hadith book logo

হালাল রিযিকের সন্ধানে

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০১

উপার্জিত হারাম থেকে পরিত্রাণের উপায়

হারাম উপার্জন থেকে তওবা করা :

আমাদের উপার্জনের মধ্যে জেনে বা না জেনে অনেক সময় হারাম উপার্জন হয়ে থাকতে পারে। এমতাবস্থায় আমরা তওবা করার মাধ্যমে পরিত্রাণ পেতে পারি। কেননা কুরআনে বলা হয়েছে,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا تُوْبُوْاۤ اِلَى اللهِ تَوْبَةً نَّصُوْحًاؕ عَسٰى رَبُّكُمْ اَنْ يُّكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهَارُ﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা করো- একান্ত বিশুদ্ধ তওবা। তাহলে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দকর্মসমূহের (গুনাহগুলো) মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়ে গেছে। (সূরা তাহরীম- ৮)

হারাম উপার্জন করার জন্য অনুতপ্ত হওয়া :

তওবা করার জন্য অন্যতম শর্ত হচ্ছে অনুতপ্ত হওয়া। সুতরাং নিজের উপার্জনের মধ্যে হারাম কোন কিছু থাকলে তার জন্য অনুতপ্ত হতে হবে এবং অনুশোচনা করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿اِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللهِ لِلَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ السُوْٓءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوْبُوْنَ مِنْ قَرِيْبٍ فَاُولٰٓئِكَ يَتُوْبُ اللهُ عَلَيْهِمْؕ وَكَانَ اللهُ عَلِيْمًا حَكِيْمًا﴾

আল্লাহ কেবল তাদের তওবা-ই কবুল করেন, যারা অজ্ঞতাবশত পাপ করে ফেলে, অতঃপর তাড়াতাড়ি তওবা করে নেয়। আল্লাহ এসব লোকের তওবা কবুল করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা- ১৭)

হারাম উপার্জন না করার দৃঢ় সিদ্ধামত্ম গ্রহণ করা :

কোন বিষয়ে তওবা করলে তা থেকে বিরত থাকা এবং বিরত থাকার উপর অটল থাকা আবশ্যক। সুতরাং কেউ যদি হারাম উপার্জন করে এবং এমতাবস্থায় তওবা করে তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং তাকে যে কোন ধরনের হারাম উপার্জন না করার দৃঢ় সিদ্ধামত্ম নিতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَالَّذِيْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْاۤ اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوْا لِذُنُوْبِهِمْؕ وَمَنْ يَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّوْا عَلٰى مَا فَعَلُوْا وَهُمْ يَعْلَمُوْنَ﴾

মুমিন তো তারাই- যখনই তারা কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা নিজেদের জীবনের প্রতি অত্যাচার করে ফেলে, তখনই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেদের অপরাধসমূহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ব্যতীত কে আছে, যে অপরাধসমূহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা যা (পাপ) করেছে, তার উপর জেনে-শুনে অটল থাকে না। (সূরা আলে ইমরান- ১৩৫)

হালাল উপার্জন ও হারাম উপার্জনকে পৃথক করা :

হালাল ও হারাম উপার্জনের ক্ষতি ও পরিণতি সম্পর্কে সবকিছু উপলব্ধি করার পর উভয়টিকে পৃথক করে ফেলতে হবে। কোনভাবেই হারাম উপার্জনের দিকে ঝুঁকা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلْ لَّا يَسْتَوِي الْخَبِيْثُ وَالطَّيِّبُ وَلَوْ أَعْجَبَكَ كَثْرَةُ الْخَبِيْثِ فَاتَّقُوا اللهَ يَاۤ أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ﴾

বলো, অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়, যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে মুগ্ধ করে। অতএব হে বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা! আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সূরা মায়েদা- ১০০)

অর্জিত হারাম উপার্জনসমূহ থেকে মুক্তি লাভ করা :

যেহেতু হারাম উপার্জন হচ্ছে অবৈধ সম্পদ। সুতরাং এগুলো নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করাও হারাম। কাজেই এগুলো নিজের কাছে জমা করে রাখার কোন সুযোগ নেই। বরং এর সবগুলো সম্ভব হলে প্রকৃত মালিককে দিয়ে দিতে হবে, নতুবা কোন সওয়াবের আশা না করে কেবল দায়মুক্তির উদ্দেশ্যে কোন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে ফেলতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اَنْفِقُوْا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّاۤ اَخْرَجْنَا لَكُمْ مِّنَ الْاَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيْثَ مِنْهُ تُنْفِقُوْنَ وَلَسْتُمْ بِاٰخِذِيْهِ اِلَّاۤ اَنْ تُغْمِضُوْا فِيْهِؕ وَاعْلَمُوْاۤ اَنَّ اللهَ غَنِيٌّ حَمِيْدٌ﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা বের করেছি তার মধ্য হতে পবিত্র জিনিসসমূহ দান করো। আর তোমরা খারাপ জিনিস দান করার ইচ্ছা করো না। কেননা অন্ধ না হলে তোমরা নিজেরাই তো সেটা গ্রহণ করতে চাও না। জেনে রেখো, নিশ্চয় আল্লাহ সম্পদশালী ও প্রশংসিত। (সূরা বাক্বারা- ২৬৭)

অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কেবল পবিত্র জিনিসসমূহ থেকে দান করতে বলেছেন, যা থেকে দান করলে সওয়াবের আশা করা যায়। আর হারাম উপায়ে উপার্জিত সকল সম্পদ যেহেতু অপবিত্র, সুতরাং সেগুলো থেকে দান করলে কোন সওয়াবের আশা করা যায় না।

এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  : مَنْ كَانَتْ لَهٗ مَظْلَمَةٌ لِأَحَدٍ مِنْ عِرْضِه أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُوْنَ دِيْنَارٌ ، وَلَا دِرْهَمٌ إِنْ كَانَ لَهٗ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِه وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهٗ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِه فَحُمِلَ عَلَيْهِ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যদি কেউ তার ভাইয়ের মান-সম্মান অথবা অন্য কোন কিছুর উপর যুলুম করে থাকে, তাহলে সে যেন আজই তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে নেয়, সেদিন আসার পূর্বে যেদিন কোন টাকা-পয়সা কাজে আসবে না। সেদিন যদি তার নেক আমল থেকে থাকে, তাহলে যুলুম পরিমাণ অনুযায়ী নেক আমল থেকে কেটে নেয়া হবে। আর যদি নেক আমল না থাকে, তাহলে মাযলুম ব্যক্তির গুনাহসমূহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। [সহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৫৮০; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৭৩৬১; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১১৭৮০; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৩৫; জামেউস সগীর, হা/১১৪৫৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২২২২; মিশকাত, হা/৫১২৬।]

উল্লেখ্য যে, এ ক্ষেত্রে যদি সম্পদ খুবই সামান্য পরিমাণও হয়, তাহলেও উপরোক্ত পদ্ধতিতে দায়মুক্তি করে নেয়া আবশ্যক। কেননা হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ أُمَامَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ - - قَالَ مَنِ اقْتَطَعَ حَقَّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ بِيَمِيْنِه فَقَدْ أَوْجَبَ اللهُ لَهُ النَّارَ وَحَرَّمَ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ فَقَالَ لَهٗ رَجُلٌ وَإِنْ كَانَ شَيْئًا يَسِيْرًا يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ وَإِنْ قَضِيْبًا مِنْ أَرَاكٍ

আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার নিজ হাত দিয়ে কোন মুসলিমের হক খেয়ে ফেলে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব করে দেন এবং জান্নাত হারাম করে দেন। তখন একজন লোক তাকে জিজ্ঞেস করল, যদি তা সামান্য বসত্মু হয়? তিনি বললেন, যদিও তা আরাক গাছের ডাল পরিমাণও হয়। [সহীহ মুসলিম, হা/৩৭০; মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৪০৯; নাসাঈ, হা/৫৪১৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২২৯৩; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/২১২২৬; জামেউস সগীর, হা/১১০২১; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৮৪১; মিশকাত, হা/৩৭৬০।]

বেশি বেশি ভালো কাজ করা :

বেশি বেশি ভালো কাজ করলে সওয়াবের পাল্লা ধীরে ধীরে ভারি হতে থাকে এবং পাপের পাল্লা হালকা হতে থাকে। এভাবে এক সময় ভালো কাজগুলো পাপের কাজগুলোকে মিটিয়ে দেয় এবং এক সময় সওয়াব বৃদ্ধি পেতে থাকে। সুতরাং জীবনে উপার্জিত হারাম সম্পদের কথা ও পাপ কাজের কথা চিমত্মা করে বেশি বেশি ভালো কাজ করতে হবে। তাহলে হারাম উপার্জনের প্রভাব মিটে গিয়ে হালাল উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়বে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ﴾

নিশ্চয় ভালো কাজ মন্দ কাজকে মিটিয়ে দেয়। (সূরা হুদ- ১১৪)

আল্লাহর নিকট বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা :

যেহেতু হারাম উপার্জন করা একটি মারাত্মক ধরনের গুনাহ; সুতরাং এ থেকে পরিত্রাণের জন্য বেশি বেশি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কেননা কোন বান্দা অন্যায় করার পর তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَنْ يَّعْمَلْ سُوْٓءًا اَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهٗ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللهَ يَجِدِ اللهَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا﴾

আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করে অথবা নিজের প্রতি যুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু হিসেবেই পাবে। (সূরা নিসা- ১১০)