hadith book logo

হালাল রিযিকের সন্ধানে

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮২

৩. চাকুরি

নির্দিষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করার নামই হচ্ছে চাকুরি। ইসলাম উপার্জনের এ ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেছে। অনেক নবী ও রাসূল চাকুরির মাধ্যমে উপার্জন করে গেছেন। যেমন- মূসা (আঃ) শু‘আইব (আঃ) এর বাড়িতে চাকুরি করেছেন।

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ قَالَ : مَا بَعَثَ اللهُ نَبِيًّا إِلَّا رَعَى الْغَنَمَ فَقَالَ أَصْحَابُه وَأَنْتَ فَقَالَ نَعَمْ كُنْتُ أَرْعَاهَا عَلٰى قَرَارِيْطَ لِأَهْلِ مَكَّةَ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, মহান আল্লাহ পৃথিবীতে এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি, যিনি ছাগল চরাননি। তখন সাহাবীগণ বললেন, (হে আল্লাহর রাসূল!) আপনিও কি? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ- আমিও কয়েক কীরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরাতাম। [সহীহ বুখারী, হা/২২৬২; শারহুস সুন্নাহ, হা/২১৮৫; মিশকাত, হা/২৯৮৩।]

তবে এ ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত কতগুলো বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। যেমন-

১. দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতে হবে :

যিনি চাকুরি করবেন বা শ্রম দিবেন তাকে ঐ শ্রম দেয়ার জন্য যোগ্য হতে হবে। সুতরাং কোন ব্যক্তির এমন কোন পদে চাকুরির আবেদন করাও ঠিক নয়, যে পদে চাকুরি করার ক্ষমতা তার নেই। হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ ذَرٍّ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَلَا تَسْتَعْمِلُنِىْ قَالَ فَضَرَبَ بِيَدِه عَلٰى مَنْكِبِىْ ثُمَّ قَالَ يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ ضَعِيْفٌ وَإِنَّهَا أَمَانَةٌ وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْىٌ وَنَدَامَةٌ إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِىْ عَلَيْهِ فِيْهَا

আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বললাম, আপনি কি আমাকে কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিবেন না? এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর হাত আমার কাঁধের উপর রেখে বললেন, হে আবু যর! তুমি বড় দুর্বল ব্যক্তি। আর এ পদ হচ্ছে কঠিন আমানতের ব্যাপার। কিয়ামতের দিন তা-ই হবে লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ। তবে যে ব্যক্তি এ দায়িত্ব পূর্ণ যোগ্যতার সাথে গ্রহণ করবে এবং দক্ষতা ও সততার সাথে যথাযথভাবে তা পালন করবে তার বেলায় নয়। [সহীহ মুসলিম, হা/৪৭২৩; মুসনাদে তায়ালুসী, হা/৪৮৭; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/২০৭০৭; মুসত্মাদরাকে হাকেম, হা/৭০২০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/৩৩২০৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২১৭৬; মিশকাত, হা/৩৬৮২।]

২. বৈধ পন্থায় চাকুরি গ্রহণ করতে হবে :

চাকুরি গ্রহণ করার সময় অবশ্যই বৈধ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। নতুবা উক্ত চাকুরির মাধ্যমে উপার্জিত সমসত্ম সম্পদ হারাম হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে অনেক চাকুরির ক্ষেত্রেই অসৎ পন্থা প্রায়ই চোখে পড়ে। যেমন- ঘুষ প্রদান করা, স্বজনপ্রীতি করা, চাকুরির প্রশ্নপত্র ফাঁস করে নেয়া ইত্যাদি।

৩. ক্ষতিকর প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা যাবে না :

যেসব প্রতিষ্ঠান জনগণের বা মুসলিম জাতির ক্ষতি বয়ে আনে, সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা যাবে না। চাই সেটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক বা গার্মেন্টস হোক বা ঔষধ কম্পানিই হোক বা কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই হোক। সুতরাং যেসব ঔষধ কম্পানিতে ভেজাল ঔষধ তৈরি করে সেখানে চাকুরি করা যাবে না, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলাম বিরোধী আদর্শ শিক্ষা দেয়া হয় সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকুরি করা যাবে না, যেসব পানীয় জনগণের জন্য ক্ষতিকর সেসব পানীয় তৈরির কম্পানিতে চাকুরি করা যাবে না। এভাবে চাকুরির ক্ষেত্রে এ দিকটি যথাযথভাবে লক্ষ্য রেখে চাকুরি করতে হবে।

