hadith book logo

হালাল রিযিকের সন্ধানে

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৮

নির্ধারিত রিযিকের উপর সমত্মুষ্ট থাকার উপায়

নিম্নসত্মরের লোকদের প্রতি দৃষ্টি দেয়া :

নিজের তাকদীরে লিপিবদ্ধ রিযিকের উপর সমত্মুষ্ট থাকার জন্য সর্বদা অপেক্ষাকৃত নিচের সত্মরের লোকদের দিকে তাকাতে হবে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -- اُنْظُرُوْا إِلٰى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوْا إِلٰى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوْا نِعْمَةَ اللهِ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকদের প্রতি দৃষ্টি দাও এবং তোমাদের চেয়ে উঁচু স্তরের লোকদের দিকে দৃষ্টি দিয়ো না। কেননা আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ না ভাবার এটাই উত্তমপন্থা। [সহীহ মুসলিম, হা/৭৬১৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০২৫১।]

ইমাম ইবনে জারির বলেছেন, এ হাদীসে সব ধরনের কল্যাণের কথা রয়েছে। কারণ মানুষ যখন দুনিয়াবী বিষয়ে তার উপরের (সত্মরের লোকদের) দিকে তাকায়, তখন সে তার ন্যায় নিয়ামত প্রত্যাশা করে। আর তার নিকট রক্ষিত আল্লাহর নিয়ামতকে সে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখে। আরো অধিক কামনা করে তার সমকক্ষ বা নিকটবর্তী হওয়ার জন্য। আর এটাই মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। আর যদি দুনিয়াবী বিষয়ে তার নিচের (সত্মরের লোকদের) দিকে তাকায়, তখন তার সামনে আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশিত হবে, ফলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে, বিনয়ী হবে ও কল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করবে। [জালালুদ্দীন সুয়ূতী, আদ-দীবাজু ‘আলাল মুসলিম, ৬/২৭৬ পৃঃ।]

সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা :

বর্তমানে প্রায় সকলের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, সচ্ছলতা সম্মানের প্রতীক এবং অসচ্ছলতা অসম্মানের প্রতিক। সুতরাং আমরা যাকে সচ্ছল হিসেবে দেখতে পাই তার ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করে থাকি এবং যাকে অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল হিসেবে দেখতে পাই তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে থাকি। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে বাসত্মবতা হচ্ছে এর বিপরীত। কেননা কাউকে সচ্ছলতা দান করা বা না করাটা আল্লাহর একটি পরীক্ষা। আল্লাহ তা‘আলা এর মাধ্যমে যাকে ইচ্ছা পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَاَمَّا الْاِنْسَانُ اِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهٗ فَاَكْرَمَهٗ وَنَعَّمَهٗ فَيَقُوْلُ رَبِّيْۤ اَكْرَمَنِ – وَاَمَّاۤ اِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهٗ فَيَقُوْلُ رَبِّۤيْ اَهَانَنِ﴾

মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন এবং সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন তখন সে বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। আবার যখন তাকে পরীক্ষা করেন এবং রিযিক সঙ্কুচিত করে দেন তখন সে বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে তুচ্ছ করেছেন। (সূরা ফাজর- ১৫, ১৬)

আল্লাহর সিদ্ধামেত্মর ব্যাপারে সমত্মুষ্ট থাকা :

আল্লাহই একমাত্র রিযিকের মালিক। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে অধিকহারে রিযিক দিয়ে থাকেন; আবার যাকে ইচ্ছা তার রিযিক হ্রাস করে থাকেন। সুতরাং কারো অধিক রিযিক দেখে এটা মনে করা যাবে না, তাকে এতো এতো রিযিক দেয়া হলো, তাহলে আমাকে কেন দেয়া হলো না অথবা একজন ধনী লোককে যেরূপ রিযিক দেয়া হয়েছে সেরূপ আমাকে দেয়া হলো না কেন। বরং এটা মনে করতে হবে যে, আল্লাহ আমাকে যতটুকু রিযিক দিয়েছেন সেটা হচ্ছে তাঁর অনুগ্রহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوْ بَسَطَ اللهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهٖ لَبَغَوْا فِى الْاَ رْضِ وَلٰكِنْ يُّنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا يَشَآءُۚ اِنَّهٗ بِعِبَادِهٖ خَبِيْرٌ ۢبَصِيْرٌ﴾

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রিযিক বাড়িয়ে দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছানুযায়ী পরিমাণ মতো দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সবকিছু জানেন এবং দেখেন। (সূরা শূরা- ২৭)

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ঐ ব্যক্তি প্রকৃত সফল, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে আর তাকে জীবন ধারণে (অভাবও নয়; বিলাসও নয়) পরিব্যাপ্ত পরিমাণ রিযিক দেয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে তুষ্টও করেছেন। [সহীহ মুসলিম, হা/২৪৭৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৫৭২; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৮১২১; মুসত্মাদরাকে হাকেম, হা/৭১৪৯; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৮২৯; মিশকাত, হা/৫১৬৫।]

রিযিক বণ্টনের অধিকার আল্লাহর- এ বিশ্বাস রাখা :

আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর সবকিছুর ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যার উপর ভিত্তি করে সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলা সকল প্রাণীর রিযিক বণ্টনের উপরও একটি ভারসাম্য তৈরি করে দিয়েছেন, যার উপর ভিত্তি করে তাদের জীবন নির্বাহ হয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَّعِيْشَتَهُمْ فِى الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيًّاؕ وَرَحْمَةُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ﴾

আমিই তাদেরকে তাদের পার্থিব জীবনে জীবিকা বণ্টন করি এবং একজনকে অপরজনের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি, যাতে একে অপর থেকে সেবা নিতে পারে। আর তারা যা জমা করে তা হতে তোমার প্রতিপালকের রহমত খুবই উৎকৃষ্ট। (সূরা যুখরুফ- ৩১, ৩২)

পরকালের জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়া :

পার্থিব জীবন মানুষকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেয়। তাই পার্থিব জীবনের উপর পরকালকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং পরকালের নিয়ামতের প্রতি আকৃষ্ট হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا ‐ وَالْاٰخِرَةُ خَيْرٌ وَّاَبْقٰى﴾

কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাক। অথচ আখিরাতের জীবনই উত্তম ও চিরস্থায়ী। (সূরা আলা- ১৬, ১৭)