hadith book logo

হজ পালন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নান্দনিক আচরণ

লেখকঃ ফায়সাল বিন আলী আল বা’দানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৬

গ.রাসূলুল্লাহর নম্রতা

তাওয়াযু ও নম্রতা নিঃসন্দেহে একটি সেরা চরিত্রগুণ, মহত্ত্বের শিকারযন্ত্র, আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদা বেড়ে যাওয়ার কারণ। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে মারফু হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ r বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হলো আল্লাহ তাকে মর্যাদাপূর্ণ করলেন।’’ আল্লাহ তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন :

وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

‘‘আর যারা আপনার অনুসরণ করে তাদের প্রতি বিনয়ী হন।’’ রাসূলুল্লাহ r তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ মানলেন ও এমন পর্যায়ে পৌঁছোলেন যে কেউ আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। তিনি নিজেই নিজের সেবা করতেন, বাড়িতে তিনি তাঁর পরিজনের সেবায় নিয়োজিত হতেন, জুতো ঠিক করতেন, কাপড় সেলাই করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন, নিজের প্রয়োজনীয় বস্ত্ত সামগ্রী বহন করতেন, বাচ্চাদেরকে ছালাম দিতেন ও তাদেরকে আদর করতেন, তাঁর সঙ্গীদের থেকে বেশভূষা থেকে শুরু করে কোনো কিছুতেই স্বতন্ত্র হতেন না। যে কোনো মানুষের ডাকে তিনি সাড়া দিতেন হোক সে শ্বেতাঙ্গ অথবা লাল বর্ণের। তিনি বলতেন : ‘‘আমি আহার করি যেভাবে কৃতদাস আহার করে, আমি বসি যেভাবে কৃতদাস বসে।’’ অন্যদিকে তিনি প্রচন্ডভাবে নিষেধ করেছেন তাঁকে যেন অতিরঞ্জিত আকারে প্রশংসা না করা হয়, প্রতিপালক তাঁর যে অবস্থান নির্ধারিত করেছেন তা থেকে ঊর্ধ্বে উঠানো না হয়। হাদীসে এসেছে : আমাকে অতিরঞ্জিত করে প্রশংসা করো না যেমন করেছে নাসারারা ইসা ইবনে মারয়াম এর ক্ষেত্রে। আমি তো নিছক তার দাস অতঃপর বলো আল্লাহর দাস ও রাসূল।’’

হজ্বে মানুষদের পরিচালনা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর তাওয়াজু ও নম্রতার বহু উদাহরণ রয়েছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নীচের কয়টি:

* জীর্ণ গদি ও চার দিরহাম মূল্যেরও হবে না এমন চাদরে হজ্ব সম্পাদন।

* সর্বসাধারণ থেকে স্বতন্ত্র অবস্থান অবলম্বন করতে অস্বীকার করা রাসূলূল্লাহর বিনম্র আচরণের একটি বিমূর্ত উদাহরণ। এর বড়ো প্রমাণ- যে পানিতে হাত লাগেনি, ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় সে ধরনের পানি পান করানোর প্রস্তাব দিলে রাসূলুল্লাহ r তা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘‘ ওটার কোনো প্রয়োজন নেই, মানুষ যেখান থেকে পান করছে সেখান থেকে আমাকে পান করাও।’’

* উসামা ইবনে যায়েদ (রা) কে আরাফা থেকে মুজদালিফা পর্যন্ত সহ-আরোহী করে নেয়া যদিও তিনি মাওয়ালীদের মধ্যে একজন ছিলেন ।

সবাইকে তাঁর কাছে আসতে দেয়া এবং কাউকে বঞ্চিত না করা। আর রাসূলুল্লাহ rএর তো কোনো দারোয়ান ছিল না যারা মানুষকে ফিরিয়ে দিবে, রাসূলুল্লাহ r এর সাথে সাক্ষাৎ করতে ও কথা বলতে নিষেধ করবে ।

* শুধু মাত্র একজন মহিলার কথা শুনতে দাঁড়িয়ে যাওয়া রাসূলুল্লাহr এর বিনম্র আচরণেরই অকাট প্রমাণ।

* কোরবানি জবাই করার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র বড়োত্ব না দেখানো বরং এক্ষেত্রে অন্যদের প্রতিনিধিত্ব বৈধ হওয়া সত্ত্বেও , নিজ হাতে ৬৩টি কোরবানি জবাই করা। নিঃসন্দেহে নম্রতার এ এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

রাসূলুল্লাহ r তাঁর এই তাওয়াজু ও নম্রতা দিয়ে মানুষের হৃদয় কেড়েছেন, ভক্তির পাত্র হয়েছেন, তাদের ভালোবাসা পেয়েছেন। তাই যারা হজ্বে দাওয়াতি কাজে জড়িত রয়েছেন, তাদের উচিত এই সর্বোত্তম চরিত্রের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর অনুসরণ করা যাতে তারা মানুষের সাথে আরো বিনয় ও নম্রতার পরিচয় দিতে পারেন; বিশেষ করে যারা দুর্বল ও প্রয়োজনগ্রস্ত তাদের ও যারা দুনিয়ার ধনসম্পদের আপনার থেকে নীচে তাদের সাথে। ইবনুল মুবারক বলেছেন : ‘‘বড়ো তাওয়াজু হলো আপনি নিজেকে এমন ব্যক্তির পর্যায়ে নিয়ে রাখবেন দুনিয়ার ধনসম্পদ আপনার থেকে যার কম, যাতে সে আঁচ করতে পারে ধনরত্নের কারণে আপনি তার থেকে উত্তম নন ।’’ সাথে সাথে এই তাওয়াজু ও নম্রতা হাজ্বীদের ভালোবাসা লাভের ও তাদের কাছে বিশ্বস্ত হওয়ার একটি প্রবেশদ্বার। এ বিনয় ও নম্রতার মাধ্যমেই তাদেরকে পরিণত করতে পারেন উত্তম শ্রোতায়।