৪. ঈমান ও আমলের ক্ষতি করে এমন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা যাবে না :

যেসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করলে ঈমান বা ফরয আমলের কোন ক্ষতি হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা যাবে না। যেমন- অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলোতে নামায আদায় করার জন্য সময় দেয়া হয় না বা বাধা দেয়া হয়, রোযা রাখতে বাধা দেয়া হয়, টাখনুর নিচে কাপড় পরতে বাধ্য করা হয়, নারী কর্মীদেরকে পর্দা বর্জন করতে বাধ্য করা হয়। সুতরাং যেসব প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা যাবে না।

৫. অন্যায় কাজে সহযোগিতামূলক চাকুরি করা যাবে না :

যেসব কাজ ইসলামে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, সেসব কাজে কোন ধরনের সহযোগিতা হবে- এমন কোন প্রতিষ্ঠানে বা পদেও চাকুরি করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْاِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللهَؕ اِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ﴾

তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার বিষয়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের বিষয়ে একে অন্যের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে খুবই কঠোর। (সূরা মায়েদা- ২)

তাই যেসব প্রতিষ্ঠানে সুদ, ঘুষ, ধোঁকা, প্রতারণা ইত্যাদি বিদ্যমান সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা যাবে না। যেসব প্রতিষ্ঠান আল্লাহর আইন বাসত্মবায়নে বাধা প্রদান করে সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা যাবে না। কেননা এগুলোতে চাকুরি করা মানেই তাদেরকে সহযোগিতা করা।

৬. চাকুরিজীবিকে নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে :

যিনি চাকুরি করবেন তাকে অবশ্যই তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে। অন্যথায় যদি কেউ তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলা করে বা ফাঁকিবাজি করে, তাহলে তার ঐ অবহেলিত সময়ের পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ হবে না। সুতরাং চাকুরিজীবিকে অবশ্যই পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে, আমত্মরিকতা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। হাদীসে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : كُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِه وَالْإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِه وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِيْ أَهْلِه وَمَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِه وَالْمَرْأَةُ فِيْ بَيْتِ زَوْجِهَا رَاعِيَةٌ وَمَسْؤُوْلَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا وَالْخَادِمُ فِيْ مَالِ سَيِّدِه رَاعٍ وَمَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِه قَالَ وَحَسِبْتُ أَنْ قَدْ قَالَ وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِيْ مَالِ أَبِيْهِ

ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নেতা একজন রক্ষক; তাকে তার অধীনস্তদের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের লোকজনদের রক্ষক; তাকে তার অধীনস্তদের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের রক্ষক; তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। খাদেম তার মালিকের রক্ষক। আর এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ইবনে উমর (রাঃ) বলেন, আমার মনে হয় তিনি এও বলেছেন, ছেলে তার বাপের সম্পদের রক্ষক। [সহীহ বুখারী, হা/২৭৫১; মু‘জামুল আওসাত, হা/৩৮৯০; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১২৪৬৬; মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হা/২০৬৪৯।]

৭. দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকতে হবে :

যে চাকুরি করবে তাকে অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ ঘুষ গ্রহণ করা, আত্মসাৎ করা, স্বজনপ্রীতি করা, অন্যায়ভাবে কাউকে সুযোগ সুবিধা প্রদান করা, কারো প্রতি যুলুম করা ইত্যাদি কাজ থেকে মুক্ত হতে হবে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ لَعَنَ رَسُوْلُ اللهِ - - الرَّاشِىَ وَالْمُرْتَشِىَ .

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষ দাতা ও গ্রহীতাকে লানত করেছেন। [আবু দাউদ, হা/৩৫৮২; তিরমিযী, হা/১৩৩৭; ইবনে মাজাহ, হা/২৩১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৫৩২; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৫০৭৭; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২২১১; মিশকাত, হা/৩৭৫৩।]