hadith book logo

শামায়েলে তিরমিযী

লেখকঃ মুহাম্মাদ বিন ঈসা আত তিরমিযী (রহ.) • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

অধ্যায়- ২ : নবী ﷺ এর মোহরে নবুওয়াত

خَاتَمٌ অর্থ- আংটি, মোহর, সীল। মোহরে নবুওয়াত হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দু’কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত একটি গোশতের টুকরা। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নবুওয়াতের নিদর্শন; আর এ নিদর্শনের কথা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহেও বর্ণিত ছিল।

নবী ﷺ এর দু’কাঁধের মধ্যভাগে মোহরে নবুওয়াত ছিল :

عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيْدَ يَقُوْلُ : ذَهَبَتْ بِي خَالَتِيْ اِلَى النَّبِيِّ فَقَالَتْ : يَا رَسُوْلَ اللهِ ، اِنَّ ابْنَ أُخْتِي وَجِعٌ . فَمَسَحَ رَأْسِيْ وَدَعَا لِيْ بِالْبَرَكَةِ ، وَتَوَضَّاَ ، فَشَرِبْتُ مِنْ وَضُوْئِهٖ ، وَقُمْتُ خَلْفَ ظَهْرِهٖ ، فَنَظَرْتُ اِلَى الْخَاتَمِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ ، فَاِذَا هُوَ مِثْلُ زِرِّ الْحَجَلَةِ

১২. সায়িব ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমার খালা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে গেলেন। এরপর তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাগ্নে অসুস্থ। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার মাথায় হাত বুলালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু‘আ করলেন। তারপর তিনি ওযূ করলেন। আমি তাঁর ওযূর অবশিষ্ট পানি পান করলাম এবং তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সহসা তাঁর দু’কাঁধের মধ্যস্থ মোহরে নবুওয়াতের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে, যা দেখতে পাখির (কবুতরের) ডিমের মতো। [সহীহ বুখারী, হা/১৯০; সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩৩; মু‘জামুল কাবীর, হা/৬৫৪০; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬২২; মিশকাত, হা/৪৭৬।]

তা ছিল ডিমের ন্যায় লাল গোশতপিন্ড :

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ : رَاَيْتُ الْخَاتَمَ بَيْنَ كَتِفَيْ رَسُوْلِ اللهِ غُدَّةً حَمْرَاءَ مِثْلَ بَيْضَةِ الْحَمَامَةِ

১৩. জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দু’কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত দেখেছি। আর তা যেন ছিল ডিমের ন্যায় লাল গোশতপিন্ড। [সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১০৩৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৭; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৬৩০১; জামেউস সগীর, হা/৮৯৩৯; মিশকাত, হা/৫৭৭৯।]

সাহাবীগণ ইচ্ছে করলে মোহরে নবুওয়াতকে চুম্বন করতে পারতেন :

عَنْ رُمَيْثَةَ قَالَتْ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ، وَلَوْ اَشَاءُ اَنْ أُقَبِّلَ الْخَاتَمَ الَّذِيْ بَيْنَ كَتِفَيْهِ مِنْ قُرْبِهٖ لَفَعَلْتُ ، يَقُوْلُ لِسَعْدِ بْنِ مُعَاذٍ يَوْمَ مَاتَ : اهْتَزَّ لَهٗ عَرْشُ الرَّحْمٰنِ

১৪. রুমায়সা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা‘দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) এর ওফাতের দিন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি যে, তাঁর মৃত্যুতে রহমান (আল্লাহ তা‘আলা) এর আরশ কেঁপে উঠেছিল। রুমায়ছা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন এ উক্তি করেন তখন আমি তাঁর এত নিকটে ছিলাম যে, ইচ্ছে করলে তাঁর মোহরে নবুওয়াত চুম্বন করতে পারতাম। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৮৩৬; মু‘জামুল কাবীর, হা/২০১৬৫; মা‘রেফাতুস সাহাবা, হা/৭০০৫।]

সেটি ছিল এক গুচ্ছ কেশের মতো :

عَنْ اَبِىْ زَيْدٍ عَمْرُو بْنُ اَخْطَبَ الْاَنْصَارِيُّ قَالَ : قَالَ لِيْ رَسُوْلُ اللهِ  : يَا اَبَا زَيْدٍ ، اُدْنُ مِنِّي فَامْسَحْ ظَهْرِيْ ، فَمَسَحْتُ ظَهْرَهٗ، فَوَقَعَتْ اَصَابِعِيْ عَلَى الْخَاتَمِ قُلْتُ : وَمَا الْخَاتَمُ ؟ قَالَ : شَعَرَاتٌ مُّجْتَمِعَاتٌ

