মানুষ তাঁর ভালোবাসায় আত্মোৎসর্গ করেছে, তাঁর আনুগত্যে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অন্য পক্ষে মানুষকেও নির্দেশনা দেয়া তার পক্ষে সহজ হয়েছে, তাদেরকে পরিচালনা হয়েছে অকঠিন। হজ্বে রাসূলুল্লাহrএর এ দয়া ও করুণার বহু উদাহরণ দেখতে পাই। যেমন :

- যারা সঙ্গে করে কোরবানীর পশু আনেন নি তাদেরকে ইহরাম থেকে পুরোপুরি হালাল হতে বাধ্য করা, যার মধ্যে স্ত্রীদের সংশ্রবে যাওয়া, স্বাভাবিক কাপড় পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার শামিল রয়েছে। এটা মানুষের প্রতি করুণা-বসতই তিনি করেছেন।

- আরাফায় জোহর ও আসর একসাথে জমা করা, মুযদালিফায় যাওয়ার সময় মাগরিব দেরি করে পড়া যাতে বার বার যাত্রাবিরতির ফলে মানুষের কষ্ট না হয়, এবং হাজ্বী তার উট ও আসবাবপত্র ঠিক ওই জায়গায় রাখতে পারে যেখানে সে রাত্রি যাপন করবে।

- রাতের বেলায় চাঁদ ডুবে গেলে মানুষদের পূর্বেই মুযদালিফা থেকে দুর্বলদেরকে প্রস্থানের অনুমতি দেয়া। যাতে তারা ১০ যিলহজ্বের কাজগুলো অন্যদের আগেই সেরে নিতে পারে ।

- রাসূলুল্লাহ r ১০ যিলহজের কাজগুলো সহজ করে দিয়েছেন ; এগুলো আগে পিছে হয়ে গেলে কোনো সমস্যা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং যারা এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছেন তাদেরকে বলেছেন, ‘‘ কোনো সমস্যা নেই। ’’

- প্রয়োজনগ্রস্তদের জন্য তিনি সহজ করে দিয়েছেন, যেমন আববাস (রা) কে মিনার রাত্রিগুলো মককায় যাপনের অনুমতি দিয়েছেন হাজ্বীদেরকে পানি পান করানোর উদ্দেশ্যে। উটের রাখালদেরকেও অনুমতি দিয়েছেন য়াউমুননাহরের পরের দু’দিনের কঙ্কর নিক্ষেপ যে কোনো একদিন একসাথে করে ফেলার।

- হজ্ব যার ওপর ফরজ হয়েছে, যদি নিজে আদায় করতে অক্ষম হয় তাহলে প্রতিনিধি দিয়ে আদায় করাকে তিনি বৈধ করে দিয়েছেন

- মানুষের প্রতি সহজ করার উদ্দেশে কখনো তিনি অতি উত্তমটা ছেড়ে দিয়েছেন, যেমন আরোহিত অবস্থায় তোওয়াফ ও সাঈ করা, হজরে আসওয়াদ লাঠি দিয়ে স্পর্শ করা, এবং তা চুমু খাওয়া ও হাত দিয়ে স্পর্শ করা ছেড়ে দেয়া; পক্ষান্তরে তোওয়াফ ও সাঈ’র সময় হেঁটে চলাই উত্তম। তিনি এরূপ এজন্য করেছেন যাতে লোকদেরকে তাঁর নিকট থেকে সরিয়ে না দেয়া হয়, অথবা ভির-মুক্ত করার জন্য তাদের মারধর না করা হয়।

- অসুস্থের প্রতি দয়া পরবশ হওয়া। তাদেরকে দেখতে যাওয়া এবং তাদের জন্য যা সহজ হবে সে-বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়া এ পর্যায়েরই উদাহরণ।

তাই যদি আপনি এই রহমতের মৌসুমে আল্লাহর অনুকম্পা পেতে চান, তাহলে দুর্বলদের প্রতি দয়া দেখান, তাদের প্রতি করুণা প্রদর্শন করেন, কারণ ‘‘করুণকারীদেরকে আল্লাহ করুণা করেন’’ আর ‘‘ যে ব্যক্তি করুণা করে না তার প্রতি করুণা করা হয় না,’’ ‘‘ আল্লাহ রহম করেন না যে মানুষকে রহম করে না,’’ ‘‘ বান্দাদের মধ্যে যারা রহমকারী কেবল তাদেরকেই আল্লাহ রহম করেন,’’ আর সতর্ক থাকুন, যদি পরিত্রাণ পেতে চান, দয়া রহমত ও করুণা যেন কখনো আপনার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া না হয়,

‘‘যেহেতু রহমত কেবল হতভাগ্য ব্যক্তি হতেই ছিনিয়ে নেয়া হয়’’ আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ-ধরনের পরিণতি থেকে হিফাযত করুন।