hadith book logo

হজ পালন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নান্দনিক আচরণ

লেখকঃ ফায়সাল বিন আলী আল বা’দানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

এক. একত্ববাদের যত্ন ও চর্চা

তাওহীদ- প্রধান বিষয়সমূহের একটি যা রাসূলুল্লাহর জীবনে সবচেয়ে বেশি যত্ন পেয়েছে।

وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ

‘‘ তোমরা হজ ও ওমরাহ আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করো।’’ আল্লাহর এ-নির্দেশ হজ পালনে ঐকান্তিকতার তাগিদ করছে। এ-নির্দেশের বাস্তবায়নেই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাওহীদকে তাঁর জীবনের মধ্যমণি বানিয়েছেন ও এর জন্যই সর্বস্ব উৎসর্গ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। পবিত্র হজ পালনে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কর্মধারা ও আমল একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে এ বিষয়টি মূর্ত হয়ে উঠে। নিম্নবর্ণিত বিষয়সমূহে তাওহীদের প্রতি এ-গুরুত্বই প্রকাশ পেয়েছে অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে ।

১.তালবিয়া: তালবিয়া, হজের স্লোগান ইবাদত-আরাধনা, জীবন-মরণ সবকিছু একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই নিবেদিত- তালবিয়ার শব্দমালা এ কথারই ঘোষণা। হজরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :‘‘ তাওহীদ অবলম্বনে তিনি ﷺ তালবিয়া শুরু করলেন ও বললেন : আমি হাজির, হে আল্লাহ ! আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই। নিশ্চয়ই প্রশংসা ও নেয়ামত তোমার এবং রাজত্বও , তোমার কোনো শরিক নেই।’’ হজরত ইবনে ওমর বলেন : ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ এ-শব্দমালায় আর কিছু বাড়াতেন না’ হজরত আবু হুরায়রার (র) বর্ণনা মতে তালবিয়ায় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لبيك إله الحق لبيك ‘আমি হাজির সত্য ইলাহ আমি হাজির’। তালবিয়ার শব্দমালায় এক আল্লাহর সান্নিধ্যে হাজিরা দেয়া, ও তার লা-শরিক হওয়ার ঘোষণা বার বার অনুরণিত হয় , আলোড়িত হয় একত্ববাদ অবিচল দৃঢ়তায়। তালবিয়া যেন সকল পৌত্তলিকতা, প্রতিমা-পূজা, অথবা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সত্তার সমীপে হীনতা দীনতা প্রকাশের বিরুদ্ধে এক অমোঘ ঘোষণা যা নবী-রাসূল পাঠানোর পিছনে প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত। যে ঘোষণার সার্থক রূপায়ণ ঘটতে দেখা যায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শিরক ও মুশরিকদের সকল কর্মকান্ড থেকে দায়-মুক্তি ও তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা পড়ে শোনানোর মাধ্যমে।

২. ধর্মকর্ম পালনে ইখলাস-ঐকান্তিকতা যেন অর্জিত হয়, রিয়া ও লোক-দেখানো থেকে যেন দূরে থাকা যায় সে জন্য প্রতিপালকের কাছে আকুতি প্রকাশও তাওহীদ কেন্দ্রিকতার একটি আলামত। হজরত আনাস থেকে এক মারফু হাদিসে এসেছে : ‘ হে আল্লাহ ! এমন হজ চাই যা হবে লোক-দেখানো ও রিয়া থেকে মুক্ত।’’

৩. তাওয়াফ শেষে যে দু’রাকাত নামাজ আদায় করতে হয় সেখানে ‘সূরা ইখলাস’ ও ‘সূরা আল-কাফিরুন’ পাঠের নিয়ম, তাওহীদের প্রতি গুরুত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। হজরত জাবের  বলেন : ‘‘ তিনি ﷺ এ-দু’রাকাতে তওহিদভিত্তিক সূরা ও ‘কুল য়্যা আইয়ুহাল কাফিরুন ’ তিলাওয়াত করলেন।’’ অন্য এক বর্ণনায় তিনি ইখলাসের দুই সূরা‘ ‘কুল য়্যা আইয়ুহাল কাফিরুন’ ও ‘কুল হুআল্লাহু আহাদ’ , তিলাওয়াত করেন।’’

৪. সাফা ও মারওয়ায় তাওহীদনির্ভর দোয়া একত্ববাদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অচ্ছেদ্য সম্পর্ককে নির্দেশ করে। হজরত জাবেরের (র) এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন:‘‘ অতঃপর তিনি ﷺ সাফায় আরোহণ করলেন, কাবা দৃষ্টিগ্রাহ্য হলো, তিনি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্বের কথা বললেন , তাঁর বড়োত্বের ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন : لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير، لا إله إلا الله وحده ---- ‘ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক , তাঁর কোনো শরিক নেই । রাজত্ব তাঁরই। প্রশংসাও তাঁর। তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।’ মারওয়াতে গিয়েও তিনি অনুরূপ করলেন।

৫. আরাফার দোয়া ও জিকিরসমূহেও তাওহীদের বাণী উচ্চারিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে , ‘ উত্তম দোয়া আরাফা দিবসের দোয়া, আর আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের সর্বোত্তম কথাটি হলো : لا إله إلا الله وحده لا شريك له ، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير ‘ আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই , তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই । প্রশংসাও তাঁর । তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।

আমর ইবনে শুয়াইবের বর্ণনা মতে : আরাফার দিন রাসূলুল্লাহ যে দোয়াটি পড়েছেন তা ছিল : لا إله إلا الله ---- ‘ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই-----’ অন্য এক বর্ণনা মতে তিনি بيده الخير ‘তাঁরই হাতে কল্যাণ’ অংশটি বাড়িয়ে দেন।

হজকারীদের - এমন কি ব্যাপকার্থে - মুসলমানদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে বিচিত্র ধরনের বেদআত, কুসংস্কার ও শিরকের ধূম্রজালে জড়িয়ে রয়েছে অনেকেই। এইজন্য ওলামা ও আল্লাহর পথে আহবায়কদের উচিত মানুষদেরকে ধর্মের মৌল বিষয়সমূহ ও তাওহীদের হাকীকত সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, শিরক ও বিপথগামিতা থেকে হুঁশিয়ার করা। তাওহীদ সম্পর্কে গুরুত্ব অন্যান্য বিষয়ের গুরুত্বকেও ছাপিয়ে যাবে এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আদর্শ । তিনি যখন হজরত মায়াযকে ইয়েমেনে পাঠালেন , বললেন : আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল , এ-সাক্ষীর প্রতি তাদেরকে আহবান করবে। তারা এক্ষেত্রে আনুগত্য প্রকাশ করলে জানিয়ে দেবে - আল্লাহ তাদের ওপর , রাত ও দিনে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। এক্ষেত্রে আনুগত্য প্রকাশ করলে জানিয়ে দেবে - আল্লাহ তাদের সম্পদে সাদকাহ ফরজ করেছেন যা ধনীদের থেকে নেয়া হবে ও গরিবদেরকে দেয়া হবে।’’

হজে পালনীয় প্রতিটি কর্মেই তাওহীদের অমোঘ ভাব বহুধা ধারায় প্রবাহিত, ও রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক একনিষ্ঠভাবে চর্চিত। তাই হজ পালনকারী প্রতিটি ব্যক্তিরই প্রয়োজন হৃদয়ের প্রতিটি ভাঁজে তাওহীদের ভাব প্রসারিত করে দেয়া। তাওহীদের ধারক ও বাহক বনে যাওয়া।