১৫. আবু যায়েদ আমর বিন আখতাব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, হে আবু যায়েদ! আমার কাছে এসো এবং আমার পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাও। তখন আমি তাঁর পিঠে হাত বুলাতে থাকলাম। এক পর্যায়ে আমার আঙ্গুলগুলো মোহরে নবুওয়াতের উপর লেগে গেল। বর্ণনাকারী আমর বিন আখতাব (রাঃ) কে বললেন, ‘খাতাম’ (মোহরে নবুওয়াত) কী জিনিস? তিনি বললেন, এক গুচ্ছ কেশ। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৯৪০; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৮।]

সালমান ফারসি (রাঃ) মোহরে নবুওয়াত দেখে ঈমান এনেছিলেন :

عَنْ اَبِيْ بُرَيْدَةَ ، يَقُوْلُ : جَاءَ سَلْمَانُ الْفَارِسِيُّ اِلٰى رَسُوْلِ اللهِ حِيْنَ قَدِمَ الْمَدِيْنَةَ بِمَائِدَةٍ عَلَيْهَا رُطَبٌ فَوَضَعَهَا بَيْنَ يَدَيْ رَسُوْلِ اللهِ ، فَقَالَ : يَا سَلْمَانُ مَا هٰذَا ؟ فَقَالَ : صَدَقَةٌ عَلَيْكَ وَعَلٰى اَصْحَابِكَ ، فَقَالَ : اِرْفَعْهَا ، فَاِنَّا لَا نَأْكُلُ الصَّدَقَةَ قَالَ : فَرَفَعَهَا ، فَجَاءَ الْغَدَ بِمِثْلِهٖ ، فَوَضَعَهٗ بَيْنَ يَدَيْ رَسُوْلِ اللهِ ، فَقَالَ : مَا هٰذَا يَا سَلْمَانُ ؟ فَقَالَ : هَدِيَّةٌ لَّكَ ، فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ لِاَصْحَابِهٖ : اُبْسُطُوْا . ثُمَّ نَظَرَ اِلَى الْخَاتَمِ عَلٰى ظَهْرِ رَسُوْلِ اللهِ فَاٰمَنَ بِهٖ وَكَانَ لِلْيَهُوْدِ فَاشْتَرَاهُ رَسُوْلُ اللهِ بِكَذَا وَكَذَا دِرْهَمًا عَلٰى اَنْ يَّغْرِسَ لَهُمْ نَخْلًا فَيَعْمَلَ سَلْمَانُ فِيْهِ حَتّٰى تُطْعِمَ فَغَرَسَ رَسُوْلُ اللهِ النَّخلَ اِلَّا نَخْلَةً وَّاحِدَةً غَرَسَهَا عُمَرُ فَحَمَلَتِ النَّخْلُ مِنْ عَامِهَا وَلَمْ تَحْمِلْ نَخْلَةٌ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ مَا شَأْنُ هٰذِهِ النَّخْلَةِ فَقَالَ عُمَرُ يَا رَسُوْلَ اللهِ اَنَا غَرَسْتُهَا فَنَزَعَهَا رَسُوْلُ اللهِ فَغَرَسَهَا فَحَمَلَتْ مِنْ عَامِهَا

১৬. আবু বুরায়দা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মদিনায় হিজরতের পর একবার সালমান ফারসী (রাঃ) একটি পাত্রে কিছু কাঁচা খেজুর নিয়ে এলেন এবং তিনি তা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সামনে রাখলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে সালমান! এগুলো কিসের খেজুর? (অর্থাৎ হাদিয়া না সাদাকা?) তিনি বললেন, এগুলো আপনার ও আপনার সাথীদের জন্য সাদাকা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এগুলো তুলে নাও। আমরা সাদাকা খাই না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি তা তুলে নিলেন। পরের দিন তিনি অনুরূপ খেজুর নিয়ে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সামনে পেশ করেন। তখন তিনি বললেন, সালমান! এসব কিসের খেজুর? সালমান (রাঃ) বললেন, আপনার জন্য হাদিয়া। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা হস্ত প্রসারিত করো (হাদিয়া গ্রহণ করো)। এরপর সালমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পৃষ্ঠদেশে মোহরে নবুওয়াত দেখতে পেলেন; অতঃপর ঈমান আনলেন।

