hadith book logo

হজ পালন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নান্দনিক আচরণ

লেখকঃ ফায়সাল বিন আলী আল বা’দানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৮

ঙ. মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ r এর এহসান

দুনিয়ার ধনসম্পদ আরাম-আয়েশ ও চাকচিক্যের প্রতি যার হৃদয় নির্মোহ সে মানুষের প্রতি এহসান করতে আদৌ কষ্ট পায় না। আর যখন কোনো ব্যক্তি তার আচরণে এহসানের প্রমাণ দেয়, সমাজের অন্যান্য সদস্যদের সাথে শত্রুতা ও দ্বন্দ্ব-কলহের, তখন, অবসান ঘটে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়। কেননা মানুষের অন্তর্জগৎ এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে যে এহসানকে সে পছন্দ করে, এহসানকারীর সম্মান শ্রদ্ধা করে, উপকারকারীর সামনে বিনয়াবনত হয়। এই মর্মে পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে :

ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ

‘‘ যা অধিক ভালো তা দিয়ে দমন করো , তাহলে তোমার ও যাদের মাঝে শত্রুতা রয়েছে তাদেরকে এ-অবস্থায় পাবে যে তারা যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। ’’

রাসূলুল্লাহ r এর জীবনধারা ভেবে দেখলে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে প্রতীয়মান হয় যে তিনি চূড়ান্ত পর্যায়ের দুনিয়া-বিমুখতা ও গভীরতম এহসান একত্রে জমা করেছেন। দীর্ঘ তিন মাসের মতো চলে যেতো অথচ তাঁর বাড়িতে আগুন জ্বলতো না। খেজুর ও পানি এ’দুটোই হত এ সময়ে তাঁর ও তাঁর পরিবারের ভোজ্য। তিনি সবার থেকে বেশি দানশীল ছিলেন, আর তাঁর দান ছিল ওই ব্যক্তির মতো দারিদ্র্যকে ভয় পাওয়া যার স্বভাববিরুদ্ধ। রাসূলুল্লাহ r বলতেন : ‘‘ ওহুদ পাহাড় পরিমাণ আমার যদি স্বর্ণ হতো তবে আমার আনন্দ এতে হতো যে তিন দিন পর তার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না , কেবল সামান্য অংশ ব্যতীত যা ঋণের জন্য ধরে রাখব। এরকম তিনি এজন্যই করতে পারতেন যেহেতু তার হৃদয় আল্লাহর সাথে বাঁধা; তাঁর সমস্ত ভাবজগৎ জুড়ে রয়েছে আখেরাতের চিন্তা । আর দুনিয়ার ব্যাপারে তিনি তো একেবারেই ছিলেন নির্মোহ , বিমুখ। এমনকী দুনিয়ার মূল্য তাঁর কাছে মাছির ডানার সমানও ছিল না।

হজ্বে মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ r এর এহসান গুণে শেষ করা যাবে না। হজ্বের যেকোনো দিক নিয়ে চিন্তা করলে রাসূলুল্লাহ r এর এহসান অত্যন্ত মূর্ত হয়ে প্রকাশ পায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো নিরূপ :

- রাসূলুল্লাহর সাথে হজ্বের নিয়ত করে যারা বাড়ি থেকে আসতে দেরি করল তাদের প্রতি এহসান করে রাসূলুল্লাহ যুলহুলাফায় পুরা একটি দিবস অপেক্ষা করলেন ।

- হজ্ব মৌসুমে অধিক পরিমাণে দান খয়রাত করা এহসানের এক উদাহরণ। তিনি তার একশত উটের গোশত সমস্তটাই দান করে দেন এমনকি এর চামড়া ও গদিসহ সমস্ত কিছু আর তিনি একাধিক জায়গায় সদকার সম্পদও বণ্টন করেন।

- মানুষের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও তাদের সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখা।

- উসামা ইবনে যায়েদ ও ফযল ইবনে আববাস (রা) কে আরাফা মুযদালিফা ও মিনার চলাচলের সময় সহ-আরোহী করে নেওয়াও এহসানের একটি আলামত।

- খোতবায় দুর্বলদের প্রতি সদাচারের নির্দেশ দেয়া , ও তাদেরকে প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শেখানো, তাদের হজ্ব পালন সহজ করে দেওয়াও এহসানের একটি নিদর্শন।