(বর্ণনাকারী বলেন) সালমান (রাঃ) জনৈক ইয়াহুদির গোলাম ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে এত এত দিরহামের বিনিময়ে এবং এ শর্তে খরিদ করেন যে, সালমান তাঁর ইয়াহুদি মনিবের জন্য একটি খেজুর বাগান করে দেবে এবং তাতে ফল আসা পর্যন্ত তত্ত্বাবধান করতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নিজ হাতে একটি চারা ছাড়া সবগুলো রোপণ করলেন এবং একটি চারা গাছ ওমর (রাঃ) রোপণ করেছিলেন। সে বছরই সকল গাছেই খেজুর আসল কিন্তু একটি গাছে খেজুর আসল না। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এ গাছটির এ অবস্থা কেন? উমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এটি রোপণ করেছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ চারাটি উপড়িয়ে আবার রোপণ করলেন। ফলে সে বছরই তাতে খেজুর আসল। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৪৭; শারহুল মা‘আনী, হা/২৯৮৬; মুসনাদুল বাযযার, হা/৪৪০৭।]

ব্যাখ্যা : إِنَّا لَا نَأْكُلُ الصَّدَقَةَ ‘আমরা সাদাকা ভক্ষণ করি না’ এ বাক্যের মধ্যে আমরা দ্বারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর ঐ সমস্ত আত্মীয়-স্বজনকে বুঝানো হয়েছে, যাদের জন্য সাদাকা খাওয়া হারাম।

এটি ছিল এক টুকরো বাড়তি গোশত :

عَنْ اَبِيْ نَضْرَةَ الْعَوَقِيِّ قَالَ : سَاَلْتُ اَبَا سَعِيْدٍ الْخُدْرِيِّ عَنْ خَاتَمِ رَسُوْلِ اللهِ يَعْنِي خَاتَمَ النُّبُوَّةِ - فَقَالَ : كَانَ فِي ظَهْرِهٖ بَضْعَةٌ نَاشِزَةٌ

১৭. আবু নজর আওয়াকী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মোহরে নবুওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, তা ছিল তাঁর পৃষ্ঠদেশের উপর এক টুকরো বাড়তি গোশত। [জামেউস সগীর, হা/৮৯৩৯; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২০৯৩।]

এটি ছিল মুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুলীর ন্যায়, আর এর চারপার্শ্বে আচিলের মতো কতগুলো তিলক ছিল :

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَرْجِسَ قَالَ : اَتَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ وَهُوَ فِي نَاسٍ مِّنْ اَصْحَابِهٖ، فَدُرْتُ هٰكَذَا مِنْ خَلْفِهٖ ، فَعَرَفَ الَّذِي أُرِيْدُ ، فَاَلْقَى الرِّدَاءَ عَنْ ظَهْرِهٖ ، فَرَاَيْتُ مَوْضِعَ الْخَاتَمِ عَلٰى كَتِفَيْهِ مِثْلَ الْجُمْعِ حَوْلَهَا خِيْلَانٌ كَاَنَّهَا ثَاٰلِيْلُ ، فَرَجَعْتُ حَتّٰى اسْتَقْبَلْتُهٗ ، فَقُلْتُ : غَفَرَ اللهُ لَكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ ، فَقَالَ : وَلَكَ فَقَالَ الْقَوْمُ : اَسْتَغْفَرَ لَكَ رَسُوْلُ اللهِ ؟ فَقَالَ : نَعَمْ ، وَلَكُمْ ، ثُمَّ تَلَا هٰذِهِ الْاٰيَةَ ﴿وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْۢبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ﴾

১৮. আবদুল্লাহ ইবনে সারজিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আসলাম। তখন তিনি তাঁর সাহাবীগণের মাঝে ঘুরতেছিলেন। এক পর্যায়ে আমি তাঁর পিছু ধরলাম। তিনি আমার মনোবাঞ্ছনা বুঝতে পেরে পিঠ থেকে চাদর সরিয়ে ফেলেন। তখন আমি তাঁর দু’কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত দেখতে পাই। আর তা ছিল মুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুলীর ন্যায় এবং এর চারপার্শ্বে আচিলের মতো কতগুলো তিলক শোভা পাচ্ছিল। এরপর আমি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। তখন তিনি বললেন, তোমাকেও ক্ষমা করুন। তারপর লোকে আমাকে বলতে লাগল, তুমি বড়ই সৌভাগ্যবান। রাসূলুল্লাহ ﷺ তোমার মাগফিরাত কামনা করেছেন। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ- তিনি তোমাদের জন্যও দু‘আ করেছেন। এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন-

﴿وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْۢبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِ﴾

(হে রাসূল!) আপনি আপনার জন্য এবং মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন। (সূরা মুহাম্মাদ- ১৯) [সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১১৪৩২; মা‘রেফাতুস সাহাবা, হা/৩৭৩১।]

- بَابُ مَا جَاءَ فِيْ شَعْرِ رَسُوْلِ اللهِ