- উম্মতের নাজাতের ব্যাপারে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ এবং আল্লাহ যেন তাদেরকে কবুল করেন সে কামনা ব্যক্ত করাতেও রাসূলুল্লাহর এহসানের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কেননা আল্লাহর কাছে প্রার্থনায় এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ r খুবই জোর দিয়েছেন। আরাফা ও মুযদালিফার দিন তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেছেন । আর জনৈক ব্যক্তি তাঁর কাছে জিকির">দোয়া চাইল তিনি তাঁর দোয়া সবার জন্য ব্যাপক করে দিয়ে বললেন:‘‘ আল্লাহ তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।’’ এটিও ব্যাপক এহসানের উদাহরণ।

- এহসানের আরেকটি উদাহরণ বালাগের তথা তিনি যে সত্য পোঁছিয়ে দিয়েছেন এ বিষিয়টির পুনরাবৃত্তি ও পরিপূর্ণ স্পষ্টতার ব্যাপারে তাগিদ; যাতে সবাই তাঁর বক্তব্য বুঝে ও অনুধাবন করতে পারে।

- ফেতনা ও সন্দেহের জায়গা থেকে তাঁর সাহাবাদেরকে বাঁচানোর আগ্রহ থেকেও এহসান প্রতিভাত হয়। এর প্রমাণ, ফযল ইবনে আববাসের (রা) গ্রীবা ঘুরিয়ে দেয়া যখন তিনি খাসআমিয়া মহিলার প্রতি নজর দিচ্ছিলেন। এবং যখন তাঁর চাচা আববাস (রা) এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন তিনি তখন বললেন : ‘‘ একটি যুবক যুবতী দেখলাম, তাই তাদেরকে শয়তানের আক্রমণ থেকে নিরাপদ মনে করলাম না ।’’ মসজিদে খাইফে দু’ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে তাঁর কথাও এ পর্যায়ে পড়ে। এ-দুই ব্যক্তি তাদের অবস্থান-স্থলে নামাজ পড়ে মসজিদে খাইফে এসে দেখেন রাসূলুল্লাহr নামাজ পড়ছেন , তারা নামাজে শরিক না হয়ে মসজিদের পিছনে বসে গেলেন, রাসূলুল্লাহ r তাদেরকে বললেন : এরূপ করো না, তোমরা যদি নিজ নিজ অবস্থানস্থলে নামাজ পড়ে থাক আর জামাতের মসজিদে আস তাহলে তাদের সাথে নামাজ পড়ো, আর এটা তোমাদের জন্য নফল হবে।’’

আপনি যদি আল্লাহর মহববত পেতে চান, তার করুণা ও নেয়ামত প্রাপ্তিতে নিজেকে ধন্য করতে চান তাহলে রাসূলrএর চরিত্রে চরিত্রবান হন। অতঃপর আপনার আমলকে উত্তম করুন, দুর্বল ও প্রয়োজনগ্রস্তদের প্রতি বদান্য ও সদয় হন, চাই তা জ্ঞান বিতরণ করে হোক অথবা ধনসম্পদ শক্তি ও যাতায়াতের বাহন ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করে হোক। এরশাদ হয়েছে :

وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

‘‘তোমরা এহসান করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ এহসানকারীদের পছন্দ করেন।’’ আরো এরশাদ হয়েছে :‘‘ এহসানের প্রতিদান কি এহসান ব্যতীত অন্যকিছু হতে পারে।’’ আপনার হজ্ব মাবরুর হজ্ব হোক, আপনার পাপ মোচন হোক, আপনি পেয়ে যান বেহেশতে প্রবেশের অধিকার, এ বিষয়ে লালায়িত হলে দরিদ্রদেরকে খাবার খাওয়ান। সুন্দর চরিত্র শক্তভাবে ধরে রাখুন, কারণ যিনি বলেছেন মাবরুর হজ্বের প্রতিদান বেহেশত ব্যতীত অন্যকিছু নয়, হজ্বের উত্তম কাজ কোনটি এবিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর করে বলেছেন:

‘‘ খাবার খাওয়ানো ও সদকা করা’’।